ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক


৫.১। আরবি ভাষায় লিঙ্গ মাত্র দুটি: পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ। মানুষের উৎপত্তি এবং জগতে মানুষের অবস্থান ও মানুষের প্রকৃতি নিয়ে কথাগুলোতে শব্দের লিঙ্গে নানা প্রকার শিফটিং আমরা দেখতে পাই। কোথাও ‘সঙ্গী’ পুরুষ-বাচক ও কোথাও স্ত্রী-বাচক। আল্লাহ যখন ‘হে মানবজাতি’ বা ‘হে বিশ্বাসীরা’ বলে সম্বোধন করেন বা ‘তোমরা’ সর্বনাম ব্যবহার করেন, তখন তার মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকে।

৫.২। আমরা আগের দুই পর্বে নারী-পুরুষের অস্তিত্বের উৎসগত ঐক্য (নাফসিন ওয়াহিদাতিন) এবং জগতে তাদের মর্যাদা ও অবস্থানের (আদম) দিক থেকে সমরূপতা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। নারী-পুরুষের এই সমরূপতাকে আল্লাহ প্রকাশ করেছেন অন্য আরও দুটি আয়াতে।

২:১৮৭ আয়াতে বলা হয়েছে: হুন্না লিবাসুল্লাকুম, ওয়া আন্‌তুম লিবাসুল্লাহুন্না। অর্থাৎ: তোমরা তাদের পরিচ্ছদ এবং তারা তোমাদের পরিচ্ছদ।

৭:৭১ আয়াতে বলা হয়েছে: আল মু’মিনুনা ওয়াল মু’মিনাতি বায়্‌দুহুম আউলিয়াউ বায়্‌দিন। অর্থাৎ: বিশ্বাসী পুরুষরা ও বিশ্বাসী নারীরা পরস্পরের বন্ধু।

৫.৪। আল্লাহ পুরুষ ও নারী উভয়কে জীবনে সফলতার ক্ষেত্রে সমরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আল্লাহর উপর আস্থা রেখে, পুরুষ হোক বা নারী, যে-ই সৎ ও ন্যায়ানুগ কাজে নিরত থাকবে, তারাই প্রবেশ করবে কাননে এবং তারা অণুপরিমাণেও প্রতারিত হবে না। (কোরান ৪:১২৪)

৫.৩। নৈতিক গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে এমন কোন গুণ-বৈশিষ্ট্যের নজীর কোরানে নেই যা আল্লাহ পুরুষকে অর্জন করতে বলেছেন, কিন্তু নারীকে বর্জন করতে বলেছেন। এমন কোন গুণ নেই যা পুরুষের জন্য অবাঞ্ছিত হয়েছে, কিন্তু নারীর জন্য বাঞ্ছিত হয়েছে। এমন কোন দোষ নেই যা পুরুষের জন্য কম নিন্দনীয়, কিন্তু নারীর জন্য বেশী নিন্দনীয়। ৩৩:৩৫ আয়াতে বিস্তারিত বলা হয়েছে নিম্নরূপভাবে।

নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণকারী পুরুষ ও আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণকারী নারী, আল্লাহর উপর আস্থাশীল পুরুষ ও আল্লাহর উপর আস্থাশীল নারী, কর্তব্যনিষ্ঠ পুরুষ ও কর্তব্যনিষ্ঠ নারী, সত্যনিষ্ঠ পুরুষ ও সত্যনিষ্ঠ নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, সংযমী পুরুষ ও সংযমী নারী, গোপনীয় অঙ্গ সংরক্ষণকারী পুরুষ ও গোপনীয় অঙ্গ সংরক্ষণকারী নারী, আল্লাহকে স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে স্মরণকারী নারী—তাদের জন্য আল্লাহর নিকট রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও বিপুল প্রতিদান। (কোরান ৩৩:৩৫)

৫.৫। কিন্তু অহংকারী ও প্রাধান্যকামী পুরুষ মনস্তত্ত্বকে আল্লাহ আক্রমণ করেছেন নিচের দুটি আয়াতে।

“When any of them is given a good news regarding female, his face is darkened; and he is a repressor. He hides himself from community because of the evil of the glad tiding which he has received. Shall he keep this in humiliation or shall he bury it in the dust? Ah, evil indeed is whatever they decide!” (Koran 16:58-59)

“And when any of them is given a good news regarding that he has refered to the All-Compassionate in analogy, his face is darkened; and he is a repressor. What is he then! – he is one who is brought up with ornaments alone and he is one who is not lucide in arguments.” (Koran 43:17)

৫.৫.১। প্রথমটিতে আল্লাহ সাধারণভাবে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক পৌরুষ-অভিমানী মনোভাবের চিত্র এঁকেছেন। কন্যা সন্তানের জন্মসংবাদ থেকে শুরু হয় এই বৈষম্যকামী মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া—তার মুখ কালো হয়ে যায়, সে তার অন্তরে অন্তরে মর্মজ্বালায় ভুগতে থাকে, যা সে গোপন করতে সচেষ্ট হয়ে উঠে। এই মানসিকতা নারীদের শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, স্বাধীনতা, স্বাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পক্ষে সকল পদক্ষেপের বিরোধিতা পর্যন্ত করতে শুরু করে প্রকাশ্যে ও গোপনে।

৫.৫.২। দ্বিতীয় আয়াতে এই মনোভাবকেই মমতাবান আল্লাহ নিজের সাথে সম্পৃক্ত করে প্রকাশ করেছেন। আরবি ভাষায় গর্ভ (রেহেম) ও মমতা (রাহমা)—এই শব্দ দুটি একই মূল থেকে এসেছে। সনাতন আরবরা ফেরেশতাদেরকে নারী হিসেবে গণ্য করতো এবং আল্লাহর সন্তান বলে মনে করতো। আমারাও নারী ও মমতা শব্দ দুটিকে খুবই নিকট সম্পর্কে আবদ্ধ শব্দযুগল বলে জানি। ভাষাগত দিক থেকে এবং/বা—এমনকি—বিশ্বাসের দিক থেকে, গর্ভের অধিকারী নারীকে মমতাময় ও করুণাময় আল্লাহর গুণের সাথে যারা নিকট সম্পর্কে আবদ্ধ করেছে, তারাই আবার নারীকে অবদমিত করতে উদ্যত হয়, কোরানের মৌলিক নীতিকে ধ্বংস করে নিজেদের জন্য অধিকতর মর্যাদা দাবী করে বসে।

৫.৬। বিচার দিবসের চিত্র আঁকতে গিয়েও আল্লাহ নারীকে এনেছেন এভাবে।

When the female, buried alive, is questioned –
For what crime she was killed.
(Koran 81:8-9)

মানবজাতির ইতিহাসে বৈরিতা, শোষণ ও অত্যাচারে দাস-মালিক, কৃষক-জমিদার, শ্রমিক-পুজিঁপতি, জনগণ-রাষ্ট্র ইত্যাদি নানা যুগল থাকলেও আল্লাহ নারী-পুরুষ যুগল থেকে নারীকেই বেছে নিয়েছেন চিত্রটি আঁকতে গিয়ে। নারীকে অবদমিত রাখা, তাকে অধীন করে রাখা, তার স্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্বকে অস্বীকার করা, তার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলা—এই সবই নারীকে শিশু করে রাখা, সেই শিশুকে মাটির নীচে প্রোথিত করে ফেলা এবং তাকে হত্যা করার নামান্তর। নারীর অধিবাস যেন জীবন্ত কবরবাস। নারী যখন ধর্ষিত হয়, এই মানসিক অবস্থা তখন বলে নারীর চলন বাঁকা; ‘চলন সোজা’ নারীর বেলায় বলে নারী চলতে গেল কেন; যখন ঘরের ভেতর অত্যাচারটি ঘটে তখন আর কী বলার বাকি থাকে এছাড়া যে, নারী মাটির নীচে গেল না কেন!

৫.৭। কিন্তু প্রসঙ্গ অনুসারে যদি কোন অনুজ্ঞা বা নির্দেশনা কেবল পুরুষ বা কেবল নারীর জন্য নির্ধারিত হয়, তবে তার বিপ্রতীপটিও সঠিক হয়—পুরুষের কর্তব্যভারে আধিক্য ও কর্তব্য সম্পাদনে পদক্ষেপে অগ্রভূমিকা সহ। পুরুষের এই অতিরিক্ত ভার কিন্তু আবার নারীর প্রতি পুরুষের দান নয়, এটি নারীর প্রাপ্য হয় নারীর গর্ভ ধারণে সক্ষমতা ও গর্ভধারণের কষ্টের বিপরীতে। আল্লাহ নিজেই এর জন্য নারীকে নির্বাচন করেছেন, সক্ষমতা দান করেছেন। এখানে নারীর উপর ভার অর্পিত হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে, যা থেকে নারী পালাতেই পারছে না; কিন্তু পুরুষের ভারটি আইনগত ও নৈতিক বিধায় এটিকে কর্তব্যে আধিক্য হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়।

৫.৮। মায়ের কাছে মানুষের ঋণের কথা আল্লাহ সমগ্র মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এই আয়াতে: We have enjoined on man kindness to his parents: In pain did his mother bear him, and in pain did she give him birth. (Koran 46:15)। মানুষের এই ঋণ নারীকে দিয়েছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এবং গর্ভসমূহ সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে তিনি এই সচেতনতাকে তাঁর সম্বন্ধে সচেতনতার সাথে যুক্ত করেছেন এভাবে: O mankind! Be careful of your duty to your Lord Who created you from a single soul and from it created her mate and from them twain hath spread abroad a multitude of men and women. Be careful of your duty toward Allah in Whom ye claim your rights of one another, and toward the wombs. Lo! Allah hath been a watcher over you. (Koran 4:1)।

৫.৯। এই রেসিপ্রোসিটি বিধিটি আল্লাহ উল্লেখ করেছেন কোরানের ২:২২৮ আয়াতে: লাহুন্না মিস্‌লুল্লাযি আলায়হিন্না বিল মারুফ, ওয়া লির্‌রিজালি আলায়হিন্না দারাজাত। অর্থাৎ: তাদের (নারীদের) প্রাপ্য হবে তার সমরূপ, যা তাদের (নারীদের) নিকট থেকে প্রত্যাশা করা হবে, শিষ্টাচার সম্মত ভাবে; এবং পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের (নারীদের) নিকট থেকে যা প্রত্যাশা করা হবে তার চেয়ে বেশী।

৫.১০। কোরানের নারীনীতি মূলক বচনসমূহের মধ্যে এই ২:২২৮ আয়াতাংশ একটি প্রধান বচন। আগামী পর্বে এই আয়াতাংশটি নানা অনুবাদক কিভাবে অনুবাদ করেছেন তা এবং ‘দারাজাত’ শব্দটি নিয়ে কী অন্যায় করা হয়েছে তা পরীক্ষা করে দেখার চেষ্টা করবো।

চলবে …

পরের পর্ব: নারীর কোরান – ৬ (দারাজাত)

প্রথম পর্ব: নারীর কোরান – ১ (ভূমিকা)
n
বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী