ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

একটি সমাজ সভ্যতা-সংস্কৃতির বিচারে কতটুকু উৎকর্ষতা অর্জন করেছে জেলখানা তার প্রকৃত সূচক হিসেবে কাজ করতে পারে। কোন সমাজের কারাগারের অবস্থা কিরকম, সেখানে অভিযুক্তদের সাথে, সাজাপ্রাপ্তদের সাথে কিরূপ আচরণ করা হয়, তা-ই সে সমাজের সাংস্কৃতিক উন্নতির মান নির্ধারণের মোক্ষম উপায়। একই কথা প্রযোজ্য ধৃত বিদেশী গুপ্তচর ও যুদ্ধবন্দীদের বেলাতেও। দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, ক্রীড়া এসব ক্ষেত্রে অর্জন সব বাদ দিয়ে জেলখানায় যাওয়া যেতে পারে একটি সমাজকে চেনবার জন্য।

কোরানে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহ একদিকে মুসলিমদেরকে ভর্ৎসনা করছেন যুদ্ধে কৌশলগত ভ্রান্তির জন্য, আবার একই সাথে তাদের প্রশংসা করছেন নিজেরা না খেয়ে, নিজেদের খাবারের উত্তম অংশ যুদ্ধবন্দীদেরকে দেয়ার জন্য। আরেকটি উদাহরণ এখানে দেয়া যায়। নবীপত্নী আয়েশা আবু বকরের কন্যা। নিজ কন্যা, এবং নিজ জীবনের চেয়েও প্রিয়তর নবীর পত্নীর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় অংশ নেয়ার কারণে যে মুসলিম কবি সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তাঁকে প্রতিমাসে ব্যক্তিগতভাবে ভাতা হিসেবে অর্থ দিয়ে আসছিলেন আবু বকর। এ রটনার ঘটনা আয়েশাকে, নবীকে, আবু বকরকে এবং সমগ্র মুসলিম সমাজকে কতদূর বিব্রতকর অবস্থায়, মানসিক যাতনায় ফেলেছিল তা অনুমান করতে পারেন কি? এরূপ ঘটনার পর একজন পিতার মানসিক অবস্থা অনুমান করতে পারেন কি? এটা কতখানি কষ্টকর তা কন্যার পিতারা ভালই বুঝতে পারেন। কাজেই আবু বকর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি তাকে এই ভাতা আর প্রদান করবেন না। কিন্তু আল্লাহ কোরানে এই সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেননি, বরং ভাতা প্রদান অব্যাহত রাখার আদেশ করেন। এই আদেশ সকল মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য হয়ে আছে।

কোন সমাজটি উন্নত? যেখানে মানুষেরা শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনায় ব্যস্ত থেকেও সম্পদ, শিল্পকলায় উন্নত; নাকি যেটি শিল্পকলা, দর্শন, প্রযুক্তি ইত্যাদিতে পশ্চাৎপদতা সত্ত্বেও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, মমতা এবং তাদের মধ্যকার অপরাধীদের প্রতি মানবিক আচরণে শ্রেষ্ঠ?

মার্মাডিউক পিকথলের লেখা একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম ইংল্যান্ডের একটি জরিপের কথা। সেখানে একটি হাইপথেটিক্যাল সিচুয়েশন দিয়ে একটি সিদ্ধান্তের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। অবস্থাটি ছিল এরূপ। মনে করুন একটি ঘরে আগুন লাগল যে ঘরটিতে একটি শিশু অবস্থান করছে ও একটি প্রাচীন গ্রীক ভাস্কর্য রয়েছে। ভাস্কর্যটি অনন্য ও নিপুণ যা পুড়ে গেলে আর কোনদিন তা বা তার মত আরেকটি পাওয়া যাবে না। কিন্তু আপনি এদের যে কোন একটিকেই কেবল রক্ষা করতে পারবেন। অবস্থা এমন যে, দুটিকে কোনভাবেই একসাথে রক্ষা করতে পারবেন না; একটিকে রক্ষা করতে এগোলে ততক্ষণে অন্যটি পুড়ে যাবে।

এই অবস্থায় আপনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন? পশ্চিমা বিদ্বজ্জন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিকদের কাছে এর উত্তর চাওয়া হয়েছিল। তাদের বেশীর ভাগেরই সিদ্ধান্ত ছিল ভাস্কর্যটি রক্ষা করতে হবে। মানব শিশু প্রতিদিন গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায় এবং প্রতিটি মানুষ স্বল্পকাল মাত্র বেঁচে একদিন না একদিন মারা যায়। কিন্তু ভাস্কর্যটি, যেটির কোন বিকল্প নেই, মানব জাতির অমূল্য সাংস্কৃতিক অর্জন যা টিকে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, মানব জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে। আজ আমি বা আপনি হয়তো চট করে বলে দেব, না! আমরা শিশুটিকেই রক্ষা করব, চুলায় যাক ভাস্কর্য। কিন্তু সমগ্র বিশ্বের সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড কি ভিন্ন কথা বলে না?

এবার আমি মুসলিমদের জন্য একটি হাইপথেটিক্যাল সিচুয়েশন দেই। মনে করুন একদল ইসলাম-বিদ্বেষী কাবা ঘর ধ্বংস করতে একত্রিত হয়ে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে, একদল মুসলিম কিছু খৃস্টান বা ইহুদির একটি কাফেলাকে হত্যা করে তাদের সম্পদ ছিনতাই করতে এগোচ্ছে। আপনার হাতে কেবল এতটুকু শক্তি ও সুযোগ রয়েছে যা দিয়ে যে কোন একটি অপরাধী দলকে বিরত করতে সক্ষম হবেন। এখন আপনি কী করবেন? কাবা রক্ষা করতে যাবেন? নাকি খৃস্টান বা ইহুদি রক্ষা করতে যাবেন? হয়তো এখানেও আমরা দ্বিতীয় বিকল্পটির পক্ষেই কথা বলব। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। ভারতের হিন্দুরা মসজিদ ভেঙ্গে দিলে বাংলাদেশের হিন্দুরা শঙ্কিত হয়ে উঠে, এমনকি আক্রান্তও হয়।

কোরানে ‘মুহম্মদ’ নামটি এসেছে চারবার, তাঁর আরেক নাম ‘আহমদ’ এসেছে একবার। কোরানে নবীর সমসাময়িক আর কোন মুসলিমের নাম আছে কি? কোরানে আবুবকর বা আলীর নাম আপনি খুঁজে পাবেন না। কেবল মাত্র একজনের নামই পাবেন। তিনি যায়েদ। কিন্তু যে প্রসঙ্গে যায়েদের নাম এসেছে, প্রাসঙ্গিকতা থাকা সত্ত্বেও ‘অভিজাত’ জয়নবের নামটি কিন্তু সেখানে আসেনি। এই যায়েদ নবীর মুক্ত ক্রীতদাস যাকে তিনি পরে পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। যায়েদ বলেন যে, গৃহস্থালি কোন কাজে নবী তাকে কখনও বলেননি, তুমি এটা কেন করলে বা ওটা কেন করলে না। নবী ‘উহ’ শব্দটিও কখনও করেননি। কেন নবী এমনটি করেননি? বা করতেন না? আমার ঘরের কাজের মেয়েটি একটি বাসন ভেঙ্গে ফেলল আর অমনি তাকে আমি কথায় অপমান করে বসলাম, বা আরও এগিয়ে নির্যাতন করলাম। এতে প্রমাণ হলো যে, আমি মনে করি আমার মর্যাদা কাজের মানুষটির মর্যাদার চেয়ে বেশী; এবং কেবল তা-ই নয়, আমার কাছে বাসনটির মূল্য মানুষটির বা তার মর্যাদার চেয়েও বেশী।

এক “আগের কালের চিন্তা অনুসারে অভিজাত” আরব গোত্রপতি আবু যর এবং এক কালের ক্রীতদাস আবিসিনিয় কৃষ্ণাঙ্গ বেলালকে নিয়ে ঘটনা। কোন বিষয়ে তাদের আলোচনা বিতর্কের রূপ নেয়। এতে এক পর্যায়ে আবু যর বলে বসলেন, “কৃষ্ণাঙ্গ নারীর পুত্র, এটা বুঝা তোমার সাধ্যে নেই।” নবী একথা শুনে আবু যরকে বলেছিলেন, “তোমার চিন্তা এখনও ঝুলে আছে অজ্ঞতার কালের গর্ভে।” পরে আবু যর বেলালের বাড়ী গিয়ে মাথাটি মাটিতে রেখে বেলালকে বলেছিলেন, “বেলালের পবিত্র পা যতক্ষণ না এই বোকা, উদ্ধত আবু যরের মাথাকে দলিত না করছে ততক্ষণ এ মাথা মাটি থেকে উঠবে না।” বেলাল এতে রাজী হচ্ছিলেন না। কিন্তু জেদের তীব্রতা দেখে বেলাল এক সময় বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য আলতো ভাবে তার পা আবু যরের মাথায় স্পর্শ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ঘটনা সত্যই হোক আর মিথ্যাই হোক, এতে যে মানুষের প্রকৃত ধর্মের মর্মকথাটি উঠে এসেছে তাতে সন্দেহ নেই।

কারও পঞ্চাশ লক্ষ টাকার গাড়ীতে রিকশাচালক আঁচড় কেটে দিল বা বডিতে বড়সড় একটা ট্যাপ খাইয়ে দিল। আর অমনি তাকে বকা ও গালে চড় লাগিয়ে দেয়া হল। এতে প্রমাণিত হল, গাড়ীর মূল্য রিকশাচালকের সম্মানের চেয়ে বেশী বলে গাড়ীর মালিক মনে করেন। গাড়ীর মালিক ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। পুলিশের কাছে গিয়ে নালিশ করতে পারেন। কিন্তু রিকশাচালকের সাথে এমন আচরণ করতে পারেন না যা এটি প্রকাশ করে যে, গাড়ীর মালিকের চিন্তায় রিকশাচালক তার থেকে মর্যাদায় ছোট বা রিকশাচালকের মর্যাদা গাড়ীর মূল্যের চেয়ে কম। এমন মন নিয়ে গাড়ীতে বসে আমি যতই কোরান তেলাওয়াত শুনি না কেন অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীতই শুনি না কেন, তাতে আমি ধার্মিক হলাম, সভ্য হলাম, সংস্কৃতিমনা হলাম ভাবলে নিজের সাথে নিজে কেবল প্রতারণাই করলাম।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী