ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

বিডিনিউজ২৪.কম একটি অনলাইন সংবাদ সংস্থা যার ইংরেজি ও বাংলায় অনলাইন সংবাদ পোর্টাল রয়েছে। এর সাথে সাথে সংস্থাটি একটি সিটিজেন জার্নাল ভিত্তিক বাংলা ব্লগ সার্ভিস প্রদান করে আসছে। এখানে রয়েছেন অনেক লেখক এবং অনেকানেক পাঠক। লেখার গুণগত মান, পাঠকদের সচেতন প্রতিক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রকবৃন্দের সতর্কতা এই ব্লগ পোর্টালটিকে অন্য অনেক ব্লগ পোর্টাল থেকে আলাদা করেছে। বিডিনিউজ২৪.কম ব্লগ প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করলো “নগর নাব্য” শিরোনামে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ব্লগ সংকলন ২০১২।

প্রায় বছর খানেক ধরে ব্লগে অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে, যাদের মধ্য থেকে লেখা নির্বাচন করা পর্বত আরোহণের মতোই দুরূহ কাজ। ম, সাহিদের নেতৃত্বে প্রথম বাছাই কমিটি এবং নাজনীন খলিলের নেতৃত্বে চূড়ান্ত বাছাই কমিটি এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছেন। নুরুন্নাহার শিরীন ও নাজনীন খলিলের সম্পাদনায় ফেব্রুয়ারি ২০১২ তে বইটি প্রকাশ করে শ্রাবণ প্রকাশনী। বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন আইরিন সুলতানা। উল্লেখ্য, ব্লগারদের প্রস্তাবিত বিভিন্ন নামের মধ্য থেকে বইয়ের জন্য সুন্দর এই ‘নগর নাব্য’ নামটি বাছাই করা হয়েছিল।

প্রচ্ছদ, বাঁধাই, কাগজ, ছাপা এবং বিন্যাসের গুণগত মানের দিক থেকে বইটি দুই কথায় অতীব সুন্দর ও সহজ পাঠ্য হয়েছে এবং নির্ধারিত ২২৫ টাকার বিপরীতে বইটিকে সুলভই বলা যায়। বইয়ের একটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর প্রচ্ছদটি যার বর্ণনা এককথায় দেয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনই আমার মতো অক্ষমের পক্ষে শব্দের উপযুক্ত মালা বা সম্ভারও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বইয়ের বাধাই চমৎকার বলা না গেলেও যথেষ্ট সন্তোষজনক বলা যায়। লেখাসমূহের শিরোনাম, দেহ, মন্তব্য ইত্যাদি বিভিন্ন অংশের বিন্যাসে একটি ছিমছাম সারল্য যেমন রয়েছে তেমনই রয়েছে নান্দনিকতার ছাপ। কাগজের মান ও টেক্সট ছাপার মান অত্যন্ত ভাল হয়েছে।

তবে বিভিন্ন লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলো বোধগম্যতা ও ছাপার মান বিচারে একেবারেই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। দ্বিবিধ কারণে এটি ঘটেছে বলে আমার ধারণা: এক. একজন ব্লগার ডিসপ্লে বিবেচনায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় ছবি লেখার সাথে সন্নিবিষ্ট করতে চান না। সাইজে ছবিটা কতটুকু হবে তা নির্ধারিত হতে পারে মনিটরে প্রাপ্য দেশগত বিস্তৃতির উপর। ফলে তিনি ছবি আপলোডের আগে ছবির ফাইলকে যতটা সম্ভব ছোট করে নেন, যাতে পেইজ লোডে কম সময় প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিকভাবেই এসব ছবি কাগজে ছাপানোর সময় কম রেজোল্যুশন বা আকারের অপর্যাপ্ততার কারণে ভাল ফল দেয় না; দুই. ছবিগুলো সাদাকালোয় ছাপানো হওয়ায় বিপত্তিটা আরও বেড়েছে। আগামীর জন্য এর একটি সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

বইয়ের শুরুতে আকাঙ্ক্ষা বাক্যটিতে—”বন্ধ হোক শিরশ্ছেদ প্রথা, সড়ক মৃত্যু, বিএসএফ ত্রাস, সাইবার সন্ত্রাস”—গৃহীত চারটি বিষয় সময়োচিত ও সুচিন্তিত হয়েছে। তবে বইটির মোড়ক পাতার শুরুর ও শেষের ভাঁজে যে দুটি বিবরণ লেখা হয়েছে তা কলেবরে বড় হয়ে গিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অক্ষরের আকার ছোট করতে বাধ্য হওয়ায় তা পাঠক বান্ধব হতে পারেনি। এতে করে বিবৃতি দুটির উদ্দেশ্য চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। মোড়কের ভাঁজের কথাগুলো চুম্বকধর্মী ও সহজ-পাঠ্য হলে বই-পিয়াসির মনে বইটি সংগ্রহের বা পাঠের আগ্রহ তৈরি হতে পারে। আমার বিশ্বাস, লেখা দুটি পরিমাণে কম হলে ভাল হতো এবং এখান থেকে ছেঁটে দেয়া কথাগুলো প্রয়োজনে সম্পাদকীয়তে আনা যেত।

দেড় পৃষ্ঠার সম্পাদকীয়টি সুলিখিত হয়েছে। তবে একটি কথা না বললেই না। লেখাটির শুরুতেই একেবারে চতুর্থ ও পঞ্চম বাক্য দুটি—”আবার নিছক পর্নো জাতীয় ব্লগেরও কিছু কমতি নেই। যা নষ্ট মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট বলা যায়”—আমার মনে রীতিমতো ধাক্কা দিয়েছে, পড়তে গিয়ে খটকা লেগেছে। এখানে এই নেতিবাচক বাক্য দুটি এবং বিশেষভাবে “পর্নো” শব্দটি নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় প্রতীয়মান হয়েছে। এধরণের তথ্য বা শব্দ একান্ত প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ছাড়া অন্যত্র টেনে না আনাই ভাল।

বইটিতে মোট সাতাশটি ব্লগ স্থান পেয়েছে। এতো এতো ব্লগের বিশাল স্তূপ থেকে কয়েকটিকে নির্বাচন করা খুবই কঠিন। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, যে ব্লগগুলো নির্বাচিত হয়েছে সেগুলো লেখার গুণে শ্রেষ্ঠ তা কোনভাবেই বলা যায় না। অনেক ভাল লেখা নির্বাচকমণ্ডলীর নজরে না আসা খুবই স্বাভাবিক। কাজেই নির্বাচিত ব্লগের লেখকরা সৌভাগ্যবান—একথা একেবারেই অতিশয়োক্তি যে নয় তা সকলেই মানবেন। তবে এই সাতাশটি লেখার মধ্যে কয়েকটি লেখাকে স্বকীয়তায় ও লিখন শৈলীতে উন্নত মানের বলে মনে হয়েছে। যেমন: ১. শহর রক্ষার বেড়ীবাঁধ: যেখানে সীমান্ত তোমার সেখানেই দখল আমার – সাইফ ভূঁইয়া; ২. প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ ও দেশ গড়তে প্রতিবন্ধীদের জন্য কল্যাণ নয়, অধিকার চাই – সগীর হোসাইন খান; ৩. নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন – রাইসুল ইসলাম সৌরভ; ৪. মিডিয়ার কর্তৃত্ব, প্রতিমিডিয়ার মধ্যস্বত্বভোগিরা – ফকির ইলিয়াস; ৫. উন্নয়নশীল দেশের জন্য উন্মুক্ত এবং ফ্রি সফটওয়্যার – আশিকুর-নূর ইত্যাদি। নাহুয়াল মিথের দশ পৃষ্ঠার ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার’-এর ভাষা সুললিত ও অনবদ্য। সুখপাঠ্য এই লেখাটি আমাদের জন্য একটি দলিল হয়ে থাকল।

কোন কোন লেখার শেষে পাঠকদের মন্তব্য সন্নিবিষ্ট হয়েছে। লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়ার ধরণ ও প্যাটার্ন উপস্থাপন করাই এর উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু মন্তব্য বাছাই সংক্রান্তে একটি বিষয় সুখজনক বিবেচিত না হওয়ায় তা নিয়ে দুটি কথা আবশ্যক হয়েছে। এর আগে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ব্লগে যখন একটি লেখা বা মন্তব্য বা মন্তব্যের উত্তর প্রকাশিত হয় তখন তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর উপরেই থেকে যায়। কিন্তু বইয়ে প্রকাশের জন্য যখন তা নির্বাচিত হয় তখন এর দায় এসে পড়ে নির্বাচকমণ্ডলীর উপরও। এবং সেই সূত্রে—যেহেতু তারা ব্লগ কর্তৃপক্ষের এবং ব্লগ কমিউনিটির প্রতিনিধির মত কাজ করেন সেহেতু—সে দায় কর্তৃপক্ষ এবং কমিউনিটির উপরও বর্তায়। কোন কোন মন্তব্য ও প্রতিমন্তব্য অশালীন, উগ্র ও আক্রমণাত্মক হয়েছে। এতে কমিউনিটির ভাবমূর্তি এবং বইটির মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে। মূল লেখার বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, সম্প্রসারণমূলক ও সুস্থ-গঠনমূলক সমালোচনাগুলোর মধ্যেই এক্ষেত্রে সীমিত থাকা গেলে ভাল হতো।

নিজ ব্লগে বইয়ের প্রচারণাটি ভালভাবেই হয়েছে। তবে আগামীতে বইয়ের পক্ষে প্রচারণার জন্য অন্যান্য ব্লগ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে এবং তাদের ব্লগে বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়ার ক্ষেত্রে একটি সমঝোতায় আসার প্রয়াস হাতে নেয়া যেতে পারে। একে অপরের এরূপ প্রকাশনার পক্ষে সৌজন্যমূলক বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য তারা সমঝোতা করতে পারেন।

পরিশেষে, বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে যারা শ্রম দিয়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ। সেই সাথে বইটির বহুল প্রসার এবং আগামীতে নতুন বইয়ের অব্যাহত প্রকাশ কামনা করছি।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী