ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

৩.১। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে সুরা মুমতাহানা’র প্রথম নয় আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে বিষয়টি ছিল ‘ওয়ালা’। আজ আমি কোরানের ৩নং সুরা আলে ইমরান’য়ের ১১৮নং আয়াত, ১১৯নং আয়াতের প্রথম বাক্য ও ১২০নং আয়াত নিয়ে আলোচনা করব। সম্পূর্ণ ১১৯নং আয়াত নিয়ে আমি ভবিষ্যতে আলোচনা করতে ইচ্ছুক। ১১৮নং আয়াতের বিষয় হচ্ছে ‘বিতানা’, যার অর্থ করা হয়েছে ‘অন্তরঙ্গ বন্ধু’। আমরা দেখতে চেষ্টা করব এর প্রকৃত তাৎপর্য কী।

৩.২। “হে বিশ্বাসীরা, তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে ব্যতীত অন্যকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের অনিষ্ট সাধনের সুযোগ পরিহার করে না, যা তোমাদের বিপন্ন করে তা তারা কামনা করে। তাদের মুখ থেকে বিদ্বেষ নিশ্চয়ই প্রকাশিত হয় এবং তারা যা অন্তরে লুক্কায়িত রাখে তা বৃহত্তর। আমরা চিহ্নসমূহ তোমাদের জন্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলাম, যদি তোমার চিন্তাশীল হয়ে থাক।” (৩:১১৮)

৩.৩। আমরা উপরের আয়াতে একটি মনোদশার সাথে পরিচিত হই। এই মন অন্যের অনিষ্ট সাধনের, তাকে বিভ্রান্ত করার, প্রতারিত করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না; অন্যকে বিপন্ন করার চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, কামনা ও বাসনা সে পোষণ করে। এই রকম মনের অধিকারীর মুখ থেকে বিদ্বেষ, ঈর্ষা, ঘৃণার প্রকাশ ঘটে বা সে তা ঘটিয়ে ফেলে। তার মনে বিদ্যমান প্রকৃত বিদ্বেষ আয়তনে আরও বিশাল, যা সে লুক্কায়িত রাখে।

৩.৪। আমরা এর আগে দ্বিতীয় অংশে সুরা মমতাহানা’র প্রথম আয়াত বিশ্লেষণকালে দেখেছিলাম ঠিক এর বিপরীত মনোদশা। বিশ্বাসী তার শত্রুর জন্য অন্তরে বিশালায়তন মমতা লালন করে। কিন্তু নিরাপত্তার স্বার্থে সে তার মমতার কিছু অংশ লুক্কায়িত রাখে। মাঝে মাঝে সে নিজের নিরাপত্তার ক্ষতি করে তা প্রকাশ করে ফেলার ভুলটি করে বসে। বিশ্বাসীদের এই মনোদশার বিপরীত দশাসম্পন্ন মন তার মধ্যে বিদ্যমান বিশাল বিদ্বেষটি লুকিয়ে রাখে, ভ্রান্তিবশত বা অসতর্কতাবশত কিছু অংশ সে প্রকাশ করে ফেলে।

৩.৫। মুমতাহানা’য় বিশ্বাসীদের বেলায় ‘তুসির্‌রু’ শব্দটি ও বর্তমান আয়াতে ‘তুখফি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। উভয় শব্দের অর্থ ‘লুক্কায়িত করা’। ‘সির’ হচ্ছে এমন গুপ্ততা যা লক্ষ্যের দিকে বা বিষয়ের দিকে ধাবিত হতে চায়, তার কাছে প্রকাশিত হতে চায়। আর ‘খফি’ হচ্ছে এমন গুপ্ততা যা উৎসের মধ্যে সংকুচিত থাকতে চায়, বিষয়ের কাছে প্রকাশিত হতে চায় না। এক স্থানে ভ্রান্তির উৎস মমতা ও অন্য স্থানে ভ্রান্তির উৎস বিদ্বেষ। ভ্রান্তির উৎসের ও প্রবাহদিকের বৈপরীত্য এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মমতা ও বিদ্বেষ জলে ভাসমান হিমখণ্ডের মতো; তবে পার্থক্যটি হচ্ছে মমতা ভেসে উঠতে চায় ও বিদ্বেষ ডুবে থাকতে চায়। আবার এটাও বলা যায়, মমতা অসতর্ক হলে নিজের ক্ষতি করে, বিদ্বেষ অসতর্ক হলে অন্যের ক্ষতি করে। মমতা যত বেশী হয় অন্যের অত্যাচার তত বেশী সহ্য করে; বিদ্বেষ যত বেশি হয় অন্যে তত বেশি অত্যাচারের শিকার হয়।

৩.৬। ‘অন্তরঙ্গ বন্ধু’ বুঝাতে এখানে ‘বিতানা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ‘বিতান’ অর্থ বস্ত্রের অভ্যন্তর তল যা পরিধানকারীর গায়ের সাথে লেগে থাকে। বিশ্বাসীদেরকে যারা রোধ ও বিনাশ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য এবং বিশ্বাসীরা নিজেদেরকে যেভাবে গড়ে তুলতে চায় তা যারা বানচাল করতে চায়, তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিশ্বাসীরা বিশ্বস্ত ব্যক্তিদেরকেই নিজেদের কাজের সংবেদনশীল পদগুলোতে বসাবে, অন্যদেরকে নয়। এটি এমন একটি নীতি যা সকলেই অনুসরণ করে। কেউ আশা করতে পারে না যে, ভারতীয়রা এমন ব্যক্তিকে এরকম পদে বসাবে যে ভারতের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সব দেশের সামরিক বাহিনী ও সরকার এই নীতি মেনে চলে।

৩.৭। এখানে বিদ্বেষের কথা মুখে প্রকাশিত হওয়াকে অন্তরে বিদ্বেষের অস্তিত্বের বিদ্যমানতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। যে বা যারা এরূপ করে তাদের মধ্য থেকে বা এরূপ কাজ যারা করে তারা যাদের অংশ তাদের মধ্য থেকে কাউকে ‘বিতান’ হিসেবে বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে না নিতে বলা হয়েছে। এটি কোন জাতি বা সম্প্রদায়ের অবধারিত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়নি, বা ভবিষ্যৎ বাণী হিসেবে বলা হয়নি। তখনকার মুসলিমদের মধ্যে এমন অনেক ব্যক্তি ছিল যারা বিশ্বাসী হওয়ার দাবী করা সত্ত্বেও নবীর প্রতি বিদ্বেষের লক্ষণ বাচন ও আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করে ফেলেছিল। তাদের বেলায় ও তারা যাদের সাথে নৈকট্য বজায় রাখে তাদের জন্য এই আদেশ প্রযোজ্য হয়। ‘তোমাদের মধ্য থেকে’ কথাটির যুক্তিসঙ্গত তাৎপর্য হচ্ছে ‘তোমাদের অনুরূপ’—অর্থাৎ যারা বিশ্বস্ত, বিশ্বাসভঙ্গকারী নয়, কপট হওয়ার লক্ষণযুক্ত নয়, বিদ্বেষপরায়ণ নয়, ইত্যাদি।

৩.৮। মুমতাহানা’য় ওয়ালা’র ক্ষেত্রে অত্যাচারকে কেন্দ্র করে কথা আবর্তিত হয়েছে। এখানে ‘বিতানা’র কথা এসেছে এবং বিদ্বেষের বাচনিক প্রকাশকে কেন্দ্র করে কথা আবর্তিত হয়েছে। ‘ওয়ালা’র ক্ষেত্রে যারা নবীকে না মেনেও অত্যাচার থেকে বিরত থাকে তাদের বেলায় বিষয়টি মুসলিমদের সুবিবেচনার কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিতানা’র বেলায় সেসব মুসলিম বাদ পড়ে যাচ্ছে যাদের বিশ্বস্ততা প্রশ্নবিদ্ধ। ‘ওয়ালা’ বাইরের সাথে সম্পর্কের বিষয়, আর ‘বিতানা’ প্রধানত মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

৩.৯। “লক্ষ্য কর! তোমরা তো তারা যারা তাদেরকে ভালবাসে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না। …” (৩:১১৯)

৩.১০। এখানে স্পষ্টতই দেখা যায় যে, বিশ্বাসীরা মুসলিমদের, অন্য ধর্মাবলম্বীদের, এমনকি তাদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ ও তাদের ক্ষতিসাধনে পিয়াসিদেরকেও ভালবাসে। কারও প্রতি তারা বিদ্বেষপরায়ণ হয় না, কারও ক্ষতি করে না, কারও সাথে প্রতারণা করে না। এখানে ‘মাহাব্বা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ভালবাসা বা প্রেম। যুক্তিটা হচ্ছে: তোমরা তাদেরকে ভালবাস—এই বাস্তবতা সত্ত্বেও তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না, ভালবাসতে নারাজ। তোমরা তাদের প্রতি বিশ্বস্ত—এই বাস্তবতা সত্ত্বেও ওরা তোমাদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ। আর কত করবে? এই যদি অবস্থা হয় তবে তাদেরকে তোমরা তোমাদের কার্যাবলীতে এমন স্থান কেন দেবে যেখানে মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ও বিশ্বস্ত মানুষের অধিষ্ঠান আবশ্যক? এখানে ভালবাসা প্রত্যাহারের কোন আদেশ দেয়া হয়নি। বরং তা বিশ্বাসীদের মনে ভালবাসার অস্তিত্বের—যা প্রকৃত ও কাম্য অবস্থা—বিবরণ মাত্র। বিশ্বাসীদেরকে বলা হয়েছে ভালবাসার বশে ক্ষতিসম্ভব পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার জন্য।

৩.১১। উপরের আয়াতগুলো সাধারণত যেভাবে বুঝা হয়ে থাকে: হে ঈমানদারেরা, তোমরা ‘বেইমান’দের সাথে বন্ধুত্ব করবে না; তাদের প্রত্যেকেই অবধারিতভাবে তোমাদের ক্ষতি করবে, তোমাদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ থাকবে; তোমাদের মনে তাদের জন্য ভালবাসা থাকাটাই অপরাধ; তারা যখন তোমাদেরকে ভালবাসে না তখন তাদেরকে ভালবাসার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। এই ধরণের ব্যাখ্যা করাটা কোরানের প্রতি একটি চরম অবিচার।

৩.১২। “যদি তোমাদের মঙ্গল হয় তবে তাতে তারা বিমর্ষ হয়; আর যদি তোমরা বিপন্ন হও তবে তাতে তারা হর্ষোৎফুল্ল হয়। যদি তোমরা ধৈর্যশীল হও ও সজাগ থাক তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করছে আল্লাহ তা বেষ্টন করে আছেন।” (৩:১২০)

৩.১৩। উপরের আয়াতে আমরা অসুন্দর ও অশুভ মনোদশার আরেকটি চিত্র পাই। অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষের পোষকরা অন্যের মঙ্গলে অখুশি হয় আর বিপদে উল্লসিত হয়। এর বিপরীতে আল্লাহ সুন্দর ও বীরোচিত মনের চিত্র এঁকেছেন। এখানে দুটো গুণ ও একটি চিন্তার কথা বলা হয়েছে: (ক) ধৈর্য বা মানসিক দৃঢ়তা, (খ) সচেতনতা, সতর্কতা, সজাগতা এবং (গ) আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা। এই (গ)-তে উল্লেখিত চিন্তনীয় বিষয়টি হচ্ছে: হিংসার বিপরীতে বিশ্বাসীরা পাল্টা হিংসা-বিদ্বেষের পথ, নিষ্ঠুরতার বিপরীতে পাল্টা নিষ্ঠুরতার পথ অবলম্বন করে না; তারা ধৈর্য ধরে, সজাগ থাকে এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করে। যেসব মানুষ মনে করে যে, হিংসুকদেরকে আল্লাহ নয়, শয়তান সৃষ্টি করেছে, প্রতিপালন করছে, তাদের প্রকৃতি শয়তান নির্ধারণ করেছে এবং তাদের উপর আল্লাহর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, সেসব মানুষ অহিংসা, মমতা ও ন্যায়ের ধর্মের নীতি লঙ্ঘন করে নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে চায়।

(অসমাপ্ত)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী