ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

জনপ্রিয় কথাশিল্পী, চলচ্চিত্রকার ও নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার-পরিজনকে নিয়ে ব্লগ, টেলিভিশন ও পত্রিকায় নানা রকমের কথা, আলোচনা ও ভাষ্য-ব্যাখ্যা আমরা পড়ছি ও শুনছি। বিষয়টি অত্যন্ত নাজুক ও সংবেদনশীল হওয়ায় এ প্রসঙ্গে কথা না বলাই নিরাপদ বিবেচিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কাউকে অবিচারের শিকার হতে দেখেও চুপ থাকা যেমন ক্ষতিকর, তেমনই আবার কারও জন্য সুবিচার আশা করতে গিয়ে অন্যের প্রতি অবিচার করে বসাও তেমনই ক্ষতিকর। ভারসাম্য যখন কঠিন হয়ে পড়ে তখন কিছু না করে বসে থাকলেও ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। তাই পাঠকবৃন্দের সুবিবেচনা প্রত্যাশা করে আমি কিছু বলতে চাই; এবং তা বলতে গিয়ে সাধ্যমত সতর্ক থাকারও চেষ্টা করব।

দুটি বিয়ে করলে কিছু সমস্যার উদ্ভব হয়। হুমায়ূনকে নিয়ে আমাদের কথাবার্তার একটি বড় অংশের উৎপত্তি এখান থেকেই। তবে এ কথাও তো ঠিক যে, কারও পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ না করা বা নাক না গলানোটাও আমাদের নৈতিক জীবনের অঙ্গ। অন্যের বিচার করো না – এই শিক্ষাকে আমরা হেলাভরে পরিহার করতে পারি না। এ কথার অর্থ এ-ও নয় যে, আদালত থাকবে না বা অন্যকে অবিচারের সম্মুখীন হতে দেখলেও আমাদেরকে নিষ্ক্রিয় থাকতে হবে। এখানে বিচার না করার অর্থ হচ্ছে সামাজিক পরিমণ্ডলে কারও বিচার না করা, অন্য ব্যক্তির ব্যক্তিগত কাজের বা অন্য পরিবারের পারিবারিক ক্রিয়াকাণ্ডের সঠিকত্ব-বেঠিকত্ব নির্ধারণের চেষ্টা না করা। এ ধরণের চেষ্টাকে অনধিকার চর্চাও বলা যায়।

এবার আসল কথাটিতে আসি। হুমায়ূন একজন বিত্তশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নুহাশ পল্লীসহ আরও অনেক সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন। এই সম্পত্তির কারণে তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধ, শঙ্কা বা উদ্বেগের সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক; এবং আহা-মরি দোষেরও কিছু নয়। আবার, নুহাশ পল্লীকে ঘিরে তাদের যেমন উৎকণ্ঠা থাকতে পারে, তেমনই এটিকে ঘিরে হুমায়ূনের পরিবার বহির্ভূত জনদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হতে পারে। তবে এই অন্যদের আগ্রহটিকে কোনভাবেই উচিত বলা যায় না। এই পরের বিষয়টি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

হুমায়ূনের রেখে যাওয়া সম্পত্তি তার আইনতঃ উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি। এখন এই সম্পত্তির মালিক তাঁর মা, স্ত্রী শাওন, এবং আগের চার সন্তান ও পরের দুই সন্তান। তারা নিজেরা মিলেমিশে এর ব্যবস্থা স্থির করবেন। তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তা আদালত নিষ্পত্তি করতে পারে। এখানে অন্যদের বলার কিছু নেই, যেহেতু এই সম্পত্তিতে তাদের কোন অংশ নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হতে পারে অন্যদের আগ্রহের কারণে। অন্যের ধনে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক কিছু করতে পারার সম্ভাবনা দেখা দিলে নানাভাবে এই অন্যেরা কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে। তারা পরিকল্পিত প্রচারণার আশ্রয় নেবে। তাদের স্বার্থে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাদের চরিত্র হননের পথ ধরবে। আবার যাকে তাদের স্বার্থসিদ্ধিতে সহায়ক মনে হবে তারা তার পাশে এসে দাঁড়াবে।

এই অন্যদের সম্মিলিত শক্তি নোভা, শীলা, বিপাশা ও নুহাশদের শক্তির চেয়ে বেশী। ফলে নোভা-শীলাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, এই সম্ভাবনার চিন্তা থেকে জাত প্রতিক্রিয়ায় আবার শাওন আক্রান্ত হতে পারেন। তার বিরুদ্ধেও বিদ্বেষজাত প্রচারণা হতে পারে। তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন এবং আরও ভেঙ্গে পড়তে পারেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শাওন তার স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের একজন এবং তার দুই শিশু সন্তানেরও অধিকার আছে তাদের পিতার সম্পদে। কিন্তু এই দুই শিশু সন্তানের অংশ দুটো নিয়ে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল এই দুই সন্তানই দিতে পারেন প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর। তার আগ পর্যন্ত এই দুইয়ের অংশ রক্ষণাবেক্ষণ করা তাদের বর্তমান অভিভাবকের কর্তব্য। আমাদের কর্তব্য হুমায়ূনের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কোন পার্থক্য না করা, কাউকে পরিত্যাগ না করা, তাদের সকলের প্রতি সুবিচার হোক তা কামনা করা।

আমাদের দাবী হোক – আমরা বাইরের লোকদের উৎপাত দেখতে চাই না, তারা পরের ধনে জোর খাটিয়ে বা কৌশল করে নিজেদের সুবিধা তৈরি করতে সফল হচ্ছে তা আমরা দেখতে চাই না। আইনে সম্পত্তি যাদের, তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হোক – এটাই কাম্য। তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক এবং এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাহির থেকে যেকোনো ধরণের চাপ সৃষ্টির সকল তৎপরতার অবসান হোক।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী