ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 
৮.১। আমরা আগের অংশগুলোতে যা বলেছি তার মর্ম হচ্ছে এই যে, কোরানে বিধৃত আদর্শের প্রথম দুই নীতি হচ্ছে অহিংসা ও মমতা। সকল নবী ও রাসুলরা এই দুইটি নীতি অনুসরণ করেছেন। বিশ্বাসীরাও মক্কায় এই নীতি দুটি কোনরকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই অনুসরণ করেছেন। সেখানে সৎকর্মশীলতা, সদাচার, দানশীলতা, মমতা ও ক্ষমাশীলতার দিকে নির্দেশমূলক আয়াতগুলো ছিল সীমা বর্জিত। নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য শক্তি প্রয়োগের প্রাধিকার তাদের সেখানে ছিল না। তখন আল্লাহ’ই ছিলেন তাদের প্রতিরক্ষী বন্ধু বা ওয়ালি। মদিনায় যখন নবী রাজনৈতিক প্রাধিকার সম্পন্ন হয়ে উঠেন তখন তাঁকে প্রতিরক্ষার অনুমতি প্রদান করা হয়।

৮.২। প্রতিরক্ষাকে বিধিবদ্ধ করতে গিয়ে আল্লাহ এই মর্মে বলেছেন যে, এর মধ্যে কল্যাণ নিহিত আছে, যদিও বিশ্বাসীদের কাছে যুদ্ধ বা প্রত্যাঘাত অপছন্দনীয়। তিনি সুরা বাকারার ২১৬নং আয়াতে বলেন:

“তোমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান দেয়া হলো, যদিও তোমরা তা অপছন্দ কর। এটি সম্ভব যে, তোমরা এমন কিছু অপছন্দ কর যার মধ্যে কল্যাণ নিহিত আছে এবং তোমরা এমন কিছু ভালবাস যা তোমাদের জন্য মন্দ পরিণামের কারণ হতে পারে। আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।” (কোরান ২:২১৬)

উপরের আয়াতে এটি স্পষ্ট যে, যুদ্ধ একটি অনভিপ্রেত কাজ। কেবলমাত্র মন্দকে এড়ানোর উদ্দেশ্যে বাধ্য হয়ে এই পথ অবলম্বন করতে হয়। এই আয়াত যুদ্ধ সংক্রান্তে প্রথমতম আয়াতগুলোর একটি। এই আয়াত কপটদের মনোভাবকে প্রকাশ করে না, বরং সাধারণভাবে বর্ণনা করে বিশ্বাসীদের মনের অবস্থাকে। বিশ্বাসীরা আঘাতের বিপরীতে আঘাত করাকেও অপছন্দ করেছিল, তাদেরকে প্রদান করা মমতার শিক্ষার কারণেই।

৮.৩। নীচে কোরান থেকে সুরা যুখরুফ’য়ের ৩৯ থেকে ৪৩নং আয়াত উল্লেখ করা গেল, যার মধ্যে আমরা পাই প্রতিরক্ষার মৌলিক নীতিগুলো।

“যারা সীমাতিরিক্ত নিপীড়নের শিকার হলে নিজেদেরকে সাহায্য করতে অগ্রসর হয়। অশুভের পরিণাম সমরূপ অশুভ। তবে যে ক্ষমা করে ও শান্তিপূর্ণ মীমাংসার পথ অবলম্বন করে তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট রয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি অত্যাচারীদের ভালবাসেন না। যারা নিজেদেরকে সাহায্য করতে অগ্রসর হয়, অত্যাচারিত হবার পর, যখন এ পথ ছাড়া অন্যকিছু তাদের সামনে থাকে না। এ পথ কেবল তাদের বিরুদ্ধে যারা মানুষের উপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীকে সীমাহীন নিপীড়নে প্লাবিত করে তোলে, যার অধিকার তাদের নেই। তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। এবং যে ধৈর্য ধারণ করবে ও ক্ষমা করবে এটি হবে তার কর্মকাণ্ডে সংকল্পে দৃঢ়তার পরিচায়ক।” (কোরান ৪২:৩৯-৪৩)

আমরা এই আয়াতগুলো থেকে যে ধারণাগুলো পাই: সীমাতিরিক্ত নিপীড়ন, প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে প্রত্যাঘাতে রূপ ও পরিমাণে সমতা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার অগ্রবিবেচনা এবং শান্তির অগ্রাধিকার।

৮.৪। ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা কোরানে চিত্রিত হয়েছে একটি ইতিবাচক সামর্থ্য হিসেবে—অক্ষমের মনের অনন্যোপায় জনিত দশা হিসেবে নয়। এটিকে বৌদ্ধিক ও মানসিক উন্নত অবস্থা, অর্থাৎ ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা, হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটি এসেছে প্রথম নীতি হিসেবে। প্রতিরোধের আদেশটি উপস্থাপন করা হয়েছে রিএকটিভ কর্তব্য হিসেবে এবং অসামর্থ্য থেকে জাত হিসেবে।

৮.৫। উপায় ও অবলম্বনের দিক থেকে প্রতিরোধ সামর্থ্যের সাথে জড়িত ও সহনশীলতা অসামর্থ্যের সাথে জড়িত। আমরা তাই সাধারণত বলে থাকি, পারলে প্রতিরোধ কর, না পারলে সহ্য কর। এটিকে আমরা বলতে পারি সহজ নীতি। কিন্তু চিন্তা ও মননের দিক থেকে বিষয়টি বিপরীত। চৈতন্যগত দিক থেকে তাই আমরা বলতে পারি, পারলে সহ্য কর, না পারলে প্রতিরোধ কর। এটিই ধর্মনীতি, সাধনার নীতি। এই নীতি কোরানে বিধৃত হয়েছে এবং এটি নবীর জীবনের নীতি।

৮.৬। মমতার বেলায় কথা হচ্ছে: তুমি অত্যাচার করলেও আমি ভালবাসব, ধৈর্যশীল থাকব, ক্ষমা করব—সে সামর্থ্য আমার আছে, তুমি আমাকে অপারগ করতে পারবে না, এজন্য আমি আমার নিজ থেকে সক্রিয়। প্রতিরোধের বেলায় কথা হচ্ছে: আমি আর সহ্য করতে সমর্থ নই, আমি অপারগ এবং একারণে আমি প্রতিরোধে বাধ্য হচ্ছি—যার জন্য তুমিই দায়ী। মমতা নিজ থেকে বাইরের দিকে যেতে চায়, প্রতিরক্ষায় অত্যাচারীরা মমতার উপর সীমা আরোপ করে। আবার এই সীমা আরোপটা অহিংসা ও মমতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। প্রতিরক্ষা হচ্ছে অহিংসা ও মমতার পর মানুষের জীবনাদর্শের তৃতীয় পর্যায়ে আরোপযোগ্য তৃতীয় নীতি যা মানুষের আদর্শকে পূর্ণতা দিয়েছে।

৮.৭। যীশুর কাছ থেকে পাওয়া ‘একগালে চড় দিলে আরেক গাল পেতে দাও, তোমার জামাটা নিয়ে যেতে চাইলে তাকে কোট শুদ্ধ দিয়ে দাও’ নীতি এমন সামর্থ্যসূচক নীতি। এই নীতি বিশ্বাসীদের অনুসৃত নীতিও। বিশ্বাসীরা মক্কা জয় করার পরও কোন প্রতিশোধ নেননি। তারা তাদের বেদখল হওয়া বাড়িঘরও দাবী করেননি। এমনকি মদিনা ছেড়ে মক্কায় পুনরায় বসবাস শুরু করেননি।

৮.৮। আমরা কোরানে একটি নতুন এটিচুড পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের বাস্তব এটিচুড ঠিক এর উল্টোটি। আমরা সহ্য করাটাকে নিয়েছি রিএকটিভ হিসেবে, সামর্থ্যের অভাব জনিত কারণে কৃত কাজ হিসেবে। যেন আমরা বলতে চাই: আমি সহ্য করছি কারণ তুমি আমাকে বাধ্য করছ, আমার যে তোমাকে প্রতিরোধ করার শক্তি নেই। আবার যখন শক্তি হয় তখন যুদ্ধ শুরু করার জন্য চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রোএকটিভ হই এবং ভাবটা এমন—এবার দেখাব মজা, কত ধানে কত চাল, ইত্যাদি।

৮.৯। এখানে ধৈর্য-ক্ষমা এবং প্রতিরোধ কি একটি আরেকটির মিউচুয়েলি এক্সক্লুসিভ বিকল্প? নাকি তারা আবার একই সাথে প্রযোজ্য হতে পারে? যিনি বীর, যিনি সামর্থ্যবান, তিনি প্রতিরক্ষার কালেও ধৈর্য ও ক্ষমার নীতি একই সাথে অনুসরণ করেন। তিনি চিন্তা করেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের নিশ্চয়তার কথা। যেটুকু অত্যাচার সংঘটিত হয়ে গেছে তিনি তার জন্য শত্রুকে ক্ষমা করেন এবং পুনরাবৃত্তি রোধে যতটুকু প্রতিশোধ বা প্রতি-বল প্রয়োজন তা বিচার করে প্রয়োগ করেন। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে, অস্থির হয়ে, অপমানিত বোধ করে সেপথে অগ্রসর হন না এবং তার প্রযুক্ত বল কখনও শত্রুর প্রযুক্ত বলের চেয়ে বেশী হয় না। ধৈর্য ছাড়া এই বিচারবোধের অধিকারী হওয়া সম্ভব নয় এবং ক্ষমাশীলতা ছাড়া অত্যাচারী শত্রুর উপর সর্বনিম্নসম্ভব পরিমাণ কষ্ট আরোপের প্রতি আগ্রহ বা দায়িত্ববোধ বজায় রাখা যায় না।

৮.১০। কেউ যখন আমাদের প্রতি হিংসাত্মক হয়, আমাদের উপর অত্যাচার করে, তখন আমাদের প্রথম ভাবনা হওয়া উচিত এটি যে, আমরা তা উপেক্ষা করতে পারি কিনা, তা সহ্য করতে সক্ষম কিনা, তার প্রতি ক্ষমাশীল থাকতে পারি কিনা। কারণ ধৈর্য ও ক্ষমার পথকে আল্লাহ প্রতিরোধের পথের চেয়ে উত্তম বলে সাব্যস্ত করেছেন। তবে যদি প্রতিরোধ না করার মধ্যে অকল্যাণ থাকে, যদি প্রতিরোধে কল্যাণ থাকে তবে আমরা প্রতিরোধে অগ্রসর হতে পারি।

৮.১১। যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ভেবে চিন্তে নিতে হয় যদি তাতে কল্যাণ থাকে। আর সিদ্ধান্ত নিলে যত দ্রুত সম্ভব এবং উভয় পক্ষের যত কম সম্ভব ক্ষতির মধ্যে সীমিত থেকে তা শেষ করা আবশ্যক। ফলে সেই পর্যায়ে যুদ্ধ হয়ে উঠে নিজেদের পক্ষ থেকে একটি সক্রিয় কাজ। কোরানে যুদ্ধের যে ইতিবাচক আহ্বান রয়েছে তা সব এই পরের পর্যায়ের কথা। নাজিলের সময়ের দিকে থেকেও আয়াতগুলোর মধ্যে এই ধারা রয়েছে। অপরদিকে, বিশ্বাসীরা শত্রুদেরকে শাসিয়ে কথা বলতেন না, হুমকি ধামকি দিয়ে মূর্খের মত বড় বড় ভবিষ্যৎ বাণী করতেন না। ‘তোমাদেরকে ধ্বংস করবো, তোমাদেরকে উৎখাত করবো’—এরকম কথার বাণ শোনা যেতো নবীর শত্রুশিবির থেকে। কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধের ক্ষেত্রে এসে তারা হারে হারে টের পেত বিশ্বাসীরা কী পরিমাণে দুর্জয় ও তাদের প্রতিরক্ষার দেয়াল কী পরিমাণে দুর্ভেদ্য। তারা আরও টের পেত, তাদের আস্ফালন কী পরিমাণে নির্বুদ্ধিতা প্রসূত।

৮.১২। বিশ্বাসীদের শত্রুরা তাদের শত্রুদেরকে অসম্মান করত, তাদের প্রতি কোন দায়িত্ব আছে বলে মনে করত না, তাদের জন্য কোন মমতা তাদের মনে ছিল না। তাদের মুখে ছিল আস্ফালন; তারা চোখ রাঙিয়ে, আঙ্গুল উঁচু করে চিৎকার করে শাসিয়ে কথা বলত আর যুদ্ধ করতে গিয়ে কেবলই হেরে যেত। বিশ্বাসীরা তাদের শত্রুদের প্রতিও মমতা পোষণ করত, তাদের সম্মান করত, তারা নম্র স্বরে কথা বলত আর যুদ্ধে জয়ী হতো।

(সমাপ্ত)

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী