ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

এর আগে ‘দেশ কি ভাল চলছে না?’ শিরোনামে একটি ব্লগ লিখে সমালোচিত হতে হয়েছিল আমাকে। বন্ধুরা আমার মুখের দিকে চেয়ে যে নিজেদেরকে সংযত রেখেছিলেন তাও আমি টের পেয়েছিলাম। তবে বিশ্বমন্দার কালে সরকার দেশ যেভাবে চালিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাতে সরকারকে কৃতিত্ব দিতে আমার এখনও অনীহা নেই। সরকার সমালোচিত হচ্ছে কেন তা আমি সে লেখাটিতে তিনটি ভাগ করে দেখাতে চেয়েছিলাম। প্রথম ভাগটির মধ্যে অনেকেই প্রশ্রয়ের সুর শুনেছিলেন। তবে আশার কথা হলো, খোদ মূল সরকারী দল ও তার শরিক দলগুলো খোদ সংসদেই এবার নিজেদের শাসন নিয়ে এমন সমালোচনায় মুখর হয়েছেন যার মধ্যে প্রশ্রয়ের সুরটুকু পর্যন্ত নেই। এটি আমাদের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী কিন্তু ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক ঘটনা। এজন্য সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার কাজ করেছে তাতে সন্দেহ নেই।

এতদিন ধরে আমরা সরকারের মুখে কেবল সরকারের সাফল্যের বন্দনা-গীত এবং বিরোধী দলের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড, দেশকে পিছিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র ও সরকারকে ব্যর্থ করার তৎপরতার নিন্দা-গীত শুনে আসছিলাম। এই গীতিমালা নতুন কিছু নয়। বিএনপি’র আমলেও আমরা শুনেছি, আগের আমলের আওয়ামী লীগের কণ্ঠেও শুনেছি। তবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর বৈশিষ্ট্য এমন যে গলা অবধি ডুবলেও তারা তারস্বরে এতাদৃশ বন্দনা-নিন্দা-গীত গাইতে কার্পণ্য করে না। এবার যখন নিজেদের মুখে নিজেদের সমালোচনার ঝড় উঠেছে তখন অনুমান করা যায় যে তাদের নাক-চোখও যে তলিয়ে যাচ্ছে তা তারা বুঝে গিয়েছেন। ফলে জনমনে যে অস্বস্তি বিরাজ করছে তা যে সর্বাংশে বিরোধী দলের রটনা বা কারসাজির ফল নয় তা এখন সরকারের সমর্থকদের মুখের উপরও প্রভাব ফেলেছে।

চার চারটি বছর পর বিলম্বে হলেও সরকারের বোধের উদয় হয়েছে। নির্বাচনের আরও এক বছর বাকী। এই এক বছরকে যদি নেহায়েত কম সময় মনে করা না যায় তবে সরকারের করণীয় আছে অনেক কিছু। সরকার সেসব করণীয় কাজে এবার মন দিক এটাই জনগণ প্রত্যাশা করবে বলে আশা করা যায়। অন্যদিকে, কয়েকদিন ধরে লাগাতার হরতাল দিয়েও বিএনপি ইলিয়াস আলীকে উদ্ধার করতে পারেনি। এর পর বিরাট সমাবেশ করে রোজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করে বিএনপি ও তার সহযোগী দলগুলো আপাতত শান্ত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটিও একটি ভাল কথা, আশার কথা।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংকট, খুন-গুম, শেয়ার বজার কেলেঙ্কারি, বিরোধী দলের সমাবেশে প্রকাশ্যে বাধা দেয়া ইত্যাদি সংক্রান্ত যন্ত্রণার ইতি ঘটেনি বটে, কিন্তু তা এখন জনগণের চিন্তায় পুরনোও হয়ে গেছে। তাদের মনে এখন প্রধান শঙ্কা, উৎকণ্ঠা ও তাদের সামনে প্রধান সংকট আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে তা নিয়ে। আমাদের মনে আছে, অনির্বাচিত, অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী ও তার পক্ষে যত যুক্তি তা সবই উদগত হয়েছিল বর্তমান সরকারী দলের মাথা থেকে। তখন বিএনপি যা যা বলেছিল তা সব এখন শুনতে হচ্ছে সেই আওয়ামী লীগের মুখ থেকে। এবার অবশ্য নতুন যুক্তিও যুক্ত হয়েছে। আদালতের নির্দেশনার সুবিধাজনক অংশটুকু আর গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকাণ্ড। অবশ্য আমাদের এও মনে আছে যে, সেই সরকারটি নাকি ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল এবং তাদের কাজের বৈধতা দেয়ার অগ্রিম আশ্বাসও আমরা শুনেছিলাম।

ক্ষমতার জন্য রাজনীতির বহুরূপ দেখতে আমরা অনভ্যস্ত নই। বিএনপি এবার বলছে সেই কথা যার বিরোধিতা সে নিজেই করেছিল আগের বার। যাই হোক, বিএনপি এবার বলতেই পারি যে, আমাদের আগে অত জ্ঞান ছিল না, যত জ্ঞান আওয়ামী লীগের ছিল। কিন্তু যে শিক্ষা তাদের কাছ থেকে পাওয়ার সুযোগ, মূর্খতা দূর করার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছিল সেই গুরুজি নিজেই এবার নিজের দেয়া জ্ঞান কী করে নিজেই ভুলে গেল! এই সেদিন রাশেদ খান মেনন সংবিধান আবার সংশোধনের প্রস্তাব করলেন, আর সুরঞ্জিত বাবু বিনা বিলম্বেই তার অসম্ভবপরতার কথাটিও জানিয়ে দিলেন সাফ।

গেলবার আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে একেবারে প্রথমেই সদলবলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে তারপর আন্দোলন জোরদার করেছিল। আমরা জানি লেবুর রসের জন্য ফুটো করে চাপাচাপি করতে হয়, তবেই রস বেরোয়। ফুটো বন্ধ করে চিপলে বেচারা লেবুর ত্রাহি অবস্থা হলেও রস পাওয়া যায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার-রূপ রস বেরুতে পারে কেবল সংসদ থেকে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে – তাও আবার দুই তৃতীয়াংশের সমর্থনে। পদত্যাগের ফলে দুই তৃতীয়াংশে ঘাটতি পড়ল ও রস বেরুবার ফুটো গেল বন্ধ হয়ে। তখন সংবিধানের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য সংবিধান – এমন মহৎ (?) কথাও আমরা শুনেছিলাম। শুনেছিলাম সংবিধান ভঙ্গ করে নির্বাচন দাও, পরে সংসদে তার বৈধতা দেয়া যাবে – এমন অসাংবিধানিক পরামর্শও। তবে সে পরামর্শে কান না দিয়ে বিএনপিকে একটি একতরফা নির্বাচন করে জাত-মান খুইয়ে তড়িঘড়ি করে সংবিধান বদলে সংসদ ভেঙ্গে দিতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারকে জনগণ যে ভূমিধ্বস জয় দিয়েছে তাতে বিএনপির পিচ্চি সংসদীয় দলটি সংসদে না গেলেও ফুটো বন্ধ হবার কোন সুযোগ নেই। এ অবস্থায় সরকার নিজেই চিন্তা করে একটি ভাল সমাধান এখনও বের করতে পারে। আদালতও এতে বাধ সাধার মত কিছু করেনি বা বলেনি।

তবে বিএনপিকেও একটি সৎপরামর্শ দেয়া যায়। হৈ-হাঙ্গামা করে তোমরা গুম ইলিয়াসকে যেমন উদ্ধার করতে পারনি, তেমনই হৈ-হাঙ্গামা করে সরকারের ঘুমও ভাঙ্গাতে পারবে না। সরকার যতটুকু দিতে চায় তা নিয়েই তোমরা নির্বাচনে যাও। এবার যদি এভাবে নির্বাচনে জিততে না পার তবে রাজনীতি করার দরকার কী? কারচুপি করে সতেরকে বিশ করা যায়, পনেরকে পঁচিশ করা যায় না। এই সুযোগে এবার যদি তোমাদের জিত হয় তবে পরের নির্বাচনে তোমরা উনিশকে বিশ করতে পারবে। তখন আমাদেরও দেখার সুযোগ হবে তোমাদের অধীনে পরের নির্বাচনের আগে আজকের আওয়ামী লীগ নতুন কোন নৃত্যগীতের আসরটি বসায়। কাজেই শান্ত আছ, শান্তই থাক।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী