ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

বাস্তবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে দেখার চেষ্টা করি না। বরং কাককে কিভাবে ময়ূরপুচ্ছ দিয়ে সাজানো যায় সে ফিকির নিয়ে দাঁড়াই ও সাজানোর কোশেশ করি। কিন্তু স্বপ্ন তো স্বপ্নই – বাস্তব নয়, বাস্তবাধিক কিছু। অবচেতন মনের সব গহ্বর, অলিন্দ আর চোরাপথগুলোয় সেখানে আলো পড়ে ও উৎকটভাবে সেসব উদ্ভাসিত হয়। গতরাতে যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তখন আমার গুরুজী শয়তান চুলের মুঠি ধরে টেনে-হিঁচড়ে আমাকে এক আয়নার সামনে নিয়ে ফেলে ও বাতাস বিদারী হুংকার দিয়ে বলে, “দ্যাখ্।” আমি মাথা তুলে তাকিয়ে ছিলাম আয়নার দিকে, যেভাবে সদ্য আকাশ হারানো উদ্ভ্রান্ত নারী আলুথালুভাবে বসে নিজেকে খুঁজে ফেরে। বেঁচে থাকলে মরে যেতাম, না থাকায় লেখার সুযোগটি পেয়ে গেলাম! যা দেখলাম তার বিবরণ, যিনি ভাববেন ও আমার জন্য কাঁদবেন তাঁর উদ্দেশ্যে লিখে দিলাম।

যুক্তিবাদ

আমি যুক্তিনিষ্ঠ যুক্তিবাদী। আমি ঈশ্বরকে দেখিতে পাই না বলিয়া তাঁহার উপাসনা করি না। আমি বস্তু দেখিতে পাই, তাই বস্তুর উপাসনা করি। ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’, তাই আমি সর্বদা রুটি খুঁজিয়া বেড়াই। ঈশ্বরের বচনে আমি সাড়া দেই না, কারণ আমি অনন্ত স্বর্গের প্রলোভন হইতে মুক্ত। আমি জ্ঞানের মধুভাণ্ডে বৃত্তের পরিধি বরাবর পিপীলিকার ন্যায় চলি এবং দৃষ্টির ক্ষীণতাকে একটি ‘পস্টুলেট’ ধরিয়া বক্রপথকে সরলপথ সাব্যস্ত করি। আমি কার্য-কারণের পশ্চাদগতি ছাড়িয়া কারণ-কার্যের সম্মুখগতিতে চলি। আমি ফল দ্বারা বৃক্ষকে চিনিতে চেষ্টা করি না বরং বৃক্ষের নাম সুন্দরী রাখিয়া ফলের পরিচয় নির্ণয় করি; ফল-গরলে দেহ আকণ্ঠ নীল হইয়া উঠিলে নীলকে রাঙ্গা ভাবিয়া কাব্য রচনা করি।

দ্বন্দ্বমূলক নীতিবাদ

আমি মার্ক্সের ন্যায় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী নহি, আমি মার্ক্সের শিক্ষকের ন্যায় দ্বন্দ্বমূলক ভাববাদীও নহি। আমি সার্বজনীন দ্বন্দ্বমূলক নীতিবাদী। আমি এক্ষণে একক্ষেত্রে যে নীতি প্রয়োগ করি, পরক্ষণেই অন্যক্ষেত্রে তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত নীতি প্রয়োগ করিয়া থাকি।

যোগের শিক্ষার প্রয়োগ

আমি তুচ্ছ ও মিথ্যা মায়ার সূত্রসকল ছিন্ন করিয়া নিজেকে তমসা ও রাজসিকতা হইতে মুক্ত করিয়াছি এবং সাত্ত্বিক হইবার সাধনায় নিয়োজিত হইয়া নিজেকে বিশ্বব্যাপী প্রসারিত করিয়া চলিয়াছি। আমি নিজের মাকে ছাড়িয়া অন্যের মাকে মা বলিয়া ডাকি, নিজের ভাইকে ছাড়িয়া অন্যের ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি, নিজের বউকে ছাড়িয়া অন্যের বউকে বউ বলিয়া ডাকি।

প্রেমের শিক্ষার প্রয়োগ

রাজশক্তির কোনো মালিক বা অর্থশক্তির কোনো নকিব আমার নিকট আমার জামাটির জন্য আব্দার করিলে আমি বত্রিশ পাটি দন্ত বিকশিত করিয়া তাহাকে আমার কোটটি পর্যন্ত দিয়া দেই। তিনি তাহার সহিত এক মাইল যাইতে বলিলে আমি তাহার তল্পি লইয়া তুষ্টচিত্তে দুই মাইল গমন করি। আমি খাজনা আদায়কারীদের মত নহি। আমি নিজের পীড়া ভুলিয়া শত্রুর চিকিৎসায় মত্ত থাকি। শত্রুর চোখে ধূলির কণায় আমি অস্থির হইয়া যাই। নিজের চোখের কড়িকাঠের জ্বালা ভুলিয়া তাহার সেবা করি। আমি বন্ধুর দোষ গোপন রাখি, প্রকাশ করিয়া তাহাকে হেয় করি না। দুষ্টজনের কর্মকাণ্ড আমি দেখিয়াও দেখি না, খুঁজিয়া-পাতিয়া তাহার কোনো ভাল কাজের সন্ধান পাইলে, না পাইলে পরের কাজ চুরি করিয়া, উহা ফেরী করিয়া বেড়াই।

ন্যায়ের শিক্ষার প্রয়োগ

আমি ন্যায়বিচারে প্রস্তরবৎ অনমনীয়। শত্রু দেখিলে তাহার চুলচেরা বিচার করিয়া ও তন্ন তন্ন করিয়া ত্রুটি অনুসন্ধান করিয়া বেড়াই, এবং কণামাত্রের সন্ধান পাইলে, না পাইলে মিথ্যা অপবাদ দিয়া, ন্যায়ের স্বার্থে ন্যায়ের দাবীতে ঢোল পিটাইতে থাকি। ছিঁচকে চোর আমাকে দেখিলে ডাকাত ভাবিয়া পড়শির ঘরে লুকায়। ডাকাতের সরদার আমাকে দেখিলে খুনি ভাবিয়া উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ায়। আমার মুখের কাব্য শুনিয়া সিঁধেল চোরের মুখরা মা-ও শরমে মরিয়া যায়, আমার হাতের কাণ্ড দেখিয়া পিরামিডের মালিক মমি ছাড়িয়া পালায়।

পরিত্রাণ

আমি পরিত্রাণের মঞ্চ প্রস্তুত করি। সুখী তাহারা যাহারা দরিদ্র, স্বর্গরাজ্যের অধিকার তাহাদেরই। তাই যাহারা দারিদ্র্য হইতে মুক্তির সম্ভাবনারহিতভাবে দরিদ্র আমি তাহাদের নিকটেও যাই না। যেই সকল দরিদ্রের বাড়ীর মাটির নিচে মণিমুক্তা লুক্কায়িত, পাছে উদ্ধার করিয়া তাহারা স্বর্গরাজ্য হারায় – এই ভয়ে সুরঙ্গ কাটিয়া মণিমুক্তা গোপনে নিজের বাড়ীতে আনিয়া রাখি। কেহ ধনী হইয়া উঠিলে সকল পথে গিয়া আমি তাহাকে পুনরায় স্বর্গরাজ্যের উপযুক্ত করিয়া তুলি। আমি নিরীহ মানুষের এক গালে কষিয়া চড় মারিয়া তাহার জন্য অপর গাল পাতিয়া দেওয়াকে সহজ করিয়া দেই।

সংস্কৃতি

আমি কৃষকেরটা খাইয়া, শ্রমিকেরটা পরিয়া উদ্বৃত্ত মূল্য দিয়া বাঁদরনাচ দেখি এবং সংস্কৃতির উচ্চতা ও বিস্তার পরিমাপ করিয়া উদ্বৃত্ত সময় কাটাই। আমি ‘চাষার বাচ্চা’, ‘মজুরের বাচ্চা’ দুটি গালি বিশেষ বলিয়া লিখি এবং বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা দিয়া তাহাকে ‘সেলিব্রিটি’ বলিয়া মানি।

বাস্তববাদ

আমি বাস্তববাদী, আবেগপ্রবণ নহি। আমি দূরের হরিণগুলিকে দৌড় প্রতিযোগিতায় মাতাইয়া দিয়া আমার নিকটে ছুটাইয়া আনি এবং সেরাটির গলায় মালা দিয়া তাহার মাংস ভক্ষণ করি। আমি সম্পদের কমতির কারণে বাধ্য হইয়া কেবল নিজের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করি আর বিহঙ্গদের সকলের জন্য গড়িয়া দেই কেবলই স্মৃতির মিনার। উহারা বনবাদাড়ে ঘুরিয়া মরে ও ফুল ছিঁড়িয়া আনে, আমি প্রাসাদে বসিয়া গান গাহিয়া সেই ফুলমধু পান করিয়া যাই।

মৈত্রীর দূত

আমি ঈশ্বর ও শয়তানের মাঝে মিলনবিন্দু। আমি এক হাতে ধরিয়াছি ঈশ্বরের হাত, অন্য হাতে হাত শয়তানের। আমি কাশী গিয়া ঈশ্বরের পূজা দেই আর ভিটায় ফিরিয়া শয়তানের পায়ে দেই ফুল। আমি ঈশ্বরেরে আত্মাকে স্থাপন করি শয়তানের ক্রুশে। আমি বুকের ভিতর শয়তানকে রাখিয়া নিজেকে রাখি ঈশ্বরের ঘরে। আমি ঈশ্বরের বাণী বর্শায় বিঁধিয়া সওয়ার হই শয়তানের ঘোড়ায়। আমি ঈশ্বরের থেকে যাহা পাই তাহা তুলিয়া দেই শয়তানের হাতে, নিজের জন্য কানাকড়িটিও রাখি না – যেন ঈশ্বর তুষ্ট থাকেন আমার আমানতদারীতে আর শয়তান তুষ্ট থাকে সব পাইয়া।

ভার্চুয়াল

আমি স্বনির্ভর, আমি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী। আমি পরের অনুগ্রহে প্রাপ্ত স্বচ্ছ সুধাজল ঘরের কোনায় রাখিয়া স্বোপার্জিত বিষের আগুনে জ্বলিয়া পুড়িয়া মরি। আমি পরের তৈরি আকাশের দিকে চাহিয়াও দেখি না, আমি পরের তৈরি সাগরের জলে অঙ্গ ভিজাই না, আমি পরের তৈরি মাটির সাথে খেলায় মাতি না। আমার জগত আমার জীবন আমার মনের মত করিয়া আমারই নিজের গড়া।

গণতন্ত্র

আমি গণতন্ত্রী। আমি সজ্জনদিগের কথায় কর্ণপাত পর্যন্ত করি না, কারণ তাহারা সংখ্যালঘু। আমি দুর্জ্জনদিগের প্রতি মন পাতিয়া রাখি ও তাহাদের মন্ত্রণায় জীবনের ডালি সাজাই, কারণ তাহারা সংখ্যাগুরু।

সমাজতন্ত্র

আমি সমাজতন্ত্রী। আমি সমাজের প্রবাহে ভাসিয়া বেড়াই। আমি সকলের সুরে সুর ধরিয়া সোচ্চারে নিজের চেতন-দশার বিজ্ঞাপন তৈয়ার করি। আমি পিতৃপুরুষদিগের পদাঙ্ক খুঁজিয়া বেড়াই; সন্ধান পাইলে ছাপের উপর ঠায় দাঁড়াইয়া মার্ক-টাইম করিতে থাকি।

কার্যবিভাজন

আমি যাহার যাহা কাজ তাহা তাহার জন্য রাখিয়া দেই, অন্যের কাজে নাসিকা সঞ্চালন আমার কর্ম নহে। আমি নিজে চিন্তা করি না, চিন্তার ভার ইব্রাহিমের মাথায় থাকুক। আমি নিজে কান পাতিয়া শুনি না, শোনার ভার মুসার কানেই থাকুক। আমি নিজে কর্ম করি না, কর্মের রথ কৃষ্ণের হাতেই থাকুক। আমি নিজে ভাবি না, ভাবনার রাজ্য বুদ্ধই ভোগ করুক। স্বীয় জীবনের ক্রুশ আমি নিজে বহন করি না, ক্রুশের ভার যীশুর কাঁধেই থাকুক। আমি নিজের পথ নিজে পাড়ি দেই না, চলার দায় মুহম্মদের কাছেই থাকুক। আমার কাজ তাঁহাদের ঘাড়ে সওয়ার হইয়া অগ্নি-পিতার চুলায় কাষ্ঠ দেওয়া।

[মথি, মার্ক ও লুকের গসপেল থেকে কিছু বিষয় নেয়া হয়েছে। আমার মনে হয় যীশুর কথা চুরি করলে পাপ হয় না এবং কপিরাইটও ভঙ্গ হয় না।]M

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী