ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমরা শুনে থাকি, মানুষ সামাজিক জীব। কিন্তু তার আগের কথা হলো, প্রতিটি ব্যক্তি স্বাধীন। আমরা শুনেছি, মানুষ জন্মায় স্বাধীনভাবে বা মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন। স্বাধীন ব্যক্তি মানুষেরা জন্মায় সমাজে, সমাজের কোলে সে বেড়ে উঠে, সমাজ নিয়ে তাকে চলতে হয়, সমাজই তার শবদেহকে অন্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠার হাত থেকে রক্ষা করে। স্বাধীনতা নিয়ে জন্মানো শিশুটি সমাজের কোল না পেলে স্বাধীনতাসহ তাকে বিদায় নিতে হতো জন্মের পরপরই। মানবসমাজ স্বাধীন ব্যক্তিদের সমাজ। স্বাধীনতার সম্বিত ও অধিকারের সাথে তার সমাজনির্ভরতা মানুষকে করে তুলেছে রাজনৈতিক জীব। আমরা তাই এটাও শুনেছি, মানুষ রাজনৈতিক জীব। এ থেকে প্রসূত হয় নৈতিকতা। আমরা এও শুনেছি, মানুষ নৈতিক জীব।

রাজনীতিতে আমাদের প্রথম নৈতিক আবশ্যিকতা কী হতে পারে যা আমাদেরকে একাধারে ব্যক্তি হিসেবে স্বাধীন এবং সেই সাথে সামাজিক ভাবে একতাবদ্ধ রাখতে পারে? এর উত্তরে বলা যায়, একটি সর্বজন গ্রাহ্য প্রাথমিক চুক্তিই তা পারে। এই চুক্তি হতে পারে মৌলিক নীতির সমবায়ে। ব্যক্তি হিসেবে আমি নিজেই নিজের উপর নৈতিক বিধিমালা আরোপ করতে পারি অথবা পারি সেগুলোকে ঈশ্বরের অনুজ্ঞা হিসেবে গ্রহণ করতে। কিন্তু মানবসমাজে পরস্পরের নিকট অধিকার দাবীর ভিত বা পারস্পরিক কর্তব্যের উৎস এই স্বাধীনভাবে কৃত চুক্তির মাধ্যমেই রচনা করা সম্ভব। আজকের বিশ্বের বহুলাংশ ‘শক্তিই শাসনের অধিকার’—এই মতকে পরিত্যাগ করেছে এবং সাংবিধানিক রাষ্ট্র ও জাতিসংঘের মাধ্যমে চুক্তি অনুসরণের নীতিকে (অন্ততঃ নীতিগতভাবে) গ্রহণ করেছে।

তাহলে ‘ব্যক্তির স্বাধীনতা’ নিজেই চুক্তির প্রথম নীতি হতে হয়। সকল ব্যক্তি-মানুষের উৎস এক, সকল ব্যক্তি-মানুষ পরিবার, জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সমমর্যাদার অধিকারী, এই মর্যাদা থেকে কোনোকিছুই তাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না—এমন একটি আদিসূত্র মেনে না নিলে ব্যক্তিকে স্বাধীন মনে করার যুক্তি পাওয়া যায় না। আধিপত্যবাদীরা ও শোষণকামীরা নিজেদেরকে সুপিরিয়র মনে করে বলেই এ পথে এগোয়। তারা মনে করে অন্যকে অনুগত করার ও তাকে সেবাদাসে পরিণত করার অধিকার তার আছে, যেহেতু সে সুপিরিয়র। ‘মর্যাদায় সকল মানুষ সমান’ হচ্ছে চুক্তির দ্বিতীয় নীতি। এ থেকে আমরা একে একে পৌঁছতে পারি অহিংসা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে। সেই সাথে আসছে সমাজের দুর্বল করে রাখা অংশের পক্ষে, সমর্থনে দাঁড়ানোর নীতি—যা তাদেরকে ক্রমান্বয়ে সমমর্যাদা ও সমানাধিকারের দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা।

মানুষ প্রাকৃতিগতভাবেই সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন চায়। কিন্তু এজন্য তারা ধর্ম, জাতি, বর্ণ, পেশা, লিঙ্গ ভিত্তিতে নিজেদেরকে বিভক্ত করে, অপরের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ও আধিপত্যকামী হয়। তারা বৈষম্য করে, শোষণ করে, অপমান করে—অন্যের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে কার্যত অস্বীকার করে। অর্থাৎ, তারা মনে করে তাদের স্বার্থই কেন্দ্রীয় ও সর্বোচ্চ (অহংকার ও আধিপত্য), এবং অন্যেরা, অন্যদের জীবন ও শ্রম নিছক প্রথমোক্তদের স্বার্থার্জনের (বৈষম্য ও শোষণ) উপকরণ মাত্র। কিন্তু সকলের জন্য সমানাধিকার ও সম্পর্কের ক্রমোন্নতি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহায়তা ছাড়া অর্জিতব্য নয়। এই সমঝোতা সম্ভব হয় না মৌলিক মূল্যমানগুলোকেই আইন প্রণয়নের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সকলে একমত না হলে।

আইনের লক্ষ্য হচ্ছে এই পৃথিবীতে স্বাধীনতা, সাম্য, শান্তি, নিরাপত্তা, সামাজিক সুবিচার, কল্যাণ ও সুখ। এরা পরস্পরের পরিপূরক ও সহায়ক। এগুলো অর্জন করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তি অন্বেষণের পথকে সুগম ও বিকাশমান করাও আইনের উদ্দেশ্য হয়ে উঠে। সমাজ কখনই বা আজ পর্যন্ত ১০০% ন্যায়ভিত্তিক হয়ে উঠেনি। কাজেই সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী/গোষ্ঠী ও দুর্বল করে রাখা বা বঞ্চনার মধ্যে নিপতিত করা শ্রেণী/গোষ্ঠকে এগিয়ে আনার ক্রমাগত চেষ্টাও আইনের লক্ষ্য হয়। অর্থাৎ, মানবসমাজ একটি বিকাশমান ও গতিশীল সত্ত্বা হবার কারণে আইনের লক্ষ্য হয় মানুষের জ্ঞান ও চেতনার বিকাশ, ন্যায়সম্মত সম্পর্ক ও আদানপ্রদানের দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া এবং জীবনমানে ক্রমাগত উন্নতিসাধন। এটিকে বলা যায় প্রগতি। এরূপ প্রগতির সাধনাকে কোরানে বলা হয়েছে ‘ইসলাহ’ বা সংস্কার, মীমাংসা, ক্রমোন্নতি সাধন। ‘আমলে সালেহ’ অর্থ দাঁড়ায় প্রগতির জন্য সক্রিয়তা। কোরানে ইতিবাচক মানুষের চিত্রকে সূত্রাকারে আঁকা হয়েছে এভাবে, “আল্লাযিনা আমানু ওয়া আমেলুস্ সলিহাত…”। অর্থাৎ, যারা আল্লাহ ও তাঁর প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখে এবং ন্যায় ও শুভের লক্ষ্যে প্রগতিশীলভাবে সক্রিয়।

মুসলিম আইনবেত্তারা আইনের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন তা এক কথায় সকল মানুষের জন্য স্বাধীনতা ও ইহলৌকিক জীবনের নিরাপত্তা—সম্পদ, সম্মান ও যুক্তিবোধের সংরক্ষণ। তারা প্রধানত তিনভাগে প্রয়োজনকে নিম্নরূপে বিভক্ত করেছেন:

১। জারুরিয়াত বা Necessity বা মৌলিক প্রয়োজন: যেমন, মানুষের বিশ্বাস ও মতের স্বাধীনতা, জীবন সংরক্ষণ, প্রজাতি বা প্রজন্ম সংরক্ষণ, সম্পদ সংরক্ষণ, যুক্তিবোধ সংরক্ষণ, সম্মান সংরক্ষণ ইত্যাদি; অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা ইত্যাদির নিশ্চয়তা বিধান।

২। হাজিয়াত বা Requirements বা সাধারণ প্রয়োজন: যেমন, জীবনকে স্বাচ্ছন্দপূর্ণ, সহজ, কষ্টমুক্ত ও বিকাশমান রাখার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা অর্জন নিশ্চিত করা এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা। বিজ্ঞান, টেকনোলোজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, পুলিশ ইত্যাদি।

৩। তাহসিনিয়াত বা Beautification বা নান্দনিক প্রয়োজন: যেমন, পরিবেশ, খাবার, ফ্যাশন, বাসস্থানের নান্দনিক উৎকর্ষতা সাধনে শিল্প, কলা, কৌশল ইত্যাদি।

সমকালীন মানবসমাজ নীতিগতভাবে স্বাধীনতা, সাম্য, নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ইত্যাদি মূল্যমানকে মেনে নিয়েছে। ফলে এনিয়ে কেউ আমাদের সাথে আর বিবাদ করতে আসছে না। এটি একটি বিরাট অগ্রগতি ও আমাদের জন্য একটি সুবিধাজনক ক্ষেত্র। কিন্তু সমস্যা এখানে যে, এসব নীতি অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না, আমাদের লুকানো অহংকার ও মিথ্যাচারের জন্য। আমরা আমাদের ঘোষিত নীতির প্রতি যত্নবান নই, আমরা চুক্তিগুলোর প্রতি বিশ্বস্ত ও আন্তরিক নই।
n
বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী