ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক


৪.১। সাধারণত ধারণা করা হয়ে থাকে যে, আল্লাহ প্রথমে পুরুষ সৃষ্টি করেছেন, তার থেকে প্রথম নারী এবং পরে এই জোড়া থেকে সমস্ত নরনারী। ‘আদম-হাওয়া’র এই ব্যাখ্যা আমরা শৈশবেই জেনে থাকি। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে এই যে, কোরানের কয়েক স্থানে ‘আদম’ নামটির উল্লেখ পাওয়া গেলেও কোথাও ‘ইভ’ বা ‘হাওয়া’ নামটি নেই। তার স্থানে বলা হয়েছে ‘আদমের সঙ্গী’। নারী ও পুরুষের মধ্যে কে আগে বাস্তবে মূর্ত হয়েছিল তা কোরান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ‘ইভ’ বা ‘হাওয়া’ নামটি সমগ্র কোরানে ব্যবহৃত না হওয়ার মধ্যে একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে বলেই মনে হয়।

৪.২। আগের পর্বে আমরা দেখেছি যে, নারী-পুরুষের জেন্ডার বিভাজনের ক্ষেত্রে উৎস হিসেবে ‘নাফস’ শব্দটি প্রত্যেকবার ব্যবহার করা হয়েছে। এই ‘নাফস’ স্ত্রীবাচক শব্দ হলেও ‘আদম’ পুরুষের নাম হিসেবে আমরা জানি। ‘নাফস’য়ের বেলায় সঙ্গী পুরুষবাচক, এবং ‘আদম’য়ের বেলায় সঙ্গী স্ত্রীবাচক শব্দ রূপে এসেছে। যখন মানবজাতির নারী-পুরুষ—এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনের উৎস নিয়ে কথা বলা হয়েছে তখন কোরানে ‘পুরুষ’ বা ‘আদম’ শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। এর মধ্যেও গভীর তাৎপর্য নিহিত আছে ধারণা করা যায়।

৪.৩। ‘আদম’য়ের কাহিনী নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে কোরানের ২:৩০-৩৯, ৭:১০-২৫, ১৭:৬১-৬৫, ১৮:৫০ ও ২০:১১৫-১২৩ আয়াতে। তার জ্ঞান, জগতে তার অবস্থান ও মর্যাদা, পতন, অনুশোচনা, ক্ষমা লাভ ইত্যাদি আয়াতসমূহের আলোচিত বিষয়। কোরানের নানা স্থানে ‘আদম’ নামটি এসেছে পঁচিশবার; এর মধ্যে ‘বনি আদামা’ বা ‘আদম সন্তান’ বা ‘চিলড্রেন অব এডাম’ সাতবার (৭:২৬, ২৭, ৩১, ৩৫, ১৭২, ১৭:৭০ ও ৩৬:৬০); ‘জুররিয়াতি আদামা’ বা ‘আদমের অফস্প্রিং’ (১৯:৫৮) একবার। তিনটি আয়াতে আদমের সঙ্গিনীর কথা এসেছে (২:৩৫, ৭:১৯, ২০:১১৭)। আদমের দুই পুত্রের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ৫:২৭-৩১ আয়াতে; তবে হাবিল ও কাবিলের নাম (এবেল ও কায়েন) সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তাছাড়া ৩:৩৩ ও ৩:৫৯ আয়াতে আদম নামটি নুহ, ইব্রাহিম, ইমরান, যিশু ইত্যাদি নামের সাথেও এসেছে।

৪.৪। আমরা আগের পর্বে বলেছিলাম যে, মানুষ ইন্টারনালি নারী-পুরুষে বিভক্ত ও পরস্পরের পরিপূরক, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে সকলে একরূপ। সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, যেখানে জগতে মানুষের অবস্থান, মর্যাদা, জ্ঞানগত সামর্থ্য, নৈতিক দুর্বলতা, পতন, অনুতাপ, মানুষের চৈতন্যগত সক্ষমতা ও তার মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ সম্বন্ধে কিছু বলা হয়েছে সেখানে ‘আদম’ নামটি ব্যবহৃত হয়েছে। সঙ্গিনীর কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে জগতে বসবাস ও অশুভের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সংগ্রামের ক্ষেত্রে—যেখানে সঙ্গীর উল্লেখ তাৎপর্যপূর্ণ হয়।

৪.৫। আদমের কাহিনীগুলো রূপকধর্মী বা এলেগরিক্যাল। ‘আদম’কে সার্বিক ধারণা (‘মানুষ’) বা মূল ব্লুপ্রিন্ট (‘নাফস’) এর নাম হিসেবে দেখলে প্রতিটি নারী-পুরুষই আদমের অন্তর্ভুক্ত। পুরুষের বেলায় বলা যায় আদম পুরুষ ও নারী তার সঙ্গী এবং নারীর বেলায় আদম নারী ও পুরুষ তার সঙ্গী। পুরুষ যেমন আল্লাহর প্রতিনিধি, তেমনই নারীও এবং পুরুষ যেমন ভাষাগত ও গাণিতিক প্রতীকের মাধ্যমে বিবরণ তৈরির সামর্থ্যের অধিকারী, তেমনই নারীও। পুরুষের প্রতি যেমন ফেরেশতারা নত ও শয়তান দ্রোহী, তেমনই নারীদের বেলায়ও।

৪.৬। কোরানের কয়েক স্থানে ফেরেশতাদেরকে আদমের প্রতি নত হওয়ার বিষয়টি লিখিত আছে (২:৩৪, ১৭:৬১, ১৮:৫০, ২০:১১৬)। আবার ৭:১০-১১ আয়াতে আমরা দেখি মানবজাতিকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বহুবচনে ‘তোমাদের’ সর্বনাম ব্যবহার করে প্রথমে বলছেন সৃষ্টি ও রূপদানের কথা এবং তারপর আসছে আদমের প্রতি নত হবার নির্দেশটি। এখানে জগতে মানুষের বাস্তব সৃজন ও রূপায়নের সাথে বর্ণিত হয়েছে রূপকধর্মী ‘আদমের প্রতি ফেরেশতাদের নতি ও ইবলিসের প্রত্যাখ্যান’কে।
(7:10) And We have given you power in the earth, and appointed for you therein livelihoods. Little give ye thanks! (7:11) And We created you, then fashioned you, then told the angels: Fall ye prostrate before Adam! And they fell prostrate, all save Iblis, who was not of those who make prostration.

৪.৭। ‘প্রকৃতি’র বা জগতের বিপরীতে মানুষ হচ্ছে ‘পুরুষ’। এই পুরুষকার লিঙ্গগত পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়—লিঙ্গগত নারীও মানুষ হিসেবে, ব্যক্তি হিসেবে এর অধিকারী। মানুষ হচ্ছে সেই সত্ত্বা যা লিঙ্গগতভাবে ইন্টারনালী নারী-পুরুষে বিভক্ত, যেখানে নারী ও পুরুষ পরস্পরের পরিপূরক। এই বিভাজন প্রজননে অংশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে, কোন অযৌন বিষয়ে বা ক্ষেত্রে এই বিভাজনের কোন অর্থ নেই। আমরা জগতে প্রতিষ্ঠাকে পুরুষবাচক গুণ বলতে পারি ও নিজের রেপ্লিকা সৃষ্টিতে সক্ষমতাকে নারীবাচক গুণ হিসেবে দেখতে পারি। প্রথম গুণের বিচারে প্রতিটি নারীর মধ্যে পুরুষধর্ম রয়েছে এবং একইভাবে দ্বিতীয় গুণের বিচারে প্রতিটি পুরুষের মধ্যে নারীধর্ম রয়েছে।

৪.৮। প্রসঙ্গত বলা যায়, কোরানে আদমের ভ্রান্তি ও পতনের জন্য তার সঙ্গীকে (বা নারীকে বা হাওয়া’কে) দোষী করা হয়নি। আদমের ভ্রান্তিকে কোথাও আদমের এবং কোথাও উভয়ের ভ্রান্তিকে উভয়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সঙ্গীর প্ররোচনায় আদম পতিত হয়েছে—এই কথা কোন ইঙ্গিতেও কোরানে উল্লেখিত হয়নি, যদিও আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, হাওয়ার প্ররোচনায় আদম ভ্রষ্ট হয়েছিল।

৪.৯। আমরা কোরানের কোথাও ‘নারী অবলা’, ‘লজ্জা নারীর ভূষণ’ ইত্যাকার কোন কথা পাই না। পুরুষের গায়ে শক্তি বেশী হতে পারে; আবার নারীও গর্ভধারণের সামর্থ্য সম্পন্ন, যেক্ষেত্রে পুরুষ অক্ষম। কোরানে এমন কোন নৈতিক গুণ বা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ নেই যা পুরুষের জন্য প্রশংসনীয় কিন্তু নারীর জন্য অনভিপ্রেত বা নারীর জন্য প্রশংসনীয় কিন্তু পুরুষের জন্য অনভিপ্রেত। লজ্জাশীলতা পুরুষের জন্যও অভিপ্রেত গুণ, আবার দৃঢ়তা নারীর জন্যও।

৪.১০। আমরা যদি ধরেও নেই যে, ‘আদম’ ও ‘নাফস’ সমার্থক তবুও অতীতের ভাষ্যকারদের প্রচলিত মতের আসল দাবীটি স্ববিরোধী। তাদের মতে আদম থেকে হাওয়া সৃষ্ট হয়েছে ও তাই আদমের মর্যাদা হাওয়ার চেয়ে বেশী। যদি উৎস অপেক্ষা উৎপন্নের মর্যাদা কম হয়ে থাকে তবে মাটি থেকে উৎপন্ন আদম মর্যাদার অধিকারী হয় কিভাবে? মাটি থেকে উৎপন্ন আদমের মর্যাদা মাটি থেকে বেশী হলো, কিন্তু আদম থেকে উৎপন্ন হয়ে হাওয়ার মর্যাদা আদম থেকে কম কেন হলো তার কোন ব্যাখ্যা তাদের কাছে পাওয়া যাবে কী? আবার একই পিতা-মাতা আদম ও হাওয়া থেকে জন্ম নেয়া পুরুষ ও নারী সন্তানদের মধ্যে মর্যাদায় ফারাক কী করে সম্ভব তারও কোন উপযুক্ত ব্যাখ্যা তাদের কাছে নেই। আদম পুরুষ বলে তার পুরুষ সন্তানের মর্যাদা বেশী কী করে হয় যদিও তাদের মায়ের মর্যাদা কম এবং নারী সন্তানদের বেলায় কী করে মর্যাদা কম হয় কেবল এই কারণে যে, তারা তাদের কম মর্যাদার মায়ের সন্তান, যদিও তাদের পিতা আদম?

চলবে ….

পরের পর্ব: নারীর কোরান – ৫ (নারী)
প্রথম পর্ব: নারীর কোরান – ১ (ভূমিকা)
n
বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী