ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
র‍্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ লিমন পা হারান সতের মাস আগে। লিমনের প্রতি সহানুভূতির পাল্লা ভারী বলেই প্রতীয়মান। যারা ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোকে সহ্য করতে পারেন না তারা তো লিমনের পাশে। যারা তা নন তারা বলছেন—এটি একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা। র‍্যাব লিমনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুটি। লিমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর: অস্ত্র রাখা ও সরকারী কাজে বাধা দেয়া। পুলিশ মামলা দুটির চার্জশীট দাখিল করেছে। অন্যদিকে, লিমনের মা র‍্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশের প্রতিবেদনে র‍্যাব অব্যাহতি পায়। এদিকে আরেকটি সরকারী প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান লিমনের পাশে দাঁড়ান এবং বলেন, লিমন তোমার ভয় নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি লিমনের সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আচরণের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানিয়েছে। উল্লেখ্য, লিমন এখন জামিনে মুক্ত জীবন যাপন করছেন।

গত ঈদের দিনে লিমনের পরিবারের সাথে বিরোধের ঘটনা ঘটল ইব্রাহিমের পরিবারের সাথে—যা পত্রপত্রিকায় ও টিভি মিডিয়াতে প্রচারিত হয়েছে। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে হামলা ও প্রহারের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। ইব্রাহিম লিমন ও তার মাকে আহত করেছে এই অভিযোগ লিমনদের; আবার লিমনরা ইব্রাহিমকে আহত করেছে এই অভিযোগ ইব্রাহিমের। উভয়েই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এদিকে ইব্রাহিম আক্রান্ত হয়েছে শুনে তার শ্যালক ফোরকান ঘর থেকে বের হন, কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর ঘরে ফেরত আসতে পারেননি। আবারও পাল্টাপাল্টি মামলা। তবে এবার একদিকে লিমনরা ও অন্যদিকে র‍্যাব নয়—ইব্রাহিমরা। আগের ঘটনায় লিমনকে পা হারাতে হয়েছিল এবারকার ঘটনায় ফোরকানকে জীবন দিতে হল।

লিমনের পা হারানোর দুঃখজনক ঘটনায় যে ধূমজাল আছে ফোরকানের দুঃখজনক মৃত্যু সে ধূমজালের উপর নতুন আলো ফেলেছে। আমরা এখন এমন একটি বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছি যেখান থেকে এই আলোর আশায় আমরা প্রতীক্ষা করতে পারি। নীচে দুটি পয়েন্ট উল্লেখ করা গেল যা নিয়ে বিশদ তদন্তের আবশ্যকতা ও উপযোগিতা উভয়ই রয়েছে।

(১) পত্রিকা ও অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায় এই ইব্রাহিম র‍্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচিত বা কথিত। তার পরিবারের সাথে জমিজমা নিয়ে লিমনের পরিবারের বিরোধ অনেকদিনের। এই ইব্রাহিম আবার র‍্যাবের মামলায় লিমনের বিরুদ্ধে সাক্ষীও বটে! তিনি সত্যি র‍্যাবের সোর্স কি-না, হলে কবে থেকে? [অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যটি ২৭/৮/২০১২ তারিখ সকাল ১০:৩০ এ পরিবর্তন করা হয়েছে। ১নং মন্তব্য ও তার উত্তর দ্রষ্টব্য।—লেখক]

(২) পত্রিকা থেকে আরও জানা যায়, ঈদের দিনের হামলার ঘটনা জানতে পেরে ফোরকান ঘর থেকে বের হলেও ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিকটবর্তী এক আত্মীয়ের ঘরে তার মৃত্যু হয়। পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত হয়নি বলেই জানি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এখন প্রমাণ করা সহজ যে, তিনি হামলার শিকার হয়ে মারা গিয়েছেন নাকি পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন—অর্থাৎ লিমনদের বিরুদ্ধে করা হত্যা মামলাটি যথার্থ নাকি মিথ্যা।

২৫শে আগস্ট তারিখের যুগান্তর পত্রিকা থেকে জানা যায়, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এই হত্যা মামলার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এসব বিষয়কে সত্য বানানোর চেষ্টা করা হলে রাষ্ট্রের উপর কালিমা লেপন করা হবে। সেই সাথে আরও প্রকাশিত হয়েছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, লিমনের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য খোদ চেয়ারম্যানেরই পদত্যাগ কার উচিত। ২২শে আগস্টের বিডিনিউজ২৪.কম এর ইংরেজি সংস্করণ থেকে জানা যায়, টিআইবি লিমনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

অবস্থা ও তা থেকে সৃষ্ট স্থানীয় ও জাতীয় প্রতিক্রিয়া এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, লিমন নিয়ে বৎসরাধিক কাল ধরে চলমান ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থানে বিদ্ধ করেছে। জিজ্ঞাসা: লিমন কি রাষ্ট্রের শক্তিমান সংস্থার উপর্যুপরি আঘাতের শিকার? নাকি লিমন নিজেই অপরাধী? যেখানে লিমনের মত অল্প বয়সী এবং আপাতদৃষ্টিতে নিতান্তই নিরীহ একটি ছেলের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিশালী অংশ কর্তৃক এমন আঘাতের মত স্পর্শকাতর বিষয়ের অবতারণা হয়েছে সেখানে দীর্ঘ সতের মাস পরেও আমরা অন্ধকারে রয়ে গিয়েছি। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী যদি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে না নেন তবে আমাদের মতো জনগণের জন্য আর কোন আশার বা ভরসার স্থলটি বাকী থাকে?

লিমনের ঘটনাকে টিআইবি অভিহিত করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য লজ্জাজনক ব্যর্থতার একটি নজির হিসেবে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান একে দেখছেন রাষ্ট্রের উপর কালিমা লেপনের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে। আমরা জানি বর্তমান সরকারী দল জনগণের ভোটে তিন বার নির্বাচিত হয়েছে এবং ভোট ছাড়া আগ্রাসী রক্তারক্তির পথে হাঁটার কোন নজীর এ দলের নেই। এ দল সেই দল যে দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাই এদলের নিকট জনগণের প্রত্যাশা বেশী হবে এটা এদল অস্বীকার করতে পারে না। একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিভাগীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবী, যুক্তির কথা।

লিমনের ব্যাপারে দুটি সম্ভাবনাকেই আমরা বিচার করে দেখতে পারি।

এক. লিমনের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ যথার্থ ও তার বিচার হওয়া দরকার: কিন্তু অবস্থার অগ্রগতি দেখে আমাদেরকে কি এটি ধরে নিতে হবে যে, জনমতকে আমলে নিয়ে সরকার দায়সারা ভাবে ধীরগতিতে এগুচ্ছে? র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার মত অপরাধ করা এবং জনগণের এই বিভ্রান্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে কি নির্ভরযোগ্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত আবশ্যক হয় না?

দুই. লিমন অত্যাচারের শিকার হয়েছে: এই ক্ষেত্রে সরকারকে শক্ত অবস্থান নিতেই হবে—এছাড়া তার গত্যন্তর নেই। আমরা র‍্যাবের মুখপাত্রদেরকে টিভির টকশোতেও দেখেছি। তারা আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সাথে বলেন, নীতিভঙ্গের কারণে র‍্যাবের অনেক সদস্যই বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন, শাস্তি পেয়েছেন ইত্যাদি। তাহলে লিমনের ব্যাপারে এতো অনীহা কেন থাকবে?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমরা প্রধানত বুঝি মানবাধিকার ও নিরাপত্তা। কাজেই আমরা এবার লিমন সংক্রান্তে ঘটে যাওয়া এই নতুন ঘটনার প্রেক্ষিতে আরও জোরাল অবস্থান নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকলাম। আমরা এনিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠা ও যন্ত্রণার অবসান চাই।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী