ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক


আমার প্রথম বিদেশ দেখা হয়েছিল প্যারিসের লাদিফঁস শহরে পঁয়ত্রিশ দিন বাস করার মধ্য দিয়ে। ফিরে এসে মা’কে বলেছিলাম, অন্তত একবার ওরকম দেশ দেখে আসাটা কাজের হয়। প্যারিসের রাস্তায় পড়ে মনে হয়েছিল কুপবাসী বুঝি সমুদ্রে এসে পড়ল। টিভি স্ক্রিন বা সিনেমার পর্দা যত বড়ই হোক—বাইরে থেকে দেখা আর ভেতর থেকে দেখার অনুভূতি একরকম নয়। বিদেশ সব সময়ই ভয়ের ক্ষেত্র বলে মনে হতো। বন্ধুরা যখন একে একে পাড়ি দিয়ে চলেছিল তখনও এই ভয়ের কারণে পাড়ি দেবার ইচ্ছে হতো না। চেষ্টা করেও দেখিনি—কারণটা আলস্যই হোক বা অক্ষমতাই হোক। আবার এটিও খেয়াল করে দেখেছি: বিদেশে কয়েক দিন পরেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়, কবে বাড়ী ফিরব গুণতে গুণতে যেন দিন যায়। স্বার্থপরের মত ভাবি—ট্রেনিংয়ের নিকুচি করি, টাকাটা দিয়ে দাও, চলে যাই।

তবে ফেব্রুয়ারির শীতে কানাডার কুইবেক সিটি বরফের জন্য ভাল লেগেছে। সারা কানাডা এমনিতেই উত্তরে; তার উপর কুইবেক বিরাট এই দেশের উত্তর পাশে। তাপমাত্রা তখন শূন্য থেকে ১৫/২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস নীচে। এখানে বাড়িঘরের ঘনত্ব খুবই কম। প্রশস্ত সব সড়ক। এক ভবন থেকে অন্য ভবনে যেতে গাড়ী প্রয়োজন—যেমন এককালে বর্ষায় আমাদের গ্রামে এক বাড়ী থেকে অন্য বাড়ীতে যেতে নৌকার প্রয়োজন হতো। বিস্তীর্ণ বিরান ভূমি পড়ে আছে। এমন শহর কোমর পরিমাণ বরফের স্তূপে ঢাকা। মাটি বা ঘাসের কোন চিহ্ন নেই। শুধু রাস্তাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করে রাখা। এতো বরফ দেখে আমি তো যাকে বলে একেবারে গলে সারা—এরকম বরফ আচ্ছাদিত ভূমি দেখার সুযোগ এ জীবনে খুব সম্ভব আর হবে না। ছিলাম মাত্র আঠার দিন, কিন্তু আজও মনে ধরে আছে সেই স্মৃতি।

এবার আসার সুযোগ হয়েছে জার্মানিতে। এখানে এখন হেমন্ত। তাপমাত্রা ৬ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওঠানামা করছে। গাছের পাতারা নানা শেডের লালচে ও হলদে বর্ণে যেন সেজে উঠছে—আমাদের দেশের বিয়ের কনেদের মত। এখানকার মানুষের কাছে তাই হেমন্ত হয়ে আছে একটি আকর্ষণীয় ঋতু। এই বর্ণবৈচিত্র্য প্রতিবেশকে করে তুলছে হৃদয়গ্রাহী। কিন্তু না, এ তাদের যৌবনের পূর্ণতা নয়। পাতাদের ঝরে পড়ার প্রস্তুতি। সবুজ পাতাগুলো বিবর্ণ হয়ে উঠছে ঝরে পড়ার জন্য। ঝরে পড়ছেও। মৃত্যুর আগে পাতারাই বুঝি কেবল অমন সুন্দর সাজে সেজে উঠতে পারে! যেন বলছে: আমি মরে ঝরে পড়ব, কিন্তু মনে আঁচড় কেটে দেব, আরেক হেমন্তের জন্য তোমাকে প্রতীক্ষায় রেখে যাব।

আমরা থাকছি বেডেন-উর্টেমবার্গ প্রদেশের প্রধান শহর কার্লস্রুহ’য়ে। একসময় বেডেন ও উর্টেমবার্গ আলাদা ছিল—পরে তারা একীভূত হয়ে একটি প্রদেশ গঠন করে এবং উর্টেমবার্গের রাজধানী স্টুটগার্ট প্রদেশটির রাজধানী হয়। কার্লস্রুহ রাজধানীর মর্যাদা হারিয়েছে বটে, তবে এতে এর লাবণ্যটি রক্ষা পেয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। রাইন নদীর তীরে ছোটখাটো ছিমছাম ধীর স্থির একটি মাঝারী ধরণের শহর এই কার্লস্রুহ। মানুষের আধিক্য নেই, নেই ট্যাক্সি ক্যাবের সারি। এমন শহরে যারা জন্ম নিয়ে মরণ তক বসবাস করে তাদেরকে খানিকটা ঈর্ষা করাই যেতে পারে। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা কালো পনেরই আগস্টে এখানেই ছিলেন। ডঃ ওয়াজেদ তখন এখানকার ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টারে (১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত) কাজ করতেন। ২০০৯ সালে কার্লস্রুহ বিশ্ববিদ্যালয় (১৮২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত) ও এই রিসার্চ সেন্টারটিকে একীভূত করে কার্লস্রুহ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (কেআইটি) প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা বর্তমানে ইউরোপের একটি অন্যতম প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত। নোবেল পাওয়ার পর ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস’ও কার্লস্রুহ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। আমরা শনি-রবি বাদে প্রতিদিন ট্রামে করে ডুরলাখ যাই প্রশিক্ষণ নিতে। এই ডুরলাখ আধা গ্রাম আর আধা শহর—এর মোহনীয়তার রহস্য এটাই। মনে হচ্ছে এবার দেশে ফিরে যাওয়ার দিন খারাপ লাগবে; এক মাস কিভাবে যে চলে গেল!—এমনটা মনে হবে।

জার্মানির মেয়েরা দীর্ঘাঙ্গিনী; এবং যাকে বলে আপরাইট—মেরুদণ্ড ও গ্রীবা সোজা রেখে হাঁটে, দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে; তারা ঠোটে রং মাখে না। অবশ্য আমার জার্মান প্রশিক্ষক লিপস্টিকের ব্যাপারে খিলখিলিয়ে হেসে দ্বিমত করে বলেছিলেন, ইউ হ্যাভ গট এ ভেরি রং আইডিয়া। আমার না দেখা বার্লিন, হামবুর্গ, মিউনিখ, ফ্রাংকফুর্টের মত বড় বড় শহরের মেয়েদের তুলনায় দেখা কার্লস্রুহ’র মেয়েরা হয়তো “মফস্বল”য়ের মেয়ে। ফরাসী মেয়েরা আমাদের দেশের মেয়েদের মতই অনর্গল কথা বলে চলে। নানা সুরের টানের বৈচিত্র্য, স্বরের মার্গে নাটকীয় উত্থান-পতন, মুখের এক্সপ্রেশনে বচনোচিত পরিবর্তনের খেলা, চোখ ও ভ্রু’র চঞ্চলতা—সব মিলিয়ে মনে হয় ফরাসী ও বাঙালী মেয়েতে তেমন ফারাক নেই। ফরাসী ভাষাটাও যেন তৈরি হয়েছে ওষ্ঠ, অধর আর জিহ্বার জন্য—এদের গড়নের সাথে উপযোগী করে। কিন্তু জার্মান ভাষা বুঝি চিন্তার ভাষা, কলমের ভাষা। ভাষার প্রভাব কি মেয়েদের আচরণের উপর পড়ে? তা যদি না হবে তবে লিবনিজ, কান্ট, ফিখটে, শেলিং, হেগেলের দেশের মেয়েরা কথা কেন কম বলে? দেখলেই মনে হয় ভাবছে, চিন্তা করছে—তা সে বাসে-ট্রামে বসেই থাকুক বা পদব্রজেই থাকুক, একাকিনী থাকুক বা দলেবলে।

দপ্তরে একবার জনৈক ফরাসীকে ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলাম, তোমরা রাইনের এপারবাসীরা জান কিভাবে কথা বলতে হয়, আর ওপারবাসীরা জানে কিভাবে চিন্তা করতে হয়। যদি মানবজাতিকে একটি দেহের সাথে তুলনা করা যায় তবে ফরাসীরা এর মুখ ও জার্মানরা বুদ্ধি। শুনে বেচারা পারলে আমাকে ঘুষি মারে আরকি। ফরাসী কথা বলতে ছাড়েনি। কোপের সাথে বলেছিল, আই উইল কিল ইউ। কিন্তু ভাবগম্ভীর জার্মান মেয়েরা অত কী ভাবে? নাকি আরও কোন সমস্যা আছে তাদের? কোন দুঃখ? তা আমার অবশ্য অজানাই রয়ে গিয়েছে। যা জানতে পেরেছি তা হলো: সেখানে পরিবার শিথিল, সংসার হয় না, হলেও সাধারণত বেশীদিন টেঁকে না। আর সবচে গুরুতর বিষয়টি হলো: জার্মানরা সংখ্যায় কমছে, নাটকীয়ভাবে কমছে। গড়ে একজন নারী ১.৪ জন মাত্র সন্তান প্রসব করছে; যেখানে পণ্ডিতজনদের মতে রিপ্লেসমেন্ট রেট ২.১। কেউ কেউ বলছেন, ১.৫ এর কম ফারটাইলিটি রেট একটি জাতিগত মৃত্যুকুপ—একবার পড়ে গেলে হাজারও চেষ্টায় আর উঠা যায় না। ওদিকে তুর্কি বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিকেরা সমানে সন্তান নিয়েই চলেছে—খাস জার্মানদের জন্য এ হচ্ছে আশঙ্কার উপর আরেক শঙ্কা।

মুখরা ফরাসী মেয়েদের মুখে কথা খইয়ের মত যতই নাচুক, গর্ভদশার বিচারে তারাও গম্ভীরা জার্মান মেয়েদের মতই। কালো আফ্রিকা আর আরব আফ্রিকা থেকে সমানে মানুষ আসছে—প্যারিস গিজ গিজ করছে। তাদের ফারটাইলিটি রেটও বেশী। অন্যদিকে, খাস ফরাসীদের বাল-বাচ্চা কম। গোটা পঞ্চাশেক বছর পর ফ্রান্সের মোট লোকসংখ্যার কত শতাংশে তারা গিয়ে নামবে কে জানে! তবে গবেষকেরা, নীতি নির্ধারকেরা বসে নেই। কুপের তত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবার তাদের। অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস! একদিন এত লোকের খাবার কোত্থেকে আসবে নিয়ে চিন্তিত হতে হয়েছিল। আজ দুঃশ্চিন্তা করতে হচ্ছে, খাবার উৎপাদন করবে কে তা নিয়ে। সেদিন সুখবাদ ও বিজ্ঞান ফারটাইলিটি রেট কমিয়ে আনতে দ্রুত সফল হয়েছিল; কারণ রাষ্ট্র ও ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা তখন একরূপ হয়েছিল। কিন্তু আজ রেট রিভার্স করা কঠিন—ব্যক্তি সে ডাকে অত সহজে সায় দেবার নয়।

কেউ কেউ বলছেন, এটি তেমন কোন সমস্যাই হয়তো নয়। এটি সমস্যা, কি সমস্যা নয়, হলে উত্তরণের উপায় কী—তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য একাডেমিক গবেষণা পর্যাপ্ত নয়—এমন আক্ষেপও রয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই যুগে এরূপ বিলম্বও অনেকের কাছে আশ্চর্যের বিষয়। পরিবারের সাংগঠনিক কাঠামোর অবলোপন, পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক বিষয়ে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ধারণা, সুখবাদী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি, জন্মনিরোধ কৌশল—সব মিলিয়ে এখন সম্ভাব্য মৃত্যুকুপের মধ্যে নিপতিত ইউরোপ। কিভাবে তারা উদ্ধার পায় তা সেখানকার সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে খুঁজার ও দেখার বিষয় হয়ে উঠেছে।

যারা এবিষয়ে আরও পড়তে চান তাদের জন্য নীচে কিছু গবেষণাপত্র/রচনার লিংক দেয়া গেল।
Low Fertility in Europe: Causes, Implications and Policy Options – Kohler, Billari, Ortega
Baby Gap: Germany’s Birth Rate Hits Historic Low – Tristana Moore (May 23 2010)
Low Fertility and Policy – Peter McDonald
Very Low Fertility: Consequences, Causes and Policy Approaches – Peter McDonald
Low Fertility and Population Aging in Germany and Japan: Prospects and Policies – Warren Sanderson
Low Fertility and Sustainability – Martha Farnsworth Riche
Warning Bell for Developed Countries – Lee Kuan Yew
****

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী