ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আমার কন্যা যখন একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে তখন আমি ‘এএএ…..ইয়েস’ বলে হাততালি দেই। মুখখানি তার আভায় মণ্ডিত হয়, সে উৎসাহিত বোধ করে এবং বলে, বাবা! পরের অংকটাও করি? কোন অনুষ্ঠানে আমার বস যখন বক্তৃতা শেষ করেন তখন আমি হাততালি দেই—যদিও আমার বস আমার কন্যার মতো শিশুটি নন! রবার্ট ফিস্ক বা নোয়াম চমস্কি কষে মার্কিন সরকারের সমালোচনা করে অভিনব কোন বচন উচ্চারণ করলে বিজ্ঞ শ্রোতারাও উদ্বেলিত হয়ে হাততালি দেন, শিস দেন। জাকির নায়েক মস্ত কোন কথা বলে বসলে তৌহিদি শ্রোতাদের পক্ষেও খুশি ধরে রাখা দায় হয়, তারাও হাততালি দেন। আপনারা যারা গ্ল্যাডিয়েটর ছবিটি দেখেছেন তারা জানেন, নায়ক যখন কটাক্ষের বিরক্তির চূড়ান্ত করে মাটিতে থুথু ছিটিয়ে দেয় তখনও বিশাল জনতা বিপুল উল্লাসে হাততালিতে কলোসিয়াম কাঁপিয়ে তোলে। নায়কের অস্ত্রের আঘাতে মানুষের শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত আকাশের দিকে উৎক্ষিপ্ত হয়। জনতা আনন্দে ফেটে পড়ে। তোমরা কি বিনোদিত হয়েছ? আনন্দের মাত্রা শতগুণে বাড়ে। এর জন্যই কি তোমরা এখানে এসেছ? উন্মত্ত আনন্দ আকাশ ছুঁই-ছুঁই করে। আর নায়ক যখন থুথু ফেলে হাঁটা দেয় তখন দর্শকের আনন্দে আকাশ যেন চৌচির।

হাততালি দেই কেন? অন্যেরা কেন হাততালি দেন তা আমার পক্ষে জানা মুশকিল। অনুমান করা গেলেও বলা আরও মুশকিল। কিন্তু জাকির নায়েকের হাততালি দেয়া ভক্তদের একজন হিসেবে নিজের মনের চোরটাকে ধরে ফেলা আমার পক্ষে সহজতর। আমি কিছু কথা শুনতে চাই যা আমাকে আনন্দিত করতে পারে। এই আনন্দের উৎস মনে লুকিয়ে থাকা জয়ের ইচ্ছা হতে পারে। হতে পারে কাউকে ধরাশায়ী করার ইচ্ছা। হতে পারে ‘আমার ধর্ম সেরা ধর্ম’ নামক বোধের পরিপূরণজাত অহংকারের ইচ্ছা। এই আনন্দ আর এই জয় সবই ঘটে কথার রাজ্যে। কথার লড়াই সিম্বলে সিম্বলে লড়াই, সিম্বলের দুনিয়ায় সিম্বলী মোরগের লড়াই। এই দুনিয়া হয়ে উঠেছে মান-অপমানের দুনিয়া, হার-জিতের দুনিয়া, আনন্দ-বেদনার দুনিয়া, স্বস্তি-আক্ষেপের দুনিয়া, অপরিমেয় সুখ আর ভয়ংকর দুঃখের দুনিয়া। আমার সমস্ত সাইকোলজি, সাইকোলজির সমস্ত ঝড়-ঝাপটা, সমস্ত আন্দোলন ঘোরতর রূপ নিয়ে সেই জগতে বিরাজ করে। আমি তাই জাকির নায়েকের বক্তৃতায় জুতসই মুহূর্তে হাততালি না দিয়ে থাকতে পারি না। আমার বাসনা, আমার জীবন উঠে এসেছে সিম্বলের দুনিয়ায় মনের সমস্ত শক্তি নিয়ে।

রিকশাচালকের গালে চড়ের বাস্তব দৃশ্য আমাকে তেমন বিচলিত করে না, আমি শক্তভাবে হেরে গেছি বলে কোন আক্ষেপ তৈরি হয় না। একই কথা বলা যায় গ্রামের নগরের অনেক কষ্টের বেলায়ই। কিন্তু দেখুন আমার মনের দশা! জাকিরের মুখ থেকে জব্বর একটি কথা বেরুলে আমার মনে তৈরি হয় ভীমাকার প্রতিক্রিয়া। আমার উচ্ছ্বাস হয়ে উঠে বাঁধভাঙা। মনে হয়, আহা, আমি কতই না নসীবওয়ালা। ক্রিকেট মাঠে ভারত হেরে গেলে মনে হয় যেন দুনিয়া জয় করে ফেলেছি। আলহামদুলিল্লাহ জপে আমার মুখ ভাসে ফেনায়—এবার মজাসে দেখো ওদের মনের জ্বালা। একই কারণেই কি আমি সিনেমা হলে বসে হাততালি ও শিস দেই? নায়ক যখন ভিলেনকে পেটাতে পেটাতে কুয়ায় নিয়ে ফেলে আমার আনন্দ তখন গাছের মগডালে। হাততালি ও শিসের সন্ধান পাওয়া যায় অনেক একশন মুভিতে, ‘ও গড’ এর পরে। নায়ক ফেঁসে যাচ্ছে, প্ল্যান ভেস্তে যাচ্ছে, পৃথিবীটাকে আর বুঝি বাঁচানো গেল না—সিনেমার পাত্রপাত্রীরা অনেকেই করজোড়ে নিবিষ্টমনে ‘ও গড’ করছে। এমন সময় আচানক নায়ক পৃথিবীটাকে দিল বাঁচিয়ে—এবার হাততালি আর শিস, কোন কালে কেউ যেন ‘ও গড’ করেইনি।

তবে এই আকাশী বায়বীয় স্বাপ্নিক আনন্দ আর দুঃখের ফজিলত আছে; পণ্ডিতেরা এই ফজিলতের নাম দিয়েছেন ক্যাথারসিস। ঘোলে দুধের তৃষ্ণা মেটে। গ্লাস ভাঙলে রাগ নেমে আসে। তবে হাততালি নিতান্তই ছোট ঘটনা, হাততালি আমাদের ধর্মে হারামও নয়। কিন্তু আমারা যারা জাকির-কথা-প্রেমে দেওয়ানা, তারা কিন্তু বন্য কল্পনায়ও এই দৃশ্য অবধারণ করতে পারি না যেখানে নবী বক্তৃতা দিচ্ছেন আর তার সঙ্গীরা দিচ্ছেন হাততালি। তারা হাততালি দিতেন না, যদিও তাদের অজানা ছিল না যে, দুনিয়ায় হাততালির চল আছে। হয়তো তারা আমার মতো সরস ছিলেন না। অথবা হয়তো তারা ভাবতেন মিথ্যা দিয়ে মন ভরাট করার কোন মানেই হয় না। অথবা হয়তো কথার বোঝা সামাল দিতে গিয়ে হাততালি দেয়ার ফুসরতই পেতেন না।
n
আগের লেখা – লেখক ও ব্লগার

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী