ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক


৭.১। কোরানে উল্লেখিত ২.২২৮ আয়াতের ‘লাহুন্না মিসলুল্লাযি’ নীতিবচনটি মূলত সুবর্ণবিধির একটি বিশেষ প্রকাশ, যা আবার কোরানের অন্য নীতিগুলোর সাথে মিলে একটি ব্যাপক ও পরিপূর্ণ নীতি গঠন করতে পারে। আমরা গসপেলে যীশু প্রমুখাত পেয়েছি: ‘অন্যের সাথে সেরূপ আচরণ কর, যেরূপ আচরণ তুমি অন্যের নিকট থেকে প্রত্যাশা করে থাক’। কিন্তু এখানে একটি অচলাবস্থা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে বিধি অনুসারীর সংখ্যা কম, সেখানে এর অনুসারীদেরকেই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে হয়, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি সমাজ যদি উন্নত হয় ও বিধি অনুসারী দিয়ে সমাজ পূর্ণ থাকে তবে এই অচলাবস্থা নিরসনের নীতির প্রয়োজন হয়। এটিকে বলা যায় টাই-ব্রেকিং প্রিন্সিপল।

৭.২। বিধিটি আমার জন্য যেমন পালনীয়, তেমনই আপনার জন্যও; এবং মনে করুন আমরা দুজনেই বিধি মেনে চলতে সম্মত হলাম। মনে করুন, একটি টেবিল ঠেলে সরানো দরকার। আমি আপনার কাছে প্রত্যাশা করছি আপনি টেবিলটি ঠেলে সরিয়ে দিন। এই প্রত্যাশা আমার উপর এই দায়িত্ব অর্পন করে যে, আমিই টেবিলটি ঠেলবো। আবার আমার নিকট আপনার প্রত্যাশাও আপনাকে আমার মতো অবস্থায় উপনীত করে। অর্থাৎ, আমার নিকট আপনার প্রত্যাশামতো আপনার দায়িত্ব হয় টেবিলটি ঠেলা। কাজেই আপনার ও আমার উভয়েরই সমান কর্তব্য হলো এবং এতে করে পরস্পরের নিকট সমান অধিকারও হলো।

৭.৩। এখন প্রশ্ন হতে পারে কে আগে পদক্ষেপ নেবে? আমি আমার অধিকারকে বড় করে দেখলে অপেক্ষার পলিসি নিতে পারি। আপনিও পারেন একইরূপ চিন্তা করতে। এভাবে উভয়ে অপেক্ষা করলে টেবিলটি কোনদিনই সরবে না। যদি টেবিলটিকে সত্যি সরাতে হয় তবে কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে একটি প্রতিযোগিতার নীতি প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ উভয়ের জন্য ‘কে আগে টেবিল ঠেলতে পারে’ ধরণের নীতি। যদি আমরা উভয়েই কর্তব্যপরায়ন হই, নিজের অধিকার নিয়ে চিন্তিত না হই, তবে আপনি আমাকে আগে যাওয়ার সুযোগ দেবেন না, এবং আমিও চাইবো আপনার আগেই টেবিলের কাছে চলে আসতে। কাজেই এই সদর্থক অবস্থাতেও প্রতিযোগীতা একটি নীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কোরানের ২:১৪৮ ও ৫:৪৮ আয়াতে আল্লাহ এই নীতিটি লিখে দিয়েছেন: ‘ভালর জন্য প্রতিযোগীতা কর’।

৭.৪। দ্বিতীয় একটি কেইস আছে। মনে করুন, আপনি তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন; আর আমি আছি সুবিধাজনক অবস্থায়। আপনি প্রতিযোগীতার জন্য প্রয়োজনীয় সমরূপ গ্রাউন্ডে বিরাজ করছেন না। এখন কে আগে এগিয়ে আসবে? বিধিটি নিজেও তা ব্যাখ্যা করতে পারে। আমি যেহেতু প্রত্যাশা করি যে, আমার অসুবিধার কথা অন্যে বিবেচনা করুক, সেহেতু আপনার অসুবিধার কথা আমার বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন, তবে দেখতে পাবেন এটি একজনকে কর্তব্য পরিহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোন পরিস্থিতিতে কর্তব্য থেকে অব্যহতির লাভের সিদ্ধান্ত সাধারণত কর্তব্যপরায়ন নিজে সহজে নিতে চায় না। এজন্য স্পষ্ট অব্যহতির বা অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। কাজেই এই এরূপ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা জনের উপর স্পষ্টভাবে অগ্রভূমিকা আরোপ করতে হয়। এই ২.২২৮ আয়াতটিতে আমরা সক্ষমদের জন্য অগ্রভূমিকার বাধ্যতা পাই। এতে অসুবিধাজনক অবস্থানে থাকা জনের দায়িত্বভার হ্রাস পায়।

৭.৫। কোরানে আরেকটি নীতির উল্লেখ আছে ২৩:৯৬ ও ৪১:৩৪ আয়াতে; যা হচ্ছে: ‘ভাল নিয়ে মন্দের সম্মুখীন হও’ নীতি। যদিও এর অর্থ অনেক ব্যাপক তবুও এখানে এর প্রয়োগ সম্ভব। এই নীতি অনুসারে যে টেবিল ঠেলতে অগ্রসর হতে বিলম্ব করে তাকে অনুসরণ না করে ও তার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে নিজেই অগ্রসর হও, এবং যতবার এমন ঘটে ততবারই অগ্রসর হও। কাজেই প্রতিযোগীতার বিধি, অগ্রভূমিকার বিধি ও ভাল নিয়ে মন্দের সম্মুখীন হওয়ার বিধি সুবর্ণ বিধিকে পূর্ণতা দেয়। গসপেলেও এই কথা ভিন্ন ভাষায় বর্ণীত হয়েছে: যে তোমার ক্ষতি করে, তুমি তার উপকার করো মর্মের নানা বচন রয়েছে।

৭.৬। বর্তমান ‘লাহুন্না’ নীতিটি এই দ্বিতীয় কেইসের। এই নীতি নারী ও পুরুষের জন্য সমরূপ অধিকার নির্ধারণ করেছে, পুরুষদের উপর অগ্রভূমিকা অর্পন করেছে এবং নারীদের ভারকে হ্রাস করেছে। বাংলা ট্রান্সলিটারেশন, আরবি ও শব্দগত ইংরেজি অনুবাদ নীচে দেওয়া হলো।

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ

ওয়া (and) লাহুন্না (for them) মিস্‌লুল্লাযি (like of that) আলায়হিন্না (on them) বিল্‌মারুফ (as reasonable/known), ওয়া (and) লির্‌রিজালি (for men) আলায়হিন্না (on them) দরাজাত (precedence)।

And for them is equitable to what is expected of them, according to what is reasonable. And for men is the precedence over what is expected of them।

৭.৬.১। সহি ইন্টারন্যাশনাল আলায়হিন্না এর অর্থ করেছে ‘what is expected of them’ হিসেবে। প্রথম ‘আলায়হিন্না’ যা বুঝায় দ্বিতীয় ‘আলায়হিন্না’ তা-ই নির্দেশ করে বুঝলে অর্থ আরও পরিষ্কার হয়।

৭.৬.২। মারুফ শব্দের মূল অর্থ ‘সুবিদিত’। এর থেকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ অর্থেও উপনীত হওয়া যায়, কারণ যা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কাছে সুবিদিত, তা যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত। আচরণের ক্ষেত্রে তা-ই আবার শিষ্টাচার সম্মত হবে। একারণে মারুফ শব্দের অর্থ সাধারত ন্যায়্যসঙ্গত, শিষ্টাচারসম্মত, সুন্দর, সুবিদিত ইত্যাদি করা হয়ে থাকে। মানুষ পারস্পরিক অধিকারের বেলায় অন্য ক্ষেত্রগুলোতে যে নীতিকে শুদ্ধ ও যুক্তিযুক্ত মনে করে নারীর বেলায় তা থেকে সরে আসবে না। কাজেই নারীর প্রাপ্য নির্ধারিত হচ্ছে তার কাছে প্রত্যাশার সমরূপভাবে, যেখানে সমপরিমাণটি নির্ধারিত হচ্ছে সুবিদিত, যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়সঙ্গত ভাবে এবং তা প্রদেয় হচ্ছে শিষ্টাচারসম্মত, সুন্দর ভাবে।

৭.৬.৩। ‘তাদের’ শব্দটি দ্বারা জেন্ডার নির্ধারণ করা যায় না বিধায় আমরা নারীবাচক সর্বনামের স্থলে ‘নারীদের’ পদটি ব্যবহার করে স্পষ্টতা আনতে পারি। তাহলে নীতিটি বাংলায় এভাবে লেখা যায়: ‘নারীদের জন্য তার সমরূপ, যা নারীদের উপর—ন্যায়সঙ্গতভাবে; এবং পুরুষদের জন্য, যা নারীদের উপর তদ্‌বিষয়ে অগ্রভূমিকা।’

৭.৬.৪। এখানে আলোচনা হচ্ছে নারীর অধিকার, স্বার্থ, তার প্রতি কর্তব্য নিয়ে—মর্যাদার বিষয়টি এখানে অনুপস্থিত। প্রথমে যা বলা হচ্ছে তার ফলিত বা চূড়ান্ত তাৎপর্য অধিকারের সমতা, কর্তব্যভারের সমতা—যা অনুবাদকরা অস্বীকার করেননি। এই অবস্থায় হুট করে মর্যাদায় অধিক্য বুঝতে হলে একটি অহেতুক ও অবৈধ অনুমানের উপর নির্ভর করতে হয়। অবৈধ একারণে যে, পুরুষের জন্য মর্যাদায় আধিক্যের কথায় উপনীত হলে সমতার পূর্ব নীতিটি অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাছাড়া, স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ইসলাম ধর্মে একটি পূর্বস্বীকৃত নীতি—কারণ নারী-পুরুষের উৎস এক (কোরান ৪:১), এবং আল্লাহর বিচারে উভয়ের চূড়ান্ত অর্জিতব্য মর্যাদা কাজের ভিত্তিতে নির্ধারিতব্য (কোরান ৪৯:১৩)।

৭.৬.৫। নবীর সাহাবি ইবন আব্বাস কোরানের এই আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর সামনে নিজেকে সজ্জিত অবস্থায় উপস্থাপন করে থাকি, যেহেতু আমিও চাই যে, তিনিও তা করুন; এবং তিনি এই প্রসঙ্গে এই আয়াতটি উ্ল্লেখ করেন। ইবন কাসিরের তফসিরে পাওয়া এই বর্ণনা কোরানের এই আয়াতের যথার্থ ব্যাখ্যা।

৭.৭। এই নীতিটি মূলত রেসিপ্রোসিটির নীতি। বিধিটি আবার নিজেও রেসিপ্রোকাল। সেমতে প্রথম অংশের জন্য বলা যায়: পুরুষের নিকট নারী যেরূপ প্রত্যাশা করবে, নারীর নিকট থেকে পুরুষেরও সেরূপ প্রাপ্য হবে। কিন্তু অগ্রভূমিকা নিয়ে তিন রকম কথা বলা যায়: ১. পুরুষ সক্ষম হলে, নারী সক্ষম বা অক্ষম উভয় অবস্থায় পুরুষের জন্য অগ্রভূমিকা নির্ধারণ করতে পারে। ২. নারী যদি সক্ষম হয়, তবে নিজ ইচ্ছায় অগ্রভূমিকা নিজের জন্য নির্ধারণ করতে পারে, ৩. পুরুষ যদি অক্ষম হয়, তবে সক্ষম নারীর জন্য অগ্রভূমিকা বাধ্যতামূলক হতে পারে। সক্ষমতার প্রশ্ন আসে কোরানের আরেকটি নীতি থেকে; যা হচ্ছে: ‘কর্তব্য সামর্থ্যের অতিরিক্ত হবে না’।

৭.৮। মুসলিম আইনবেত্তারা সাধারণত দায়িত্বের বা কর্তব্যের অপরিহার্যতা নির্ধারণ করতে চেষ্টা করেন। অর্থাৎ কার উপর দায়িত্ব অর্পিত হলে উপযুক্ত কারণ ব্যতীত সে সেই দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃত হতে পারবে না। যেমন, যুদ্ধ করা সক্ষম পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক থাকে। কিন্তু সক্ষম পুরুষের সংখ্যা কোন যুদ্ধে যথেষ্ট হিসেবে বিবেচিত না হলে, সক্ষম নারীরা প্রয়োজনীয় সংখ্যা পূরণ করবে। এ অবস্থায় নারীরা বলতে পারবে না যে, তারা যুদ্ধে যাবে না। মুসলিম আইনবেত্তাদের মধ্যে এই অভিমতও রয়েছে যে, কোন সমাবেশে যদি উপস্থিত পুরুষদের কেউ নামাজ লীড করতে না জানে কিন্তু সেখানে কোন সক্ষম নারী বর্তমান থাকে, তবে সেই নারীই নামাজ লীড করবে। এরকম অবস্থায় নারী দায়িত্ব পরিহার করতে পারবে না। বা বলতে পারবেন না যে, তিনি ইমামতি করবেন না।

৭:৯। কোরানের নারী নীতি হচ্ছে এরকম: নারীকে অগ্রসর করে আনার জন্য পুরুষরা সহায়ক হয়ে পাশে দাঁড়াবে ও কাজ করবে; নারীরা উদ্যেগী হবে এবং নিজেদেরকে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত করবে, এবং তারা নিজেদের বিবেচনা অনুসারে অগ্রসরমান হবে। পুরুষরা তাদের উপর তাদের অনিচ্ছায় ভার চাপাতে পারবে না, আবার নারীদের নিজ সিদ্ধান্তে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাদেরকে বাধা দেবে না। সক্ষম নারীরাও পুরুষরা অক্ষম হয়ে উঠলে সহযোগীতা করতে পিছপা হবে না।

৭.১০। রাজুল (রিজাল-এর একবচন) শব্দটির অর্থে ব্যাপকতা রয়েছে। রাজুল দ্বারা প্রধানত লিঙ্গগত পুরুষ বুঝায়; তেমনই এর মধ্যে রয়েছে সক্ষম পুরুষের দ্যোতনা; সর্বোপরি, রাজুল বলতে ব্যক্তি মানুষ, সক্ষম ব্যক্তি মানুষ, বলিষ্ঠ ব্যক্তি মানুষকেও বুঝায়—নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, আমরা যদি দুই ভাই-বোনকে একে অপরের সাথে মন্দ আচরণ করতে দেখি, এবং ভাইটি যদি প্রতিবন্ধী হয় বা বোনটি স্পষ্টতই অনেক সবল অবস্থানে থাকে, তবে বোনটিকে আগে সংশোধনের উপদেশ দিতে পারি। এই ক্ষেত্রে বোনটিই রিজালদের অন্তর্ভুক্ত বিবেচিত হয়। রিজাল শব্দটি কোরানের নানা স্থানে কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে তা নিয়ে আমরা পরের একটি পর্বে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

৭.১১। এই ব্যাপক পরিসরে ‘মিস্‌লুল্লাযি’ বা সমরূপতার নীতিকে আমরা একটি সাধারণ নীতিতে রূপান্তরিত করতে পারি: ‘অন্যের প্রাপ্য হবে তার নিকট প্রত্যাশার সমরূপ, এবং সক্ষমতা বা শক্তি বা সুবিধার অধিকারীর জন্য রয়েছে অগ্রভূমিকা।’

চলবে ….

পরের পর্ব: নারীর কোরান – ৮ (কাওয়াম)

প্রথম পর্ব: নারীর কোরান – ১ (ভূমিকা)
n
বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী