ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ওমর যখন খলিফা ছিলেন তখন তিনি বিভিন্ন প্রদেশে বিচারকদেরকে নিয়োগ করে তাদেরকে স্বাধীনভাবে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। এই আদেশ দিয়ে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে বিচারকের বিচারকাজে কোন প্রভাব বিস্তার করা, নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা, বা কাজকে বাধাগ্রস্ত করার অধিকার নিজ আদেশবলেই হারান। খলিফা কর্তৃক নিয়োজিত হওয়া সত্ত্বেও এবং তাঁকে বরখাস্ত করার অধিকার থাকা সত্ত্বেও বিচারকের বিচারকাজ সংক্রান্তে খলিফা হিসেবে বিচারকের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে এমন কোন আদেশ জারী করার এখতিয়ার আর খলিফার ছিল না। এমনকি প্রধান প্রশাসক হিসেবে তিনি নিজে বিচারকের বিচার করার অধিকারও হারান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খোদ খলিফাই যদি মনে করেন যে তিনি অন্যের বা আদালতের কোন কর্মচারীর বা বিচারকের অবিচারের শিকার হয়েছেন তবে তিনি কিভাবে সুবিচার প্রার্থী হতে পারেন? তিনি কি খলিফার আসনে বসে বিচারের আশায় কোন বিচারকের প্রতি কোন আদেশ বা রুলিং জাতীয় কিছু জারী করতে পারতেন? এ প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই আলীর শাসনামলে। আলীর বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বর্মটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। একদিন তিনি জনৈক ব্যক্তির গায়ে বর্মটি দেখতে পান। আলী বিচারকের অফিসে গিয়ে অন্য সকলে যে নিয়মে বিচারপ্রার্থী হয় সে নিয়মে তিনি বিচার চাইলেন। কিন্তু খলিফাকে দেখে বিচারপতি উঠে দাঁড়ালে খলিফা এটিকে বিচারকের প্রথম অবিচার বলে মন্তব্য করেছিলেন। এতে বিচারক বসে পড়েন ও নিয়ম মতো মামলা পরিচালনা করেন এবং উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে আলীর মামলা খারিজ করে দেন।

আমাদের আইন প্রণয়ন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ তিনটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান—যদিও সংসদীয় গণতন্ত্রের কারণে আইন প্রণয়ন ও শাসনের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। সংসদ, আদালত ও সরকার সব প্রতিষ্ঠানই আইন দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত হয়। (প্রথম সংবিধান সংসদ কর্তৃক প্রণীত হয়নি; কোন সাংবিধানিক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের কালের দশা বিবেচনা বহির্ভূত রাখা হলো।) সংসদ আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করে। আইনে বিচার বিভাগ উৎপন্ন ও পরিচালিত হলেও বিচার বিভাগ সংবিধানের আইনেই স্বাধীন। আবার আমাদের সংসদও প্রচুর ক্ষমতাসম্পন্ন। সংসদ ও সাংসদবৃন্দের এই বিশেষ অধিকার রয়েছে যে, সংসদের কার্যপ্রণালী নিয়ে বা সংসদে বা সংসদীয় কমিটির সভায় কোন সাংসদের বলা কথার বিরুদ্ধে আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। গোল বেঁধেছে এখানে।

আমরা সংসদ ও আদালতকে এরূপ অবস্থায় দেখতে চাই না। প্রতিষ্ঠান দুটি স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও পরস্পরের সাথে সম্পর্কিতও বটে। যেখানে কোন বিষয় উভয়ের রাজ্যের প্রান্তদেশীয় সে রকম কোন বিষয়ে বিরোধ হলে তা সহনীয় হয়। কিন্তু তা যদি বাঁধে একজনের রাজ্যের কেন্দ্রীয় অংশ নিয়ে তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার ধারণা, আদালতের কাছে কোন মীমাংসা প্রার্থনীয় হলে সে প্রার্থনা করতে হবে আদালতে প্রার্থনার নিয়ম অনুসারে। এই বিবাদের ভাষাও লক্ষণীয় যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের স্পীকারের ‘জনগণ কর্তৃক বিচার বিভাগকেও রুখে দাঁড়ানো’ সংক্রান্ত কথাটি গ্রহণযোগ্য নয়—এটি এমন একটি বিপদজনক কথা যা আইন প্রণেতা প্রমুখাৎ উচ্চারিত হতে পারে না। একই ভাবে স্পীকার নিজের দপ্তরে বসে প্রধান বিচারপতিকে লক্ষ্য করে বলতে পারে না যে, তিনি যা মীমাংসা করবেন তাতে তাঁদের সমর্থন থাকবে। আদালতের রায়ের প্রতি এরূপ সমর্থনের বা রায় মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে কারও ইচ্ছা প্রকাশের কোন অর্থ নেই—আদালত তো কোন সালিশ কেন্দ্র নয় যে, এভাবে সব পক্ষের সম্মতিসূচক ইচ্ছার উপর বিচারের প্রাধিকার নির্ভরশীল।

রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের উচ্চপদে আসীন জনদের কারও নিকট থেকে আমরা পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক ও কটাক্ষমূলক বচনাদি প্রত্যাশা করতে পারি না। এতো সহজেই ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল’, ‘সংবিধান লঙ্ঘন’ ইত্যাদি অভিযোগ শুনলে আমাদের সেই সব লোকের কথাই মনে পড়ে যায় যারা কথায় কথায় অন্যকে ‘কাফির’, ‘মুরতাদ’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করেন। গণতন্ত্র কেবল সিস্টেম দিয়ে গড়া যায় না—এর জন্য প্রয়োজন বিবেচনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ছাড়া কেবল সিস্টেম দিয়ে গণতন্ত্রে সাফল্য অর্জিত হয় না।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী