ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

একটি রাষ্ট্রের মূল সনদ হচ্ছে তার সংবিধান। তারপর আছে তার আইন। রাষ্ট্রের সব নাগরিক এই সংবিধান ও আইন অনুসরণ করবে—এটাই প্রত্যাশিত। এই সংবিধান থেকেই উৎসারিত হয় আমাদের জীবনের অনেক পারস্পরিক কর্তব্য ও অধিকার। সংবিধান ও আইন ভঙ্গ করলে রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করার অধিকারী। সংবিধান থেকেই রাজনৈতিক দলের উন্মেষ ঘটে। নির্বাচনে জয়যুক্ত হলে দল রাষ্ট্রযন্ত্রের চালক হয়, জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক নেতৃত্ব প্রদান করে। কোন রাজনৈতিক দল সংবিধান ও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একটি করে গঠনতন্ত্রও থাকে। রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত দল সংশ্লিষ্টে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ: দলটির উৎপত্তির আইনগত উৎস, এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অনুসৃতব্য মূল চুক্তি বা নিয়মাবলী। একটি রাজনৈতিক দল, যা রাষ্ট্র শাসনের উদ্দেশ্যে নির্বাচনে অংশ নেয়, আলু-পটলের ব্যবসার কোন কোম্পানি নয়, অথবা নানা ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত বিরাট কোন বিনোদন ক্লাব নয়। কাজেই প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে তার অস্তিত্বের উৎস হিসেবে সংবিধানকে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকৃতি দান এবং শাসনকাজে সংবিধান অনুসরণ করার স্পষ্ট অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি বিদ্যমান থাকবে তা প্রত্যাশা করা যায়।

আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ, জাতীয়তাবাদী দল, জামায়াতে ইসলামি ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান চারটি রাজনৈতিক দল, যারা এদেশে চারটি প্রধান সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা ও দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। এদের মধ্যে প্রথম দুটি দল কোন র‍্যাডিক্যাল ভাবাদর্শের ধারক নয়; কিন্তু শেষের দুটি দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্য এমন যা একদিকে র‍্যাডিক্যাল ও অন্যদিকে সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক কিছু নীতির ঘোর পরিপন্থী, বা পরিপন্থী হয়ে উঠার সম্ভাবনা বা আশঙ্কা যুক্ত। তবে চারটি দলের কোনটির গঠনতন্ত্রেই সংবিধান অনুসরণের কোন স্পষ্ট অঙ্গীকার নেই।

জামায়াত বা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে এই সংবিধান বিষয়ে চুপ থাকার কারণ যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায় তাদের আদর্শ থেকে। জামায়াত মানুষের তৈরি কোন মতবাদ ও আইনে বিশ্বাস করে না, তারা এসব মতবাদ ও আইনকে অস্বীকার করে—এরূপ কথা তাদের গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে লিখিত আছে। আর সংবিধান তো মানুষেরই তৈরি। অন্যদিকে, কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ মার্কসবাদ ও লেলিনবাদ—যা ব্যক্তি-মালিকানায় বিশ্বাস করে না। আইন দ্বারা সমর্থিত/সম্মত সম্পদ থেকে পরবর্তীতে অন্য কোন নতুন আইন দ্বারা সেই সম্পদের অধিকারীর নিকট থেকে তা কেড়ে নেয়া যায় না। আমাদের সংবিধান এই সম্পদের অধিকারকে সংরক্ষণ করে। কিন্তু মার্কসবাদ-লেলিনবাদ এই অধিকারকে অস্বীকার করে। ব্যক্তিমালিকানার বিলোপ সাধনকে তারা বিপ্লব বলে থাকে এবং কমিউনিস্ট পার্টি নিজেকে একটি বিপ্লবী দল বলে উল্লেখ করেছে তার গঠনতন্ত্রে। তাছাড়া ঈশ্বরবাদ যেভাবে একটি ধর্মীয় বিষয়, সেভাবেই নিরীশ্বরবাদ বা বস্তুবাদও একটি মতাদর্শগত বিষয়—ধর্মের মতই যা রাজনীতিতে আসতে পারে না।

কোন রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সংবিধান বিরোধী কিছু না থাকা যেমন দরকার, তেমনই দরকার সংবিধানের সাথে কমপ্লায়েন্ট হওয়াও। সংবিধান অনুসরণের স্পষ্ট স্বীকৃতি বা অঙ্গীকারের মাধ্যমেই এই কমপ্লায়েন্স সম্ভব। নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা প্রত্যাশা করতে পারি যে, তারা দলীয় গঠনতন্ত্র থেকে সংবিধান বিরোধী অংশ দূর করার কথা বলার সাথে সাথে, গঠনতন্ত্রকে সংবিধানের সাথে কমপ্লায়েন্ট করার কথা বলাও। অর্থাৎ, গঠনতন্ত্রে এমন কথা সন্নিবেশিত করার কথা বলা, যে কথা থেকে স্পষ্টতই বুঝা যাবে যে দলটি সংবিধান অনুসরণে সম্মত, স্বীকৃত বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এবিষয়ে চুপ থাকাকে কমপ্লায়েন্স বলা যায় না।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রটি আমার কাছে তুলনামূলকভাবে সর্বাধিক সুলিখিত বলে মনে হয়েছে। এটি চারটি মাত্র অনুচ্ছেদে, পাঁচটি মাত্র বাক্যে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে তুলে ধরেছে—যেখানে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করাকে একটি লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। অন্য কোন দলের গঠনতন্ত্রে ‘সংবিধান’ বা ‘সাংবিধানিক’ শব্দগুলো খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, গঠনতন্ত্রে সংবিধান অনুসরণের কোন স্পষ্ট অঙ্গীকার না থাকলেও তাতে ‘অঙ্গীকার’ শিরোনামে চব্বিশটি অঙ্গীকারমূলক অনুচ্ছেদ রয়েছে। জাতীয়তাবাদী দলের গঠনতন্ত্রে ‘অবজেকটিভস এন্ড এইমস’ নামক একটি ধারায় মোট ১৭টি অনুচ্ছেদে তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটিকে খুব সুলিখিত বলে আমার কাছে মনে হয়নি। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, ইসলাম ধর্মের প্রভাবে অভিব্যক্ত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ইত্যাদি বিষয়ে কথা থাকলেও নারী, শিশু, কৃষক-শ্রমিক, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদি ইস্যুতে এখানে স্পষ্ট করে আলাদাভাবে কিছুই বলা হয়নি।

আওয়ামী লীগের সদস্য পদ লাভের জন্য যে যোগ্যতা নির্ধারিত হয়েছে তার প্রথম দুটি এরূপ: ক. বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অখণ্ডত্ব, রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও জননিরাপত্তা-বিরোধী এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত রহিয়াছেন বলিয়া প্রতীয়মান নহেন; খ. বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগকারী বা নাগরিকত্ব বাতিলকৃত ব্যক্তি নহেন। জাতীয়তাবাদী দলের গঠনতন্ত্রেও অনুরূপ শর্ত আরোপ করা হয়েছে: Any person who does not have legal Bangladeshi citizenship cannot be member of Jatiyatabadi Dal. (1) Those who are against the independence, sovereignty and integrity of Bangladesh, believe in underground politics, involved in any anti-social and anti-people activities will not get the party’s membership।

কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে সহযোগী সদস্যপদ লাভের জন্য এরূপ কোন শর্ত সরাসরি বা স্পষ্টভাবে লিখিত হয়নি। এক্ষেত্রে তাদের ভাষ্য হতে পারে এই যে, এরূপ ব্যক্তিরা যেহেতু ‘ইসলামী মূল্যবোধ’, জাতীয় সংহতি ও জামায়াতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচীর পরিপন্থী কাজে লিপ্ত তাই এরূপ ব্যক্তি সংগঠনের সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু এরূপ পরোক্ষ ব্যাখ্যা গঠনতন্ত্রের দুর্বলতার নির্দেশক। কৃষক-শ্রমিক শ্রেণী ও তাদের মত অন্য যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে তাদের মুক্তি ও উন্নতি, সকল ধর্মাবলম্বীর জন্য সমানাধিকার, পিছিয়ে পড়া জাতিসমূহকে (চাকমা ইত্যাদি) জীবন মান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে আনা, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা, পরিবেশ উন্নয়ন, মত ও প্রেসের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে তাদের গঠনতন্ত্রে সুস্পষ্ট কোন কথা নেই। তারা সবকিছুই ইসলামের মূল্যবোধ, সুবিচার, কল্যাণ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে সংক্ষেপে বলেছেন বলেই হয়তো দাবী করবেন। জামায়াতের গঠনতন্ত্রের প্রাথমিক সকল অংশই ইসলাম ধর্মের একটি ব্যাখ্যা স্বরূপ। এই গঠনতন্ত্র একটি ধর্ম প্রচার সমিতির গঠনতন্ত্র মাত্র –রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র নয় বলেই মনে হয়।

দেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করা আওয়ামী লীগ ও জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলেও, কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে সমাজতন্ত্র ও একটি কমিউনিস্ট সমাজ গঠন। এজন্য এটি প্রথমেই নিজেকে একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবী করেছে এবং বিপ্লব সাধনের জন্য মার্কসবাদ ও লেলিনবাদ প্রদর্শিত বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বনের কথা বলেছে। তবে এর গঠনতন্ত্রে শোষিত শ্রেণী, পশ্চাৎপদ এথেনিক মাইনরিটির উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন, সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে সাম্য, নারী ও শিশু অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধিপত্যবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, চিন্তা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে স্পষ্ট ও সুলিখিত কথা রয়েছে।

সূত্র:
১। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র
২। জাতীয়তাবাদী দলের গঠনতন্ত্র
৩। জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র
৪। Country Report based on Research and Dialogue with Political Parties
[দ্রষ্টব্য: কমিউনিস্ট পার্টির গঠনতন্ত্র আমি ওয়েবসাইটে খুঁজে পাইনি। এটি সম্পর্কে বলা আমার কথার ভিত্তি হচ্ছে এই রিপোর্টতে দেয়া গঠনতন্ত্রের অনুদিত অংশ।]

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী