ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 
২.১। কোরানের ৬০নং সুরা মুমতাহানা’র প্রথম নয়টি আয়াতে প্রতিরক্ষা মৈত্রী সম্পর্কীত আলোচনা পাওয়া যায়। তার মধ্যে ৪, ৫ ও ৬নং আয়াতে প্রাসঙ্গিকভাবে ইব্রাহিমের (আল্লাহ তাঁর উপর শান্তি বর্ষণ করুন) উদাহরণ রয়েছে, যা এই লেখার প্রথম অংশের বিষয় ছিল। এখন ১-৩, ৭-৯ আয়াত নিয়ে আলোচনা করা গেল।

“হে বিশ্বাসীরা, আমার শত্রুদের ও তোমাদের শত্রুদের প্রতি স্নেহকে প্রসারিত করে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না, যখন সত্যসহ তোমাদের কাছে যা এসেছে তা তারা প্রত্যাখ্যান করছে, রাসুলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছ—যদি তোমরা বহির্গত হয়ে থাক আমার পথে সংগ্রামের জন্য ও আমার সন্তোষসূচক অনুমোদনের জন্য। তোমারা লুকিয়ে তাদের সাথে স্নেহের বিষয়টি সম্পন্ন করতে চাও; এবং আমি জানি যা তোমরা গোপন রাখ ও যা প্রকাশ্যে বল। তোমাদের মধ্যে যে এরূপ কাজ করে, নিশ্চয়ই সে সুপরিমিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।” (৬০:১)

“যদি তারা তোমাদের উপর প্রাধান্য লাভ করতে পারে তবে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে উঠবে, তাদের শক্তি ও প্রচারণাকে তোমাদের বিরুদ্ধে অশুভভাবে প্রসারিত করবে, এবং তোমরা যেন সত্যকে প্রত্যাখ্যান কর তার জন্য কাতর হয়ে উঠবে।” (৬০:২)

“পুনরুত্থানের দিনে না তোমাদের আত্মীয়রা, না তোমাদের সন্তানেরা, তোমাদের কোন কাজে আসবে। আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ন্যায্য বিচার করে দেবেন। এবং তোমরা যাকিছু কর আল্লাহ তার দর্শক।” (কোরান ৬০:৩)

***[ইব্রাহিমের আদর্শ সংক্রান্ত ৪, ৫ ও ৬নং আয়াত]***

“সম্ভবত আল্লাহ তোমাদের এবং তাদের মধ্যকার যাদেরকে তোমরা শত্রু হিসেবে পেয়েছ তাদের মধ্যে স্নেহ স্থাপন করবেন। আল্লাহ শক্তিমান, এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মমতাবান।” (৬০:৭)

“যারা আদর্শের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, তোমাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বহিষ্কার করে না, তাদের সাথে দয়ার্দ্র ও ন্যায়ানুগ হতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। তিনি তাদেরকে ভালবাসেন যারা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত।” (৬০:৮)

“আল্লাহ কেবল মাত্র তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন যারা আদর্শের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বহিষ্কার করেছে, বহিষ্কারে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে—তবে তো তারা অত্যাচারীই।” (৬০:৯)

২.২। আয়াতের শুরুতে আল্লাহ ও বিশ্বাসীদের শত্রুর কথা বলা হয়েছে। ‘যারা তোমাদের শত্রু’—এই বচন যা প্রকাশ করে তা হচ্ছে ‘যারা তোমাদের সাথে শত্রুতা করে’—’যাদের সাথে তোমরা শত্রুতা কর’ নয়। প্রসঙ্গত আরও বলা যায়, ‘যে আমার সাথে শত্রুতা করে, আমি তার শত্রু’—এধরণের কথা শর্তসাপেক্ষ এবং রেটরিক। এর অর্থ এই নয় যে, আমি শত্রুতার সূচনা করি, আমি তার সাথে শত্রুতামূলক আচরণ করি, সে শত্রুতার অবসান ঘটালেও আমাকে সে শত্রু হিসেবেই পাবে। এর অর্থ, যে আমাকে আক্রমণ করবে আক্রমণকালে সে আমাকে শত্রু হিসেবেই পাবে। যদি একটি গল্প লেখা হয় যেখানে সেলিম আবির্ভূত হয় জামালের শত্রু হিসেবে, জামালকে ধ্বংস করার জন্য সেলিম একের পর এক অভিযান পরিচালনা করে, তবে গল্পর শুরুটা উল্টো ভাবেও করা যায় এই বলে, ‘বড় হয়ে আমাদের জামাল সেলিমের শত্রু হবে’। এই উল্টো কথার অর্থও এই নয় যে, জামাল শত্রুতা করছে।

২.৩। আল্লাহ তাদেরকে তাঁর শত্রু এবং মদিনার মুসলিমদের শত্রু বলে সাব্যস্ত করছেন যারা (ক) নবীর বাণীকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং (খ) কেবল মতাদর্শের কারণে ক্রমাগত নির্যাতন ও উৎপীড়নের মাধ্যমে মুসলিমদেরকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। এভাবে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করাটাই ছিল প্রকারান্তরে তাদেরকে বহিষ্কার করা। কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায় কর্তৃক সত্যকে কেবল মাত্র প্রত্যাখ্যান করা অন্যের প্রতি নির্যাতনমূলক কাজ নয়। কিন্তু মুসলিমরা যে মতাদর্শকে সত্য বলে বিবেচনা করে সেটিকে রোধ করার জন্য, বিলুপ্ত করার জন্য যখন কেউ পরিকল্পিতভাবে ও স্থায়ীভাবে নির্যাতন ও নিপীড়নের পথ অবলম্বন করে তখন সে প্রকাশ্যে সীমালঙ্ঘন করে—এমনকি মুসলিমদের মতাদর্শ যদি মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবুও এটি প্রকাশ্যে সীমালঙ্ঘন।

২.৪। ‘ওয়ালি’ অর্থ বন্ধু। কিন্তু এই বন্ধু শত্রুর বিপরীত; অর্থাৎ নিরাপত্তা, রক্ষা, প্রতিরক্ষা, প্রটেকশন সংক্রান্তে বন্ধু। প্রশ্ন হচ্ছে, সেকালের কোন মুসলিম তাদের শত্রু শিবিরের কাউকে এরূপ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে যাবেন কেন? সে তো মুসলিমকে রক্ষা করতে আসছে না। এই আয়াতে পরে মায়া-মমতার কথা এসেছে, যা থেকে বুঝা যেতে পারে ব্যাপারটা। মদিনার মুসলিমরা মক্কায় তাদের আত্মীয়-স্বজনকে বা পূর্ব-উপকারীকে রক্ষা করতে প্রবণ হতে পারেন। তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করা মানে প্রকারান্তরে শত্রুকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা বা গ্রহণ করা।

২.৫। প্রথম আয়াতের প্রথম অংশের অর্থ হতে পারে: হে বিশ্বাসীরা, তোমরা স্নেহকে প্রসারিত করে তাদের সাথে ‘ওয়ালা’র সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ো না; তোমরা স্নেহের বশে তাদেরকে ওয়ালি বানিও না; তোমাদের অন্তরে বিদ্যমান স্নেহ যেন তোমাদেরকে কার্যত ‘ওয়ালা’র সম্পর্ক স্থাপন করা পর্যন্ত নিয়ে না যায়। এখানে স্নেহের কাজটিতে ‘তুল্‌কুনা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ: অফার করা, নিজের দিক থেকে একতরফা ভাবে প্রবাহিত, প্রসারিত বা বিস্তৃত করা। বলা যেতে পারে: নিজেদের দিক থেকে একতরফা ভাবে ভালবেসে, স্নেহ করে বা স্নেহ-ভালবাসা অফার করে, বা স্নেহের বশে এমন শত্রুদেরকে বন্ধু হিসেবে নিও না।

২.৬। যদি মুসলিম সমাজের কোন ব্যক্তি বা গোত্র নবীর প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তি বা গোত্রের সাথে ওয়ালাতের সম্পর্কে আবদ্ধ হয় এবং সেমত কাজ করে তবে তা মদিনার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করবে এবং মদিনার নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ণ করবে, নবীর সামরিক পরিকল্পনা হুমকির মধ্যে পড়বে। নবীর নেতৃত্বে মুসলিমরা দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে—আর তা ছিল নিজেদেরকে আল্লাহর দেয়া মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তোলা, নিজেদেরকে রক্ষা করা, এবং নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। আল্লাহ তারপর যা বলছেন তার মর্ম হতে পারে এই জিজ্ঞাসা—তোমরা কিভাবে এরূপ বন্ধুত্ব করে নিরাপত্তার ক্ষতি করতে পার যখন তোমরা সব ছেড়ে মক্কা থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছ? এই সুরার দ্বিতীয় আয়াতে আশঙ্কার কথা আরও বিস্তৃতভাবে বলা হয়েছে।

২.৭। তারপর আল্লাহ বলছেন, ‘তুসির্‌রুনা ইলাইহিম বিল মাওয়াদ্দাতি’—যার অর্থ: তোমরা তাদের প্রতি স্নেহকে গোপনে প্রকাশ করছ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মদিনার একজন মুসলিম কেন গোপনে শত্রুপক্ষের কাওকে ভালবাসতে যাবেন? তিনি যদি নবী বা অন্য মুসলিমদেরকে একথা প্রকাশ্যে বলেন যে, মক্কাবাসীদের জন্য তাঁর মন কাঁদে—তাহলে কি তাঁরা হতাশ বা বিরক্ত হতেন? নিশ্চয়ই না। মমতার বশে যদি তিনি এমন কিছু করেন যার বিরুদ্ধে মদিনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে তোলার অভিযোগ উঠতে পারে তবেই তিনি তা লুকিয়ে করতে চাইবেন। এরূপ ক্ষেত্রে মুসলিমদের কর্তব্য অন্তরস্থ স্নেহকে লুকিয়েই রাখা; তার বশে ক্ষতিসম্ভব কোন পদক্ষেপ না নেয়া। অর্থাৎ, মনের স্নেহকে মনেই রাখ—প্রতিরক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন বাস্তব কাজের মাধ্যমে এই একতরফা স্নেহকে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাক। কারণ, তোমাদের মনে বিদ্যমান স্নেহকে আল্লাহ তো তেমন ভাবেই জানেন, যেমন ভাবে জানেন স্নেহের মৌখিক বা আচরণগত প্রকাশকেও। অর্থাৎ, তোমরা যে তাদেরকে ভালবাস—এই পুণ্যকর্ম আল্লাহর অজানা নয়।

২.৮। তারপর আল্লাহ বলছেন যে, যারা এরকম কাজ করে তারা সুপরিমিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। লুকিয়ে কাজ করার প্রবণতা একজনকে সুপরিমিত পথ থেকে সরিয়ে দেয়। মমতার প্রসারের দিক ও সীমা সম্বন্ধে পরিমিতিতে ভুল করে চললে সুপরিমিত পথ থেকে বিচ্যুত হতে হয়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্তরে গোপনে করা এমন কাজ রাষ্ট্রের জন্য তার লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার পথেও বাধা দেয়।

২.৯। এখানে একজন মুসলিম কেন ভুল করতে পারেন? বিচারে ভুল হয় কখন? যখন দুটো নীতির একটি আরেকটিকে প্রতিহত করতে চায় বা একটি নিজেকে প্রসারিত করতে চায় ও অন্যটি অপরটিকে সীমিত করতে চায়। মমতা ও প্রতিরক্ষার মধ্যে এরকম সম্পর্ক রয়েছে। আর একারণে আল্লাহ বিশদভাবে পরিষ্কার যুক্তি প্রদান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে সঠিক মীমাংসায় উপনীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বৌদ্ধিক সামর্থ্য তৈরি করতে চাচ্ছেন। এই ভ্রান্তির সম্ভাবনা ও কারও দ্বারা এই ভ্রান্তি সংঘটিত হওয়া স্নেহ-মমতার নীতির আবশ্যকতাকেই নির্দেশ করে। সুরার প্রথম দুই আয়াত সতর্কতার সাথে পড়লে দেখা যাবে যে, আল্লাহ অত্যাচারী শত্রুদের প্রতি মমতাবান ও স্নেহশীল হতে নিষেধ করছেন না; সতর্ক করছেন স্নেহের বশে ক্ষতিকর বাস্তব কাজ না করার জন্য। সামাজিক দিক থেকে এর যুক্তি তিনটে: (ক) তারা প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে তোমাদের থেকে নিজেরাই দূরে সরে গিয়েছে যা স্নেহকে একতরফা করেছে, (খ) তারা অত্যাচার করে তোমাদেরকে ঘর থেকে বিতাড়িত করেছে, (গ) যদি তারা প্রাধান্য পায় তবে তারা তোমাদেরকে পেয়ে বসবে।

২.১০। মুসলিমদের পক্ষ থেকে এমন ভ্রান্তির সম্ভাবনা কেন দেখা দিল? বা তাদের কেউ এরকম কাজ কেন করল? আপনি যদি আপনার সন্তানকে প্রথমেই যুদ্ধের শিক্ষা দিয়ে তার মনে যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব চাঙ্গা করে তোলেন তবে তার বিচারিক ভ্রান্তিটা ঘটবে অত্যাচারের দিকে—সে অন্যের মন্দিরে আগুন দেবে। কিন্তু যদি প্রথম জীবনে বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি ভালবাসা ও মমতার শিক্ষা দেন এবং বড় হওয়ার পর তাকে মমতার নীতি লঙ্ঘন না করে আত্মরক্ষার অনুমতি দেন তবে সে ভ্রান্তিকে এড়াতে মমতার দিকে পিছু হটবে—সে নিজের মসজিদকে পুড়তে দেখবে। নবীরা প্রয়োগ করেন দ্বিতীয় প্রক্রিয়া বা ধারাটি। আমরা কোরানে দেখতে পাই যে, আল্লাহ ইব্রাহীম কর্তৃক পিতার জন্য প্রার্থনা করার কাজটি অনুমোদন করেননি এবং বদরের যুদ্ধে নবীর নমনীয়তাকেও আল্লাহ নেতিবাচক ভাবে দেখেছেন—উভয়েই স্ব স্ব সিদ্ধান্তে মমতার দিকে বেশী সরে এসেছিলেন। আল্লাহ তাঁদের উভয়ের উপর শান্তি বর্ষণ করুন।

২.১১। সাধারণত এই আয়াতকে বা এই রকম আয়াতগুলোকে অত্যন্ত কঠোরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। মুমতাহানা’র আয়াতগুলোর মধ্যে একটি সুগভীর মমতার সুর রয়েছে, মুসলিম মনের মমতার প্রতি আল্লাহর একটি মমতাপূর্ণ ও ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। মুসলিমদেরকে আল্লাহ আশ্বস্ত করতে চান, তাদেরকে যুক্তি দিয়ে বুঝাতে চান, তাদেরকে সান্ত্বনা দিতে চান। যেন বলতে চান—দেখ, তাদের ভালর জন্য তোমাদের মনে যে আকুতি তা আমি বুঝি। তোমাদেরকে যারা কষ্ট দেয় তাদেরকেও কষ্ট থেকে মুক্ত রাখতে তোমরা চেষ্টা করছ। কিন্তু তারা তো কেবল তোমাদের শত্রু তা নয়, আমারও শত্রু। আমারও তো একটি পরিকল্পনা আছে যেটিকে সফল করে তোলার জন্য আমি নিজে তোমাদেরকে ক্রমাগত নির্দেশনা দিয়ে চলেছি। সে পরিকল্পনায় অংশ নেয়ার জন্যই তো তোমরা ঘর থেকে বের হয়ে এসেছ। কিন্তু তোমাদের দ্বারা ভুল পদক্ষেপ নেয়া, নিজেদেরকে বিপন্ন করে তোলা তো তোমাদের কর্তব্য হতে পারে না। আমি নিজেও মমতাবান; যারা তোমাদের সাথে শত্রুতা করছে তাদের প্রতি আমিও মমতাবান। আমিই তোমাদেরকে মমতাবান হতে শিখিয়েছি। তবে তোমাদের নিরাপত্তার জন্য যতটুকু সতর্কতা দরকার সেমত কাজ করতে ভুল করবে না। ধৈর্য ধর, আজকের শত্রু কাল স্নেহশীল বন্ধু হয়ে উঠতে তো পারে; বা এটি খুবই সম্ভব যে, শীঘ্রই এমন সময় আসবে যখন তোমরা তোমাদের স্নেহ-মমতাকে কার্যত প্রকাশ করতে পারবে। উপলব্ধি করার চেষ্টা কর, চূড়ান্ত বিচারের দিনে আত্মীয়, সন্তানেরা কারও কোন কাজে আসে না; আমি তোমাদেরকে এই যে নিষেধ করলাম তার জন্য কষ্ট পেয়ও না, আশ্বস্ত হও—সেদিন আমি তোমাদের জন্য ন্যায্য নিষ্পত্তি করে দেব।

২.১২। অষ্টম আয়াতে ‘আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না’—এই নেতিবাচক ভাবে সেখানে বর্ণীত অনুজ্ঞাটি এসেছে। ‘আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন’—এভাবে কেন তা দেয়া হলো না? ঘটনা প্রবাহকে অনুসরণ করলে এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। একটি বড় সেটের অন্তর্ভুক্ত একটি সাবসেটের সীমা স্পষ্টীকরণকালে প্রাসঙ্গিক হতে পারে এমন প্রশ্ন—ওটার বেলায় কী হবে? ওটা কি এর আওতায় পড়বে? যদি না পড়ে তখন উত্তর হয়— না, এটা এর মধ্যে পড়ে না, এটা কেবল ওর জন্য প্রযোজ্য। আপনি একদল মানুষকে প্রথমে শিক্ষা দিয়েছেন মমতাকে সর্বত্র প্রসারিত করার জন্য। তারপর অত্যাচারী শত্রুকে বন্ধু বানাতে নিষেধ করলেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে, যারা আমাদের সাথে যোগ দেয়নি, আবার অত্যাচারও করছে না তাদের বেলায় কী হবে? তখন উত্তর দেয়া যায়—না, তাদের বেলায় এই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হচ্ছে না, এ কেবল ওদের বেলায় প্রযোজ্য।

২.১৩। প্রথম আয়াতকে সাধারণত যেভাবে অনুবাদ করা হয় তা থেকে এরূপ বুঝা হয়ে থাকে: (ক) ‘কাফের’দেরকে ভালবেসে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না, (খ) তোমরা গোপনে তাদেরকে ভালবাস, কিন্তু আল্লাহ জানেন তোমরা যা গোপন কর ও যা প্রকাশ কর। এখান থেকে যা বুঝা হয়ে থাকে: ভালবাসাটাই অপরাধ ও গোপনে ভালবেসেও সুবিধা হবে না, যেহেতু আল্লাহ মনের গোপন কথাও জানেন। স্নেহের অনুভবকে যদি মনের মধ্যেই সীমিত রাখা হয় ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কোন কাজ না করা হয় তবে সমস্যা কোথায়? নবীর মনে তাঁর শত্রুর জন্য কি স্নেহ-মমতা ছিল না? তিনি কি তাদের প্রতি মনোদশার দিক থেকে মমতাশূন্য ছিলেন? এর হ্যাঁ-সূচক উত্তর তো রুমি বা তেরেসার জন্যও খাটে না—আর মুহম্মদ ও যীশু (আল্লাহ উভয়ের উপর শান্তি বর্ষণ করুন) তো তাদের চেয়েও অনেক উচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত। যদি আমরা আন্তরিক স্নেহ ও স্নেহের বশে কৃত ক্ষতিকর কাজের মধ্যে ফারাক করি এবং যদি স্নেহকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে কার্যত অপ্রকাশিত রাখাকে অনুজ্ঞা বা আদেশ হিসেবে নেই তবে এই সুরার ১ থেকে ৯নং আয়াত, নবীর জীবন, কোরানের সামগ্রিক শিক্ষা, ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকল মহান চিন্তার সাথে চমৎকার সঙ্গতি আমরা পাই।

২.১৪। ভাল ও সুন্দরের দিকে সঙ্গত ব্যাখ্যা কি ভাল? নাকি ঘৃণা ও শত্রুতার সমর্থনে অসঙ্গতিপূর্ণ ব্যাখ্যা ভাল? সবচেয়ে বড় কথা: এ আয়াতগুলো থেকে কোন অসঙ্গত ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করে ভালবাসাকে নিষিদ্ধ করা গেলেও ঘৃণাপন্থীরা কোন ভাবেই ঘৃণা করার বৈধতায় উপনীত হতে পারবেন না—বড়জোর বলতে পারবেন, ভালবেসো না। তারা যদি বলেন, ভাল না বাসার অবধারিত অর্থ হলো ঘৃণা করা, তাহলে এটি হবে একটি অবৈধ উল্লফন। এই অর্থ মনের প্রকৃতিকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করে না। মানুষের পক্ষে ভালবাসা ও ঘৃণা দুটো থেকেই একই সাথে শূন্য হওয়াও সম্ভব—যে দশাকে বলা হয় বৈরাগ্য দশা।

১.১৫। বন্ধুত্ব বা প্রতিরক্ষা মৈত্রী (‘ওয়ালা’) আদর্শ, তত্ত্ব, ধর্ম, মত, দর্শন এসবের উপর প্রতিষ্ঠিত—সুরাটির ১, ৮ ও ৯নং আয়াত তিনটি থেকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। এখানে বিষয়টি অত্যাচারের ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। প্রথম আয়াতে যে অস্বীকৃতির কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে নবীকে অস্বীকার করা, তাঁর উপস্থাপিত স্বাধীনতা, সাম্য, অহিংসা, মমতা ও ন্যায়ের মূল্যমানকে অস্বীকার করা। এরূপ অস্বীকৃতির মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করেছে মুসলিমদের থেকে। এই সুস্পষ্টভাবে কৃত বিচ্ছিন্নতা একটি যুক্তি হিসেবে এসেছে বন্ধুত্ব করার বিপক্ষে—অর্থাৎ যারা নিজেরাই দূরে সরে গেছে তাদের প্রতি মমতার এমন প্রকাশ, যা তোমাদেরকে বিপন্ন করে তুলছে, তার ন্যায্যতা নেই। অপরদিকে, যারা নবীকে গ্রহণ না করেও অন্তত অহিংসার নীতিকে লঙ্ঘন করেনি তাদের বেলায় একই নীতি প্রযোজ্য হয় না—যে কথা ৮নং আয়াতে বলা হয়েছে।

(অসমাপ্ত)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী