ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

১। ইমানুয়েল কান্ট বা বেনেডিক্ট স্পিনোজার মতো দার্শনিকদের কাছে যৌক্তিকতা (রিজন) ও যুক্তির (লজিক) স্থান ছিল সবার উপরে; প্লেটো, এরিস্টটল বা ইবন রুশদের বেলায়ও কথা একই। স্পিনোজা রীতিমতো ইউক্লিডীয় জ্যামিতির মতো করে তার নৈতিকতা বিষয়ক মত প্রতিষ্ঠার প্রাণান্ত করে ছেড়েছেন। কিন্তু এসব চিন্তকের জীবন বা তাদের প্রত্যাশিত বা নির্দেশিত জীবন-রূপ কি শেষতক চিন্তাগতভাবে গণনাসর্বস্ব ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিরস যান্ত্রিকতায় পর্যবসিত হয়?—একটি ঘড়ি বা কম্পিউটারের জীবনের মতো? অন্যদিকে, কবি বায়রনের মতো রোমান্টিকতাবাদীদের নিকট আবেগের (প্যাশন) গুরুত্ব ও মূল্যই সর্বাধিক। আবেগ দিয়েই আমাদের জীবন জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়, উচ্ছ্বসিত ও আপ্লুত হয়। আমরা এ-ও দেখতে অভ্যস্ত যে, মানুষ সঠিকতার বা ভালোত্বের চেয়ে প্রবৃত্তিগত আবেগ নির্দেশিত সুখের জন্যই বেশি ব্যাকুল, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই যৌক্তিকতা বা নৈতিকতা নিতান্তই গুরুত্বহীন; অথবা তা একটি গৌণ বিচার্যবিষয় হয়ে থাকে মাত্র, যা আদতে সামাজিক বা গণ চাপের বিপরীতে আত্মরক্ষা বা আক্রমণের উদ্দেশ্যে প্রতিক্রিয়া মাত্র। আবার ভাল জীবন ও মন্দ জীবন নিয়েও আমাদের একটি ভাবনা রয়েছে; এখানে কর্মের ভাল-মন্দ বিচারটি নৈতিকতার সাথে সম্পৃক্ত। এখানে ব্যক্তি ও গণের মধ্যে একটি অদ্ভুত সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। নৈতিক নিয়ম ভঙ্গকারী যে ব্যক্তি দৃষ্ট ও অনুভূত সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে অবিচারমূলক মনে করেন, তিনিই আবার অন্যের বেলায় সেরূপ সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরিতে অংশীদার হয়ে থাকেন। কোন নৈতিক নিয়মের প্রশ্নে নীতিগতভাবে আমাদের অবস্থান এক হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান বিভিন্ন হতে পারে; বিত্তবানদের কাছে ভিক্ষাবৃত্তির মতো পাপ আর হয় না, আর বিত্তবঞ্চিতদের কাছে বিত্তই সব পাপের মূল।

২। যৌক্তিকতা ও যুক্তির পথ ধরে আমরা না পারছি জগত ও জীবনের চূড়ান্ত রহস্য উন্মোচন করতে, আর না পারছি সর্বসম্মত কোন ব্যবহারিক বা বাস্তবিক নৈতিক নিয়মাবলীতে উপনীত হতে। তবে জগত ও জীবন সম্পর্কীয় আমাদের প্রাথমিক ধারণা নৈতিক নিয়মাবলীর ধারণ-ধারণ নির্ধারণে যেমন ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনই বোধের পার্থক্যের কারণে জগত-জীবন সম্পর্কে একই ধারণা সম্বলিত দুটি গোষ্ঠী পরস্পর বিরুদ্ধ নৈতিক মতাদর্শ তৈরি করতে পারে। একই ধর্মে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও আমরা কাউকে পরার্থপর, মমতাময় ও কল্যাণকামী হতে দেখি আবার কাউকে বিদ্বেষপরায়ণ, যুদ্ধংদেহী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসী হতে দেখি। বস্তুগত ও পার্থিব স্বার্থভাবনা দ্বারা মানুষ যেমন চালিত হতে পারে তেমনই একটি আদর্শ বা ধর্মের মালিকানাবোধ ও তা সঞ্জাত গোষ্ঠী ধারণা থেকেও স্বার্থভাবনার উৎপত্তি হতে পারে। অন্যদিকে, আদর্শের মৌখিক দাবী বা একাডেমিক অবস্থান এবং বাস্তবে যাপিত জীবনের মধ্যেও দুস্তর ফারাক থাকতে পারে। আমরা আমাদের বৈষম্যমূলক সামাজিক ঐতিহ্য অথবা ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ সঞ্জাত অবস্থানকে আদর্শ সম্মত করে তোলার লক্ষ্যে যুক্তির বিন্যাস ঘটাতে পারি, যদিও এটি পক্ষপাতমুক্ত (ফেয়ার), বিষয়গত বা নৈর্ব্যক্তিক (অবজেক্টিভ) তথা শুদ্ধ যৌক্তিকতার পথ নয়; বরং এটি আদালতে নিজ মক্কেলের অনুকূলে উকিল কর্তৃক যুক্তি তৈরির অনুরূপ। দর্শনে এটি যুক্তাভাস (রেশনালাইজেশন) নামে পরিচিত।

৩। যেকোনো চিন্তানির্ভর কিন্তু প্রত্যয়প্রসূ ধর্ম বা দর্শন যৌক্তিকতার উপরেই প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু খোদ যৌক্তিকতার বৈধতার যুক্তি কী—এই প্রশ্নের সহজ ও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর আমাদের কাছে নেই। নৈতিকতা বা আবেগ—যেটিকেই আমরা বড় করে দেখি না কেন, অন্যের নিকট, বিশেষ করে প্রতিপক্ষের নিকট, বিষয়টিকে তুলে ধরার সময় আমরা যুক্তির আশ্রয়ই নিয়ে থাকি—যেন ‘যৌক্তিকতা’ উভয় পক্ষ কর্তৃক গৃহীত কোন নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারীর নাম। তাহলে কি আমরা এই দাবী করতে পারি যে, নৈতিক নিয়ম যুক্তি-নির্ভর? যা অযৌক্তিক তা-ই অনৈতিক? আবার যুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আমাদের ভুল হয়ে থাকে বলেও আমরা মনে করি। এই ভ্রান্তিকে পরিহার করার আবশ্যকতা কোথা থেকে আসে? ‘বেঠিক যুক্তি দিও না, সঠিক যুক্তি দাও’—এটি কি ‘বেঠিক কাজ করো না, সঠিক কাজ করো’র মতো একটি নৈতিক নিয়ম? এবার আবেগের সাথে নৈতিকতার সম্পর্কটিও বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। আমরা নানা রকমের অবেগানুভূতির মধ্যে ভাল-মন্দ, উচ্চ-নীচ ফারাক করে থাকি। আমরা আবেগ থেকে নৈতিকতায় উপনীত না হয়ে বরং নৈতিক ধারণা দ্বারা আবেগের বিচার করে থাকি, যা আবার একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া।

৪। আমরা যৌক্তিকতা ও নৈতিকতার মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টিকে আরও অগ্রসর করতে পারি। যুক্তির পথ ধরে নৈতিকতায় উপনীত হওয়া সম্ভব—এমন কথায় আমাদের আস্থা রয়েছে। কিন্তু এ দাবী কি করা যায় যে, নৈতিকতার যুক্তি-নিরপেক্ষ রূপ ও অবস্থান রয়েছে? ন্যায়বিচার যুক্তিনিরপেক্ষভাবেই ভাল ও কর্তব্য, এবং একইভাবে, অত্যাচার মন্দ ও পরিত্যাজ্য—যুক্তি দিয়ে এটিকে প্রমাণ করা সম্ভব, আবার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেও কথাটির সঠিকতা ক্ষুণ্ণ হয় না— এরূপ দাবী করা যায় কি? যুক্তির পথ ধরে যদি এই সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় যে, অত্যাচার মন্দ কিছু নয়, তবে কি এই দাবী করা যাবে যে, এই যুক্তি বিন্যাসের সূচনায় অথবা অগ্রগমনে নিশ্চয়ই কোথাও ভ্রান্তি রয়েছে? যদি কেউ অত্যাচারকে যুক্তির বিচারে পরিত্যাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অক্ষম হওয়া সত্ত্বেও অত্যাচার করা পরিহার করে চলেন তবুও অনেকেই তাকে নিম্নমানের মানুষ হিসেবে দেখবেন না। আমরা জানি, একটি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের উপর আঁকা বর্গের ক্ষেত্রটি ভূমির ও লম্বের উপর আঁকা বর্গ দুটির ক্ষেত্রের সমষ্টির সমান। জ্যামিতির সাথে এর সম্পর্কটি কিরূপ? স্পষ্টতই ত্রিভুজ তার সকল বৈশিষ্ট্য নিয়ে জ্যামিতির অগ্রগামী আবার জ্যামিতিসিদ্ধও বটে। যৌক্তিকতা ও নৈতিকতার সর্ম্পকটিও কি অনুরূপ? একথা কি বলা যায় যে, একটি শুদ্ধ নৈতিক নিয়মাবলী রয়েছে, যা শুদ্ধ যুক্তি দ্বারা সিদ্ধ করা সম্ভব এবং কোন যুক্তি দিয়ে সেই নৈতিক নিয়মকে ভ্রান্ত সাব্যস্ত করা হলে যুক্তিটিকেই ভ্রান্ত বলে দাবী করা চলে? এখানে আবার সেই পুরাতন প্রশ্নটি উপরে উঠে আসে: শুদ্ধ যুক্তির কাঠামো বা রূপ কী?

৫। অত্যাচারী কোন দার্শনিক, বিজ্ঞানী বা শিল্পীর চেয়ে অত্যাচার করা থেকে বিরত যেকোনো সাধারণ মানুষও উন্নততর মানুষ—এরূপ কথার বিরোধিতা করতে চাইবেন না অনেকেই। বৈষম্য ও শোষণ তথা অত্যাচার যদি স্বগতভাবেই অনৈতিক হয় তবে আমাদের অনেক আবেগই—যেগুলো বৈষম্য ও শোষণের দিকে একজনকে পরিচালিত করে—মন্দ ও পরিত্যাজ্য বলে পরিগণিত হতে বাধ্য। যৌক্তিকতা ও আবেগের সাথে নৈতিকতার এই সম্পর্কগত বৈশিষ্ট্য নৈতিকতাকে যৌক্তিকতা ও আবেগের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে। ফলে মানুষ একটি অত্যুন্নত যন্ত্র অথবা একটি অত্যুন্নত প্রাণী মাত্র না থেকে মুখ্যত একটি নৈতিক সত্ত্বা হয়ে উঠে। এক্ষেত্রে মানব জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা বৌদ্ধিক বা শৈল্পিক বা দৈহিক প্রতিভার দীপ্তির মাত্রা দ্বারা বিচার্য হয় না। কেবল নবী, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি, লেখক, গায়ক, শিল্পী, অভিনেতা, খেলোয়াড়, বীর, আমলা, ব্যবসায়ী হওয়ার কারণেই কারও জীবন সফল হলো—তা আর বলা চলে না; বরং এদের প্রত্যেকের জীবনের সফলতা-ব্যর্থতা নৈতিক নিয়মাবলীর সাথে তাদের যাপিত বাস্তব জীবনের সঙ্গতির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে। শুদ্ধ নৈতিক নিয়মাবলী ও তার উৎস যা-ই হোক না কেন, আমরা যদি নীতিগতভাবে একথা মেনে নেই যে, নৈতিকতার সাথেই জীবনের সাফল্য ও তাৎপর্য সম্পর্কিত, তবে জীবনকে গড়ার প্রশ্নে অনেক প্রভাবশালী দার্শনিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য, পদ্ধতি ও পরিকল্পনার সাথে একাত্ম হওয়া এবং এগুলো থেকে জাত মূল্যমানগুলোকে গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে।

৬। পক্ষপাতমুক্ত নৈর্ব্যক্তিক যৌক্তিকতা বা যুক্তিশীলতার সম্ভাবনার মতো নৈতিকতায়ও নৈর্ব্যক্তিকতা বা নিরপেক্ষতার সম্ভাবনা আছে কি? অর্থাৎ সার্বজনীন বা শুদ্ধ যৌক্তিকতা ও সার্বজনীন বা শুদ্ধ নৈতিকতা বলে কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে কি? যদি থাকে তবে তার সত্ত্বাগত উৎস কী এবং মানবসমাজ কর্তৃক গ্রহণীয় হওয়ার যৌক্তিক ভিত কী। বাস্তবে এখনও সার্বজনীন যৌক্তিকতা বলে কোন কিছুতে আমরা সম্মত হত পারিনি, যদিও সাদামাটাভাবে বা ভাসাভাসাভাবে কথাটি অনেক সময়ই ব্যবহার করে থাকি। যৌক্তিকতার সীমাবদ্ধতা ও তদ্‌জাত বহুত্বই আমাদের মতবিরোধের অনেক কারণের একটি। বহু যৌক্তিকতার প্রতিটিই আবার জাতিগত, সম্প্রদায়গত, শ্রেণিগত ইত্যাদি পর্যায়ে সার্বজনীনতা এমনভাবে তৈরি করতে পারে যা মূলত বদ্ধমত ভিত্তিক ঐক্য হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়াও সকল সংস্কারের পক্ষে তার অধিকারীর নিকটও যুক্তি থাকে। নৈতিকতার ব্যাপারেও অনুরূপ পরিস্থিতি বিদ্যমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের অন্বেষণ কাজটি থেমে নেই; যা দুটি বিষয়কে নির্দেশ করে—তাদের একটি দুঃখজনক বাস্তবতা ও অন্যটি আশাব্যঞ্জক প্রত্যাশা। দুঃখজনক বিষয়টি হচ্ছে, আমাদের ইতিহাস প্রধানত অত্যাচার, বৈষম্য ও শোষণের ইতিহাস। আমরা নিজেরাই আমাদের অবস্থা ও ক্রিয়াকাণ্ড নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমাদের মধ্যে বিভাজন ও অবিশ্বাস অত্যন্ত গভীর ও দুস্তর। নানাবিধ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সুবাদে সংঘাত হয়ে উঠেছে ভয়াবহ; যার চিত্র আমরা দেখি জোনাথন গ্লোভার’য়ের “হিউম্যানিটি: এ মোরাল হিস্ট্রি অব দি টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি” বইটিতে। অন্যদিকে আশার বিষয়টি হচ্ছে আমাদের এই প্রত্যাশা যে, সার্বজনীন বা নৈর্ব্যক্তিক বা শুদ্ধ যৌক্তিকতা সম্ভব, অথবা অন্তত অধিকাংশ মানুষের পক্ষে পক্ষপাতমুক্তভাবে শুদ্ধ যুক্তি অবলম্বন করে যুক্তিশীল হয়ে উঠা সম্ভব। একইভাবে মানবজাতির পক্ষে যথাযথ নৈতিক নিয়মাবলীও খুঁজে পাওয়া যেমন সম্ভব হতে পারে, তেমনই সেগুলোকে বাস্তবে অনুসরণ করে চলাও সম্ভবপর হতে পারে। এই আশার বাণীই আমরা শুনতে পাই অমর্ত্য সেন’য়ের “দি আইডিয়া অব জাস্টিস” গ্রন্থটিতে।

৭। একথা বোধ হয় কেউই অস্বীকার করবেন না যে, মানবজীবনে আবেগও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গরম আবেগের প্রাবল্য ও ঠাণ্ডা যৌক্তিকতার হিসাবের মধ্যে কোনটির তাড়ন-শক্তি বেশী এবং আমাদের নৈতিকতাবোধের সাথে আবেগের সম্পর্কই বা কী—তা নিয়ে নানা রকম কথা সম্ভব। মানবজাতিকে নিয়ে এ বিষয়ে কোন সার্বিক কথা বলা শক্ত। বিভিন্ন ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক গঠনে বেশ পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত দার্শনিক-বিজ্ঞানীরা যুক্তি দ্বারা ও কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা আবেগ দ্বারা বেশি পরিচালিত হন। আমাদের সকল নৈতিক নির্বাচনের পেছনে আবেগের ভূমিকা রয়েছে, তবে যুক্তির কাছে পরাজয় মেনে আবেগের আগের নির্বাচনকে আমরা অনেক সময় ত্যাগও করে থাকি। জগত-জীবন সম্বন্ধীয় দার্শনিক মততন্ত্রগুলোর নির্মাতা কেবল যে যৌক্তিক চিন্তা তা নয়, এর পেছনে আবেগেরও ভূমিকা থাকে। একটি অবিচারমূলক অবস্থা বা কন্ডিশনের প্রতিক্রিয়ায় বিপরীত দার্শনিক মততন্ত্র তৈরি হতে পারে, যেক্ষেত্রে আবেগ চালকের ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগে ইউরোপে ইনকুইজিশনসহ নানা প্রকার অত্যাচার ও অবিচারের সাথে যাজক সম্প্রদায়ের জড়িয়ে পড়ার কারণে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি তার অনুরূপ প্রতিক্রিয়া আমরা তখনকার মুসলিম বিশ্বে বা প্রাচ্যের বৌদ্ধ বিশ্বে দেখিনি। শিল্পকলা ও কাব্যের অধিষ্ঠানও এই আবেগানুভূতির দুনিয়ায় এবং এগুলো গণমানুষের আবেগকেও প্রভাবিত করতে পারে। ব্যক্তির বস্তু-দেহ-অতিক্রমণের (ট্রন্সেন্ডেন্স) অভীপ্সা অথবা বস্তুবাদী অবস্থান উভয়ই আবেগ দ্বারা তৈরি বা নির্ধারিত হতে পারে। চিন্তার ভাষা ও বিন্যাসে নতুনত্ব ও সৌকর্যও আমাদের আবেগকে নাড়া দিতে পারে, যদিও পরবর্তীতে ভ্রান্ত সাব্যস্ত হয়ে তা পরিত্যক্ত হতে পারে। তবে নৈতিকতার সাথেই আবেগের সম্পর্ক, যৌক্তিকতার সাথে তার সম্পর্কের চেয়ে বেশী ঘনিষ্ঠ বলেই মনে হয়। আমরা নৈতিকতা তথা ন্যায়-অন্যায় বা ভাল-মন্দ সংশ্লিষ্ট ধারণাকে সমর্থন করি প্রধানত প্রত্যক্ষ বা অব্যবহিত বা সজ্ঞা সঞ্জাত বোধ বা অনুভব থেকে, যৌক্তিকতা থেকে নয়। কিন্তু নৈতিক নিয়ম প্রয়োগের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতাই আমাদেরকে পথ দেখাতে পারে আর সেপথে চলতে শক্তি যোগায় আবেগ এবং আবেগই পথ চলাকে আনন্দময় করে। অন্যদিকে, আবেগ আমাদেরকে ভ্রান্ত পথেও পরিচালিত করতে যথেষ্ট সক্ষম, যে কারণে আবেগকে যৌক্তিকতার নজরদারিতে রাখার প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য যেন নৈতিকতা নির্দেশিত সীমা লঙ্ঘিত না হয়।

৮। আমাদের জীবনে নৈতিকতা, যৌক্তিকতা ও আবেগ—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। এরা একে অপরের সাথে তাৎপর্যপূর্ণভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছে। আমাদের পক্ষে তাদেরকে সমন্বিত করাও সম্ভবপর। যৌক্তিকতা যখন নৈতিকতাকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হয়, আবেগ যখন নৈতিকতাসমৃদ্ধ হয়, নৈতিকতা যখন আবেগতপ্ত হয় তখন নৈতিকতা, যৌক্তিকতা ও আবেগের মধ্যে সম্মিলন ঘটে। আমরা এখন একটি উপসংহার টানার চেষ্টা করতে পারি: (ক) নৈতিকতা হচ্ছে যৌক্তিকতা ও আবেগের অগ্রবর্তী এবং নৈতিক নিয়মের বিচারেই জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ধারিতব্য। এটি হচ্ছে কিতাব, যাকে যৌক্তিকতা বা আবেগ বাতিল করতে পারে না, বরং তাদেরকে কিতাবের অনুবর্তী হতে হয়। নৈতিকতা হচ্ছে শর্তহীন আদেশ বা ঈশ্বরের অনুজ্ঞা। (খ) নৈতিক নিয়মগুলো প্রয়োগ করে চলার বাস্তব ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা আমাদেরকে তুলনামূলকভাবে শ্রেষ্ঠ বিকল্পটি খুঁজে বের করে দিতে পারে; অর্থাৎ যৌক্তিকতা পথ দেখায় ও পথে আলো ফেলে। এই সক্ষমতাকে বলা যায় হিকমাহ বা প্রজ্ঞা বা দার্শনিকতা। (গ) আবেগ আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ বিকল্পটিকে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে, সেপথে চলার শক্তি যোগায় এবং পথ চলাকে আমাদের জন্য স্বস্তিময় করে তোলে। আবেগানুভূতিগুলোর মধ্যকার যেগুলো আমাদেরকে কিতাবে থেকে দূরে সরিয়ে নেয় সেগুলোর প্রাবল্য থেকে মনকে পরিশুদ্ধ করা ও যেগুলো ইতিবাচক সেগুলোকে প্রবল রাখার কাজটিই হচ্ছে তাযকিয়া।

n

আরও দেখতে পারেন: নবীদের তিনটি কাজ: গ্রন্থ, প্রজ্ঞা ও পরিশুদ্ধি

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী