ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

১। নানা জনের সাথে আমাদের দেখা হয়, দেখা হলে অনেক সময় কথাও হয়। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে কোন কোন সময় জড়িয়ে যাই বিতর্কে, বিতর্ক আবার প্রায়শই মন্দ কথায় শেষ হয়। বিতর্ক আমরা কেন করি? নিজ মতের বিপরীত কথা শুনলেই আমরা বিতর্ক শুরু করে বসতে পারি। মন্দ কথা বলি কেন? ক্রুদ্ধ হয়ে যাই, তাই। বা যুক্তি খুঁজে পাই না, তাই। ক্রুদ্ধ হলে জেতার পথ রুদ্ধ হয়। যুক্তি-তর্কে হেরে গেলেই এটা অবধারিতভাবে প্রমাণিত হয় না যে হেরে যাওয়া ব্যক্তির মত ভুল। এ তো গেল উৎস-কারণ। এদের উদ্দেশ্য-কারণ কী? যদি জিজ্ঞেস করা যায়, আচ্ছা ভাই, বিতর্কটা কেন করলেন? চুপ থাকলে চলতো না? গালাগালইবা কেন করলেন? তাহলে কী উত্তর আমরা আশা করতে পারি?

২। আমরা মনে করে থাকি, দেশের ও দশের উন্নতির জন্য আমার মতটাই ঠিক। বিরুদ্ধবাদীর মত আমাদের জন্য ক্ষতিকর। অনেক সময় আমরা আরও দূর পর্যন্ত যাই ভাবনার ক্ষেত্রে। আমরা বিরুদ্ধবাদীকে অসৎ, চক্রান্তকারী, মিথ্যাবাদী ইত্যাদি ভেবে বসি; কাজেই নিজের স্বার্থে নয়, দশের স্বার্থে, ভালর স্বার্থে আমাকে বিতর্ক করতে হয়। তা বেশ ভাল কথা। সুন্দর করে নিজের কথাটা সংক্ষেপে বলে দাও। সবাই দুই কথাই শুনলো। এবার তাদেরকেই চিন্তা করতে দাও। তুমি তো আর জনে জনে সকলের অভিভাবক হতে পারবে না। সকলকে জোর করে ভালটা দেখানোর দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে তুমি কি সফল হতে পারবে? বিবাদটি কথার সাথে কথার, কথকের সাথে কথকের নয়।

৩। বিতর্কেরও নানা ধরণ আছে। একটি নেতিবাচক ও অপরটি ইতিবাচক। যিনি নেতিবাচক, তিনি কেবলই অপরের ভুল ধরতে প্রবণ হন। তার একই বুলি – তোমার মত ভুল, তুমি নিজে খারাপ ইত্যাদি। কিন্তু সে নিজের মতটিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে না, বা তেমন কোন মত যেন তার কাছে নেই। কেউ যখন কিছু বলে কেবল তখনই তার মুখে কথা জোটে। এটি অনেকটা এরকম: আমি কাউকে নোংরা পানি পান করতে দেখলেই কেবল ‘ও পানি খেয়ো না, খেয়ো না’ বলে চিৎকার করে বেড়াই; কিন্তু পরিষ্কার পানি কী, কোথায় পাওয়া যায় তা কখনই তাকে বলি না। কারও কাছে যদি বলার মত ইতিবাচক কিছু না থাকে, তবে সে সাড়াটা জীবন কেবল ‘না না’ বলেই বিতর্ক করে। সে কোন ক্রিয়া করতে পারে না, জীবন কাটে কেবল প্রতিক্রিয়ায়। যে শিশুর হাতে চকলেট আছে সে তা বিতরণ করে, যার নেই সে কেবল পরের চকলেটের দোষই ধরতে পারে।

৪। স্বেচ্ছাচারী হয়ে আক্রমণাত্মক সুরে বলা বা গালাগালের পর্যায়ে পড়ে এমন কথাবার্তার কোন উদ্দেশ্য আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে গালাগালের প্রবণতা বা স্বভাব তৈরি হয় একধরণের শঙ্কাবোধ থেকে, অতৃপ্তি থেকে এবং কাপুরুষের মত মানসম্মান সব জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও জিততে হবে এমন মরিয়া ভাব থেকে। এই মরিয়া ভাব তৈরি হয় নিজ মতের দুরবস্থার কারণে। কোন মতের পক্ষ নিয়ে যে গালাগালে জড়িয়ে পরে তার জানা দরকার যে, তার মতের দুরবস্থার জন্য যারা দায়ী সে নিজে তাদের একজন। শুধু তাই নয়, সে নিজের মতের বৃহত্তর শত্রু, নিজের মতের বিরোধীর চেয়েও বড় শত্রু। মন্দভাষী নিজে বিরোধীর চেয়েও বেশী ক্ষতি করে নিজের মতের। একইভাবে সে বেশী ক্ষতি করে তার বন্ধুদের। সে নিজেকেই কেবল অপমান করে না; বিব্রত করে, বেকায়দায় ফেলে তার বন্ধুদেরকেও।

৫। এই যে মন্দ কথায় প্রতিরোধ – তার দর্শনটি কী? প্রতিরোধকারী মনে করে ঐক্য আর বিরোধ মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ, যেখানে একটির হওয়া অপরটিকে হতে দেয় না; যেমন লুডু খেলার ডাইসের ছয় পিঠ মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ, একের বেশী তল একসাথে উপরে থাকতে পারে না। কিন্তু বিরোধ ও ঐক্য সেরকম নয়। আমার পক্ষাবলম্বীর সাথেও বিরোধ সম্ভব, আবার আমার প্রতিপক্ষের সাথেও ঐক্য সম্ভব। একজনের যদি নীতির একটি সেট থাকে তবে বন্ধুর কাজে অনুমোদন বা অননুমোদন এই নীতির ভিত্তিতেই হয়। ফলে এখানে বন্ধু নিঃশর্তভাবে সমর্থিত হয় না। আবার প্রতিপক্ষের সাথে যদি নীতির একটি সাবসেটের মিল থাকে তবে সেখানে বিরোধের মধ্যেও ঐক্য সম্ভব হয়। কোন প্রতিপক্ষই শর্তহীনভাবে প্রতিরোধ্য নয়। ঐক্য ও বিরোধ সম্পূর্ণ পৃথক দুটি রাজ্য নয় – একটি রাজ্যের দুই অংশ যারা জটিল সম্পর্কে আবদ্ধ।

৬। বন্ধুর বা স্বমতের অধিকারীদের বেলায় একজন যে নীতি-নৈতিকতা অবলম্বন করে, বা অবলম্বন করে বলে দাবী করে, সে যখন তার প্রতিপক্ষের বেলায় সেটি ভঙ্গ করে তখন সে নিজেকেই অস্বীকার করে। এই ভাঙ্গার কাজটি আবার ঘটে এ কারণে যে, সে মনে করে প্রতিপক্ষ তার চৈতন্যের অংশ নয়, তার রাজ্যের অংশ নয়। প্রকৃত কথা হচ্ছে, প্রতিপক্ষ আমার জীবনের, মনের, চিন্তারই অংশ এবং বাইরের কেউ নয়, পর নয়। প্রতিরোধের আক্রমণাত্মক চেষ্টা মায়া ও অবিদ্যা থেকে জাত একটি ফল। আত্মরক্ষার অধিকার সকলের আছে। কিন্তু আগ্রাসী রোধের চেষ্টা করে লক্ষ্যবস্তুকে কখনোই ধ্বংস করা যায় না – সে মরে এবং আবার জন্মায় আরও বলবান হয়ে, তার কেবলই পুনর্জন্ম হতে থাকে। নিজেকে গড়ার অবসর কখনোই এরূপ রোধকারীর জীবনে জোটে না। তাছাড়া এটি আরও প্রকাশ করে দেয় যে, সে তার নিজের নীতি হয় ভালভাবে বুঝতে পারেনি, নয়তো নীতিকথা একটি মিথ্যা এবং কৌশলমাত্র – আসল উদ্দেশ্যটি হচ্ছে স্বার্থ। কোরানে এ দুটিকে আখ্যায়িত করা হয়েছে যথাক্রমে জাহিলিয়াত (অবিদ্যা) ও নিফাক (কপটতা – যাকে আবার আখ্যায়িত করা হয়েছে আত্মপ্রতারণা হিসেবে) বলে। এখানে সন্ধির পথই প্রজ্ঞাসম্মত পথ; এমনকি নিজে ঠকে হলেও। এতে নিজেকে গড়ে তোলার অবসর পাওয়া যায়।

৭। কথার স্ববিরোধের কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। আমরা অনেকেই পশ্চিমাদের ধ্বংস ও সর্বনাশ কামনা করে কথা বলি, আবার একই সাথে তাদের সাধনার ফল বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি নিজের ঘরে ব্যবহার করি। মুসলিম আমি হিন্দুকে অপছন্দ করে কথা বলি, আবার একই সাথে তার উৎপন্ন দ্রব্যাদি ব্যবহার করি, মরণাপন্ন অবস্থায় কাছে পেলে সাহায্যের জন্য তাকেই ডাকি। আমি সংবিধান সংবিধান করে চিৎকার করি অথচ ট্যাক্স ফাঁকি দিলে যে নাগরিককে জেলে দেয়ার দাবী করি, মতাদর্শের বৈপরীত্যের কারণে তারই নিরাপত্তার অধিকার, নাগরিক হিসেবে তার সাংবিধানিক অধিকারকে বেমালুম অস্বীকার করে কথা বলি।

৮। এতক্ষণ তো আমিও কেবল ‘না না’ গীতই গেয়ে গেলাম। এখন কিছু ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ গীত গাই। গুটিকয়েক নিয়ম মেনে চললেই আমারা এখানে ভাল কিছু অর্জন করতে পারবো।

৯। নিজেকে নিয়ে ভাব, অন্যকে নিয়ে ভাবার আগে

পৃথিবীর সব মানুষের জীবনও যদি ব্যর্থ হয়, কিন্তু তোমার জীবন হয় সফল, তবে তুমি হারালেটা কী? পৃথিবীর সব মানুষের জীবনও যদি সফল হয়, কিন্তু তোমার জীবন হয় ব্যর্থ, তবে তুমি পেলেটা কী? পৃথিবীর সব মানুষ জাহান্নামে গেল, কেবল তুমিই মুক্তি পেলে, তাতে তোমার অসুবিধাটি কোথায়? পৃথিবীর সব মানুষ মুক্তি পেল, তুমিই কেবল জাহান্নামে গেলে, তাতে তোমার সুবিধাটি কী হলো?

১০। ভালর জন্য প্রতিযোগিতা কর

বিতর্ক, গালাগাল এক ধরণের প্রতিযোগিতার মনোভাব থেকে জাত। এরকম না করলে পিছিয়ে যাব, ওরা সব খেয়ে ফেলবে, সর্বনাশ হয়ে যাবে তখন ইত্যাদি। কিন্তু আমরা জানি, ঘরের অন্ধকারকে ঝাঁটা দিয়ে ঝেঁটিয়ে দূর করে ঘরকে অন্ধকারমুক্ত করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ঘরে জানালা তৈরি করা। এতে আলো আসে, অন্ধকার এমনিতেই দূর হয়। ভালর জন্য প্রতিযোগিতার কাজটিও এমন ধরণের। কেউ চোখ বন্ধ করে রাখলে জানালায় কাজ হয় না ঠিকই, কিন্তু চোখ বন্ধ করে রাখার অধিকার তো সকলেরই জন্মগত ও অলঙ্ঘনীয় অধিকার।

১১। ভালসহ মন্দের সম্মুখীন হও

মন্দভাষীর কথায় অস্তিত্ব বিপন্ন হয় না, মানও যায় না। ব্যক্তির জীবন ও সম্মান কাঁচের মতো ঠুনকো নয়। পাল্টা মন্দ কথা বলে নিজেকে রক্ষা করা যায় না বা তার প্রয়োজনও হয় না। এরকম প্রচেষ্টা হলো উইন্ড মিলের সাথে কাঠের তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করার মত। মন্দ কথার বিপরীতে ভাল কথাসহ তার সামনে হাজির হওয়া যায়। নয়তো গায়ে না মেখে চুপ করে বসে থাকা যায়। যে ভাল কথায় কান দেয় না সে নিজের ক্ষতি নিজেই ডেকে আনবে। তোমার ভালর জন্য তোমার শুধু প্রয়োজন ধৈর্য।

১২। কেউ ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়

অন্যদের বেলায় একথা যদি সত্য না হবে তবে আমি এত কথা বলি কেন? ব্লগ লিখি কেন? মন্তব্য করি কেন? আমি নিশ্চয়ই যেটিকে সঠিক মনে করি সেটিকে অন্যদের সামনে তুলে ধরতে চাই, অন্যদেরকে ভ্রান্তি থেকে বের করে আনতে চাই। তাহলে তো এটিও আমাকে মানতে হয় যে, আমিও ভুল করতে পারি। কাজেই আমার মতের বিরুদ্ধে যিনি লিখছেন তার কথাও মন দিয়ে শান্ত মনে শোনা, বিচার করে দেখাও আমার কর্তব্য। নয়তো আমি নিজেকে শুধরবো কিভাবে, এগিয়ে নিয়ে যাব কিভাবে? আমি যে প্রত্যাশা নিয়ে লিখি, অন্যেরাও তো সেই একই প্রত্যাশা নিয়ে লিখেন; আর আমার চিন্তা ও কথার ভাণ্ডারে যা আছে তা সবই সঠিক – এমন তো নয়, এবং ভাণ্ডারটি এমনভাবে পূর্ণও নয় যে তাতে আর সংযোজনের দরকার নেই।

১৩। সাক্ষাতে যা বলতে লজ্জা পাই, তা ব্লগেও বলব না

আমরা ব্লগে রেজিস্টার্ড হই আর না-ই হই – এখানে একটি সুযোগ নেয়ার সুযোগ আমাদের আছে। সুযোগটি হচ্ছে প্রাইভেসি বা গোপনীয়তার সুযোগ। প্রকাশ্যে (যেখানে পরিচয় বাস্তবতঃ সামাজিকভাবে প্রকাশিত) আমরা অনেক কাজ থেকেই বিরত থাকি, কিন্তু গোপনে (যখন কেউ আমাকে চিনতে পরে না) তা অবলীলায় করে বসি। যেহেতু ব্লগে কেউ আমাকে চিনছে না তাই সহজেই মন্দ ভাষা ব্যবহার করতে পারি, অথচ এই আমি কিন্তু পড়শির সাথে বা অফিসে সহকর্মীর সাথে বিরোধের ক্ষেত্রে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য সংযত থাকি। কাজেই ব্লগের এই ভার্চুয়াল জগতে কিছু বলার আগে ভেবে দেখা যেতে পারে বাস্তব সামাজিক পরিমণ্ডলে আমি তা বলতাম কি-না।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী