ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

মাথায় বুদ্ধি বেশী ছিল বলে, যুক্তি মেনে চলতাম বলে, ওরা আমাকে পিরামিডের ভেতর থাকতে দিয়েছিল। ওরা আমার নাম দিয়েছিল হামান। পেয়ে আমি খুশিতে ডগমগ হয়ে নামটি পাথরে খোদাই করে লিখে দিয়েছিলাম। দিনে দিনে আমার ক্যানাইন দাঁত দুটো দীর্ঘ হয়ে উঠে। আমি জাতে উঠলাম—অর্থাৎ ওদের মতো নেকড়ে হয়ে গেলাম। আমি সেক্সট্যান্ট দিয়ে কোণ মেপে জগতের ব্যাস খুঁজে বেড়াই ও গোলক ধাঁধায় ইঁদুরের দৌড় মেপে মনের হদিস করি। আমি রাতের আঁধারে সংগোপনে শিকারে বের হই। আমার দীর্ঘ দাঁতের কামড়ে যারা রক্ত হারায়, তারা বিনিময়ে মরার বাহারি জীবন পায়। এক নেকড়ের গ্রীবায় কামড় বসিয়ে দিলে ওরা আমার দাঁত দুটো ভেঙ্গে গুড়ো করে দেয় ও গায়ে উল্কি কেটে লিখে দেয় আমার নাম। রাজা অভিশাপ দিয়ে বলেন: তুই মরা হয়ে যা; বাকী জীবন মুক্ত হয়ে থাক। আমি মুক্তবাসের অভিশাপ নিয়ে পিরামিড-ছাড়া হই।

সেই থেকে আমি বসে থাকি তাজমহলের সিঁড়িতে। মরারা আমাকে দেখে বলে: আহা! মহান ইঞ্জিনিয়ার হামান এখন আমাদের দেশে! বেচারা ইঁদুরওয়ালা ইঞ্জিনিয়ার আর কঙ্কাল নয়, উল্কি! তাজমহল আমার মন্দির। ওরা বলে, ওখানে আফ্রোদিতির অধিষ্ঠান; কেউ বলে ভেনাস; কেউ বলে ডায়ানা। আমার কাছে অবশ্য সবই ছবি। তবে ছবিই আমার কাছে জীবনের চেয়েও জীবন্ত। আমি দিনরাত নিভৃতে ভেনাসের পায়ে আত্মা নিবেদন করি। লোকে বলে মরাদের মুখে কোন ভাবের লেশ থাকে না। আমি ইঁদুর দাবড়ানো বিজ্ঞানী—আমার চোখ থেকে লেশ লুকোয় না। যেদিন আমার মুখে সন্দেহের আলো নেমে এসেছিল, সেদিন ওরা ভয় পেয়েছিল। আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে বললো, তুই মানুষ হয়ে যা, পায়ে বেড়ি পরে দাঁড় টানতে থাক। আমি মনুষ্য-জীবনের দণ্ড নিয়ে তাজমহল-ছাড়া হই।

সারে সারে মানুষ। এক দাঁড়ে পাঁচজন। ডানে-বাঁয়ে দু’সারি। মহাজন বসে কাঠের হাতুরি ঠুকে তালের লহরী তোলে। সেই তালে হাজার দাঁড়ের ঝপাত ঝপাত শব্দ। হাতুরি ফেলে চাবুক হাতে কাছে এলে মহাজনেরে শুধাই: এ যাত্রায় তোমার আমার ফল কী? মহাজন বলে: উপরে ডেক আছে, সেখানে দাভিঞ্চি মোনালিসা আঁকে, বিটোফেন সিম্ফনি করে। কথা না বলে তুই দাঁড় টানতে থাক। তারা তোদের ইতিহাস ছবি করে রাখছে, সুর করে রাখছে। আমার চোখে বিদ্রুপের আলো দেখে দাঁড় বাইয়েরা সব ভয় পেয়েছিল। পায়ের শেকল খুলে আমাকে সাগরে ফেলে দিয়েছিল। ফেলার আগে হামান মুছে লিখে দিয়েছিল ইউনুস। আমি ডাঙার আশা ছেড়ে দিয়ে জলের আশ্রয়ে যাই।

আমি মাছের পেটে রাজ্য খুঁজে পেলাম। কিন্তু টিকল না। আমাকে যখন উগড়ে ফেলা হলো আমি তখন সিম গাছের ছায়ার তলে। বাইরে গিয়ে দেখি সারা আকাশ মেঘে ঢাকা। সব সার বেঁধে গাছ হয়ে আছে, চোখে কাঁচ, কানে ঝুনঝুনি। ওরা দেখি এখন পিরামিড গড়া ছেড়ে গাছের চাষ করে। আমাকে দেখে নেকড়েরা আমাকে আবার ফেলে দিল মরাদের মাঝে। মরারা এক কালের কথা আরেক কালে ফিরিয়ে দিতে জানে। বলে: তুই আসলে গাছ, খাম্বায় বাঁধা, যা দেখিস তা মিথ্যা, যা শুনিস তা মিথ্যা। আমি ওদের মতো চোখে কানে হাত দিয়ে বলি: কই? সবইতো ঠিকঠাক! গাছ হবো কেন? আমি যে মানবের অতীত অতিমানব! ওরা এক সুর বলে: তুই নাকে হাত দিয়ে দেখ, জিভে কামড় দিয়ে দেখ, গায়ে চিমটি কেটে দেখ; তিনটে ইন্দ্রিয় তোর এপেনডিক্স হয়ে গেছে। আমি অস্ফুটে বলি: স্বপ্নাবিষ্ট উন্মাদের দল! তোমরাই ভুল করছো; ইন্দ্রিয় পাঁচটি নয় দুটি: কাঁচ আর ঝুনঝুনি। দুঃখে অভিমানে আমি নিজের সাথে নিজেই কথা বলি। ওরা একসুরে দুলে দুলে বলে: তোর যে কবি জরথুস্ত্রের বেশে বনে বনে ঈশ্বরের মরার সংবাদ ফেরি করে ফিরছিল তার তেজ ছিল; আমাদের সে তেজ কই! থাকলে বলতাম, তোর মনরো’র হাতের নীচে কিছু নেই রে মরা, ওটা কেবলই ছবি।
n

পূর্ববর্তী ব্লগ – সামাজিক ন্যায়বিচার

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী