ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ


হিংসা দুর্বলের অধঃপতনের অভিকর্ষ।

হিংসার উৎপত্তি বাস্তবিক পরাজয়বোধ থেকে অথবা আসন্ন পরাজয়ের শঙ্কাবোধ থেকে। একজন যখন দেখে যে, সে চরমভাবে হেরে গেছে বা তার পরম বিজয় সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে, তখন তার মধ্যে হিংসার বিস্তার ঘটে, তার মন বিদ্বিষ্ট হয়ে ওঠে, সে ক্ষোভের জ্বালায় পুড়তে থাকে। আর তখন সে মরিয়া হয়ে প্রোপাগান্ডায় লিপ্ত হয়; বিদ্বেষপূর্ণ কথার দড়িতে শত্রুকে বধ করতে চায় ও অন্যদের মনে হিংসা সঞ্চালন করে নিজের দল ভারী করতে উদ্যত হয়।

অভিকর্ষের প্রভাবে বস্তু নিচের দিকে তাড়িত হয় ও তার গতি বাড়ে অভিকর্ষের অনুপাতে। তেমনই হিংসুকের কথায় বিদ্বেষের মাত্রা বাড়ে বিপন্নতাবোধের মাত্রা অনুসারে। তাই যে যত বেশী বিপন্ন মনে করে নিজেকে, সে তত জোরে চিৎকার করে বলে ‘তুই মুরতাদ’ বা ‘তুই রাজাকার’। সে তোতাপাখির মত কেবলই আওরাতে থাকে ‘ওকে ঘৃণা জানাও’, ‘ওর গায়ে থুথু দাও’, ‘ওকে স্তব্ধ কর’, ‘ওকে দেশান্তরী কর’, ‘ওকে বিনাশ কর’।

হিংসা একটি দুষ্টচক্রের মত, একটি ভাইরাসের মত। হিংসা শত্রুর অন্তরে কেবলই বুনে চলে নিজের বীজ। হিংসা দিয়ে কেউ নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, শত্রুকে সাথে নিয়ে কেবলই ঘুরতে থাকে শত্রুর বৃত্তে এবং পরিণামে নিজেকে ধ্বংস করে। লাভের লাভ হয়তো কেবল এটুকুই হয় যে, নিজের লাশটা স্থান পায় শত্রুর লাশের উপর।

হিংসা দিয়ে হিংসার চক্র থেকে বের হওয়া যায় না, কেবল নিজের দশাটা লোককে জানান দেয়া হয় মাত্র।

কি ইসলামপন্থী কি ধর্মনিরপেক্ষ, উভয় মতের নেতাদের দ্বারা হিংসার সমান প্রয়োগ আমরা দেখতে পাচ্ছি। নেতাদের মধ্যে এ অস্ত্রটি এতো প্রিয় এ কারণে যে, তা ম্যাজিকের মত কার্যকর। মানুষকে নিজের চারপাশে জড়ো করতে ও শত্রুর দুর্গের দিকে চালিত করতে এর চেয়ে বেশী কার্যকর হাতিয়ার তাদের হাতে নেই। কেন নেই তাও সহজেই অনুমেয়। এ নেতাদের কেউই তার অনুসারীদের বলতে পারে না যে, “তোমরা আমার মত হও। তাহলে মানুষ হতে পারবে।” সে সাহসই তাদের নেই। তাই তারা কেবল চিৎকার করতে থাকে ‘তোমার এই নিয়ে গেল, তোমার সেই নিয়ে গেল’ বলে এবং তারপর কানে ঢেলে দেয় হিংসার বিষ।

এই উভয় দলের নেতাদের একটি বিষয়ে সমান মিল। তারা দুপক্ষই মনে করে আম-জনতার মধ্যে তাদের মত সু(?)চেতনায় বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই তাদেরকে ‘জান্নাত’য়ের পথে বা ‘প্রগতি’র পথে উত্তেজিত করে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায়ান্তর কই।

কিন্তু এপথে এগুনো যে ইঁদুর তাড়াতে গিয়ে নিজেদের সন্তানদের হারানো, তা তারা বুঝতে পারছে না; যদিও হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাকে তারা ভালই চেনেন বলে মনে করেন।

[লেখাটা হিংসা নিয়ে, কিন্তু শিরোনামটা ‘অহিংসা’। অর্থাৎ আবেদনটা শিরে থাকল, কারণটা থাকল দেহে।]
M

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী