ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ইব্রাহিম, মুসা, যিশু, মুহম্মদসহ সকল নবীর ধর্ম শান্তির ধর্ম, সন্ধির ধর্ম, সকল মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও মমতার ধর্ম, ন্যায়ানুগ ও সৎকর্মের ধর্ম, মানুষের কল্যাণসাধন, জীবনমান উন্নয়ন, দুঃখের উৎস ও কারণগুলো দূরীকরণের ধর্ম, দানশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার ধর্ম, ধৈর্য, নম্রতা ও বিনয়ের ধর্ম। নবীরা মানুষকে যেসব বিষয় থেকে দূরে সরে আসতে আহ্বান করেছেন সেগুলো হলো হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার, সম্পর্ক ছিন্নকরণ, অসুন্দর আচরণ, অহংকার, ভীরুতা, সমাজে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, বিরোধ ও হানাহানির সূত্রপাত করা ইত্যাদি। পূর্বে বলা প্রতিটি কথার সমর্থনে কোরানে অনেক আয়াত আছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা ‘আল ওয়ালা ওয়া আল বারাআ’ বা ‘বন্ধুত্ব ও নিঃসম্পর্কতা’ সম্পর্কিত কোরানের কথা এবং সেইসাথে কোন কোন মহলের ভ্রান্ত ও একদেশদর্শী ব্যাখ্যাটি বুঝার চেষ্টা করব—যে ব্যাখ্যায় বলা হয়ে থাকে, অন্য ধর্মাবলস্বীদের সাথে ঘৃণা ও শত্রুতার সম্পর্কই নাকি মুসলিমদের রাখা কর্তব্য(?)।

‘ওয়ালা’ অর্থ বন্ধুত্ব বা মৈত্রী। দুজন ব্যক্তি, দুটি গোত্র, গোষ্ঠী বা সমাজের মধ্যে যখন বিরোধ বাধে যা শান্তিকে বিপন্ন করে তোলে, জীবন ও সম্পদের হানি ঘটাতে পারে তখন তাদের মধ্যে সন্ধি বা মীমাংসার উদ্দেশ্যে একপক্ষের সহায়তায় এগিয়ে আসাকে বলা হয় ‘মুওয়ালাত’। যদি বিরোধ যুদ্ধে পর্যবসিত হয় তবে ‘ওয়ালী’ তার সমর্থিত পক্ষকে রক্ষা করতে তার সাথে যোগ দেয়। কোরানে যে ‘ওয়ালা’ এর কথা এসেছে তা প্রধানত এই আন্তঃগোত্র, আন্তঃসমাজ মৈত্রীর কথা—আমাদের কালের পরিভাষায় এটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মৈত্রী। কোরানে বলা হয়েছে যে, বিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদের ওয়ালি। অর্থাৎ বিশ্বাসী ব্যক্তি বা গোত্র বা রাষ্ট্র বিশ্বাসীদের সাথে বিরোধে লিপ্তদের বেলায় বিশ্বাসীদের পক্ষে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করবে, যুদ্ধের সূচনা হলে বিশ্বাসীদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে।

‘ওয়ালা’ এর ব্যাপক অর্থও রয়েছে। প্রথম অনুচ্ছেদে বলা সকল সদগুণের সাথে নিজেকে যুক্ত করা, এসব গুণের অধিকারীদের সাথে যুক্ত থাকা, অত্যাচারীদের অত্যাচার থেকে অত্যাচারিতকে রক্ষা করতে অগ্রসর হওয়া, অত্যাচারীদের হাত থেকে বিশ্বাসীদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসা সবই ‘ওয়ালা’ এর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

‘বারাআ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে নিজেকে কোন কিছু থেকে অসম্পর্কিত করা, দায় থেকে মুক্ত থাকা, বিচ্ছিন্ন হওয়া ইত্যাদি। কোরানের শিক্ষা অনুসারে ‘বারাআ’ এরও ব্যাপক অর্থ রয়েছে। এ নীতি হচ্ছে মিথ্যা থেকে দূরে থাকা ও মিথ্যাচারীদের মিথ্যাচারের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা; অহংকার থেকে দূরে থাকা ও অহংকারীদের অহংকারমূলক ক্রিয়াকলাপের ফল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা; অত্যাচার থেকে দূরে থাকা ও অত্যাচারীদের অত্যাচারমূলক কর্মকাণ্ডের ফলাফল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা ইত্যাদি।

‘বারাআ’ অর্থ ঘৃণা নয়। নবীরা কোন মানুষকে ঘৃণা করেননি এবং ঘৃণা করার শিক্ষাও কাউকেও দেননি। যারা তাঁদের উপর অত্যাচার করেছে তাঁরা তাদের উপকার করার সুযোগ কখনও হাতছাড়া করেননি। তারা কারও উপর অত্যাচার করেননি, তবে আত্মরক্ষা ও অত্যাচারের অবসানের জন্য যুদ্ধের প্রয়োজন হলে তারা তাও করেছেন। মানুষকে ঘৃণা করা একটি মন্দ কাজ। ভালসহ মন্দের সম্মুখীন হওয়া নবীদের কাজ; কাজেই যারা ঘৃণা করে, ঘৃণা নয় মমতাসহ তাদের সম্মুখীন হওয়াই নবীদের কাজ। নবীরা কঠোরতাও অবলম্বন করতেন; কিন্তু তা ছিল আত্মরক্ষার্থে সমপরিমাণ প্রতিক্রিয়ামূলক বলপ্রয়োগ; ঘৃণা করা নয়।

‘ওয়ালা’ হচ্ছে একটি সামর্থ্যজনিত সক্রিয়তার নীতি—সন্ধি সম্ভব করা, শান্তি রক্ষা, জীবন ও সম্পদের হানি হতে না দেয়া এর প্রধান উদ্দেশ্য। আবার প্রসারিত অর্থে, এ হচ্ছে জগতে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের প্রসার ঘটানোর প্রচেষ্টার সক্রিয় ও পোএকটিভ নীতি। অন্যদিকে, ‘বারাআ’ প্রধানত সামর্থ্যের অভাবে নিষ্ক্রিয়তার নীতি—যেমন অত্যাচার প্রতিরোধে অসামর্থ্যজনিত কারণে অত্যাচারী থেকে দূরে সরে থাকা এবং অত্যাচার কাজে তাকে সহায়তা না করা। তাছাড়া, হিংসা-বিদ্বেষ, দুরাচারসহ সকল নেতিবাচক প্রবণতায় সাড়া না দেয়া, সকল নেতিবাচক কাজ থেকে নিষ্ক্রিয় থাকাও এই নীতির অংশ।

ইসলামে ‘ওয়ালা এবং বারাআ’ এর নীতি মূলত ধর্ম ভিত্তিক নয়—বরং ন্যায়পরতা ও অত্যাচারের ধারণা ভিত্তিক। নবীদের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীদের সাথে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের ‘ওয়ালা’ নিঃশর্ত নয়। যদি কোন বিশ্বাসী ব্যক্তি বা সমাজ অত্যাচারের পথ অবলম্বন করে তবে তাতে সহায়তা করা অন্য বিশ্বাসীদের পক্ষে করণীয় নয়—আল্লাহ কেবল ভাল কাজে পরস্পরকে সহায়তা করতে আদেশ করেছেন এবং বিপরীতটি নিষেধ করেছেন। নবীদেরকে প্রতিরোধ করতে যারা প্রকাশ্যে বদ্ধপরিকর তাদের বিপরীতে ‘বারাআ’ এর নীতি প্রযোজ্য। কিন্তু নবীদেরকে গ্রহণ না করেও যারা ন্যায়পরায়ণ জীবন যাপন করে তাদের সাথে ‘ওয়ালা’ এর সম্পর্কই আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক।

‘ওয়ালা’ এর মতো ‘বারাআ’ এর নীতিও নিঃশর্ত বা স্থির নয়। একজন যখন অত্যাচার করে বা ডাকাতি করে তখন তার থেকে বিশ্বাসী দূরে থাকবে। কিন্তু এই অত্যাচারী বা ডাকাত যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে তার সাহায্যে এগিয়ে আসাও বিশ্বাসীর কর্তব্য কর্ম হয়ে আছে। আবার কোন মুসলিম রাষ্ট্র যদি তার অন্তর্গত অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর অত্যাচার করতে থাকে তবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে ‘ওয়ালা’ এবং মুসলিম সরকারের সাথে ‘বারাআ’ এর নীতি বাধ্যতামূলক হয়।

অত্যাচারী মুসলিমদের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাঙালীদের ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করে, বাঙালীদের উপর অতর্কিতে আগ্রাসন করে, যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। এ অবস্থায় অত্যাচারী পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে ‘ওয়ালা’ নয় বরং অত্যাচারের শিকার বাঙালীদের সাথে ‘ওয়ালা’ কোরানের শিক্ষা অনুসারে বাধ্যতামূলক ছিল।

খারেজীদেরও ‘ওয়ালা এবং বারাআ’ নীতি ছিল। এ নীতি ছিল ধর্মের বহিরাবয়ব ভিত্তিক। সমাজজীবনে বাস্তব অত্যাচার তাদের কাছে প্রাধান্য পায়নি, বরং ধর্মের ব্যাখ্যার ভিন্নতাই তাদের কাছে যথেষ্ট ছিল আগ্রাসী হয়ে আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। নবীরা যেখানে কপটদেরকেও তাদের মিল্লাতের অংশ মনে করতেন, সেখানে খারেজিরা নিজেরা অন্যকে ‘কাফির’ সাব্যস্ত করে তাদেরকে হত্যা করতো, সন্ত্রাস করতো। নবীরা যেখানে তাদের বিরোধীদের সাথে সন্ধির পথ অন্বেষণ করতেন, খারেজীরা সেখানে সন্ধির আহ্বান অস্বীকার করে মুসলিমদের সাথেই যুদ্ধের সূচনা করতো।

‘ওয়ালা এবং বারাআ’ নীতি ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট কোন নীতি নয়—নানা শর্তসাপেক্ষ জটিল নীতি—বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে বিচারশীলভাবে যা প্রয়োগ করতে হয়। সামাজিক জীবন একমাত্রিক ও একস্তর বিশিষ্ট ফ্ল্যাট প্রপঞ্চ নয়—এর নানা স্তর, নানা মাত্রা রয়েছে। মনে করুন, অন্য মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে কোন পশ্চিমা সরকারের আগ্রাসী ও অত্যাচারমূলক আচরণের ক্ষেত্রে সেখানকার মুসলিমরা ‘বারাআ’ এর নীতি গ্রহণ করবে, তারা তা থেকে নিজেদেরকে অবমুক্ত রাখবে। কিন্তু একই সাথে তারা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সৎ নাগরিকের মত জীবন যাপন করবে—মানুষের মঙ্গলের জন্য সাধ্যমত কাজ করবে, নিষ্ঠার সাথে চাকুরী করবে, এতদসংক্রান্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করবে। সামাজিক পরিমণ্ডলে ঘৃণার নীতি প্রয়োগ করা হলে তাদের সেখানে অবস্থান করার কোন যৌক্তিক বৈধতা থাকে না। আর যারা অন্য দেশ থেকে এ নীতির সমালোচনা করে তাদের পূর্ব কর্তব্য হচ্ছে নিজ দেশে পশ্চিমা মুসলিমদেরকে স্থান করে দেয়ার ব্যবস্থা করে তাদেরকে চলে আসার জন্য আহ্বান করা। তা না করে দূরে বসে কেবল কথার ফুলঝুরি ও ফতোয়ার কোন যৌক্তিক, নৈতিক বা আইনগত ভিত্তি নেই। তাছাড়া কেউ তার দেশ ছেড়ে চলে আসবে কিনা তা তার সিদ্ধান্তের বিষয়—অন্যের মীমাংসার বিষয় নয়।

তারিক রামাদান যদি বলতেন পশ্চিমা আগ্রাসনকে মুসলিমদের সমর্থন ও প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করা উচিত তবে তিনি ‘বারাআ’ এর নীতি লঙ্ঘন করতেন। তারিক রামাদান নিজেকে এ থেকে স্পষ্টভাবে মুক্ত করেছেন এসব কাজের তীব্র নিন্দা করে—এমন নিন্দা মুসলিম না হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমের আরও অনেকেই করছেন, যেমন নোয়াম চমস্কি, রবার্ট ফিস্ক। আর তিনি সামাজিক পরিমণ্ডলে মুসলিমদেরকে সক্রিয় কর্মী হওয়ার জন্য যে আবেদন করেছেন তা এই লেখার প্রথম অনুচ্ছেদে বর্ণিত সৎগুণাবলী অর্জনের আহ্বান মাত্র—যে আহ্বানে সাড়া দেয়া মুসলিম মাত্রেরই কর্তব্য। তবে এটা ঠিক যে, তিনি কোন কোন মহলের নীতি বা ব্যাখ্যা লঙ্ঘন করে বিরাগভাজন হয়েছেন—যে ব্যাখ্যা আলীর সময়কালের খারেজীদের ব্যাখ্যার আধুনিক রূপ। বর্তমান কালের বা হাজার বছর আগের পণ্ডিতদের ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করা, তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রামাদানের আছে, আছে পশ্চিমা মুসলিমদের, আছে আমাদেরও—যদি সে ব্যাখ্যা যথাযথ না হয়।

আমরা যদি কোরান পড়ি তবে দেখব মমতা ও কল্যাণসাধনা কোরানের প্রথম সামাজিক নীতি। যারা ঘৃণা বিস্তারে কোরানকে ব্যবহার করছে তারা আল্লাহর সুন্দর ধর্মকে খারেজিদের মত কলুষিত করছে। আমি পরে দেখানোর চেষ্টা করব কিভাবে ঘৃণার নীতির পোষক ও প্রচারকরা নিজেদের সমর্থনে কোরানের আয়াত নিয়ে অবৈধ রিজনিং করে থাকে, অন্যায্য ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে ও কোরানের কথাকে বিকৃত করে থাকে। আমি আরও দেখানের চেষ্টা করব খারেজিদের সাথে নবী বা আলীর ধর্মের বৈপরিত্যটি কোথায়।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী