ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

৬.১। মুসার ধর্ম মূলত ও প্রধানত অহিংসার ধর্ম। তৌরাহ বলতে প্রধানত বুঝায় দশ অনুজ্ঞাকে। এর প্রথমটিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। দ্বিতীয়টিতে কোনরূপ প্রতিমা নির্মাণ করা থেকে ইহুদিদেরকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তৃতীয়টিতে আল্লাহকে লঘুভাবে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। চতুর্থটিতে যথাযথ ভাবে সাবাথ পালনের আদেশ রয়েছে। পঞ্চমটিতে আল্লাহ পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছেন। তারপর ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম অনুজ্ঞায় যথাক্রমে হত্যা করবে না, ব্যভিচার করবে না, চুরি করবে না, মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না এবং প্রতিবেশীর যা আছে তার প্রতি লোভাতুর হবে না মর্মে ইসরাইলীদেরকে আদেশ করা হয়েছে। এই শেষের পাঁচটি নেতিবাচক আদেশকে আমরা সামাজিক দিক থেকে অহিংসার পাঁচ মৌলিক অনুজ্ঞা হিসেবে দেখতে পারি। কাজেই তৌরাহ হচ্ছে অহিংসার কোড বা কিতাব, যা আল্লাহ মুসাকে দিয়েছেন।

৬.২। পরবর্তীতে আমরা যীশুর কথা হিসেবে মথির গসপেলে পেয়েছি, “এই কথা মনে কোরো না যে আমি তৌরাহ বা নবীদের বাতিল করতে এসেছি। আমি বাতিল করতে আসিনি, বরং পূর্ণ করতে এসেছি।” (মথি ৫:১৭)। অর্থাৎ অহিংসার নীতি, বা কোড বা আইন বা কিতাব যীশু বাতিল করেন নি, তিনি অহিংসার শিক্ষা বা নীতিকে আরও অগ্রসর করেছেন, পূর্ণ করেছেন। আর এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন গসপেল বা মমতার কোড বা নীতি বা কিতাব। যীশুর এই নতুন নীতির প্রকাশ রয়েছে বাইবেলের মথি, লুক, ইউহান্না প্রণীত বই তিনটিতে। লুক’য়ের বইয়ে যীশুর কথা হিসেবে লিখিত আছে, “তোমরা যারা শুনছ তাদের বলছি, তোমরা তোমাদের শত্রুদেরকে ভালবেসো, যারা তোমাদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ তোমরা তাদের মঙ্গল কোরো, যারা তোমাদের বিনাশ চায় তোমরা তাদের উন্নতি চেয়ো, যারা তোমাদের যন্ত্রণা দেয় তোমরা তাদের জন্য প্রার্থনা কোরো।” (লুক ৬:২৭-২৮)। ইউহান্নার বইয়ে আছে, যীশু বলছেন, “আমি তোমাদেরকে একটি নতুন আদেশ দিচ্ছি—তোমরা একে অন্যকে ভালবাসবে।” (ইউহান্না ১৩:৩৪)। আরও দেখুন মথি ৫:২১-২২, ৩৮-৪৮; লুক ২৯-৩৮। তৌরাহ’য়ের দশম অনুজ্ঞায় ছিল প্রতিবেশীর প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ না হওয়ার কথা আর যীশু শেখালেন প্রতিবেশীর প্রতি মমতা পোষণ করার কথা। এভাবে তিনি পূর্ণ করলেন অহিংসার নীতিকে, অহিংসার নীতিকে রূপান্তরিত করলেন মমতার নীতিতে।

৬.৩। আল্লাহ কোরানের ৫:৪৬ আয়াতে বলেন, “আমরা মেরি-পুত্র যীশুকে তার পূর্বে তৌরাহ’য় যা ছিল তার যথার্থতার সমর্থকরূপে ওদের [নবীদের] উত্তরসাধক করেছি এবং তাকে দিয়েছি গসপেল। এর মধ্যে আছে পথের দিশা ও আলো, যা তার পূর্বে তৌরাহ’য় যা ছিল তার যথার্থতা সমর্থন করে এবং যা ছিল সচেতনদের জন্য পথের দিশা ও উপদেশ।” যীশুর অগ্রসর শিক্ষার বা গসপেলের শিক্ষার বিবরণ আমরা পাই কোরানের ৫৭:২৭ আয়াতে। একটি মাত্র আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ গসপেল’য়ের সারবত্তাকে তুলে ধরেন এভাবে, “তারপর আমরা আমাদের বাণীর বাহকদেরকে একের পর এক পাঠিয়েছিলাম পূর্ববর্তীদের উত্তরসাধক হিসেবে। এবং উত্তরসাধক করেছিলাম মেরি-পুত্র যীশুকে। এবং আমরা তাকে দিয়েছিলাম গসপেল এবং তার অনুসারীদের অন্তরে স্থাপন করেছিলাম অনুকম্পা ও মমতা।”

৬.৪। আল্লাহ কোরানে আমাদেরকেও অহিংসা ও মমতার শিক্ষা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, এই কোরান তৌরাহ ও গসপেলকে বাতিল করে না, বরং তাদের যথার্থতাকে সমর্থন করে। তিনি কোরানের ৫:৪৮ আয়াতে বলেন, “এবং আমরা তোমার কাছে সত্যসহ গ্রন্থটি অবতীর্ণ করেছি, যা তোমার পূর্বে যা এসেছিল তার সংরক্ষণকারী।” তিনি ৩:৩ আয়াতে বলেন, “তিনি সত্যসহ তোমার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন যা পূর্বের গ্রন্থসমূহের সমর্থক-সংরক্ষক।” আরও দেখুন ২:৪১, ২:৯১, ২:৯৭, ৪৬:৩০, ৬১:৬ ইত্যাদি।

৬.৫। আল্লাহ কোরানের ৯০:১৭ আয়াতে সফল মানুষের চিত্র আঁকতে গিয়ে বলেছেন, “সেই সাথে যারা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরস্পরকে উৎসাহিত করে ধৈর্য ও মমতার দিকে।” আল্লাহ ১৯:৯৬ আয়াতে আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “যারা বিশ্বাস করে ও সৎ-ন্যায়ানুগ কাজে নিরত থাকে, মমতাবান তাদের উপর স্থাপন করবেন স্নেহ।” তিনি ৩:১৩৪ আয়াতে আরও উল্লেখ করেন, “যারা অনুকূল ও প্রতিকুল উভয় অবস্থায় ব্যয় করে, যারা ক্রোধকে সম্বরণ করে ও যারা মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল—আল্লাহ কল্যাণকারীদের ভালবাসেন।”

৬.৬। আল্লাহ আমাদেরকে অহংকার, মিথ্যাচার ও অত্যাচার পরিহার করতে আদেশ করেছেন। হত্যা, ব্যভিচার, চুরি, অশান্তি সৃষ্টি ও সম্পর্ক ছিন্ন করতে তিনি আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদেরকে ধৈর্য ধরতে ও মমতার অধিকারী হতে বলেছেন। এখানে তিনি ধর্ম-জাতির ভিত্তিতে মানুষে মানুষে পার্থক্য করেননি। কোরানে ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, স্নেহ ও মমতার যে ইতিবাচক নির্দেশনাগুলো রয়েছে তা সবই ধর্মভিত্তিক সীমা থেকে মুক্ত, শর্ত থেকে মুক্ত। স্নেহ-মমতা ও ক্ষমাশীলতার আদর্শ আল্লাহ কেবল মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলেননি, সকল মানুষের প্রতি প্রসারিত করতেই বলেছেন। মমতা ও ক্ষমাশীলতার চোখে সকল মানুষের দিকে তাকানো ও তাদের সম্মুখীন হওয়াই আল্লাহর শিক্ষা—তা তারা ভালই হোক বা মন্দই হোক, মুহম্মদের নবুওয়তে বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক। তাছাড়া, দানশীলতা ও সদাচারের যত আয়াত কোরানে রয়েছে সেখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভিত্তিতে সীমা টানা হয়নি।

৬.৭। আমি এর আগের লেখায় ৫.৩ অনুচ্ছেদে বলেছিলাম যে, আল্লাহ সুরা মুমতাহানা’য় সকল মানুষের প্রতি মমতার নীতি তিনি অত্যাচারীদের বেলায় বাতিল করেননি। এখানে বাতিল না করা বলতে আমি কী বুঝাতে চেয়েছিলাম? যা আগে বলবত হয় তা-ই কেবল বাতিল হতে পারে। দুটি দিক থেকে এর উত্তর রয়েছে। প্রথমত: আল্লাহ যীশুর গসপেল বা মমতার নীতি কোরান দ্বারা সংরক্ষণ করেছেন। আর দ্বিতীয়ত: আল্লাহ মুহম্মদের বেলায় শুরু করেছিলেন যীশুর নীতি থেকে। অর্থাৎ আল্লাহ এই নীতি কোরানের মাধ্যমে মক্কার মুসলিমদেরকে প্রথমে শিখিয়েছিলেন এবং মদিনায় প্রতিরক্ষার স্তরে গিয়ে মমতাকে কার্যকর পথে পরিচালিত করার জন্য ওয়ালা (এবং বিতানা’র ক্ষেত্রেও) নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন—এইটুকু নিয়ন্ত্রণও আবার কর্মগত; চিন্তা থেকে, বিচারশীলতা থেকে অবলম্বনীয় বা নির্বাচনীয় কর্ম—এটা এক্ষেত্রেও মমতাকে মন থেকে অপসৃত করা নয়। মদিনাতেও আল্লাহ প্রতিরক্ষার আয়াতের সাথে সাথে পূর্বের ন্যায় ক্ষমা, ধৈর্যশীলতার অবারিত নির্দেশ সম্বলিত আয়াতেরও পুনরাবৃত্তি করে চলেছিলেন।

৬.৮। মমতা প্রকাশক ক্রিয়াপরতায় আল্লাহ বিশ্বাসীদেরকে প্রোএকটিভ হতে বলেছেন, তিনি সম্পদ থেকে অন্যের জন্য ব্যয় করতে বলেছেন, সম্পদের উত্তম অংশ অন্যকে দিতে বলেছেন, যা নিজের জন্য ভালবাস তা অন্যের জন্য ব্যয় করতে বলেছেন—অর্থাৎ ভালবাসা ও স্নেহকে হাত পর্যন্ত বিস্তৃত করতে বলেছেন। তিনি এবার মানুষকে উদ্যোগী হতে বলছেন, মমতার প্রকাশে সমস্ত সত্ত্বাকে কার্যত ব্যবহার করতে বলছেন। আল্লাহ এবার বলছেন যে, তিনি তাদের উপর ধৈর্য ও স্নেহকে স্থাপন করবেন। তাদের উপর, অর্থাৎ তাদের সমগ্র সত্ত্বার উপর—অর্থাৎ তাদের চিন্তা, কর্ম, প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, সংগ্রাম, তাদের অন্তর, তাদের ধনসম্পদ সব কিছু মমতার, স্নেহের প্রকাশ ঘটাবে। যীশুর মমতার নীতি এখানে বীরোচিত সক্রিয়তায়, কর্মশীলতায় ও সম্পদ ব্যয়ের নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে—যা অত্যাচারীদের প্রাধান্যের বিপরীতে নয়, বরং নিজ থেকে স্বাধীনভাবে অগ্রসর হওয়ার বিষয়—যা অভিযান বা এন্টারপ্রাইজের মত।

মুসা, যীশু ও মুহম্মদ সহ সকল নবী ও রাসুলের উপর এবং তাঁদের দেখানো অহিংসা ও মমতার পথ অবলম্বনকারীদের উপর মমতাবান আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন; তাদের সমৃদ্ধি দান করুন; হিংসা, প্রতিহিংসা ও অত্যাচারের অবসান হোক; সকল মানুষ শান্তিতে থাকুক।

(অসমাপ্ত)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী