ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

জীবনে মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধীয় ধারণার প্রভাব:

মানবপ্রকৃতির সাথে জড়িয়ে আছে দুটি প্রধান প্রশ্ন। ১. কী আমাদেরকে বস্তু ও অন্য প্রজাতিগুলো থেকে আলাদা করেছে? ২. মানবসমাজের একজন সদস্য হওয়ার অর্থ কী? মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে আমাদের নানা ধারণার মধ্যে বৈচিত্র্য ও অনৈক্য থাকলেও একথা ঠিক যে, মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে ব্যক্তির ধারণা তার জীবনকে—সমাজ ও জগতের সাথে তার সম্পর্ককে—প্রভাবিত করে। আমি কী?—এই প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশেই নির্ধারণ করে আমি কিভাবে নিজেকে দেখি, কিভাবে অন্যদেরকে দেখি ও কিভাবে জীবন যাপন করি বা নিজেকে কোন আদলে গড়ে তোলাকে কর্তব্য জ্ঞান করি তা। মানবপ্রকৃতি বিষয়ে একটি সমাজের নেতৃবৃন্দের বিশ্বাস সেই সমাজের বিন্যাস ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। দর্শনের মূল প্রশ্ন হচ্ছে সত্তার প্রশ্ন—আর সত্তার প্রশ্নে প্রথম বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে মানবপ্রকৃতির প্রশ্ন, কারণ তার জ্ঞানের আপেক্ষিকতা তার প্রকৃতিসাপেক্ষ। মানুষের অভিজ্ঞতা, চিন্তা, যুক্তিবোধ, ইচ্ছা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, নৈতিকতা, নান্দনিকতা, ভাষা, সমাজ, রাষ্ট্র—এই সবই মানবপ্রকৃতির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, এরা দাঁড়িয়ে আছে মানবপ্রকৃতির উপর।

প্লেটো ও এরিস্টটল

মানবজাতির চিন্তার ইতিহাসে মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে একটি শক্তিশালী রেশনালিস্টিক ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে প্লেটো ও এরিস্টটল থেকে। প্লেটোর মতে মানুষ হচ্ছে যৌক্তিক চিন্তাশীলতা, দৈহিক ক্ষুধা ও নিজেকে উচ্চে আসীন করার প্রবণতা সম্বলিত একটি সত্তা। এই তিনকে ইংরেজিতে সাধারণত ‘রিজন’, ‘এপেটাইট’ ও ‘এগ্রেশন’ রূপে অনুবাদ করা হয়ে থাকে। এপেটাইট বলতে প্লেটো বুঝিয়েছেন দেহসংশ্লিষ্ট ক্ষুধা-তৃষ্ণা, যৌনবাসনা ইত্যাদিকে। অন্যদিকে এগ্রেসিভনেস বলতে বুঝাতে চেয়েছেন নিজেকে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্থাপন করার, অন্যের উপর জয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার, অন্যদেরকে শাসন করার ইচ্ছা ইত্যাদিকে। এটিকে আমরা প্রাচীন ভারতীয় চিন্তার সাথে মেলাতে পারি—অর্থাৎ এপেটাইটকে তামসিকতা, এগ্রেশনকে রাজসিকতা ও রিজনকে সাত্ত্বিকতার সাথে তুলনা করা যায়।

যেহেতু রিজন আমাদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে সেহেতু এপেটাইট ও এগ্রেশনকে রিজনের অধীনে রাখাই মানুষের কর্তব্য। ফলে চিন্তাক্ষমতা বা যুক্তিশীলতাই হয়ে দাঁড়ায় মানুষের সর্বোচ্চ গুণ যা মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ও তাকে বিশিষ্টতা দেয়। প্লেটো আরও বলেন যে, বুদ্ধি যদি অন্য দুটির কথা মতো চলে তবে বুদ্ধি প্রভুর স্থান হারিয়ে নিম্নতন প্রবণতার দাসে পরিণত হয় এবং এভাবে চলতে থাকলে বুদ্ধি একসময় তার সমস্ত সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। তবে গাযযালী বিষয়টিকে উল্টোভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, জন্মের পর শিশুকাল কাটে এপেটাইটের বশে, কৈশোরে-যৌবনে মানুষে মধ্যে এগ্রেশনের প্রাবল্য থাকে। এবং যৌবনে রিজনের বিকাশের সাথে সাথে তা অন্যদুটির সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় ও জয়ী হয়। তবে অনেকের বেলায় রিজনের বিকাশ অপর্যাপ্ত থেকে যায় ও শেষতক জয়ী হতে ব্যর্থ হয়। এই জয়-পরাজয়ের জন্য তিনি ইচ্ছার দুর্বলতার কথা বলেছেন। গাযযালির চিন্তায় ইচ্ছাই সর্বোচ্চ নির্ধারক হিসেবে এসেছে—ঈশ্বর ও মানুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই।

প্লেটোর ছাত্র এরিস্টটলও তার শিক্ষকের ন্যায় বুদ্ধিকেই সর্বোচ্চ স্তরে রেখেছেন। তবে এর সাথ তিনি ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘পারপাস’কে টেনে এনেছেন ও এর উপর বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার কথা হচ্ছে, যেহেতু চোখ, হাত, পা ইত্যাদি অংশের উদ্দেশ্য রয়েছে, সেহেতু সমগ্র মানবসত্তারও উদ্দেশ্য রয়েছে। আর যেহেতু রিজন মানুষের সর্বোচ্চ গুণ এবং অন্যান্যদের থেকে পার্থক্য আনয়নকারী গুণ, সেহেতু রিজন অনুসরণ করাই মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য। এরিস্টটল বুদ্ধির শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে আরও অনেক দূর নিয়ে গিয়েছেন। তার এই ঘোষণাও রয়েছে যে, যেহেতু অসভ্য-বর্বররা কম চিন্তাশক্তির অধিকারী সেহেতু গ্রীকরা তাদেরকে শাসন করার ও দাসে পরিণত করার অধিকারসম্পন্ন। এধরণের কথা তিনি নারীদের সম্বন্ধেও বলেছেন। যদিও প্লেটোর ধারণায় নারী ও পুরুষ মোটামোটি সমানই ছিল, তবুও তার ছাত্রের ধারণা ছিল একেবারেই বিপরীত। এরিস্টটলের মতে, যেহেতু নারীর রেশনালিটি অপূর্ণ, যতটুকুওবা চিন্তা করতে পারে তাও প্রয়োগের সামর্থ্যবিযুক্ত; যেহেতু পুরুষরা রিজনের পূর্ণ অধিকারী; যেহেতু নিম্নতর বৃত্তির মঙ্গল উচ্চতর বৃত্তির অধীনতায়—সেহেতু নারীদের কর্তব্য পুরুষদের অধীনে থাকা। রেনেসাঁস ও আলোকময়তাও বুদ্ধির এই শ্রেষ্ঠত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখে। চিন্তাশক্তি ও শিল্পসামর্থ্য জাত কর্ম শ্রেষ্ঠতর কর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলশ্রুতিতে কায়িক শ্রম ইতর শ্রম হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে উঠে এবং এভাবে নয়া অভিজাততন্ত্র তৈরি হয়।

জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান-মুসলিম চিন্তায় মানবপ্রকৃতি

মানবপ্রকৃতি বিষয়ে ক্রিশ্চিয়ান চিন্তা একটি প্রভাবশালী চিন্তা হিসেবে এককালে সক্রিয় ছিল এবং এখনও এর প্রভাব মানবতাবাদী চিন্তায় পরোক্ষভাবে হলেও বিদ্যমান। এমতের বেশকিছু উপাদান এসেছে তারও আগের ইহুদি চিন্তা থেকে। অন্যদিকে মুসলিমরাও এই চিন্তার ধারাকে বজায় রেখেছে। ঐতিহ্যবাহী জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান চিন্তায় মানুষ হচ্ছে ঈশ্বরের ইমেজ বা বিম্ব; আর সেকারণে সে মমতা, ইচ্ছা ও চিন্তার অধিকারী। মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য তাই ঈশ্বরকে ভালবাসা ও মানুষের প্রতি মমতাপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণ হওয়ার মাধ্যমে ঈশ্বরের সেবক হওয়া। জ্ঞান ও ইচ্ছাকে খুবই উচ্চ স্থান দেয়া হলেও ক্রিশ্চিয়ান চিন্তায় প্রেম বা ভালবাসা বা মমতাকে মানুষের প্রধানতম গুণ হিসেবে দেখা হয়েছে, যার অভাবে জ্ঞান ও ইচ্ছাও অর্থহীন হয়ে উঠে। গ্রীকরা মনে করতো যারা বুদ্ধির চর্চা করে তারাই জীবনের উদ্দেশ্যকে দেখতে পায়। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ান চিন্তায় ঈশ্বরকে ভালবাসা ও তার সেবা করার সামর্থ্য, অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্যকে সফল করার সামর্থ্য, প্রত্যেক মানুষের রয়েছে—তা তাদের বৌদ্ধিক উৎকর্ষতা যে মাত্রারই হোক না কেন। ইহুদি চিন্তায় ঈশ্বরকে ভালবাসা ও তার সেবা করার প্রকাশ ঘটে ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কারও উপাসনা না করা, আইনের অনুগত থাকা ও মানুষের সাথে সদাচরণের মাধ্যমে। মুসলিম চিন্তায় ইহুদি ও খ্রিস্টীয় ভাবনার একটি সমন্বয় দেখা যায় ও মানুষকে দেখা হয় ঈশ্বরের পার্থিব প্রতিনিধি হিসেবে। কেবল ঈশ্বরের উপাসনা করা, তার প্রতি ভালবাসায় সদিচ্ছা, দানশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সুন্দর আচরণকে অবলম্বন করে জীবন পরিচালনাকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে ধারণা করা হয়।

মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান-মুসলিম চিন্তার সাথে প্লেটো-এরিস্টটলের ঐতিহ্যবাহী রেশনালিস্টিক চিন্তার ব্যাপক মিল রয়েছে। স্বার্থপরতাকে উভয় চিন্তায়ই মানুষের ভিতগত বা সারগত প্রকৃতি হিসেবে দেখা হয়নি, বরং তাকে দেখা হয়েছে তা থেকে ঊর্ধ্বে উঠার সামর্থ্য সম্পন্ন সত্তা হিসেবে, এই ঊর্ধ্বে উঠার সাধনাই জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় ও চৈনিক চিন্তায়ও এরূপ ধারণার প্রাধান্য রয়েছে। নানাদিক থেকেই মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে ঐতিহ্যবাহী গ্রীক বুদ্ধিভিত্তিক ও জুডিয়-ক্রিশ্চিয়ান-মুসলিম ঈশ্বরভিত্তিক ধারণার মধ্যে জোরালো আবেদন রয়েছে। আমরা সাধারণত নিজেদের অভিজ্ঞতাতেই এই ধারণার সাক্ষাৎ পাই যে, চিন্তা ও বাসনার মধ্যে একটি বিরোধ রয়েছে; চিন্তা আমাদেরকে উপরের দিকে নেয় ও বাসনা টেনে নীচে নামাতে চায়। একটি চিন্তাশীল, বিবেকবান ও মমতাবান সত্তা হিসেবে মানুষের পরিচয় আধুনিক পশ্চিমা মানবতাবাদী চিন্তায়ও বিদ্যমান। অনেকেই এখনও এই ভাবনাকেই লালন করে চলেন। আমরা তাদের কাছ থেকে পাই যে, মানুষ রেশনাল ও তার জীবনের একটি উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি আশাবাদী ও মানুষের জন্য মহিমামণ্ডিত বলেই গ্রহণযোগ্য হতে হবে কেন? ঈশ্বরের অস্তিত্ব তো নিছক একটি বিশ্বাসমাত্র। যাকে ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায় না, বৈজ্ঞানিক পন্থায় পাওয়া যায় না, তার উপর ভিত্তি করে এই ধারণা টিকিয়ে রাখার আবশ্যকতা কোথায়? বুদ্ধির বন্দনাকারী গ্রীকদের ধারণা কি অবাস্তব ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত হতে পারে না? ভাল ও মন্দ বলে আদতে কিছু আছে কি? মানুষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কতটুকু স্বাধীন? বা আদৌ তার কোন স্বাধীনতা আছে কি? আমাদের মূল্যমান ও নৈতিকতা সমাজের সৃষ্ট ও লালিত কিছু ধারণামাত্র—এমন কথা বলা সম্ভব নয় কি? বুদ্ধিবাদী ও ঈশ্বরবাদী ধারণা যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, এই ধারণাকে অনেক দার্শনিকই চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং সম্ভবত বিজ্ঞানের কাছ থেকেই তা এসেছে সবচে বেশী।

ডারউইন ও ফ্রয়েড

আধুনিক জীববিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে মানবপ্রকৃতি নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে। ডারউইন ও ফ্রয়েডকে অত্যন্ত প্রভাবশালী চিন্তক বলা যায়। ডারউইনের বিবর্তনবাদী তত্ত্ব ও ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ প্রকৃত প্রস্তাবে যা-ই বলুক না কেন, তাদের কথার যে অর্থ করা হয়েছে তা মানবজাতির সংস্কৃতিতে বিরাট পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের কতটুকু তাদের চিন্তার ফল আর কতটুকু লার্জ স্কেল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রডাক্ট ভিত্তিক বিশাল পুঁজির ইচ্ছা ও পরিকল্পনা—তা চিন্তার বিষয়। আমাদের কালের সংস্কৃতি মূলত পুঁজির সৃষ্টি। পুঁজিই ডারউইন ও ফ্রয়েডকে বেছে নিয়েছে নিজের বিকাশের উদ্দেশ্যে, নিজের জন্য তাত্ত্বিক ভিত তৈরির জন্য। মানুষের উচ্চ মর্যাদাকে ও জগতে মানুষের স্বাতন্ত্র্যকে বিধ্বস্ত করা না গেলে কনসাম্পশন বাড়ানো যায় না। ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশন ও সারভাইভাল অব দি ফিটেস্ট তত্ত্বকে সামাজিকীকরণের মাধ্যমে বুঝানো সম্ভব হলো যে, মানুষ একটি প্রাণী মাত্র, রেশনালিটির কোন ঐশ্বরিক মহিমা নেই, মানুষের টিকে থাকা মানুষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও সংগ্রামে জয়ী হওয়ার মধ্যেই নিহিত। মানুষ সারগতভাবেই স্বার্থ কেন্দ্রিক।

আরও আগে টমাস হবস মানুষকে বস্তুর এমন একটি পিণ্ড হিসেবে দেখেছেন যার মানসিক ও দৈহিক ক্রিয়াকলাপকে জীবতান্ত্রিক যান্ত্রিকতার সাহায্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তার মতে, জৈবযান্ত্রিক বাসনার তাড়নায় মানুষ কাজ করে বাসনা পরিপূরণের উদ্দেশ্যে। ক্ষমতার পর ক্ষমতার জন্য অন্তহীন অবিরাম বাসনা মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, যাবত না সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মরিজ শ্লিক’য়ের ধারণাও হবসের মতোই। তার মতে, মানুষ কাজ করে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থচিন্তায়—আপাতদৃষ্টিতে যেকাজকে পরার্থপর কাজ বলে মনে হয়, চূড়ান্ত বিচারে তা-ও স্বার্থতাড়িত। দাবী করা হয়েছে যে, এই স্বার্থটি হচ্ছে বাসনার পরিপূরণ। এই তত্ত্বকে বলা হয় মনস্তাত্ত্বিক অহংবাদ, যার একটি বিশেষ আকার হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক সুখবাদ। এপিকিউরাস, বেন্থাম, স্পেন্সার, নীটশে এই তত্ত্বের নানা রূপ দিয়েছেন; বাসনাটিকে কেউ চিহ্নিত করেছেন সুখ হিসেবে, কেউ আত্মরক্ষা ও বংশরক্ষা, আবার কেউ বলেছেন ক্ষমতা ইত্যাদি।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানবমনের প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করেছেন মনোবৈজ্ঞানিক অবস্থান থেকে। তার মতে, মানুষ মূলত নিষ্ঠুর, আগ্রাসী ও স্বার্থপর। সে কোন ভদ্রজন ও বন্ধুসুলভ কিছু নয়। সে কেবল আক্রান্ত হলে পরেই আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করে এমন নয়, বরং আগ্রাসনের শক্তিশালী বাসনা দ্বারা সে সদাই তাড়িত। পড়শিরা যে কেবল তার সম্ভাব্য সহযোগী বা যৌনসঙ্গী তা মাত্র নয়; সে পড়শিকে দেখে থাকে উৎপীড়ন, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অপদস্থকরণ, এবং এমনকি জিঘাংসার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে। হুন, চেঙ্গিস, তৈমুর, ক্রুসেডার, দুটো বিশ্বযুদ্ধ—এসবকে তিনি নিজ মতের পক্ষে প্রমাণ হিসেবেও দাবী করেছেন। তিনি তার ‘সিভিলাইজেশন এন্ড ইটস ডিসকন্টেন্টস’ বইয়ে এসব লিখেছেন এবং এথেকে সেখানে তিনি যীশুর মমতার শিক্ষাকে মানুষের মৌলিক স্বভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বিধায় নাকচ করেছেন। মানুষ মমতার আবেদনে সাড়া দেবে না; সে লুণ্ঠন, পীড়ন, হত্যার পথেই হাঁটবে।

তিনি আবার এও বলছেন যে, সভ্যতা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও পরাধীন, বন্দী ও দুঃখময় করে তুলেছে। এই যন্ত্রণা লাঘবের কৌশল হিসেবে সাধারণ মানুষ মমতার শিক্ষাকে, ঈশ্বরকে গ্রহণ করে থাকে। তিনি যন্ত্রসভ্যতার বিকাশকে নতুন অলঙ্ঘনীয় অবস্থা হিসেবে দেখেছেন এবং সাধারণ মানুষকে নতুন অবস্থায় নতুন এডাপ্টেশনের দিকে যেতে বলেছেন। ফলে আমরা এখান থেকে আসলে কী পাই? মানুষ অত্যাচারী—এখানে কারা সেই মানুষ? তারা কি সভ্যতার দিকনির্ণয়কারী শক্তিমানেরা নয়? আর নতুন এডাপ্টেশনটা হবে কিভাবে? শক্তিমানদের ইচ্ছাকে মেনে নেয়া ও তাদের প্রদত্ত রিযিকে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে? ধর্মের বদলে ফ্রয়েড নান্দনিকতা ও শিল্পকলাকে জীবনের দুঃখময় ভার লাঘবের উপায় হিসেবেও দেখেছেন। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়, ক্ষুধার্ত মানুষের চিত্রের মূল্য ক্ষুধার্ত মানুষের নিকট চুলার জ্বালানীর চেয়ে বেশী নয়। তাছাড়া ঈশ্বরের কথা তাদের কাছে যতটা সহজবোধ্য, শিল্পকলা ততটাই দুর্বোধ্য।

শ্লিক অবশ্য বলেছেন, মানুষের স্বার্থপরতার প্রমাণ হিসেবে আগ্রাসনের চরম উদাহরণগুলো দেখার প্রয়োজন নেই। আমরা সাধারণভাবেই দেখতে পাই যে, দুটি বিকল্পের মধ্যে সাধারণেরাও অধিকতর স্বার্থপরিপূরক বিকল্পটিকে বেছে নেয়। ফলে আমরা বলতে পারি যে, আগ্রাসনের চরম উদাহরণগুলো সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান স্বার্থপরতার সামষ্টিক চরম প্রকাশ মাত্র—যারা শক্তিহীন তারা শক্তি অর্জন করলে একই আগ্রাসনের পথেই যেত এবং আন্তর্জাতিক আগ্রাসনে তারা জাতির নেতৃবৃন্দের ইচ্ছার অনুবর্তীই থাকে। মূল মানবপ্রকৃতি নির্ণয়ে ব্যক্তি বা শ্রেণীর ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কোন ভূমিকা নেই। অর্থাৎ সাদামাটাভাবে বললে, প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ এমনই যে, যে-ই লঙ্কা যায় সে-ই রাবণ হয়। কিন্তু আমরা শিশুদের মধ্যেও পরার্থপরতার নজির দেখে থাকি। তাই তাকে এই দাবীও করতে হয়েছে যে, এরূপ শিশুটি দেয়ার মধ্যে বেশী সুখ পেয়ে থাকে বলেই দেয়। কিন্তু মানবপ্রকৃতির মূল সমস্যাটি আনন্দ বা সুখের মধ্যে নয়, বরং কিসে আনন্দ তার মধ্যে—অর্থাৎ নিজের জন্য সঞ্চয়ের মধ্যে আনন্দ, নাকি অন্যকে দেয়ার মধ্যে আনন্দ। এই সংক্রান্ত অন্য প্রশ্নটি হচ্ছে এই যে, মানুষকে উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ দিতে পারলে কি মমতার চর্চাকে সমাজে বিস্তৃত করা যাবে না? শক্তিমানেরা কি স্বার্থচিন্তা ছাড়তে নিতান্তই অক্ষম? বস্তুবাদী ও ফ্রয়েডিয় তত্ত্ব অনুসারে তারা সত্যি অক্ষম, যেহেতু স্বার্থপরতাই মানুষের আদিম ও মৌলিক প্রকৃতি। নারীর উপর পুরুষের যৌন আগ্রসনের বেলায় যেমন পুরুষের এই “অক্ষমতা”র দাবী তার আগ্রাসনের অপরাধকে লঘু করে তোলে, একইভাবে জীবনের অন্য সকল অঙ্গনে আগ্রাসনের তাত্ত্বিক ভিত্তি এই “অক্ষমতা”র ধারণা। কিন্তু আমরা অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যেও মমতার বিপুল প্রকাশ দেখি। এক্ষেত্রে কী বলা যায়? এখানে যুক্তি দেয়া হয় যে, প্রতিটি প্রজাতির জিনের কাঠামোয় নিজ প্রজাতিকে রক্ষার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অদ্ভুত কথা হচ্ছে, হোমো সেপিয়েন্স স্বার্থচিন্তায় হোমো সেপিয়েন্সকেই হত্যা করে—আবার এই জিঘাংসাকেই মূল মানবপ্রকৃতি হিসেবে দাবী করা হয়।

মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে মানুষের ধারণা তার সমাজবিন্যাসের কাঙ্ক্ষিত রূপ নির্ধারণেও ভূমিকা রাখে। আমাদের সমাজ কি পুঁজিতান্ত্রিক হবে, নাকি সমাজতান্ত্রিক? মানুষ যদি সারগতভাবে স্বার্থপর হয়, তবে তারা কাজের প্রণোদনা পাবে কাজের ফলের মালিকানা লাভের ও সঞ্চয়ের তাড়না থেকে। এই স্বার্থচিন্তা তাকে বেশী বেশী কাজ করতেও উৎসাহিত করবে। এটাই পুঁজিবাদের মূল দর্শন এবং এই দর্শন দাঁড়িয়ে আছে ডারউইন-ফ্রয়েডের মানবপ্রকৃতির ধারণার উপর, উগ্র ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও চরম সুখবাদের উপর। এই ধারণা আগ্রাসন ও উপনিবেশবাদকেও সিদ্ধ করেছে। মানুষ যদি স্বার্থপর হয় তবে মিলিটারি, পুলিশ, জেলখানার পেছনে প্রচুর অর্থ খরচ করাটাও যুক্তিযুক্ত হয় এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ইহলৌকিক পেশাগত দক্ষতার বিকাশে নিয়োজিত রাখা ও সেখানে নৈতিকতার শিক্ষাকে অনুপস্থিত রাখাও প্রয়োজনীয় হয়। অন্যদিকে, এও তো সম্ভব হতে পারে যে, মানুষ সারগতভাবে মমতাময়, সহযোগিতাপ্রবণ, পরার্থপর। তা যদি হয় তবে এটিই কি অধিক কল্যাণকর হবে না যে, আমরা নিজেদেরকে শিক্ষিত ও উৎসাহিত করবো অন্যের ভালর জন্য যথাসাধ্য পরিশ্রম করতে, ও যা উৎপন্ন হবে তাতে অন্যকেও অংশীদার করতে? সমাজতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলে মানুষ সম্বন্ধে এরূপ ধারণার ভিত্তিতেই। তা যদি সম্ভবপর হয় তবে সামরিক খাতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা খাতে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে মানবজাতির এতো এতো খরচ কি সম্পদের দুঃখজনক অসম্মানজনক অপচয় নয়? আমরা কি বলতে পারি না যে, বিশ্বে প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠিত এই স্বার্থপরের ধারণা মানুষের বিকাশকে ভুল পথে নিয়ে গেছে? নাকি এই ভুল পথে যাওয়াটাই প্রমাণ করে যে, মানুষ আদতেই স্বার্থপর, যে প্রকৃতি থেকে তার মুক্তি নেই? আর যদি মুক্তি সম্ভব বলে একজন বিশ্বাস করে তবে সেই বিশ্বাস বা ধারণা, ভবিষ্যৎ নিয়ে তার আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রকৃতি ও লক্ষ্যকেও প্রভাবিত করবে।

মনস্তাত্ত্বিক অহংবাদী পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক সভ্যতা প্রথমে আক্রমণ করেছিল উপনিবেশগুলোকে তারপর নিজেকেই। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে তা আরও শক্তিশালীভাবে পুনরুত্থিত হয়েছে। অবশ্য যুদ্ধের সুযোগে উপনিবেশগুলোও নিজেদেরকে মুক্ত করতে পেরেছিল। এই সভ্যতার মূল কথা হচ্ছে বস্তুবাদ, সুখবাদ, যৌনতাবাদ। সমকামী বিবাহের কথা বাদই দেয়া যাক, কারণ ওতে নতুন মানুষের আবির্ভাব হয় না, এরূপ জোড়ার মৃত্যুর পর তার স্থানে কেউ থাকে না। কিন্তু সূক্ষ্মই হোক বা স্থূল, যৌনতা সর্বস্ব সংস্কৃতি ও মুক্ত যৌনতার ফলশ্রুতিতে পশ্চিমা ভূমি মানুষ দিয়ে ভরাট হয়ে উঠার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের জাতিসত্তাই ধ্বংসের আশঙ্কার মধ্যে পড়েছে। আমরা এমন দাবী করতে পারি যে, মমতার আদর্শ ও সেই আদর্শের যৌক্তিক ভিত থেকে দূরে সরে যাওয়াই তাদের এই অবস্থার জন্য দায়ী। কিন্তু তারা কি এই দাবী করতে পারবেন যে, তাদের সুখবাদী আদর্শ থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়ার ফলেই এমন সংকট তৈরি হয়েছে?

অস্তিত্ববাদীরা

ঈশ্বরে বিশ্বাসীরা মনে করে মানুষের প্রকৃতি ঈশ্বর নির্ধারণ করেছে এবং সে প্রকৃতির মধ্যে দেবত্বকে সম্ভাবনা হিসেবে নিহিত রাখা হয়েছে। এরা সেই দেবত্বের উন্মেষের সাধনাকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে দেখে। অন্যদিকে বস্তুবাদী প্রাণীবাদীরা মনে করে মানুষের প্রকৃতি তৈরি হয়েছে বস্তুধর্ম ও প্রাণীধর্ম থেকে। এদের ভাবনায় নিজেকে সংরক্ষণ করার ও জীবনকে সুখময় করে তোলার সংগ্রামে জয়ী হওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য। কিন্তু অস্তিত্ববাদী সার্ত্রে মনে করেন মানুষের কোন পূর্বনির্ধারিত সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি নেই, এবং উদ্দেশ্যও নেই—মানুষ তা-ই যা সে হতে চাইবে ও যা সে করবে। প্রতিটি ব্যক্তি পরম ও চরম ভাবে স্বাধীন, আত্মনির্ধারক এবং তার সমুদয় নির্বাচন ও কর্মের দায় সম্পূর্ণরূপে তার। অর্থাৎ রানা প্লাজার বিধ্বস্ত হাবার দায় যারই হোক, সেখানে নিহত প্রতিটি শ্রমিকই নিজ স্বাধীন নির্বাচনের (সেদিন কাজে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত) ও কাজের (প্লাজায় উপস্থিত হওয়া) ফলশ্রুতিতে নিজ জীবনের এই পরিণতির জন্য দায়ী। সার্ত্রের মতে, ব্যক্তির মধ্যে এই চরম স্বাধীনতা ও পরম দায়বদ্ধতার সম্বিত আছে বলেই সে অনুতপ্ত হয়, আক্ষেপ করে, মনকষ্টে ভোগে; পথে ডাকাতের হতে সর্বস্ব হারানো ব্যক্তির “কেন যে এই পথে আসতে গেলাম” বলে গভীর আক্ষেপ করা এই স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার সম্বিত নির্দেশ করে। তার মতে, ব্যক্তি নিজেই নিজের প্রকৃতির নির্মাতা; ও মানুষ হওয়ার অর্থ হচ্ছে নিজেকে সৃষ্টি করা। যে সব মানুষ ঈশ্বরে বা বস্তুতে মানবপ্রকৃতির উৎস খোঁজে, সার্ত্রের মতে, তারা নিজের স্বাধীনতাকে, মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দেয় এবং নির্বাচন ও কর্মের দায়দায়িত্বকে অন্যের উপর আরোপ করতে চায়। একে সার্ত্রে ‘মন্দ বিশ্বাস’-এর ফল হিসেবে দেখেন; একে তিনি ‘আত্মপ্রতারণা’ হিসেবেও দেখেন।

এরিস্টটল মানবপ্রকৃতির সাথে মানবজীবনের উদ্দেশ্যকে জড়িত করেছেন। অপরদিকে মানবপ্রকৃতির ও জীবনের উদ্দেশ্যের সব বহির্দেশীয় উৎসকে সার্ত্রে নাকচ করে দিচ্ছেন। তার ঘোষণা: অস্তিত্ব সারধর্মের অগ্রগামী; আমরা অস্তিত্ববান হলে পরেই বহির্জগত, সারধর্ম ইত্যাদিতে উপনীত হই। সার্ত্রে সঠিক হলে, মানবজীবন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বক্ষম হয়। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান, যুক্তি, ইতিহাস, ভাষা আমাদের মধ্যে এই শক্তিশালী ধারণা তৈরি করে যে, আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টি, অথবা একটি স্বাধিষ্ঠ জগতের উৎপাদ। কাম্যু ও তার মতো অস্তিত্ববাদীরা সকলেই জীবনকে এবসার্ড, ইররেশনাল, উদ্দেশ্যহীন, তাৎপর্যহীন মনে করেন—অর্থাৎ মানুষের কোন অন্য-নির্ধারিত ও রেশনাল প্রকৃতি নেই, এবং তার কোন অন্য-নির্ধারিত উদ্দেশ্যও নেই। এমন একটি অদ্ভুত পরিস্থিতিতে মানুষ কেন আত্মহত্যা না করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে?—এই প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে পড়ে। দর্শনকে যদি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তবে তা দিতে হবে যুক্তির মাধ্যমেই, কারণ দর্শনের পথ হচ্ছে যুক্তির পথ। কাফকা, কাম্যুর নিকট “আত্মহত্যার সমস্যাই দর্শনের প্রধান সমস্যা” হয়ে উঠেছে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, ঈশ্বরের জন্য বেঁচে থাকা বা পিতামাতা-সন্তানাদির জন্য বেঁচে থাকা বা সুখের জন্য বেঁচে থাকা বা আত্মহত্যার সাহসের অভাবে বেঁচে থাকা বা বেঁচে থাকার জৈব ইনস্টিংক্টের তাড়নায় বেঁচে থাকা হয় অন্য-নির্ধারিত উদ্দেশ্য, নয়তো স্বাধীন নির্বাচন যেখানে কোনটিই নির্বাচন না করাও নির্বাচনে স্বাধীনতার অংশ।

n

আগের লেখা – হাততালি

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী