ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

‘ন্যায়’ একটি অসংজ্ঞায়নযোগ্য ও অবধারণাদুঃসাধ্য ‘ধারণা’র নাম—তারপরও ন্যায় আধুনিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। কিন্তু ন্যায়নীতি অনুসরণের প্রশ্ন আসছে কেন? ন্যায়নীতি ভঙ্গ হয় এবং হবার সম্ভাবনা সর্বদাই থাকে বিধায়। ন্যায়নীতির সাথে দুটি পক্ষ বিজড়িত—যখন কোন ঘটনায় বা অবস্থায় নীতিটি ভঙ্গ হয় তখন সংশ্লিষ্ট ঘটনা বা অবস্থার ক্ষেত্রে একপক্ষ অত্যাচারী ও অন্যপক্ষ অত্যাচারিত হিসেবে আবির্ভূত হয় অথবা একপক্ষ কর্তৃক অন্যপক্ষ বঞ্চনার শিকার হয়। অত্যাচার বা বঞ্চনা কেন ও কিভাবে সংঘটিত হয়? অত্যাচারী বা বঞ্চকের মনের ‘অহংকারী বাসনা’ অত্যাচার বা বঞ্চনা করার সিদ্ধান্ত তৈরি করে এবং তা সংঘটিত হয় তার কাছে বিদ্যমান ‘শক্তির আধিক্য’ বা ‘সুযোগ-সুবিধা’ দ্বারা। শক্তির আধিক্য বা সুবিধা তিন ক্ষেত্র থেকে আসতে পারে: প্রকৃতি, উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত চিন্তাগত আদিকল্প বা প্যারাডাইম।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ন্যায়-সংশ্লিষ্ট ঘটনা বলতে কী বুঝায়? চুরি, ডাকাতি, নির্যাতন, খুন ইত্যাদি অপরাধমূলক ঘটনাগুলোর সাথে ন্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে;—উপযুক্ত শাস্তিবিধানকেই আমরা সাধারণত ন্যায়বিচার বলে থাকি। অপরাধ ও শাস্তি সংশ্লিষ্ট ন্যায়কে বলা হয় শাস্তিবিধানমূলক (রিট্রিবিউটিভ) ন্যায়। কিন্তু ন্যায় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল, কিন্তু অত্যন্ত দুরূহ, অঙ্গন হচ্ছে আধিমানসিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থা, যার মধ্যে ধারাবাহিকভাবে বৈষম্যচিন্তা ও বাস্তব বৈষম্য বিরাজ করতে পারে। এই অঙ্গনে ন্যায় জড়িয়ে আছে ব্যক্তির মর্যাদা, জীবন বিকাশে পর্যাপ্ত সুযোগ এবং লেনদেন ও সম্পদ বণ্টনের সাথে। এই ন্যায়কে বলা হয়ে থাকে বণ্টনমূলক (ডিস্ট্রিবিউটিভ) ন্যায়। একটি উন্নত সমাজে রিট্রিবিউটিভ ন্যায়ের প্রয়োজনীয়তা কমে আসতে পারে, কিন্তু সেই সমাজেও ডিস্ট্রিবিউটিভ ন্যায়ের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে না। ন্যায় কেবল তত্ত্ব, নৈতিকতা বা সামাজিক সম্পর্কের সাথেই জড়িত নয়, জড়িয়ে আছে সমাজের রাজনৈতিক সংস্থার কাঠামোর সাথেও। রাজনৈতিক সংস্থা বলতে আমরা সব ধরণের সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানকেই বুঝতে পারি, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চুক্তি ও/বা আইন দ্বারা। প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট ন্যায়কে আমরা রাজনৈতিক ন্যায় বলতে পারি, যাকে সামাজিক ন্যায় থেকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। বর্তমান আলোচনায় আমরা খুঁজে দেখতে চেষ্টা করবো ন্যায়ের জন্য কোন প্রাক-নীতিগুলো আবশ্যক। এই নীতিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক ন্যায়েরও ভিত; কোন সমাজের বিপুল অংশের মননে ও আচরণে এই নীতিগুলো বাস্তবিক প্রতিষ্ঠা না পেলে কেবল প্রতিষ্ঠান দিয়ে ন্যায়ের বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না—বরং প্রতিষ্ঠান নিজেই করাপ্টেড হয়ে উঠতে পারে।

‘অহংকার’ ও ‘অহংকারী বাসনা’ হচ্ছে ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিক স্বৈরধর্ম। অহংকারী নিজেকে অন্যের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে এবং অন্যদেরকে তার স্বার্থপূরণে সেবক বা দাস হিসেবে গণ্য করে। এটি শোষণের নীতি, বা দেবার বেলায় কম দেয়ার ও নেবার বেলায় বেশী নেয়ার নীতি। এর প্রাথমিক উৎস হচ্ছে প্রকৃতি। পুরুষ, নারী, শিশু, যুবা, বৃদ্ধ একইভাবে শক্তি-সামর্থ্যের অধিকারী নয়, আবার একই শ্রেণীর প্রত্যেক সদস্যও সমপরিমাণে এর অধিকারী নয়। পরবর্তীতে বৈষম্যটি বৃদ্ধি পেতে থাকে বৈষম্য ও বৈষম্যবৃদ্ধিকে বৈধতাদানকারী সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সিস্টেম এবং চিন্তার কাঠামো ও মূল্যবোধের আশ্রয়ে। অহংকার পরিহারের অর্থ হচ্ছে নিজেকে অন্যের সমতলে স্থাপন করা—মর্যাদা ও অধিকার উভয় ক্ষেত্রে। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম বৈষম্য সত্ত্বেও পৃথিবীর সকল ব্যক্তি মানুষ সমান মর্যাদা ও জীবন বিকাশের সুযোগের ক্ষেত্রে সমান অধিকারের অধিকারী। এই নীতি থেকেই নিঃসৃত হয় লেনদেনে সমতার নীতি—অর্থাৎ প্রত্যেকে অপরের সহযোগী, কেউ কারও দাস বা সেবক নয়। কাজেই ন্যায়ের সাথে সম্পর্কিত অন্য ধারণাগুলো হচ্ছে পারস্পরিক সহযোগিতা, সাধ্যমত কর্তব্য ও অধিকারে সমতা। কিন্তু সাম্যের এই নীতি বাস্তবায়নে সমস্যার উৎস হচ্ছে বিভিন্ন উৎপন্ন বস্তু ও বিভিন্ন পেশাগত কর্মের মূল্য নির্ধারণের সমস্যা।

ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতার বিষয়টি ন্যায়চিন্তার সাথে কিভাবে সম্পৃক্ত তা নির্ধারণ করে নেয়া প্রয়োজন। ন্যায়জাত কর্তব্যভার বহনে ব্যক্তি বাধ্য, নাকি তার স্বাধীনতা এই কর্তব্যভারের অগ্রবর্তী? ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজটি যদি কেবল প্রতিষ্ঠাননির্ভর বলে ধরা হয় এবং কোন কথিত আদর্শানুগভাবে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো—চিন্তা ও প্রতিষ্ঠান উভয় বিচারে—ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে ধরে নেয়া হয়, তবে এরূপ প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির স্বাধীনতাকে অস্বীকার বা নিষ্প্রয়োজন বলে মনে করতে পারে। কিন্তু কোন সমাজই আদর্শ ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নয়। ন্যায়ের পথে অগ্রসরমান সমাজেও বৈষম্য বা অত্যাচারের নতুন প্রক্রিয়া তৈরি হতে পারে। যেহেতু ন্যায়ের সাথে দ্বন্দ্বের সম্পর্ক আছে সেহেতু শক্তিমানদের প্রবণতা ও প্রক্রিয়ার প্রতি নজরদারীর প্রয়োজন আছে। আজ যে লেন-দেন বা দায়িত্ব-অধিকারের সেট গতকালের চেয়ে অধিক অগ্রসর তা আগামীকাল অযথেষ্ট ও সংশোধনযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ফলে নতুন দাবী উত্থাপন প্রয়োজন হবে। এই চাহিদা আবিষ্কার বা নির্ধারণ এবং উত্থাপনের জন্য ব্যক্তিকে স্বাধীন রাখার প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিকে তার নিজের জীবনকে বিকশিত করার আদর্শগত স্বাধীনতা যেমন দিতে হয়, তেমনই তাকে নতুন আদর্শ, চেতনা, মূল্যমান তৈরির স্বাধীনতাও দিতে হয়। একইসাথে অতীত থেকে প্রাপ্ত ঐতিহ্যের অন্যায্য বিবেচিত অংশকে প্রশ্ন করার স্বাধীনতও দরকার হয়। ফলে ক্রমাগতভাবে ন্যায়ের নিকটবর্তী থেকে আরও নিকটবর্তী হবার জন্যও ব্যক্তিকে তার চিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হয় যেন অন্যরা তার প্রস্তাবনা বা প্রকল্পকে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পায় এবং একটি অবাধ প্রকাশ্য গণ আলোচনা, পর্যালোচনা, বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয় ও তা বজায় থাকে।

উপরে যা লেখা হয়েছে তার ভিত্তিতে নীচের পয়েন্টগুলো লেখা যায়, যা থেকে বলা সম্ভব যে, ব্যক্তিস্বাধীনতা ন্যায্য প্রতিষ্ঠানের অগ্রবর্তী:

ক. ন্যায় একটি বিচিত্রমাত্রিক সমতার ধারণা, যেখানে সমতার পরিমাপ দুঃসাধ্য। ন্যায়ের সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য কোন সংজ্ঞা নেই। কাজেই কার ধারণাসম্মত বাস্তব কাঠামো বা কার সংজ্ঞাকে সঠিক ও যথেষ্ট ধরা হবে?—এই প্রশ্নেরও কোন সহজ সুরাহা নেই।

খ. একটি দ্বান্দ্বিক অবস্থার মধ্যে ন্যায় রূপায়িত হতে পারে পক্ষপাতমুক্ত সঙ্গত মীমাংসার মাধ্যমে, যেখানে ‘পক্ষপাতহীনতা’ ও ‘সঙ্গত’ ধারণাও উভয় পক্ষের ন্যায়চিন্তা ও/বা স্বার্থচিন্তা সাপেক্ষ, এবং মীমাংসার ক্ষেত্রে একপক্ষের শক্তির আধিক্য ও/বা প্রচ্ছন্ন হুমকির ভূমিকা থেকে যেতে পারে।

গ. ন্যায়ের বাস্তব প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তিশীল বৃত্তাবদ্ধ স্থবির প্রক্রিয়া নয়। ব্যক্তিদের চিন্তানির্মিত একটি সরল রৈখিক গতিশীল ধারাবাহিক মরফোটিক প্রক্রিয়া। কাজেই ন্যায়ের কোন চূড়ান্ত আদর্শ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই—প্রকল্পিত সব আদর্শ বা ‘শ্রেষ্ঠতম’ প্রতিষ্ঠান আখেরে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।

উপরের ধারণাগুলোকে সঠিক ধরা গেলে বলতে হয় যে, স্বাধীনতা ন্যায়জাত কর্তব্যের অগ্রবর্তী এবং এই সিদ্ধান্তেও আসা যায় যে, ন্যায় বাস্তবায়নে সামাজিক চুক্তি প্রথম আবশ্যিকতা। ন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য সমান স্বাধীনতা এবং চুক্তির ক্ষেত্রে অবাধ-মুক্ত পরিবেশ আবশ্যক। স্বাধীনতায় সমতা ন্যায়নীতিরই একটি দাবী, আর চুক্তির বৈধতা নির্ভরশীল হয়ে আছে স্বাধীনতার উপর। চুক্তি স্বাধীনতাকে সীমিত করে। যদি এই সীমিতকরণ সকল পক্ষের জন্য সমপরিমাণে হয় তবে ন্যায় বজায় থাকে। আবার অন্যদিকে, অসম স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে এক পক্ষের জন্য অধিকতর হ্রাসকৃত স্বাধীনতা; আর এরূপ একপাক্ষিকভাবে হ্রাসকৃত স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে অন্তত আংশিক পরাধীনতা। কাজেই স্বাধীনতার অর্থই হচ্ছে প্রত্যেকের জন্য সমান স্বাধীনতা। এভাবে বিশ্লেষণ করলে স্বাধীনতার সমতা নিজেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, ন্যায়নীতি প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। স্বাধীনতা-ন্যায়কে একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে আবদ্ধ কিন্তু পরস্পরের সহায়ক দুইয়ের ডাইপোল হিসেবেও গ্রহণ করা যেতে পারে যেখানে স্বাধীনতা প্রাইম মুভার—যদি ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিদের ন্যায্য সামাজবদ্ধতা উভয়টি মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় হয়।

সমান স্বাধীনতা সমান মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করে। সকল ব্যক্তিমানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী; এই নীতির জন্য আবশ্যক হয় ‘ব্যক্তিমানুষ সর্বোচ্চ মূল্যের অধিকারী’—এই নীতি। একশত টাকার নোটের মূল্য একশত টাকাই, তা নোটটি ঝকঝকে পরিষ্কার হোক বা দুমড়ানো মুচড়ানো পুরাতনই হোক, তা নোটটিকে মাথায় নিয়ে নাচাই হোক বা তার গায়ে থুথু ছিটিয়ে পা দিয়ে মাড়ানোই হোক। নারী-পুরুষ, হিজরা-অহিজরা, মালিক-শ্রমিক, রাজা-প্রজা, ছাত্র-শিক্ষক, সাধু-অসাধু, চোর-অচোর নির্বিশেষে সকল ব্যক্তি মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু শোষণের নীতিটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ব্যক্তির কলাগত নৈপুণ্যকে ও সম্পদকে মানবসত্তার চেয়ে অধিক মূল্যবান সাব্যস্ত করতে হয় ও তার মূল্য দিয়ে ব্যক্তির মর্যাদা ও স্ট্যাটাস নির্ধারণ করতে হয়। এর ফলে ছনের ঘরের মালিকের চেয়ে ইটের ঘরের মালিক অধিক মর্যাদা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও ইটের ঘরটি যারা তৈরি করেন তারাই ছনের ঘরে থাকেন। রাজমিস্ত্রির কাজেরও কলাগত মূল্য রয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কায়িক শ্রম হবার কারণে তার মূল্য আর্কিটেক্ট বা প্রকৌশলীর বুদ্ধিবৃত্তিক নৈপুণ্যের মূল্যের চেয়ে কম ধরা হয়। একারণে কৃষকের বা শ্রমিকের কায়িক শ্রমের মূল্যকে বুদ্ধিজীবী, আমলা, শিল্পী-সাহিত্যিকদের কাজের মূল্য থেকে কম ধরা হয়—এমনকি খেলোয়াড় বা নাচনেওয়ালার কাজের মূল্যকেও বেশী ধরা হয়। এভাবে এলিট শ্রেণী ও কালচার তৈরি হয়, যেখানে ফুরুৎ ফুরুৎ শব্দে চা খাওয়ার সংস্কৃতি পর্যন্ত ‘সুকুমার’ অনুভূতি ও কেতা বর্জিত গেঁয়ো ক্ষেত অ-সংস্কৃতি সাব্যস্ত হয়ে উঠে, যা আবার এই গেঁয়োদের শ্রমের মূল্যের স্বল্পতাকে যুক্তিসঙ্গত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

অভিজাত সংস্কৃতির বাস্তব সূত্র হচ্ছে ‘গ্রেটেস্ট গুড ফর স্মলেস্ট নাম্বার’—এখানে একজন ‘উন্নত’ ব্যক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে হাজার ব্যক্তি সেবাদাসে পরিণত হতে পারে। এর বিপরীত ‘গ্রেটেস্ট গুড ফর গ্রেটেস্ট নাম্বার’—এই উপযোগবাদী নীতি ন্যায়ের অধিক নিকটবর্তী ও গণতান্ত্রিক। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, এক ব্যক্তির উপর অত্যাচার করলে যদি লক্ষ ব্যক্তির উপকার হয় তবে তা করা কি বৈধ হবে? লক্ষ ব্যক্তি কি এক ব্যক্তির কাছে এরূপ অত্যাচার সহ্য করার আবেদন করতে পারে? উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোন জাহাজ যদি সাগরে ডুবতে বসে এবং কিছু মানুষ সাগরে ফেলে দিলে যদি অন্য সবাই বাঁচতে পারে তবে কি তা করা ন্যায্যতার বিচারে বৈধ হবে? ‘দাস’দেরকে ফেলে দিয়ে ‘স্বাধীন’দেরকে রক্ষা কর, ‘বর্বর’দেরকে ফেলে দিয়ে ‘সভ্য’দেরকে রক্ষা কর—এমন এরিস্টটলীয় সিদ্ধান্তের সম্ভবপরতাকে আজও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু সকল মানুষের সমান স্বাধীনতা, সমান মর্যাদা ও সমান অধিকারের নীতি ভিত্তিক বিচারে তা বৈধ হবে না। ফলে ‘গ্রেটেস্ট গুড ফর গ্রেটেস্ট নাম্বার’—এই নীতিও ন্যায়ের ক্ষেত্রে সবসময় ভাল কাজ করবে না। ‘সর্বোচ্চ সংখ্যকের জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণে শুভ’ কথাটি শুভকে সংজ্ঞায়িত করে না—এটিকে বলা যায় ‘বেগিং দি কোশ্চেন’। ফলে উপযোগবাদীরা শুভ বলতে সুখকে উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু ন্যায়ের ক্ষেত্রে ১ জনের সুখের জন্য যেমন ৯৯ জনকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই, তেমনই ৯৯ জনের সুখের জন্য ১ জনের উপর অত্যাচার চাপিয়ে দেয়ারও সুযোগ নেই—অর্থাৎ, একজনের জন্য ন্যায়কে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজন হলে নিরানব্বই জনেরই সুখের দাবী পরিত্যাজ্য হয়।

ব্যক্তিদের সমান মর্যাদা সকল শ্রমকে সমান মর্যাদায় আসীন করে। কোন প্রতিষ্ঠানের সিইও ও ঝাড়ুদার উভয়ের পেশারই মর্যাদা সমান। সম্পদ ও কলাগত নৈপুণ্যের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে মর্যাদায় ফারাক হয়—এমন কথা আধুনিক মানুষ মুখ ফুটে স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু যে জগতটিতে এখনও আমরা সচেতনভাবেই বৈষম্যকে অনেকখানি বজায় রেখেছি তা হলো এই শ্রমের মূল্যের জগত। ‘চাষার বাচ্চা’, ‘মজুরের বাচ্চা’ গালি হিসেবে প্রয়োগযোগ্য হলেও আমরা কেউ কাউকে ‘ব্লগারের বাচ্চা’ বা ‘ব্যবসায়ীর বাচ্চা’ বলে গালি দেই না। এক পরিচালক আরেক পরিচালকের সাথে বেয়াদবি করলে আমরা বিষয়টিকে একভাবে দেখি, আর পরিচালকের সাথে কেরানী বেয়াদবি করলে ‘ব্যাটা কেরানীর এত সাহস’ দেখে অবাক বা ক্রুদ্ধ হই। এখনও কোন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এই তথ্য আমাদের কাছে অর্থবহ ও কার্যকর হয়ে আছে যে, ‘কদিন আগেও ব্যাটা আমার পক্ষের লোকের বাড়িতে ফায়ফরমায়েশ খাটতো, থলে নিয়ে বাজারে গিয়ে সওদা কিনে আনতো।’ মানুষে মানুষে মর্যাদায় বৈষম্যের প্রধানতম বাস্তব বা আকারগত ভিত হয়ে আছে শ্রমের মর্যাদা ও মূল্য সংক্রান্ত বোধে পার্থক্য। এই পার্থক্য তৈরি করেছে অভিজাত শক্তিমানেরা।

লেন-দেন এবং একজনের অধিকার দাবী ও তা পরিপূরণে অপরের কর্তব্য সামাজিক ন্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। একটি আমের মূল্য সেই আমটির মূল্যের সমান। যদি একটি আমের বিনিময়ে সেই আমটিই ফিরিয়ে দেয়া হয় তবে আদর্শ ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এটিতে বিনিময় সংঘটিত হয় না। একটি আমের বিনিময়ে অন্য সময় সমরূপ আরেকটি আম ফিরিয়ে দেয়া গেলে আমরা ন্যায়ের খুবই নিকটবর্তী থাকি। কিন্তু এতে সকলকেই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আমের ফলন ঘটাতে হবে। কিন্তু বাস্তবসম্মত কথা হচ্ছে একজন আম ও অন্যজন কাপড় উৎপাদন করবে। এখন ক’টি আমের বিনিময়ে কতটুকু কাপড় সমমূল্যবান হবে তা নির্ধারণ করা একটি গুরুতর সমস্যা। শ্রমেরও নানা ধরণ আছে—কায়িক, বৌদ্ধিক, ব্যবস্থাপনাগত, ব্যবসাগত, শিক্ষাগত, শিল্পকলাগত ইত্যাদি। সমাজে ন্যায্য আদান-প্রদানের উপায় কী? মূল্য নির্ধারণের উপায় কী যার মাধ্যমে সব শ্রমে সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে? যদি এমন সমাজ-অবস্থা গড়া যায় যেখানে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আমলা সকলেই তাদের শ্রমের বিনিময়ে যা উপার্জন করে তাতে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা পান ও সবাই সাংস্কৃতিকভাবে সমরূপে বিকশিত হয় তবে বলা যায় আদান-প্রদানে আমরা ন্যায্যতার অনেকখানি নিকটবর্তী হয়েছি।

এপর্যায়ে এসে আমরা ন্যায্যতার জন্য আবশ্যক চারটি প্রধান ধারণার পুনরুল্লেখ করতে পারি:

ক. সকল ব্যক্তির সমান স্বাধীনতা,
খ. সকল ব্যক্তির সমান মর্যাদা,
গ. সকল শ্রমের সমান মর্যাদা,
ঘ. শ্রমের উপযুক্ত মূল্য ও সকলের জন্য সমরূপ সাংস্কৃতিক অবস্থা।

অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরও তিনটি পূর্বনীতি নীচে উল্লেখ করা গেল।

ক. যোগ্যতা, সাধ্য ও কর্তব্য

কৃষক বা শ্রমিক হবার সামর্থ্য অর্জনের জন্য অর্থ-বিনিয়োগ কম। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার ক্ষেত্রে শ্রম, সময় ও আর্থিক সংশ্লেষ অধিক। ব্যবসার সাথে রয়েছে ঝুঁকি, পরিচালনা দক্ষতা, শিক্ষা, সম্পদের বিনিয়োগ ইত্যাদি। ফলে বুদ্ধিভিত্তিক পেশাজীবী বা ব্যবসায়ী বেশি খরচ করে সমাজকে বেশী দেন বলে ধারণা করা হয়। এখন যদি তারা বেশী না পান, কৃষক-শ্রমিকরাও তাদের মতোই মর্যাদা ও জীবনমানে সমরূপ জীবনের অধিকারী হন, তবে মানুষ কষ্ট করে ডাক্তার-প্রকৌশলী ইত্যাদি হতে যাবেন কেন? অর্থাৎ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অলসতা ও অসামর্থ্যের বিরূপ ফল না থাকলে মানুষ পরিশ্রমী হবে কেন? এ প্রশ্ন সকল কালের ন্যায়চিন্তককেই ভাবিত করেছে। তবে এটিও পরীক্ষা করে দেখা দরকার যে, খোদ প্রশ্নটির মধ্যেই পূর্বতপ্রাপ্ত অন্যায় সংস্কারের প্রভাব নিহিত রয়ে গিয়েছে কি-না? শিক্ষার সুযোগ সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকার আবশ্যকতা রয়েছে কি-না? কৃষক-শ্রমিক হবার জন্য সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ অপ্রয়োজনীয় বলে সাব্যস্ত করা যায় কি? উচ্চ শিক্ষা কি সকলেরই অধিকার নয়? শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত রাখার দর্শন কি বৈষম্যবাদী চিন্তাজাত নয়? প্রথম জীবনে শিক্ষা গ্রহণে শ্রমের মূল্য কি পরবর্তী জীবনে বুদ্ধিগত শ্রমে কষ্টের স্বল্পতা দ্বারা পরিশোধিত হয় না? কায়িক শ্রমের কষ্ট বুদ্ধিগত শ্রমের কষ্টের চেয়ে কম নয়, বরং বেশী, বিধায় শ্রমের মূল্য নির্ধারণে প্রত্যক্ষ কষ্টের ভূমিকা থাকবে না কেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর যা-ই হোক, কোরানে মেধা, যোগ্যতা, সামর্থ্য, সামর্থ্য নির্মাণ ও বৃদ্ধির সামর্থ্য, সাধ্য ইত্যাদির সাথে কর্তব্যকে কিভাবে সম্পর্কিত করা হয়েছে তা উল্লেখ করা যেতে পারে। কোরানে মেধা, সামর্থ্য, সুযোগ ইত্যাদিকে আল্লাহর দেয়া ফাদিলাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তির কর্তব্যভার তাকে প্রদত্ত ফাদিলাহর মাত্রা অনুসারে নির্ধারিত এবং এই কর্তব্য পালন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। অন্যদিকে এ-ও বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকের কর্তব্যভার তার সামর্থ্যের অধিক নয়। দশ টাকার সম্পদ উৎপাদনের সামর্থ্য সম্পন্ন ব্যক্তি আট টাকার সম্পদ উৎপাদন করলে কর্তব্য পালনে যে ঘাটতি হয় তা, শত টাকার সম্পদ উৎপাদনে সক্ষম ব্যক্তি পঞ্চাশ টাকার সম্পদ উৎপাদন করেও কর্তব্য পালনে পূর্বোক্ত জনের চেয়ে অধিক ঘাটতি করেছে বলা যেতে পারে। কোন কোন ফাদিলাহর ক্ষেত্রে আধিক্য মানবসমাজের অন্যদের নিকট ঋণ বিশেষ, ফলে কর্তব্যে আধিক্যকে পে-ব্যাক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা সম্ভব। মেধা, সামর্থ্য ও সুযোগের আধিক্য একজনকে এসবের নিরঙ্কুশ মালিকানা দেয় না।

খ. প্রয়োজন ও ভোগ

এক ব্যক্তি তার সাধ্যমতো যা উৎপাদন করবে তা থেকে সে প্রয়োজন মতো নিজের জন্য ব্যবহার করবে—এটিই কোরানের সাধারণ নীতি। এখানে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে ‘প্রয়োজন’ নির্ধারণের সমস্যা—কে ঠিক করে দেবে কার কতটুকু প্রয়োজন? আমাদের লার্জস্কেল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রডাক্টের উপর প্রতিষ্ঠিত ভোগবাদী কন্সিউমারিস্ট সমাজে প্রয়োজনের কোন শেষ নেই। একালে মুহূর্তেই একজন কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করেও মনে করতে পারে যে, সে তার প্রয়োজন পূরণ করেছে মাত্র। ‘প্রয়োজন’ নির্ধারণ একটি শক্ত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের সফলতা নির্ণয়ে আত্যন্তিক ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করা গেলে, অহংকারী আভিজাত্যের প্রকাশ হিসেবে করা অপচয়গুলো বাদ দেয়া গেলে ব্যক্তি জীবনের সুন্দর বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও প্রয়োজনকে অনেকখানি কমিয়ে আনতে পারে।

গ. ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার

কোরানের আরেকটি প্রধান নীতি হচ্ছে, ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অংশ বিদ্যমান থাকার নীতি—অর্থাৎ যারা অতিরিক্ত সম্পদ উৎপাদন করছে তাদের সম্পদে যারা প্রয়োজনের তুলনায় কম সম্পদ সৃষ্টি করছে তাদের অধিকার রয়েছে। ফলে নিজের সম্পদ থেকে একজন অন্যজনকে যা দেয় তা মূলত দান নয়, প্রত্যর্পণ। এ থেকে আমরা যে যুক্তিসঙ্গত ধারণা পাই তা হচ্ছে, রাষ্ট্রকে হতে হবে দরিদ্রদের সহায়ক একটি প্রতিষ্ঠান, যা ধনীদের উপর নজর রাখবে যেন দরিদ্ররা প্রতারণার শিকার না হয়। রাষ্ট্রের সমুদয় কাজের উদ্দেশ্য তাহলে দাঁড়ায় লেনদেনে ক্রমাগতভাবে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, এবং সমাজের দুর্বল করে রাখা অংশের পক্ষে সহায়ক হিসেবে কাজ করা। এই নীতি থেকে যৌক্তিকভাবে আমরা এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হতে পারি যে, সমাজের সকল ধরণের প্রতিবন্ধীদের অধিকার রয়েছে সমাজ/রাষ্ট্রের নিকট থেকে মানবিক সমমর্যাদা ও অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়ার।

n

আগের লেখা – মালয়েশিয় ফ্লাইট MH370 রহস্য

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী