ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

৫.১। “বিশ্বাসীরা যেন বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে যারা বিশ্বাস করে না তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। যে এরূপ করবে তার জন্য আল্লাহর নিকট থেকে কিছু থাকবে না। তবে ব্যতিক্রম থাকল, যদি তোমরা তাদের কাছ থেকে আশংকা কর। কিন্তু আল্লাহও তোমাদেরকে সতর্ক করছেন তাঁর নিজ সম্পর্কে; এবং আল্লাহর দিকেই চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন।” (কোরান ৩:২৮)

৫.২। “নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করেছে ও দেশ ছেড়েছে, আদর্শের জন্য আল্লাহর নির্ধারিত পন্থায় সংগ্রাম করেছে সম্পদ ও জীবন দিয়ে, এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সহায়তা করেছে তারা পরস্পরের প্রতিরক্ষী বন্ধু। তবে যারা বিশ্বাস করেছে কিন্তু দেশ ছাড়েনি তাদের প্রতিরক্ষার জন্য তোমাদের উপর কোন মাত্র দায়িত্ব নেই, যতক্ষণ না তারা দেশ ছেড়ে আসছে। কিন্তু তারা যদি ধর্মের বিষয়ে তোমাদের সহায়তা প্রার্থী হয় তবে তাদের সহায়তা করা তোমাদের উপর কর্তব্য হিসেবে থাকবে। তবে যেসব সম্প্রদায়ের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে সেসব চুক্তির পরিপন্থীভাবে তোমরা তা-ও করবে না। তোমরা যা কর আল্লাহ তার দর্শক।” (কোরান ৮:৭২)

৫.৩। আমরা ‘ওয়ালা’ বা প্রতিরক্ষামূলক বন্ধুত্ব বিষয়ে একটি নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলাম সুরা মুমতাহানার নয়টি আয়াতে—সে আয়াতগুলো ছিল বিস্তারিত ভাবে নীতি নির্ধারণী আয়াত—যেখানে অত্যাচারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং যারা অত্যাচার করে না তাদের সাথে দয়ার্দ্র ও ন্যায়ানুগ পন্থা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ অত্যাচারীদের সাথে দয়ার্দ্র ও ন্যায়ানুগ পন্থা পরিহার করতে বলেননি, বলেছেন কেবল প্রতিরক্ষা চুক্তিতে না যাওয়ার জন্য। আর দ্বিতীয় গ্রুপের সাথে তিনি বন্ধুত্ব করার আদেশ দেননি, কারণ এরূপ আদেশের কোন কার্যকারিতা নেই, যেহেতু তারা নবীকে প্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেননি। কাজেই বিষয়টি রয়ে গেল অপর পক্ষের ইচ্ছা এবং মুসলিমদের বিবেচনার উপর। কিন্তু আমরা এখান থেকে যা স্পষ্টভাবে পেলাম তা হলো, অত্যাচারী ও ন্যায়পরায়ণ নির্বিশেষে এবং ধর্ম নির্বিশেষে মমতার দৃষ্টিতে সকল মানুষকে দেখার মনোভাবটি আল্লাহ মুসলিমদের জন্য বাতিল করছেন না।

৫.৪। কিন্তু উপরে উল্লেখিত প্রথম আয়াতে (কোরান ৩:২৮) বিশ্বাসীদের বদলে, অর্থাৎ তাদের বাদ দিয়ে, অর্থাৎ তাদেরকে অগ্রাধিকার না দিয়ে যারা বিশ্বাস করে না তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে বিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ মানা করছেন। যারা এরূপ করবে তাদের প্রতি প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আল্লাহর কোন মাত্র দায়িত্ব থাকবে না—অর্থাৎ নবীর বা অপরাপর বিশ্বাসী গোত্রগুলোর কোন দায়িত্ব থাকবে না, অর্থাৎ তারা আক্রান্ত হলে অপরাপর বিশ্বাসীরা তাদের রক্ষা করতে বাধ্য থাকবে না। অর্থাৎ তখন তারা ‘আমরা তোমাদের মতো বিশ্বাসী, কাজেই আমাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য’ এমন দাবী নিয়ে তারা সাহায্য চাইতে পারবে না, এবং সাহায্য করতে অপারগ হলে অপরাপর বিশ্বাসীদেরকে দায়ী করা যাবে না, বা দায়ী করা হবে না।

৫.৫। তবে এখানে একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। অবস্থানগত কারণেই হোক বা অন্য যে কোন বাস্তবতার নিরিখে ন্যায্য, উপযুক্ত, গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলে বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে যারা বিশ্বাস করে না তাদের সাথে প্রতিরক্ষা মৈত্রী করার অনুমতি বিশ্বাসীদেরকে দেয়া হয়েছে। এখানে বিবেচ্য বিষয়টি হচ্ছে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আশংকা। তবে আমরা সবাই যে আল্লাহর কাছে ফিরে যাব, তাঁর কাছে আমরা সবাই যে দায়বদ্ধ একথা যথাযথ ভাবে মনে রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবশ্যক। সুবিবেচনা, সুচিন্তা ও সুবিচার করেই সংশ্লিষ্ট বিশ্বাসী গোত্রকে এরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

৫.৬। তবে উপরে উল্লেখিত ৮:৭২ আয়াত থেকে আমরা পাই যে, ধর্ম বিষয়ে তারা সহায়তা চাইলে সহায়তা করা নবীর বা অন্য মুসলিমদের জন্য কর্তব্য হয়ে থাকবে। কিন্তু সেখানেও শর্ত থাকছে যে, নবী এই এরকম বিশ্বাসী গোত্রকে ধর্মের ক্ষেত্রেও সহায়তা করবেন না যদি এরূপ সহায়তা নবী কর্তৃক কৃত অন্য কোন মৈত্রী চুক্তির পরিপন্থী হয়। অর্থাৎ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সহায়তা সম্ভব না হলেও অনেক ক্ষেত্রে ধর্ম, অর্থনীতি, সংস্কৃতির অঙ্গনে সহায়তা সম্ভব। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সব ধরণের সহায়তাই অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে—বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে নানা পক্ষের চুক্তি অনুসারে।

৫.৭। বিশ্বাসী গোত্র অপরাপর বিশ্বাসী গোত্রের সাথেই প্রতিরক্ষা মৈত্রীতে আবদ্ধ হবে—এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু যদি কেউ অন্যরকম কিছু করে তবে সরাসরি বলে দেয়া যাবে না যে, তারা অন্যায় করেছে বা ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিরক্ষা মৈত্রীতে ‘ওয়ালা’ বিষয়টি সরল, সাদা-কালো বা একমাত্রিক কিছু নয়।

৫.৮। এখন এমন একটি হাইপথেটিক্যাল সিচুয়েশন চিন্তা করুন: মনে করুন, একটি গোত্র মদিনা থেকে বেশ দূরে বাস করছে এবং নবীর ধর্ম গ্রহণ করেছে। দূরত্বের কারণে নবীর পক্ষে কার্যকর ভাবে শক্তি প্রসারিত করা সম্ভব হচ্ছে না। নবীর কনফেডারেশনে যোগ দেয়া গোত্রটির নিরাপত্তার জন্য কার্যকরী কোন ব্যবস্থা বিবেচিত না হওয়ায় গোত্রটি ফেডারেশনে যোগ দিল না। সে তার নিরাপত্তার জন্য নবীর সাথে চুক্তি না করে পার্শ্ববর্তী কিছু গোত্রের—যারা বিশ্বাসী নয়—সাথে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হল। মনে করুন, কোন কারণে নবীর কনফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত এক ইহুদি গোত্রের সাথে সেই বিশ্বাসী গোত্রের বিবাদ বাধল এবং ইহুদি গোত্রটি নবীর আরবিট্রেশন প্রার্থনা করল। এ অবস্থায় কিন্তু নবীকে ইহুদি গোত্রটির পক্ষে বিশ্বাসী গোত্রটির বিপরীতে নেগোশিয়েট করতে হয়।

(অসমাপ্ত)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী