ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

দূর অতীতের কথা। সেই পুরাতন কাল হইতে সুন্দরবন-মধ্যে ব্যাঘ্র সমাজে মহা দুর্দিন চলিয়া আসিতেছিল। প্রতিবেশী অন্য দুই রাজ্য মহাসমারোহে পরস্পরকে জয়ের নেশায় সহস্র সহস্র যোজন পাড়ি দিয়া অভিযানের পর অভিযান করিয়া চলিলেও কোন পক্ষই এই বনের দিকে চাহিয়াও দেখিত না। বিস্তীর্ণ বন জুড়িয়া বন্ধনমুক্ত শিশু বাঘেরা মহানন্দে ছুটিয়া বেড়াইলেও পুরুষ বাঘেরা সব নিজেরা নিজেরা হানাহানিতে নিমগ্ন ছিল, আর সকল পুরুষে মিলিয়া নারী বাঘদের জীবন অতিষ্ঠ করিয়া তুলিয়াছিল। কোন বাঘিনীর চলনে বক্রতার চিহ্ন দৃশ্যমান হইলেই তাহাকে বন্দিনী হইতে হইত। ভগবান স্বর্গ হইতে ইহাই অবলোকন করিয়া চলিতেছিলেন। দেবতারা আবেদন করিলেন, হে ভগবান! নিরক্ষর শিশুদিগের জন্য আদমের ভাণ্ডার হইতে কিছু কণা মঞ্জুর হোক, উচ্ছৃঙ্খল পুরুষদিগের সুমতির জন্য লুকমানের ভাণ্ডার হইতে কিছু টুকরা মঞ্জুর হোক। ভগবান কহিলেন, উহু! পুরুষকেও বন্দীর ব্যবস্থা হউক—কেবল নারীই বন্দী থাকিবে কেন? দেবতারা দ্বিধান্বিতচিত্তে কহিলেন, প্রবলদিগকে এখনই কুপিত করিয়া তুলিলে হিতে বিপরীত হইতে পারে, বন উজাড় হওয়া সম্ভব। সদয় ভগবান স্বীয় ভাণ্ডার হইতে আলোর কণা ও নীতির টুকরা উভয়ই মঞ্জুর করিয়া কহিলেন, তবে তিনটি ব্যবস্থা একত্রেই লওয়া যাক, তোমরা সকলে মিলিয়া নামিয়া গিয়া যজ্ঞাগ্নি প্রজ্বলন কর।

বিষয়টি উত্তমরূপে বোধে আনিতে হইলে দলে দলে দেবতাদের সুন্দরবনে নামিয়া আসিবার কালের আগের মূর্খতাকে বুঝিতে হয়। আমাদের এই কালের সাথে মূর্খতার সেই কালের পন্থাগত বেশ অমিল থাকিলেও মনস্তত্ত্বের ফারাকটা যেহেতু খুব বেশী নহে, সেহেতু আমাদিগের পক্ষে সেই কালটিকে বুঝিতে কষ্ট হইবার কথা নয়। সেই কালে চলনকে ভিত্তি করিয়া বাঘিনীদের সাথে এমন আচরণ করা হইত যাহা দেখিয়া যুক্তিনিষ্ঠ এলিয়েনদিগের পক্ষে এই নির্ণয়ে উপনীত হওয়া ছাড়া অন্য গতি নাই যে, সংঘটিত কর্মটি অবশ্যই এমন কোন অপরাধ যাহার মধ্যে পুরুষের অংশ গ্রহণের কোনই সামর্থ্য বা সম্ভাবনা নাই। ব্যাঘ্র সমাজে বঙ্কিম চলনের অভিযোগে বা রটনায় বাঘিনীকে বন্দী করিয়া রাখা যাইত, আর পুঙ্গব অন্বেষণকে অদরকারী জ্ঞান করিয়া নারী নিগ্রহের দরকারি কাজে মনঃসংযোগে করা হইত। কাঁদিয়া কাটিয়া হাত জোড় করিয়া মাফ চাহিলেও পুঙ্গবদিগের অন্তর প্রস্তরবৎ অনমনীয় থাকিত।

ভগবান ব্যাঘ্রদিগের চিরাচরিত পথেই পুঙ্গবদের বন্দী করিবার আয়োজন করিলেন। তদপূর্বে কণা ও টুকরা সহযোগে না-ফরমান না-যুক্তি ব্যাঘ্রদিগকে হ্যাঁ-ফরমানিতে হ্যাঁ-যুক্তিতে অভ্যস্ত করিয়া লইলেন। অতঃপর পুঙ্গব বন্দীর ফরমান লইয়া দেবতারা হাজির হইয়া ব্যাঘ্র সমাজকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, ভগবান চাহেন তোমরা ইহা গ্রহণ কর; হে ব্যাঘ্র সমাজ! ভগবান ফরমাইয়াছেন, “বঙ্কিমা দেবীকে তাহার নিজ গৃহে আমরণ অন্তরীণ করিবে, কিন্তু তদপূর্বে চারিজন সাক্ষী আনিবে এবং কথা এতদমাত্র নহে, চারিজনকে নিজ দায়িত্বে সাক্ষ্য দিতে হইবেক। আর অপেক্ষা কর, বাঘিনীদের মুক্তির পথ লইয়া আমরা আবার আসিতেছি। আর একটি কথা, তোমাদের কাণ্ড-জড়িত দুইজনকে শাস্তি দেওয়া চাই কিন্তুক। অধিকন্তু তাহারা যদি অনুতপ্ত হয় শুদ্ধ হয় তবে তাহাদের কাহারও পিছনে ফেউ হইয়া থাকিবে না।”

এই অন্তর্বর্তী ফরমানের প্রয়োজন ছিল কিনা তাহা প্রশ্ন সাপেক্ষ হইতে পারে। তবে প্রবলদিগকে লইয়া ভগবানের নিশ্চয়ই কোন পরিকল্পনা আছে ভাবিয়া দেবতারা চুপ থাকিলেন। অন্যদিকে, নারীর সাজা মরণতক লম্বিত হইলেও পুঙ্গবেরা আহ্লাদিত হইতে পারিল না; কথার সুতা ধরিয়া সেই কারাবাস পুঙ্গবদের নসিবে গিয়াও আপতিত হয়। বাঘিনীগণ ভগবানের কাণ্ড দেখিয়া, প্রতিশ্রুতি শুনিয়া, পুঙ্গব সমাজের বর্তমান অবস্থা সন্দর্শন করিয়া এবং তাহদিগের আসন্ন দুর্দশার চিত্র কল্পনা করিয়া পুলকিত হইলেন। ফরমাবরদার শুদ্ধ ব্যাঘ্ররা বুঝিলেন পুঙ্গবদিগের আর রক্ষা নাই। প্রমাণাভাবে বাঘিনীকে বন্দী করা যাইবে না, প্রমাণসম্পদে পুঙ্গবের ভিন্ন গতি হইবে না। মাফ চাহিয়া ভাল হইয়া ছাড়া পাইলে তথারূপে বাঘিনীকেও ছাড়িয়া দিতে হয়। পুরুষের বিরুদ্ধে কোন কালে ফেউগিরি না করিলেও এইবার ফেউবৃত্তি ছাড়িতে হয়। ফরমানে পুঙ্গবদের মুক্তির কোন প্রতিশ্রুতি না থাকিলেও আশান্বিতা বাঘিনীদের সহিত ভগবানের কৃপার অপেক্ষায় ইহারাও দিবস গুণিতে লাগিল।

কিন্তু ভগবানের দূতিয়ালিতে নৈরাজ্য রামরাজ্য হইয়া উঠিলেও সকল ব্যাঘ্রই যে শুদ্ধ হইয়াছিল তাহা নহে—অনেকে ময়লা ধুইবার বদলে চাদর দিয়া কয়লা ঢাকিয়া ঘাপটি মারিয়া অপেক্ষায় থাকিল। না হয় না দেখিয়া অভিযোগ না করিলাম, না হয় দেখিয়াও অভিযোগ না করিলাম, কিন্তুক না দেখিয়া কানে কানে রটাইতে দোষ কী। ব্যাঘ্র রাজ্যে রাম আছেন, সীতাও আছেন। আমাদিগের এই গতি যাহারা করিয়াছেন দেখিব এইবার তাহারা কী করেন। উদ্বোধনে সীতাতেই সুবিধা দেখিয়া ভগবানও মৃদু হাসিয়া অপেক্ষায় থাকিলেন।

সেই সুযোগ আসিল। সীতার নামে কলঙ্ক পড়িল। রাম ভগবানের শরণাপন্ন হইলেন। ভগবান রজ্জু শিথিল করিয়া নীরব হইলেন। ভগবানের নীরবতায় রাম অচল হইলেন। রামের অচলাবস্থা দেখিয়া সীতা অভিমানে কাঁদিয়া কাটিয়া পিত্রালয়ে আশ্রয় লইলেন। রাম ও সীতার দশা দেখিয়া শিথিল রজ্জু বাহিয়া দুর্মুখদের সাহস বাড়িল। রটনার বাতেন নেতারা জাহের হইতে কুণ্ঠাহীন হইল। কয়লাদিগের সহিত কতিপয় রাম-ভক্তও জুটিল।

কিয়ৎ কাল গত হইলে রাশে টান দিয়া ভগবান কহিলেন, এইবার পুরুষের গায়ে আশি কষাঘাতের ব্যবস্থা হউক—কেবল নারী দেহই রক্তাক্ত হইবে কেন? দেবতাগণ পুঙ্গব প্রহারের ফরমান লইয়া পুনরায় নামিয়া আসিয়া ভগবানের হুংকার পেশ করিলেন, ব্যাঘ্রগণ! ভগবান ফরমাইয়াছেন, “বঙ্কিমা দেবী ও বঙ্কিম বাবু সকলের প্রত্যেককে শত কষাঘাত করিবে। এবং সুচরিতা বাঘিনীদের বিরুদ্ধে যাহারা মুখ খুলিবে, কিন্তুক চারিজন সাক্ষী আনিতে ব্যর্থ হইবে তাহারা অশীতি কষাঘাত লইয়া ফেরত যাইবে। ইহাদের সাক্ষ্য কুত্রাপি কদাচ আর গ্রাহ্য হইবেক না।”

এইবার দুষ্ট বাঘদিগের মুখে কুলুপ পড়িল—হেন কঠিন শাস্তির ফরমানে নারীর নাম আগে দেখিয়াও তাহারা খুশি হইতে পারিল না। চোখে না দেখিয়া কিছু মুখে না আনিবার শিক্ষা তাহাদের আগেই হইয়াছিল। এইবার দেখিয়াও মুখে আনিতে সাহস হারাইল, পাছে না উল্টা মুখে চুনকালি ও পিঠে দাগ লইয়া ফিরিতে হয়। শুদ্ধ ব্যাঘ্রদের বুঝিতে বাকি রহিল না, অবস্থা বেগতিক, প্রমাণ করিতে না পারিলেই ভগবানের ফরমানে কথকেরা সকলেই মোহরাঙ্কিত মিথ্যাবাদী; এক মামলা—এস্পার নয় ওস্পার, বাঘিনীর মানহানির মামলার কষ্ট নাই। বাঘিনীরা মুক্তির পথ পাইয়া আহ্লাদিত হইল, পুঙ্গবসমর্থকেরা মিথ্যাবাদীর দপ্তরে আজীবনের জন্য বন্দী হইয়া থাকিবার ভয়ে কম্পিত হইয়া ফরমানের দোষ খুঁজিতে লাগিল, ভগবানকে বাঘিনীদের পিতা বলিয়া গালমন্দ করিল।

দেবতারা আরও বলিলেন, হে ব্যাঘ্র সমাজ! ইহাই ভগবানের নির্ণয়: “তাহারা চারিজন সাক্ষী উপস্থিত করে নাই কেন? অতএব, যেহেতু তাহারা সাক্ষী আনায়ন করে নাই সেহেতু ভগবানের নিকট তাহারা মিথ্যাবাদী।” শিষ্ট ব্যাঘ্ররা বুঝিল আর মুক্তির পথ নাই, মামলা শুরু করিবার সুযোগ নাই, সাক্ষী-সবুদ আনিবার আবেদনের সময় নাই, বাকী কেবল ভাসিয়া উঠা রাম-ভক্ত রুহিতের সন্ধান। সুন্দরবনের পুঙ্গব সমাজ আইনের এহেন ব্যতিক্রমী ভূতাপেক্ষ প্রয়োগে স্তম্ভিত হইয়া বিস্ফারিত নেত্রে দেখিল এককালে যেই পিঠে চড়িয়া নারীর দেহকে রক্তাক্ত করা যাইত, সেই একই পিঠে চড়িয়া ভগবানের প্যাঁচে পড়িয়া এক্ষণে পুরুষের দেহ রক্তে ভাসিতেছে। কয়লারা নিজদিগের পিঠ বাঁচিল দেখিয়া এবং প্রশ্ন তুলিলে ময়লা দৃশ্যমান হইয়া পড়িবে বুঝিয়া চুপ করিয়া থাকিল।

রটনায় ক্লিষ্ট নারী সমাজের মর্মজলের গভীরতা এবং হেন হেনস্থায় হতচকিত পুঙ্গব সমাজের মর্মাগ্নির হুতাশনের চিত্র আঁকিবার ভার শিল্পীদের হাতেই থাকিল। ভগবান ক্লিষ্ট সমাজকে সান্ত্বনা দিয়া কহিলেন যাহা ঘটিয়াছে তাহাতেই মঙ্গল, আর আমরাও রাবণগুলিকে আশ্বস্ত করিয়া বলিতে পারি প্রমাণসম্পদে সীতার পিঠে যতখানা পড়িত প্রমাণাভাবে তোমাদের পিঠের জন্য ভগবানের কৃপায় তদপেক্ষা কুড়িখানা কম রহিল।

দেবতাগণ ফিরিয়া গেলেন, ভগবান আবার চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে বসিলেন। শত কতক বর্ষ অতিক্রান্ত হইল। পুঙ্গব ব্যাঘ্ররা কথা বানাইবার কারখানা বসাইল, রামের মুখে লক্ষণের মুখে নিজেদের গলিত মস্তিষ্ক জাত পচিত মুখ প্রসূত কুৎসিত কথা তুলিয়া দিল। ব্যাঘ্র সমাজে যাহাদিগের নামে পণ্ডিত বলিয়া রটনা আছে তাহাদিগের মাথা ঘর্মাক্ত হইল, তাহারা সংঘ গড়িল, রাম-লক্ষণের সুকথার কুঅর্থ কুভাষ্য রচিত হইল, নানা অসংলগ্ন কথা ও মিথ্যা দিয়া শত সহস্র কাগজ মসিলিপ্ত হইল, মাথার ফসল কারখানার মাল হইয়া বিশ্বময় ছড়াইয়া পড়িল। শব্দ কতক বিকৃত করিয়া, কতক গুপ্ত করিয়া বাঘিনীগণকে পুঙ্গবদিগের হাতে পূর্বরূপের মার্জিত রূপে ন্যস্ত করা হইল—বাঘিনীর অধিকার পণ্ডিতের মসি ও বাঘের অধিকার বাঘের অসিতে স্থান লইল। ভগবানের এককালের নির্বাচিতদের যে বিকৃতি ও গুপ্তি সাধনা তিরস্কৃত হইয়াছিল, সেই কাণ্ড করিয়া সেই কাহিনী জানা নতুনেরা পুরস্কৃত হইল।

বাঘিনীদের চলন লইয়া ব্যাঘ্রমনের তত্ত্ব বা সাইকোলজি সেই প্রাচীন কাল হইতেই যুক্তিছাড়া ও খাপছাড়া। এটিকে কেন্দ্র করিয়া নিজেকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করাইতে তাহারা দ্বিধা পর্যন্ত করে না। অন্য ক্ষেত্রে যাহাকে ন্যায় জ্ঞান করে, এই ক্ষেত্রে বিপরীতটা লইয়া তাহাদের অহংকার। ক্ষেত্রান্তরে যাহা মুখে আনিতে লজ্জায় মরিয়া যায়, এই ক্ষেত্রে তাহারা অবলীলায় লজ্জার মাথা খাইয়া বসে। তাল গাছটি নিজের করিবার জন্য প্রতিপক্ষকে অপমান করিতে যেখানে তাহাদের কদাচ বাঁধে না, সেখানে এই ক্ষেত্রটিতে তাল গাছের জন্য নিজের মুখে অযথাই চুনকালি লেপন করিতে দ্রুত ধাবিত হয়। উহারা অবলা, উহাদিগের মাথায় বুদ্ধি অনধিক ইত্যাদি বিচিত্র বাক্যবাণে নারীরা জর্জরিত হইলেও এই ক্ষেত্রে তাহারা নিজেদেরকে “নারী” করিয়া তুলিতে পারে। পুঙ্গবেরা এই সূত্র আবিষ্কার করিয়াছে যে, পুঙ্গবদিগের দোষ অধিক নহে, পুঙ্গব যে মাজুর, অবল, অক্ষম। প্রতিপক্ষের শক্তির বড়াইয়ে ওষ্ঠাগত প্রাণ লইয়া বাঘিনীদের দেখিতে হয়, গর্ভধারণের সামর্থ্যের অভাবকে ইহারা দারিদ্র্য না ভাবিয়া সম্পদ জ্ঞান করিতেছে। নারীদেরকে বুঝাইয়া দেওয়া হইল এবং তাহারা বুঝিয়াও ফেলিল যে, নান্দনিক পুরুষের নিকট সে প্রমোদ পুতুল ব্যতীত কিছু নহে, শিষ্ট পুরুষের নিকট সে উৎপাদন যন্ত্র অপেক্ষা অধিক কিছু নহে, আর মর্যাদাবান পণ্ডিত পুরুষের অনুগতা না হইলে তাহার জপতপ সবই বৃথা, ভগবান চাহিয়াও দেখিবেন না।

পুঙ্গব বন্দীর ফরমান পরিষ্কার ছিল। সাক্ষীরা যেহেতু বেচারা গোপাল নহেন বরং গর্বিত চক্ষুষ্মান এবং যেহেতু কাণ্ড একাকিনী সাধনীয় নহে, সেহেতু সাক্ষীদিগের চোখে পুঙ্গবটিকেও পড়িতে হয়। তবুও পণ্ডিতদের মাঝে বিশাল বিতণ্ডা বাঁধিয়া গেল। স্বার্থৈক্যে সকলেই একমত হইলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই পরের শাস্তিটা আগের শাস্তি নহে। শাস্তিটা যে অন্য এই মীমাংসায় তাহাদের এজমা থাকিলেও, এখতেলাফ দেখা দিল অপরাধী দুইজন কাহারা তাহা লইয়া। সুদূর অতীতে ভগবান কর্তৃক নির্বাচিত কোন এক সম্প্রদায়ের কোন এক ব্যক্তি খুন হইবার পর বাঁধিয়া যাওয়া ঘোর বিতণ্ডার কথা শুনিয়াও শিক্ষা না লইয়া তাহারা বরং উহাদের যোগ্য উত্তরাধিকারী হইলেন। কেহ বলিলেন, ইহারা দেবীটি ও বাবুটি, আবার কেহ বলিলেন, না, না, না, ইনারা অন্য দুই পুঙ্গব। তবে অরুচির বশেই কি নির্বুদ্ধিতার বশেই হউক, বা দুই পুঙ্গবের মহামিলনে নতুনের সম্ভাবনার অবিদ্যমানতার কারণেই হউক, দুই-পুঙ্গব তত্ত্বের হদিস না করিলেও আমাদের ক্ষতি নাই। কিন্তু আসলটির তত্ত্ব তালাশ করিলে আমাদের মত বুদ্ধিহীনদের কপালে বুদ্ধির সন্ধান মিলিতেও পারে।

বুদ্ধিমানদিগের বুদ্ধি আছে। তাহারা মত দিলেন, দেবীটিকে বন্দী তো করিতেই হইবে এবং দুজনকেই অন্য কোন শাস্তিও দিতে হইবেক। কিন্তু শাস্তির এই দ্বিতীয়টি কী? তাহারা এজতেহাদ করিয়া নির্ণয় করিলেন: তিরস্কার কর, অপদস্থ কর, এমনকি ইচ্ছা হইলে জুতা পর্যন্ত মার। অতীতের মূর্খরা যে নন্দটিকে যুক্তির মাথা খাইয়া টোকা পর্যন্ত দিতে চাহিত না, ভগবানের প্যাঁচে পড়িয়া যুক্তি দেখাইয়া এক্ষণে নব পণ্ডিতেরা সেই বাবুটিকে জুতা মারিতেও দ্বিধা করিতেছে না দেখিয়া দেবতারা ভিরমি খাইয়া ভগবানকে শুধাইলেন, হে ভগবান! ইহারা নিজেদের গালে নিজেরাই জুতা মারিবার বিধান করিতেছে কেন? ভগবান কহিলেন, ভাবিয়া দেখ, নয়তো তাদেরকেই গিয়া জিজ্ঞাসা কর; আমার ফরমানে তো জুতার কথা ছিল না।

পুঙ্গব প্রহারের ফরমানের ঐখানে কী পরিণতি হইয়াছে, কিভাবে গোঁজামিলের খিচুরি রান্না হইয়াছে তাহা উদ্ধারের ভার আপনার উপর থাকুক। আমি বরং পুঙ্গব বন্দীর এইখানে কী লাভ হইল তাহার হিসাব করি। পুরুষের কপালে জুতা জুটিলেও বিনিময়ে মুক্তি মিলিল; নারীর কপালে লটকানো গেল জুতাসহ বন্দিত্ব। জুতা সহযোগে যদি রত্নগুলিকে মুক্ত করা যায় তবে মন্দ কী! যেহেতু সেকালে ফিরিয়া যাইবার যন্ত্র নাই, যেহেতু এই শাস্তির বিধান রহিত, সেহেতু পুরুষের মুখে জুতার বাড়ি কাগজে কলমে পড়িয়া থাকিবে। জুতার বিনিময়ে পুঙ্গব সমাজকে আজিকে মুক্ত করা গেলে ভাবীকালে অপর পক্ষের মুক্তির বিনিময়ে জুতা হইতেও রক্ষা সম্ভব। মাল না ঢালিলে চুনকালি বা জুতা হইতে নারীর তো রক্ষা থাকিল না!

দেবতারা পাখায় ভর করিয়া চলেন। যুক্তির রজ্জু বাহিয়া টারজানের ন্যায় তাহারা কোথাও যাইতে পারেন না বিধায় উক্তির মর্মকূপে পড়িয়া থাকেন। ভগবানের নিকট উত্তর না পাইয়া সহস্র বর্ষ কূপে ব্যয় করিয়াও যখন জুতার তালাশ মিলিল না, তখন জুতা আবিষ্কারক পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে তাহারা পাখায় ভর করিলেন। নামিয়া আসিয়া দেখিতে পাইলেন বিশ্ব জুড়িয়া বহুবিধ ছাপাখানায় ঘরঘর শব্দে ভীমাকৃতির সব চক্র ঘুরিতেছে। সহস্র বৎসরের জঞ্জাল সকল রিসাইকেল্ড হইতেছে। সংঘের অধিপতিরা সরবে সড়কাদি প্রকম্পিত করিতেছে। ভগবানের ফরমানের নামে জাল ফরমান আকাশে বাতাসে উড়িতেছে। জাল ফরমান এখন ভগবানের ফরমান জ্ঞানে পূজিত হইতেছে।

[সত্যি হোক কি মিথ্যে, মূর্খ লেখকের দাবী, এ গল্পের কাহিনী ও চরিত্র সবই কাল্পনিক। কোন চতুর পাঠক যদি বাস্তবের সাথে কোথাও কোন মিল খুঁজে পান তবে তা তাঁর নিজের বুদ্ধিজাত।]

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী