ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন


১. নো উল্লু বানাওয়িং — আমার মতো মূর্খও মানুষকে জ্ঞানার্জনের উপদেশ দেয়। আমার বন্ধুটির মতো দুর্জ্জনও মানুষকে সুজন হতে আহ্বান করে। কারণ আমি ও আমার বন্ধুটি উভয়েই আধুনিক। কিন্তু অভিষেক যখন পা ঝুলিয়ে উঁচুতে বসে মাথা-হাত দুলিয়ে সুর করে “নো উল্লু বানাওয়িং” গীত গান তখন তিনি একটি উত্তরাধুনিকতা-সৃষ্ট চরিত্রকেই নিপুণভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লু “না-বনছেন(?!)” কারণ তার কাছে ইনফরমেশন আছে, ইনফরমেশন সংগ্রহের সহজ, কিন্তু ক্ষমতাধর, উপায় হাতে আছে। জ্ঞান বা সুজনত্বের সমস্যা নয়, উল্লু বনার সম্ভাবনাই একটি প্রধান পোস্টমডার্ন সমস্যা; উল্লু বনতে না চাওয়াটিই একটি প্রধান পোস্টমডার্ন আকাঙ্ক্ষা এবং উল্লু না বনার সক্ষমতা তার অহংকার। “নো উল্লু বানাওয়িং” এর মতো অদ্ভুত ভাষার বাক্য তাদের প্লুরালিজম-এর প্রতীক বা চরম পরিণতি হয়ে উঠেছে—‘যেকোনটিতেই চলে’, ‘যেকোন কিছুই সম্ভব’, ‘সব কিছুই যা-ইচ্ছা-তাই’। তাদের নিকট জ্ঞান কোন সমস্যা নয়, কারণ ইনস্ট্যান্ট ইনফরমেশন ডিভাইসের বদৌলতে ইনফরমেশন এভেইলেবল এনিটাইম। আবার সুজনত্বও কোন সমস্যা নয়, এজন্য যে তারা কুজন বা দুর্জ্জন নন; তাদের সমস্যা সত্য-মিথ্যার দ্রবণ-জগতে উল্লু বনার সম্ভাবনা।

২. মেট্রিক্স আন্ডার কনস্ট্রাকশন—পোস্টমডার্ন কন্ডিশন—নিউ কেইভ অব প্লেটো

লেইট ক্যাপিটালিজম ও টেকনো-সাইন্টিফিক বিপ্লব নির্মাণ করেছে পোস্টমডার্ন কন্ডিশন। পুঁজির বিশাল আকৃতি-বেষ্টনী এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির বিশাল বিকাশ-ব্যাপ্তি তৈরি করেছে ক্রয়ক্ষমতানির্ভর চিত্রভাসিত বৈশ্বিক সাম্রাজ্য এবং স্বেচ্ছায় সন্নিবিষ্ট বা প্লাগড-ইন ঔপনিবেশিক ভোক্তা জীবন। এই অবস্থার মধ্যে আমরা যারা স্রোতে ভেসে বড় হচ্ছি তাদের মধ্যে ইমেজ ও রিয়ালিটির পার্থক্য দ্রুত গুলিয়ে যাচ্ছে। অতীত হয়ে উঠছে কেবলই ইনফরমেশন—বর্তমানে এভেইল্যাবল ইনফরমেশন; ভবিষ্যৎ কেবলই ফিকশন—বর্তমানের ভোগ্য পণ্য। বাস্তব কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে একটিই, জীবন হচ্ছে বর্তমানের ধারা। বর্তমান যাপনের অর্থ হয়েছে ক্রয়ক্ষমতানুসারে কনসাম্পশন—চাহিদা নিজের চিন্তাজাত বা নিজ কর্তৃক আবিষ্কৃত নয়, মুনাফা-আগ্রাসী পুঁজির বিজ্ঞাপন দ্বারা সৃষ্ট। বিজ্ঞাপন—আরও সাধারণভাবে বললে, মিডিয়া-ইন্টারনেট কর্তৃক সরবরাহকৃত ইমেজের প্লাবন—সাজানো চাহিদা, কৃত্রিম মূল্য ও কল্পিত জীবন-স্তরের স্রষ্টা, যা ইমেজ/সিগনিফায়ার’কে বাস্তব/সিগনিফাইড থেকে অধিকতর বাস্তব, বৈধ, মূল্যবান ও শক্তিশালী হিসেবে প্রতিপন্ন ও প্রতিষ্ঠিত করে একটি হাইপাররিয়াল জগতের উন্মেষ ঘটিয়েছে। অন্যদিকে, ইনফরমেশন জাতিগত সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে ধারণাতীত গতিতে বিলুপ্ত করে ফেলছে ও ব্যক্তিরা ইচ্ছামত বিচিত্র সব মিশেল তৈরি করছে।

৩. ত্রিশক্তির বিচ্ছেদ

আগের কালে বলা হতো জগত বাস্তব, আবার কেউ কেউ বলতেন জগত মিথ্যা, মায়া বা ইলিউশন—কিন্তু উভয় ধারণাই ছিল সমগ্র-বিবেচনায়। নৈতিক ফলপ্রসূতার বিচারে কোন কোন আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তিকে অস্থায়ী ও এতদ্দর্থে মিথ্যা বলা হলেও, কেউই বলতেন না যে, জগত আংশিক মিথ্যা ও আংশিক সত্য। কিন্তু পোস্টমডার্ন জগত-চেতনার একটি বৈশিষ্ট্য এই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ একটি রিয়াল-ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা, যার কোনটুকু বাস্তব আর কোনটুকু মানুষের সাজানো তা সম্বন্ধে সে নিশ্চিত নয়। এর কারণ হচ্ছে তার জগত বস্তুর জগতের উপর মানুষের তৈরি ম্যানুপুলেটেড ছবির জগতের সুপারইমপজিশন; আর সে যেহেতু ফ্যারোও-হামান-কারুন’রা সব মতলবি বলে জেনে ফেলেছেন সেহেতু সে সবকিছুতেই সন্দিহান, আস্থাহীন।

আধুনিক চিন্তায় বিশ্বাসটা প্রবল ছিল ও আছে। এই চিন্তার সাথে ক্ষত্রিয়-বৈশ্য অক্ষশক্তি, ব্রাহ্মণ (এলিট পণ্ডিত-শিল্পীর বর্গ) ও শূদ্ররা (মেহনতি ও অ-সেলেব্রিটি আমজনতা) একাত্ম ছিল। পৃথিবীটাকে বিজ্ঞান-স্বাধীনতা-প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে এই ঐক্য বদ্ধপরিকর ছিল। উত্তরাধুনিক কালে এই ঐক্যে চির ধরেছে; ক্রিটিক্যাল তাত্ত্বিক চিন্তা (দর্শনের স্থলাভিষিক্ত), রাষ্ট্র-পুঁজি (বিজ্ঞানের স্থলাভিষিক্ত) ও সাধারণ ভাবনা (কাণ্ডজ্ঞানের স্থলাভিষিক্ত) পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। মানবজাতিকে মুক্ত করার জন্য আধুনিকরা যে মহাবয়ানের পাহাড় রচনা করেছেন তা উত্তরাধুনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে; একারণে যে, মুক্তির লক্ষ্যে আধুনিক প্রকল্প ও পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। যে বিজ্ঞানের বলে মানবজাতির মুক্তি ও বিকাশ সাধনের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, খোদ সেই বিজ্ঞানই অভূতপূর্ব রাষ্ট্র-পুঁজি নামক দৈত্য সৃষ্টি করেছে ও মুক্তির স্বপ্নকে ভেঙ্গে ফেলেছে। ফলে আধুনিকতা ছাড়তে নারাজ অক্ষশক্তি থেকে বাহ্মণরা দূরে সরে যাচ্ছেন। আবার এই বিজ্ঞানই মিডিয়া-আইটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে একীভূত করেছে ও ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের মিলিত শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে এককেন্দ্রিক সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করেছে, যেটির সাথে আমজনতা দেহ নিয়ে লটকে আছে ও মনোজগতে রিয়াল-ভার্চুয়াল ভেদরেখা নিয়ে অচেতন এবং অনেক ক্ষেত্রেই সংশয়ী হয়ে উঠছে। এই সংশয় তাদেরকে অক্ষশক্তি থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করেছে। পোস্টমডার্ন ব্রাহ্মণরা ক্রিটিক্যাল হলেও আম-জনতা “সিস্টেমে থেকেও সিস্টেমে নেই” অবস্থায় পড়েছে; সিস্টেমে নেই একারণে যে আমরা বেড়ার ওপারে লটকে আছি। আবার সিস্টেমে আছি একারণে যে, আমরা জানালা দিয়ে সাগর দেখছি না, বরং জানালারূপী স্ক্রিনে সাগরের মোশন পিকচারই আমাদের কাঙ্ক্ষিত জীবন হয়ে উঠেছে।

৪. বৈচিত্র্য

উত্তরাধুনিকতাকে তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বিভক্ত করা যায়: স্থাপত্যকলা-শিল্পকলা, জন সংস্কৃতি ও ক্রিটিক্যাল চিন্তা। এই তিনের ধরনে ফারাক রয়েছে। আবার চিন্তার ক্ষেত্রেও নানা বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে চিন্তকদের দ্বারা পোস্টমডার্ন বা পোস্টমডার্নিটিকে কোন সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না, নানা মুনি নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন। কেউ বলছেন এটি একটি সর্বগ্রাসী টেকনো-সাইন্টিফিক কন্ডিশন, কেউ বলছেন এটি হচ্ছে ইতিহাসের সমাপ্তি, কেউ বলছেন আধুনিক চিন্তার ভিতে আক্রমণ ইত্যাদি ইত্যাদি। উত্তরাধুনিকতাকে আধুনিকতার স্বাভাবিক পরিণতি যেমন বলা যায়, তেমনই আবার আধুনিকতার প্রতিক্রিয়াও বলা যায়, আবার এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধও বিদ্যমান। তবে একথাও ঠিক যে, উত্তরাধুনিক চিন্তা-ভাবনার মধ্যেও কোন ঐক্য নেই। তবে বলা যেতে পারে যে, আধুনিক দর্শনের ভিত্তি ও কাঠামোর প্রতি সংশয়, আধুনিক আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের উপর আস্থাহীনতা, আধুনিক পশ্চিমের সৃষ্ট এলিট শিল্প-চেতনার “উচ্চ” মূল্যকে অস্বীকৃতি, বহুত্ববাদ, বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি উত্তরাধুনিকতার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য।

নীচে কিছু উপমা দেয়া হলো; এগুলোর বৈপরীত্য থেকে মডার্ন ও পোস্টমডার্ন চিন্তা ও সংস্কৃতির ফারাকটি বুঝা যেতে পারে।

মডার্ন — পোস্টমডার্ন
প্রজ্ঞা — স্টাইল
আন্তরকাঠামো/উপাদান/উপলব্ধি — উপরিতল/রং/বিনোদন
মূল্যায়ন — সমালোচনা
নিয়ম — ব্যতিক্রম
ট্র্যাজেডি/সিরিয়াসনেস — কমেডি/রঙ্গ/তামাশা/ব্যঙ্গ/কটাক্ষ/ক্রীড়া/কৌতুক
পরীক্ষা/নিরীক্ষা — পরীক্ষা/অভিজ্ঞতা
চেষ্টা/সফলতা/ব্যর্থতা — চেষ্টা/আনন্দ/বোরডম
একত্ব — বহুত্ব
এককেন্দ্রিকতা/বিশ্বায়ন — বহুকেন্দ্রিকতা/স্থানীকতা
বদ্ধ — উন্মুক্ত
এক্টিভ — রিয়েক্টিভ/প্যাসিভ
সত্য একটি — সত্য বহু, অথবা, সত্য-মিথ্যা অবান্তর
সুখ/দুঃখ — ভাল লাগা/একঘেয়ে লাগা
আত্মনির্ধারণ — সুযোগ সন্ধান
রিকশাওয়ালার কষ্ট একটি অনুভূতি — রিকশাওয়ালার কষ্ট একটি অভিব্যক্তি
গণহত্যায় ক্রুদ্ধ (এংগ্রি) — গণহত্যায় অবাক (সারপ্রাইজড)
বাঙালী/ইসলামী সংস্কৃতি — ডিজুস/এফএম/জোস কালচার
সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ — স্টেডিয়ামে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা
অনাথ আশ্রমের তেরেসা ও অনাথরা — বক্সিং Colosseum-এ মুহম্মদ আলী ও দর্শকরা
পোষা ক্যানারি পাখির কষ্টে চিন্তিত — কার্টুন ডোরেমনের কষ্টে উদ্বিগ্ন

৫. পোস্টমডার্ন চিন্তার কিছু প্রধান ধারণা

মহাবয়ান (গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ): প্রতিটি সাংস্কৃতিক চেতনার—তা সেটি ধর্মভিত্তিক হোক বা বস্তুবাদী বা ইহলোকবাদী—ভিতগত ধারণা, লক্ষ্য, লক্ষ্য অর্জনের পথ ইত্যাদির যথার্থতা যুক্তিবিচারে পরমভাবে প্রামাণ্য নয়। এগুলোকে একজন যেমন গ্রহণ করতে পারেন, অন্যজন তেমনই প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন। প্রতিটি সংস্কৃতিই এই সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে চায় নিজের পক্ষে প্রবল বয়ান তৈরি করার মাধ্যমে এবং তা হস্তান্তর করতে থাকে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট। এই বয়ানকে সামাজিকীকরণের মাধ্যমে এমন শক্তিমান করে তোলা হয় যাকে সন্দেহ করা শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সমাজ বিবর্তিত হতে বা চলতে থাকে সেই বয়ানের উপর ভিত্তি করে। এক সমাজের বয়ান অন্য সমাজ কর্তৃক গৃহীত হলে তার সংস্কৃতি অন্য সমাজটির কাছে রপ্তানিও করা যায়। যেমন, আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তার মহাবয়ান সঞ্চালনের মাধ্যমে। ধর্ম, বিজ্ঞানবাদ, প্রগতিবাদ, আধুনিক আলোকময়তা, পুঁজিবাদ, মার্কসবাদ ইত্যাদি এরূপ বয়ানের উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন পোস্টমডার্ন চিন্তকরা। একে আবার তারা মাস্টার ন্যারেটিভও বলে থাকেন। উত্তরাধুনিক চিন্তকদের মতে পরম সত্যরূপে গৃহীত এককেন্দ্রিক একক বয়ান মানুষের ভিন্ন সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে। একারণে তারা বহুকেন্দ্রিকতা, প্লুরালিজম, স্থানীকতা ইত্যাদি ধারণার সমর্থন করে থাকেন।

অবিনির্মাণ (ডিকনস্ট্রাকশন): হাইডেগার পশ্চিমা অধিবিদ্যার ঐতিহ্যে একটি সমাপ্তি টানার কথা বলেছিলেন। একাজটিকে তিনি ‘আনবিল্ডিং’ বা ‘ডেস্ট্রাকশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আর অবিনির্মাণ হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত বয়ানের মধ্যকার স্ববিরোধ, নীরবতা, চিৎকার, সঙ্গতিহীন উল্লম্ফন, ফাঁকগুলোকে আবিষ্কার করা। পশ্চিমা আধুনিক মহাবয়ানের প্রধান ধারণাগুলো হচ্ছে সত্য, কাঠামো, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রগতি, মুক্তি ইত্যাদি। কিন্তু এই মহাবয়ান মানবজাতির জন্য প্রগতি বা মুক্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছে বলে উত্তরাধুনিকতাবাদী চিন্তকরা মনে করেন। মার্কিন রক্ষণশীল একাডেমিকরা অবিনির্মাণকে বিভ্রান্তিকর, চটুল কথামালার বিদেশী, ইউরোপীয় ভাইরাস হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, কারও কারও মতে, আমেরিকাতেই এটি ইউরোপের চেয়ে বেশী জনপ্রিয়।

হাইপাররিয়ালিটি: ভাষা হচ্ছে মানুষের প্রথম বিম্বায়ন যন্ত্র। ভাষার সাহায্যে আমরা বাস্তব সম্বন্ধে যেমন বিবরণ দিতে পারি, তেমনই আবার এমন বিবরণ রচনা করতে পারি যার সাথে বাস্তবের কোন সম্পর্ক নেই—অর্থাৎ ফ্যান্টাসি বিবরণ। বিবরণ হচ্ছে মূলত সিগনিফায়ার, সিম্বল। বাস্তবতা বর্জিত বা করেসপন্ডিং সিগনিফাইড বিবর্জিত সিগনিফায়ারকে বলা যায় ফ্যান্টাসি। চিত্রও আরেকটি বিম্বায়ন যন্ত্র। পোস্টমডার্ন কন্ডিশনে বিম্বায়নক্রিয়ায় চিত্র ভাষাকে ছাড়িয়ে গেছে। দুভাবে সিগনিফায়ার বড় হয়ে উঠতে পারে: ক. করেসপন্ডিং সিগনিফাইডের চেয়ে সিগনিফায়ারকে অধিকতর বাস্তব, বৈধ ও শক্তিমান করে তোলার মাধ্যমে, ও খ. ফ্যান্টাসি সিগনিফায়ার তৈরির মাধ্যমে। টেকনো-সাইন্টিফিক পোস্টমডার্ন কন্ডিশনটি গড়ে উঠেছে এভাবে সৃষ্ট বিম্বজগতের মাধ্যমে, যেখানে বাস্তব ও বিম্বের মধ্যে পার্থক্য লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ও বিম্বজগতটি প্রধান হয়ে উঠছে। বিম্বসৃষ্ট এই হয়ে উঠা বাস্তবতা ও বাস্তবতার একীভূত বাস্তবতাকে বলা হচ্ছে হাইপাররিয়ালিটি। ভাষাগত মহাবয়ান কর্তৃকও হাইপাররিয়ালিটি তৈরি করা সম্ভব। পোস্টমডার্নদের মতে আদতে হয়েছেও তাই; অতীতের ধর্ম, পশ্চিমা এনলাইটেনমেন্ট, ইতিহাস—এরা সকলেই হাইপাররিয়ালিটি তৈরি করেছে।

৬. আবার ফরাসীরা

দেকার্তে বলেছিলেন, আমি চিন্তা করি কাজেই আমি আছি। উত্তরাধুনিকদেরকে হয়তো একদিন বলতে হবে, আমি বিম্ব দেখি কাজেই আমি আছি। সে যাই হোক, ফরাসী এই দার্শনিককে বলা হয় আধুনিক দর্শনের জনক। তাঁর উত্তরসূরি ম্যালব্রাঞ্চ’ও ছিলেন ফরাসী। উত্তরাধুনিক ক্রিটিক্যাল চিন্তার আবাদভূমিও ফ্রান্স। বিশ শতকের শুরুতে সূত্রপাত হওয়া দাদা আন্দোলনকে পোস্টমডার্ন রেনেসাঁ বলা যায়। সত্তর দশকে এসে পোস্টমডার্নিজম একটি কাঠামো(?!) লাভ করে ফরাসি চিন্তক “অবিনির্মাণ”-এর বিনির্মাতা দেরিদা, “সিমুলেক্রা ও সিমুলেশনস”-এর রূপ রচয়িতা বদ্রিলার ও “পোস্টমডার্ন কন্ডিশন”-এর ব্যাখ্যাতা লিওতার্দের হাতে। এঁদেরকে দেকার্তে-ম্যালব্রাঞ্চের সাথে হয়তো তুলনা করা যায়। অথবা হয়তো বলা যেতে পারে যে, আমরা এখন পোস্টমডার্ন এনলাইটেনমেন্ট কাল বা পোস্টমডার্ন মহাবয়ান(?!) বিনির্মাণ(?!) কাল অতিক্রম করছি। দেখা যাক ভবিষ্যতে জার্মানরা কী করে—জার্মান বুদ্ধি বলে কথা! ইটালির রেনেসাঁর উন্মেষে চিন্তার ক্ষেত্রে ইবন রুশদের মতো দার্শনিকদের প্রভাব ছিল, আর কন্ডিশনটি এসেছিল আন্দালুসিয়া-দামেস্ক-বাগদাদে উৎপাদিত বিলাস পণ্যের আমদানির থেকে। পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রে চিন্তাগত প্রভাবটি এসেছে নীটশে ও হাইডেগার থেকে আর কন্ডিশনটি এসেছে মিডিয়া-আইটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার বাহিত বিশ্বায়িত পশ্চিমা ইমেজরূপী ভোগ্য পণ্য ও তথ্যের সুলভতা থেকে।

৭. রেভোলুশন, নাকি কন্ট্রোল

শতবছর আগে মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি আর বিদ্যুতের আলো দেখে যারা আপ্লুত হয়ে গদগদভাবে ভাবছিলেন যে, তারা একটি অভূতপূর্ব জগতে বাস করছেন, তারা আমাদের এই কালে উপস্থিত থাকলে লজ্জা পেয়ে বলতেন, কী কুয়ার ব্যাঙের মতোই না উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলাম সেদিন! অনেকেই এটিকে বলছেন একটি বিস্ফোরণ, একটি রেভোলুশন—টেকনো-সাইন্টিফিক রেভোলুশন, অতিমানব আবির্ভাবের মঞ্চ। হয়তো তাই। কারণ মানুষ হয়তো এমন নতুন দশা ও সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে যেখান থেকে নীটশের অতিমানবসমাজের আবির্ভাব হবে, যারা পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে বাস করবে। পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে বসবাস আবার চিন্তাহীন, আত্মসম্বিতহীন, লক্ষ্যহীন, অর্থহীন, সম্মোহিত ও বিচ্ছিন্নদের পক্ষেও সম্ভব; যদিও এরূপ মানবকে নীটশে তার অতিমানব হিসেবে মানবেন কি-না তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে পোস্টমডার্ন গণসমাজ এই ধরণের একটি সমাজই হয়ে উঠছে।

বিজ্ঞান-পুঁজি-রাষ্ট্র—এই মাস্টার ত্রয়ী সার্বজনীন করে তুলছে পোস্টমডার্নিটিকে, যা আসর করেছে দর্শন-কলা-গণ—এই ত্রয়ীর উপর। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে পোস্টমডার্নিটি মডার্নিজমের সৃষ্টি এবং পোস্টমডার্নিটি তার মাস্টারমাইন্ড মডার্নিজমের তাত্ত্বিক ভিতকে অস্বীকার করে বাস করতে চায় মাস্টারসৃষ্ট জগতটিতেই। ইস্রাইলের সন্তানেরা ফ্যারোও’কে অস্বীকার করে এক্সোডাস করেছিলেন সভ্যতার চিহ্নবিহীন প্রতীকবিহীন ছবিবিহীন বিরান মরুভূমিতে। কিন্তু পোস্টমডার্নরা স্রষ্টাকে অস্বীকার করেও তারই সৃষ্টি টেকনো-সাইন্টিফিক কন্ডিশনকেই বাঞ্ছিত কাঙ্ক্ষিত জীবনাবস্থা বলে গ্রহণ করেছেন এবং একে আশ্রয় করে বিচিত্র ভবিষ্যৎ খুঁজছেন। সমাজতন্ত্রীরা পূঁজিকে প্রতিহত করতে নয়া-আধুনিক সংগ্রামে নিয়োজিত হয়েছিলেন। কিন্তু পোস্টমডার্নরা না মানেন ফ্যারোও’কে, না আছে তাদের কোন মার্কস—আছে কেবল সামেরি আর সামেরি।

পোস্টমডার্ন দর্শন বা ক্রিটিক্যাল চিন্তাকে স্লেইভ দর্শন বলা চলে। এই চিন্তা পরিষ্কার করে তুলছে সমকালীন স্লেইভ কন্ডিশনকে এবং এই কন্ডিশনকেই বেছে নিয়ে নতুন ছবিময় জগতকে উন্মুক্ত নিয়ম-ছাড়া কাঠামো-ছাড়া বৈচিত্র্যমণ্ডিত করতে চাচ্ছে। মডার্ন চিন্তকেরা ভাবেন যে, তারা মুক্ত হচ্ছেন, স্বাধীন হচ্ছেন, উন্নতির পথে প্রগতির পথে দৌড়চ্ছেন। পোস্টমডার্নরা বুঝতে চেষ্টা করছেন কিভাবে মানুষকে নতুন ধরণের দাসে পরিণত করা হচ্ছে এবং মুক্তি খুঁজছেন মডার্ন চিন্তার স্ট্রাকচার ও ন্যারেটিভকে ডিকনস্ট্রাক্ট করার মাধ্যমে; হাইপাররিয়াল জগতকে উন্মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। এটিকে বলা যায় “রিয়ালি স্লেইভ বাট হাইপাররিয়ালি ফ্রি কন্ডিশন” এবং “হাইপাররিয়ালি ফ্রি, বিয়ন্ড গুড এন্ড ইভিল, হিস্ট্রিলেস, জিওগ্রাফিলেস কন্ডিশন”। অতিবাস্তব জগত স্বনির্ভর নয়, বাস্তব জগতের উপর নির্মিত। পোস্টমডার্ন ডিকনস্ট্রাকশনের মূল লক্ষ্য অতিবাস্তব জাগতিক বিপ্লব এবং এই উদ্দেশ্যে বাস্তব জগতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। এটি কিন্তু পুঁজির জন্য বড়ই কাঙ্ক্ষিত, নিরাপদ ও বান্ধব অবস্থা হতে পারে। একারণে ভবিষ্যতে পোস্টমডার্নিজম পুঁজির রেভোলুশনারি কন্ট্রোল সিস্টেম হয়ে উঠলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

৮. ক্রিশ্চিয়ানিটি থেকে মডার্নিটি, মডার্নিটি থেকে পোস্টমডার্নিটি

মডার্নিটি ও পোস্টমডার্নিটি—দুটোই আমাদের কাছে এসেছে পশ্চিম থেকে। মধ্যযুগে প্রতিষ্ঠিত যাজকতন্ত্রের বিরুদ্ধে বহু সংগ্রামের পর আধুনিকতাবাদের প্রতিষ্ঠা চূড়ান্ত হয়। আধুনিকতাবাদ মানবজাতিকে যুক্তিবাদিতা, বিজ্ঞান, গণতন্ত্র, জীবনমানে উন্নয়ন ইত্যাদি দিতে পেরেছে। কিন্তু যাজকীয় বয়ান ও সংগঠনের মতোই আধুনিকতাবাদও আরেকটি এককেন্দ্রিক বয়ান ও সংগঠনের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছে ও তাকে বিশ্বব্যাপী রপ্তানি করেছে। কিন্তু উত্তরাধুনিকেরা এই বয়ান ও সংগঠনের বৈধতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছেন। একদিন যে কুঠার দিয়ে ধর্মের ভিতে আক্রমণ করা হয়েছিল, সেই একই কুঠার দিয়ে উত্তরাধুনিকতাবাদ আধুনিকের ভিতে আক্রমণ করেছে। একদিন যে কলম দিয়ে বস্তুকে চরম সত্য করে তোলা হয়েছিল, সেই একই কলম দিয়ে বিম্ব বা ছবিকে সত্য করে তোলা হচ্ছে। সেকালে আধুনিকদেরকে তাদের বিরোধীদের নিকট থেকে যেসকল অভিযোগ শুনতে হয়েছে, আজ আধুনিকদেরকে উত্তরাধুনিকদের বিরুদ্ধে সেসব অভিযোগই উত্থাপন করতে হচ্ছে:—মহান সুগভীর প্রজ্ঞা ও অনুভূতি উৎসাদিত হচ্ছে, এর স্থানে জেঁকে বসছে স্টাইল ও সারফেস, মানুষ ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও অগভীর হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিষয়টি বেশ কৌতুকের। আপাতদৃষ্টিতে আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা বিবাদে লিপ্ত বলে দেখা গেলেও সেদিন সম্ভবত খুব দূরে নয় যখন স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, উত্তরাধুনিকতা আধুনিকতারই আরেক পর্ব—লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে; বৈপ্লবিক ফারাকটি কেবল অবস্থা বা কন্ডিশনের মাঝে লুক্কায়িত সম্ভাবনার মধ্যে। গেল সময়ে যে উদ্দেশ্যে এককেন্দ্রিকতার একটি বয়ানের দরকার ছিল, সেই একই উদ্দেশ্যে নতুন কন্ডিশনে বহুকেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠার ও বয়ান ভাঙ্গার বয়ানের দরকার হয়েছে। এখন আধুনিকদেরকে প্রমাণ করতে হবে যে, সূক্ষ্মতা ও স্থূলতার মধ্যে সূক্ষ্মতার মূল্য বেশী—কিন্তু এই প্রমাণ সম্ভব কিনা, বা সম্ভব হলে তা নতুন প্রজন্মের মানুষ মানবে কিনা তা প্রশ্ন-সাপেক্ষ। তাছাড়া, পুঁজির সমর্থনে যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তা পূঁজির ত্যজনে টিকবে কিভাবে? পুঁজির আঘাতে একদিন যাজকদের বর্গ উৎসাদিত হয়েছিল, তার স্থানে বসেছিল ডীপ-ডাইভার এলিটদের বর্গ; সেই পূঁজির আঘাত এখন এলিটরাও সামাল দিতে পারছেন না, তাদের স্থান কেড়ে নিচ্ছে সারফেস-রাইডার সেলেব্রিটিদের বর্গ।

নীচে এনশিয়েন্ট, মডার্ন ও পোস্টমডার্ন ভাবনার বৈপরীত্যটি কিছু রূপক দিয়ে প্রকাশ করা গেল।

এনশিয়েন্ট — মডার্ন — পোস্টমডার্ন
ঈশ্বর — বস্তু — ছবি
ঈশ্বর — মানুষ — সাইবোর্গ
যাজক — এলিট — সেলেব্রিটি
নিমপাতা — সাবান — সাবানের মোড়ক
ফলের রস — ফলের স্বাদযুক্ত সিনথেসাইজড জুস — সেজান জুস
পা — চাকা — হোন্ডা
প্রাকৃতিক পণ্য — ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রডাক্ট — ব্র্যান্ড ও মডেল

n
আগের লেখা – মমতা, ন্যায় ও কর্ম

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী