ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 
৪.১। আজকের আয়াতটি হচ্ছে কোরানের পঞ্চম সুরা মায়েদা’র ৫১নং আয়াত যা ঘৃণাপন্থীদের নিকট খুবই প্রিয় একটি আয়াত। তারা প্রসঙ্গ বা কনটেক্সট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে আয়াতটিকে উপস্থাপন করে থাকেন। এই আয়াতের তাৎপর্য বুঝতে হলে মদিনায় নবীর রাষ্ট্রের তখনকার কাঠামোটি বুঝতে হয়। তদানীন্তন আরবের সমাজ কাঠামোটি ছিল গোত্রভিত্তিক—গোত্র ছিল সার্বভৌম, ব্যক্তি তার নিরাপত্তা পেত স্বগোত্রের নিকট থেকে এবং প্রতিরক্ষার জন্য আন্তঃগোত্র মৈত্রী (ওয়ালা) চুক্তির প্রচলন ছিল। মদিনায় গিয়ে নবী বিভিন্ন বিশ্বাসী, ইহুদি ও সনাতন আরব গোত্র নিয়ে একটি কনফেডারেশন তৈরি করেছিলেন। এই কনফেডারেশন প্রতিরক্ষা মৈত্রী চুক্তিতে —এটাই নবীর মদিনা সনদ—আবদ্ধ ছিল, বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষায় পরস্পরকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে। এই কনফেডারেশনের অন্তর্গত গোত্রসমূহের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে নবী ছিলেন চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী। সুদক্ষ আরবিট্রেটর ও নেগোশিয়েটর হিসেবে নবী বহু আগে থেকেই প্রসিদ্ধও ছিলেন। আয়াতটি নীচে বিবৃত করা হলো।

৪.২। “হে বিশ্বাসীরা, তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে নিও না—তাদের মধ্যে কেউ কেউ একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্য থেকে যে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে নেবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্যায়কারী সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।” (কোরান ৫:৫১)

৪.৩। বিবদমান গোত্রসমূহের মধ্যে নিজেদের মাধ্যমে বা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গোত্রের মাধ্যমে নিষ্পত্তি অসম্ভব হয়ে উঠলে নবী নিষ্পত্তি করতেন। বিরোধের প্রকৃতি বুঝে সুবিধাজনক বিচারকের কাছে যাওয়ার প্রবণতা ছিল চুক্তিতে আবদ্ধ কোন কোন ইহুদি গোত্রের মধ্যে (দেখুন ৫:৪২)। যেহেতু ইহুদিদের নিজেদেরই গ্রন্থ ও আইন ছিল তাই তাদের নিজেদের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি তারা নিজেরাই করতে সক্ষম হবে এটা প্রত্যাশিত ছিল (দেখুন ৫:৪৩)। কিন্তু তারপরও কোন কোন ইহুদি গোত্র ক্ষেত্র বুঝে নবীকে সুবিধাজনক মনে করলে সরাসরি তাঁর কাছে বিচারের আবেদন করে বসত।

৪.৪। সুরা মায়েদা’র ৪১ থেকে ৫৩নং আয়াতে এই প্রেক্ষিতটি ও এই প্রেক্ষিতে নবীর কর্তব্য কী তা পরিষ্কার করা হয়েছে। নবী স্বীয় বিবেচনা অনুসারে সম্ভব হলে এরূপ বিচারের আবেদন ফিরিয়ে দিতে পারেন অথবা আবশ্যক ক্ষেত্রে তা সম্পন্ন করবেন (দেখুন ৫:৪৩)। ওয়ালা’র ক্ষেত্রে বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য এপ্রোচটি হচ্ছে—কোন এক পক্ষের হয়ে নেগোশিয়েট করা। এখানে অপর পক্ষের সাথে প্রতিরক্ষা মৈত্রী থাকে না। এখানে বলা দরকার যে, কারও পক্ষে নেগোশিয়েট করার অধিকার মানে অন্যায় করার ছাড়পত্র নয়। তবে নিরপেক্ষ বিচার এবং কারও পক্ষে নেগোসিয়েশন বা আরবিট্রেশনও এক কথা নয়। বর্তমান ক্ষেত্রে যেহেতু উভয়েই কনফেডারেশনের অংশ তাই নবী কোন বিশ্বাসী গোত্রের স্বার্থ রক্ষার্থে বিবদমান দুই ইহুদি গোত্রের মধ্যে একটির প্রতি আনুকূল্য করতে পারেন না—অর্থাৎ কারও জন্য ওয়ালির ভূমিকা নিতে পারেন না। আল্লাহ নবীকে ন্যায় বিচার করতে বলছেন—এতে বিশ্বাসী গোত্রের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। আর যেহেতু ইহুদিরা তাদের বিবাদ নিজেরা তাদের আইন অনুসারে নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হচ্ছে তাই তাদের আর এই প্রত্যাশার যুক্তি নেই যে, নবী তাদের আইনে বিচার করবেন। আল্লাহ নবীকে নতুন আইনের ভিত্তিতে মীমাংসা করতে বলছেন। (দেখুন ৫:৪৯)

৪.৫। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলছেন যে, তিনি ইহুদিদেরকে আলোকবর্তিকা ও পথনির্দেশনা হিসেবে তোরাহ দিয়েছেন—তাদের কর্তব্য সেটি অনুসরণ করা। তিনি খ্রিস্টানদেরকে আলোকবর্তিকা ও পথনির্দেশনা হিসেবে গসপেল দিয়েছেন—তাদের কর্তব্য সেটি অনুসরণ করা। আর নবীকে আল্লাহ আলোকবর্তিকা ও পথনির্দেশনা হিসেবে কোরান দিয়েছেন—তাঁর কর্তব্য কোরান অনুসরণ করা। (দেখুন ৫:৪৪-৪৫)

৪.৬। এদিকে আবার বিশ্বাসী গোত্রগুলোর মধ্যে বিশেষত কপটদের মধ্যে কোন কোন গোত্র এই বা ঐ ইহুদি গোত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল বা আভ্যন্তরীণ সমঝোতায় ছিল। ফলে নবীর নিষ্পত্তিতে তাদের এই সম্পর্ক প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। (দেখুন ৫:৫২-৫৩)

৪.৭। যদি নবী এক্ষেত্রে বিশ্বাসী কোন গোত্রের স্বার্থ চিন্তা করে অথবা নিজ থেকে কোন বিশেষ ইহুদি গোত্রের পক্ষে নেগোশিয়েট করেন তবে সেই গোত্রকে ওয়ালি বা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, কনফেডারেশনের অন্তর্গত গোত্রসমূহের বেলায় বরং বিশ্বাসী গোত্রের স্বার্থই অস্বীকৃত হচ্ছে—অর্থাৎ আল্লাহর বিধানেই নবী বিশ্বাসী গোত্রটির বন্ধুর মত কাজ করতে পারছেন না। যারা ‘ওয়ালা-ওয়ালা’ নিয়ে একচোখাভাবে চিৎকার করে মরছেন তাদের এই বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। আমি আগামীতে কোরানের আরেকটি আয়াত নিয়ে আলোচনা কালে দেখাতে চেষ্টা করব যে, এমন অবস্থা হওয়া সম্ভব যেখানে একটি বিশ্বাসী গোত্র নবীর কনফেডারেশনে সঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য কারণেই যোগ দিচ্ছে না এবং নবীকে কনফেডারেশনের চুক্তিমূলে ইহুদি গোত্রের পক্ষ নিয়ে সেই বিশ্বাসী গোত্রটির বিরুদ্ধে নেগোশিয়েট করতে উদ্যোগী হতে হবে। কিন্তু এ অবস্থাতেও বিশ্বাসী গোত্রটিকে কোরানের আদর্শ থেকে বিচ্যুত বা পথভ্রষ্ট বলা যাবে না।

৪.৮। ইহুদিদের যেমন নিজেদের গ্রন্থ ও আইন আছে, একই রকম ভাবে খ্রিস্টানদেরও নিজস্ব গ্রন্থ ও আইন আছে। বাস্তবে সমস্যাটি বেঁধেছিল দুই ইহুদি গোত্রের বিবাদ নিয়ে, কিন্তু তাদের সাথে খ্রিস্টানদের সম্ভাব্য কেইস সমরূপ হওয়ায় আয়াতে নির্দেশনা হিসেবে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কথা একসাথে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ মুসলিমদেরকে গ্রন্থধারীদের সাথে আভ্যন্তরীণ কোন চুক্তি বা সমঝোতায় না যেতে মুসলিমদেরকে বলছেন।

৪.৯। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচারে এ আয়াত কনফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বেলায় প্রযোজ্য। এর ব্যাপক অর্থ এই অবস্থার সমরূপ অবস্থার বেলাতেই সীমাবদ্ধ। যদি এই আয়াতের অর্থ তা-ই হয় যা আমাদের ঘৃণাপন্থী ভাইয়েরা করে থাকেন, তবে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা যায়: এই আয়াত পেয়ে নবী কি কনফেডারেশনের ইহুদী গোত্রগুলোকে কনফেডারেশন থেকে বের করে দিয়েছিলেন? তিনি কি তাদেরকে বলেছিলেন যে, পূর্বের মৈত্রী চুক্তি এখন বাতিল করা হল?

৪.১০। ইহুদিরা কনফেডারেশনে থাকার কারণে নবী মুসলিম গোত্রের স্বার্থকে উপেক্ষা করছেন। ইহুদিরা ইহুদিদের বন্ধু হলে অথবা, প্রসঙ্গত উল্লেখ, খ্রিস্টানরা খ্রিস্টানদের বন্ধু হলে অথবা ইহুদি-খ্রিস্টানরা পরস্পরের বন্ধু হলে দোষের কিছু হয় না—যেমন দোষের হয় না যদি মুসলিমরা মুসলিমদের বন্ধু হয়। এখানে ‘তাদের মধ্যে কেউ কেউ একে অপরের বন্ধু’ কথাটা দোষের বর্ণনা নয়, স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত বাস্তব অবস্থানের বর্ণনা। কিন্তু মুসলিমদের বেলায় সমস্যাটি হচ্ছে এখানে যে, প্রধান নিষ্পত্তিকারী বিচারক তাদের নিকটবর্তী, যেহেতু নবীও বিশ্বাসী এবং বিশ্বাসীদের নেতা। তাই বিশ্বাসীরা ইহুদি বা খ্রিস্টানদের বন্ধু হলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হয়। এবং ইহুদি-খ্রিস্টানদের কারও কারও মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থাকায় তাদের কারও সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক আন্তঃগোত্র স্বার্থের জটিলতাকে আরও বৃদ্ধি করে।এখানে নীতিটি এরকম: বন্ধুদের কাউকে বন্ধু হিসেবে নিও না—যেখানে বন্ধু অর্থ বা বন্ধুত্বের বিস্তৃতি দু’খানে দুরকম; অর্থাৎ, সকল বন্ধুর সাথে বন্ধুত্বে সমরূপতা বজায় রাখ।

৪.১১। নবীর সাথে কনফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত থেকে এমন সম্পর্ক কেবল মাত্র কপট মুসলিম গোত্রগুলোই করতে আগ্রহী হবে—কারণ তাদের অন্য গোপন এজেন্ডা থাকে। বিশ্বাসীদের জন্য নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে কনফেডারেশনই যথেষ্ট। ইহুদিদের সাথে বন্ধুত্বের পক্ষে সংশ্লিষ্ট মুসলিম গোত্র নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাকে যুক্তি হিসেবে পেশ করেছিল, যা আল্লাহ প্রত্যাখ্যান করছেন (দেখুন ৫:৫২-৫৩)। যদি নবীর নিরপেক্ষ বিচারে কোন বিশ্বাসী গোত্রের বন্ধু ইহুদি গোত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাতে তাদের বন্ধুত্ব ক্ষুণ্ণ হয়, বা অন্য কোন ভাবে বিশ্বাসী গোত্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে তার দায় বিশ্বাসী গোত্রের উপরই বর্তাবে। ‘তোমাদের মধ্য থেকে যে তাদেরকে বন্ধু হিসেবে নেবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলেই গণ্য হবে’ কথাটির প্রাসঙ্গিক অর্থ এটাই।

৪.১২। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এই আয়াত কোন ‘আম’ বা সাধারণ আদেশ না—এটি একটি কনফেডারেশনে বিচারিক ক্রিয়া ও তার ফলজনিত জটিলতা হ্রাসের প্রক্রিয়া। কিন্তু যারা ঘৃণার তত্ত্ব প্রচার করেন তাদের কাছে তাদের অপব্যাখ্যাসহ এই আয়াত খুবই উপাদেয় হয়ে আছে। তাদের অন্তরে কী আছে তা তারাই ভাল জানেন। তবে এই আয়তের অপব্যাখ্যা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার যৌক্তিক বিশ্লেষণ আমরা নিশ্চয়ই করতে পারি। সেটি হলো, এটা মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মানুষকে পশ্চিমের সাধারণ মানুষের মুখোমুখি করে তুলতে পারে; পশ্চিমের সকল সাধারণ মানুষের প্রতি মুসলিমদেরকে বিদ্বিষ্ট করে তুলতে পারে। যাদের মধ্যে বিদ্বেষকে কাজে লাগানো ছাড়া অন্য কিছু করার সামর্থ্য নেই তারা বিদ্বেষকে উস্কানি দিয়ে মানুষকে সঞ্চালিত করতে চায়। এদের নিকট এরূপ অপব্যাখ্যা খুবই উপযোগী বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে তারা যে পশ্চিমের সাধারণ মানুষের সামনে আল্লাহর মমতা ও ন্যায়ের ধর্মকে বিকৃত করে ভয়ংকর রূপে তুলে ধরছেন সেদিকটি তাদের বিচার করে দেখা উচিৎ।

আল্লাহ সকল নবী ও রাসুলের উপর শান্তি বর্ষণ করুন।

(অসমাপ্ত)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী