ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

kant1১.১। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) আধুনিক দর্শনের কেন্দ্রীয় অবস্থানটি ধারণ করে আছেন। তার অন্যতম তিনটি বই হচ্ছে দি ক্রিটিক অব পিওর রিজন (১৭৮১), দি ক্রিটিক অব প্র্যাকটিক্যাল রিজন (১৭৮৮) ও দি ক্রিটিক অব দি পাওয়ার অব জাজমেন্ট (১৭৯০)। যৌক্তিকতা বা বিচারবুদ্ধি বা বুদ্ধি (reason) কান্টের নিকট উচ্চ গুরুত্বের অধিকারী ছিল। তার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাবনা বিচারমূলক হলেও তাকে শেষ বিচারে ভাববাদী ও বুদ্ধিবাদী ধারার দার্শনিকদের বর্গেই ফেলা যায়। তাছাড়া তিনি ঈশ্বর, স্বাধীনতা ও অমরত্বকে নৈতিকতার প্রতি সর্বান্তরিক অঙ্গীকার ও নিষ্ঠার জন্য আবশ্যক বলে মনে করতেন। এ আবশ্যকতা ও অপরিহার্যতাকে তিনি ধর্মের যৌক্তিক ভিত্তি মনে করতেন, যদিও তিনি এও বলেছেন যে, নৈতিক আবশ্যিকতা বা যৌক্তিক প্রয়োজন বাস্তবতার নির্দেশক নয়। তিনি তার নৈতিক মত ঈশ্বর ও পরকালকে বাদ দিয়ে কেবল স্বাধীনতাকে গ্রহণ করে তৈরি করেছেন। এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, তিনিই প্রথম দক্ষতার সাথে বিশ্লেষণ করেছেন যে, জগত সম্বন্ধে আমাদের মূল্যায়ন ও নৈতিক নিয়মাবলী যৌক্তিকতা থেকে আসে না, আসে ইচ্ছা থেকে; এবং যথার্থ নৈতিক সূত্রাবলী পাওয়া যায় ইচ্ছার ভালোত্ব থেকে। নৈতিকতা বিষয়ে তার মূল দাবী হচ্ছে, একটি মাত্র বিষয় আছে যা কোনরূপ শর্ত ছাড়াই ভাল—আর তা হচ্ছে ভাল ইচ্ছা। নৈতিকতা বিষয়ে তার অন্য দুটি লেখা হচ্ছে গ্রাউন্ডওয়ার্ক অব দি মেটাফিজিক্স অব মোরালস (১৭৮৫) এবং দি মেটাফিজিক্স অব মোরালস (১৭৯৮)।

১.২। ইকবাল কান্টকে জার্মানদের প্রতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান বলে অভিহিত করেছিলেন। কান্টের বিচারমূলক জ্ঞানতাত্ত্বিক মত এখনও গুরুত্বের সাথেই বিবেচিত হয়। কান্টের প্রভাব বিভিন্নমুখী—তার দর্শনে হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক ভাববাদ, শোপেনহাওয়ার ও নীটশে’য়ের ইচ্ছাবাদ, বার্গসোঁ’র সজ্ঞাবাদ (intuitionism) ইত্যাদির বীজ নিহিত রয়েছে। তবে কান্টের আধিবিদ্যিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক মত নিয়ে মতান্তর যা-ই থাকুক, তার নৈতিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব এখন নতুন করে আগ্রহের সাথে পঠিত হচ্ছে অনেক মহলেই। রাষ্ট্রনীতি ও ন্যায়বিচার নিয়ে আজ যারা ভাবছেন তাদের একভাগ—প্রণালীবদ্ধ উদারনৈতিকতাবাদীরা, জন রলস যাদের পুরোধা—কান্টকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথেই নিয়ে থাকেন এবং সামাজিক চুক্তি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক চিন্তার জোরদার ব্যাখ্যাকার হিসেবে হবস, রুশোর ধারার বর্গে ফেলেন। ইরানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট খাতামীও কান্টের দর্শন নিয়েই উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করেছিলেন। মউদুদি আল্লাহ ও আখেরাত সম্বন্ধে বুদ্ধির মীমাংসা যেভাবে টেনেছেন তাতে অনুমান করা যেতে পারে যে, কান্ট-দর্শনের সাথে তার পরিচয় ছিল।

২। ইচ্ছা (will)

২.১। কান্টের নীতি-দর্শনের সূচনা ‘ইচ্ছা’ নামক ধারণা থেকে। এখানে কান্টের মূল পরাতাত্ত্বিক দাবী হচ্ছে, ইচ্ছা স্বাধীন। ইচ্ছা কাজ করে প্রকৃতির অন্য সকল কিছু থেকে ভিন্ন ভাবে। ইচ্ছা জগতকে প্রভাবিত করতে পারে। ইচ্ছা বিচারবুদ্ধির অধিকারী। যে সত্ত্বার মধ্যে ইচ্ছা থাকবে, তার মধ্যে বিচারবুদ্ধিও থাকবে। আমরা জগতের সাথে দুভাবে সম্পর্কিত: আমরা একাধারে জগতে দর্শক এবং সেখানে পরিবর্তন আনতে সক্ষম এজেন্ট। জগতে কী আছে ও সেখানে আমাদের জায়গা কোথায় তা নিয়ে চিন্তা করা যেমন আমাদের করণীয়, তেমনই জগতকে নিয়ে আমাদের করণীয় কী তা সম্বন্ধে চিন্তা করাও আমাদের করণীয়। তবে অবস্থা এরকম যে, আমরা যদি জগতে আমাদের স্থানসহ জগতের সবকিছুই জেনে ফেলতে সক্ষমও হই তবুও জগত নিয়ে আমাদের করণীয় কী প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ইচ্ছা ছাড়া অন্য আর কোন সত্ত্বা নেই যার অবস্থা এরকম হতে পারে। এরূপ অবস্থায় ইচ্ছার কাছে কিছু নীতিকে আশ্রয় করে কাজ নির্বাচন করার পথ ছাড়া অন্য পথ থাকে না। এই অবস্থাকে বর্ণনা করার জন্য এ কথা বলা যায় যে, ইচ্ছা স্বাধীন এবং সেটি প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করে চলে না। ইচ্ছা, চিন্তা, বাসনা ইত্যাদি মানসিক বিষয়গুলোকে আচরণবাদীরা একবারেই ভিন্ন ভাবে দেখেন ও তাদের ব্যাখ্যায় ইচ্ছা ইত্যাদি আসলে অন্যদের দ্বারা প্রত্যক্ষিত একজনের আচরণের কোন একটি প্যাটার্ন বা কাজের কোন একটি সমাহারের বা বিবরণের সংক্ষিপ্ত নাম বা সার্বিক ধারণা ছাড়া কিছু নয়। সে যা-ই হোক, “স্বাধীন ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ইচ্ছা”-ই কান্টের মূল ধারণা, যার উপর ভিত্তি করে তার নীতিতত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে।

২.২। ইচ্ছার অবস্থাটি অনন্য। জগতটি যেখানে নির্ধারিত (determined) সেখানে ইচ্ছা স্বাধীন (free) এবং সেই সাথে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন (rational)। বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সত্ত্বার মধ্যে নীতি ও সূত্র প্রণয়নের সামর্থ্য থাকে; সে প্রকৃতির নিয়ম অনুসরণ করে না, বরং অনুসরণ করে নিয়মের উপস্থাপনা বা প্রতিরূপকে (representation of law)। মানুষের বেলায় এই রিপ্রেজেন্টেশন হচ্ছে ভাষাগত বিবৃতি বা নীতি বা সূত্র। কান্টের ভাষায়, “Everything in nature works in accordance with laws. Only a rational being has the capacity to act in accordance with the representation of laws, that is, in accordance with principles, or has a will.” অর্থাৎ ইচ্ছা কাজ করে নিজ কর্তৃক প্রণয়ন করা পন্থা, সূচি, পরিকল্পনা সহকারে; নিয়ম, নীতি, সূত্র অনুসারে। এটি আবার একটি নির্বাচনমূলক কাজও বটে। এভাবে কাজ করা জড়বস্তু বা অন্যান্য প্রাণীদের—এরা প্রকৃতির নিয়ম সরাসরি অনুসরণ করে থাকে—কাজ করার মতো নয়।

২.৩। ইচ্ছা হচ্ছে কর্মের নির্দেশনামূলক নীতির—নৈতিক সূত্র—প্রণেতা। এই নৈতিক সূত্র আমাদেরকে দেখায় কী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কিভাবে তা অনুসরণ করে কাজ করা যায়। ইচ্ছা নিজেকে নিজের প্রণীত নৈতিক সূত্রের সাথে আবদ্ধ করে। ইচ্ছা ও তার ক্রিয়াকলাপকে কান্ট নিজেও অদ্ভুত বা আজব (strange) বলেই মনে করতেন। The thing is strange enough, and has no parallel in all the rest of our practical knowledge—ইচ্ছার ক্রিয়াকলাপ সম্বন্ধে একথাই বললেন কান্ট তার দি ক্রিটিক অব প্র্যাকটিক্যাল রিজন বইটিতে। জেনিফার উলেমান লিখেছেন, এই আজব জিনিসের আজব কর্মকাণ্ড নানা কারণেই আজব: একটি নির্ধারিত জগতে ইচ্ছা নিজে স্বাধীন, এটি নিজেকে নিজের অধীনে আনে, নিজের প্রণীত নীতির সাথে নিজেকে আবদ্ধ করে, এটি নিজেই সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং নিজেই নিজের উদ্দেশ্য, নিজেই নিজের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই আজব ইচ্ছা নিজেই নিজের বিষয়; হেগেলের ভাষায় বলা যায়, “the free will which wills the free will.”।

৩। ভাল ইচ্ছা (good will)

৩.১। “It is impossible to imagine anything at all in the world, or even beyond it, that can be called good without qualification – except a good will.”—এই বিরাট দাবী নিয়েই কান্ট শুরু করেছিলেন তার গ্রাউন্ডওয়ার্ক। এখানে qualification শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা তিনি যা বুঝোতে চেয়েছেন তা হলো, ভাল ইচ্ছা নিঃশর্তভাবে ভাল, ভাল হওয়ার জন্য একে অন্য কিছুর উপর নির্ভর করতে হয় না। কথা কেবল এতটুকুই নয়, কান্টের আরও দাবী, একমাত্র এবং কেবলমাত্র ‘ভাল ইচ্ছা’-ই নিজ থেকে ভাল, অন্য আর কিছু নিজ থেকে ভাল নয়। ভাল ইচ্ছার অর্থ কী? রবার্ট জনসন “good will” বলতে “strong commitment to behaving morally” বুঝেছেন। তিনি আবার এটিকে একটি “disposition to make choices of a certain kind” হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। ভাল ইচ্ছা হচ্ছে সেই ইচ্ছা যে সার্বজনীন সূত্র প্রণয়ন করে, কর্তব্যের খাতিরে তা অনুসরণ করে, সূত্রের প্রতি ভক্তিভাব সহকারে। ‘ভাল ইচ্ছা’কে নিজের ও/বা অন্যের ‘মঙ্গল ইচ্ছা’র সাথে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। কান্টীয় ভাল ইচ্ছা খুবই আকারী (formal) ও বৌদ্ধিক (rational) তথা নীতি আশ্রয়ী; এর সাথে ভক্তির যে সম্পর্ক তা হচ্ছে কেবলমাত্র আকারী নীতির প্রতি ভক্তি, যা অন্য কিছুর আকাঙ্ক্ষা, বাসনা বা অন্য কিছুর প্রতি ঝোঁক (inclination) থেকে মুক্ত।

৩.২। এটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি তিন ধরণের গুণ ও বিষয়ের অবতারণা করেন। (১) জ্ঞান, বিচার, বিদগ্ধ বুদ্ধি বা সপ্রতিভতা—মনের এসব প্রতিভা, অথবা, সাহস, দৃঢ়তা, অধ্যবসায় ইত্যাদি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নানা কারণে ভাল ও প্রত্যাশিত। কিন্তু এগুলোও খুবই মন্দ ও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে যদি প্রকৃতির এসব উপহার ব্যবহারকারী ‘ইচ্ছা’টি ভাল না হয়। কাজেই এগুলো হচ্ছে প্রকৃতি প্রদত্ত চারিত্রিক গুণমাত্র—যার অধিকারী ভাল হতে পারে আবার মন্দও হতে পারে। (২) একই কথা বলা যায় ক্ষমতা, সম্পদ, খ্যাতি, সুস্বাস্থ্যর মতো বিষয়গুলোর বেলায়ও। এগুলো একজনের সুখাবস্থার জন্য দরকারি উপাদান হলেও তা তার মধ্যে অহংকার ও ঔদ্ধত্যও তৈরি করতে পারে যদি না ভাল ইচ্ছা বর্তমান থেকে মনের উপর তাদের মন্দ প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। (৩) এমনকি এমন কিছু গুণও আছে যা স্বয়ং ভাল ইচ্ছার জন্য সহায়ক, যেমন: স্নেহ ও চিত্তাবেগে মিতাচার, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, শান্ত ভাবুকতা ইত্যাদি। এগুলো একজনের জন্য নানা কারণে মূল্যবান মানসিক বৈশিষ্ট্য হলেও ভাল ইচ্ছা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এর অধিকারী বিপদজনক হতে পারে। অনেক সুবিবেচক ঠাণ্ডা মাথার অপরাধী রয়েছে যাদেরকে এই গুণগুলো ভয়ংকর করে তুলতে পারে। অর্থাৎ উল্লেখিত গুণগুলোর কোনটিই নিজ থেকে ভাল নয় বরং ‘ভাল ইচ্ছা’ সাপেক্ষেই কেবল নৈতিকভাবে ভাল হতে পারে।

৩.৩। কান্টীয় ভাল ইচ্ছার আরেকটি আবশ্যকীয় দিক হচ্ছে এই যে, ভাল ইচ্ছা স্বগতভাবেই (intrinsically) ভাল ও পূর্ণভাবে (completely) ভাল এবং এটিই হচ্ছে সর্বোচ্চ ভাল (highest good)। কান্ট ভাল ইচ্ছাকে অন্য সব নৈতিক উৎকর্ষতা (virtue) থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন। তিনি দাবী করেছেন, জ্ঞান, অধ্যবসায়, দৃঢ়তা, কর্মক্ষমতা, সাহস, সুস্বাস্থ্য, সম্পদ, সুনাম ইত্যাদি ভাল জিনিস বলে বিবেচিত সব কিছু থেকেই বঞ্চিত কোন ব্যক্তি যদি কেবল মাত্র ভাল ইচ্ছার অধিকারী মাত্র হয় তবুও নৈতিকতার বিচারে সে পূর্ণ; অর্থাৎ, নৈতিক বিচারে সম্পূর্ণরূপে ভাল বলে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য ততটুকুই যথেষ্ট। ভাল ইচ্ছা যদি কোন কিছুই সম্পন্ন করতে না পারে বা কোন কিছুই অর্জন করতে না পারে তবুও তা মুক্তার মতো নিজ থেকেই ভাস্বর হয়ে থাকবে, যার মূল্য তার নিজের মধ্যেই নিহিত থাকবে। অন্যদিকে, কেউ যদি ভাল বলে বিবেচিত সব গুণ ও বিষয়াদির অধিকারী হয়েও ভাল ইচ্ছার অধিকারী না হয় তবে তিনি আর ভাল পদবাচ্য থাকবেন না। ভাল ইচ্ছাকে ভাল এজন্য বলা হচ্ছে না যে, এর মাধ্যমে আমরা ভাল কিছু সম্পন্ন করতে পারি বা ভাল কিছু অর্জন করতে পারি। ভাল ইচ্ছা যদি অন্য কোন উদ্দেশ্যে কাজ করে তবে তাকে আর সর্বোচ্চ ভাল বলা চলে না, বরং উদ্দীষ্ট বিষয়টি অধিকতর ভাল বিষয়ে পরিণত হয়। কাজেই ভাল ইচ্ছা নিজেই নিজের বাসনার বিষয়। কান্টের ভাষায়, “A good will is not good because of what it effects or accomplishes—because of its fitness for attaining some proposed end: it is good through its willing alone—that is, it is good in itself”। দর্শনের জগতে কান্টের এই অবস্থানটি অভিনব ও বিস্ময়কর।

৩.৪। ভাল ইচ্ছা পুরোদস্তুর বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন বা যুক্তিশীল ও পুরোদস্তুর স্বাধীন এবং তা নিজেই নিজের উদ্দেশ্য। ইচ্ছা পুরোদস্তুর বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন এই অর্থে যে, তা সবসময়ই ধারণা ও প্রতিরূপ ব্যবহার করে; সে তার কাজের জন্য সব সময়ই যুক্তি (reason) ও অর্থের (sense) খোঁজ করে। ইচ্ছা আবার পুরোদস্তুর স্বাধীন এই অর্থে যে, নীতি বা নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রে বা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সে অন্য দ্বারা নয়, নিজ দ্বারাই নির্ধারিত হয়; অর্থাৎ সে যা করে তা চূড়ান্ত বিচারে নিজেই করে। ইচ্ছার পুরোদস্তুর স্বাধীন হওয়ার আরও একটি অর্থ এই যে, তা যা করে তা নিজের জন্যই করে। অন্যের জন্য বা অন্যের উদ্দেশে কাজ করা স্বাধীনতার পরিপন্থী, এটি হচ্ছে অন্যের দাসত্ব করা। অর্থাৎ ভাল ইচ্ছা নিজেই নিজের উদ্দেশ্য। এর আরেকটি তাৎপর্য এই যে, ভাল ইচ্ছা অন্য ব্যক্তিদেরকে নিজের জন্য মাধ্যম বা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে না, যেহেতু তারাও তারই মতো ইচ্ছাবান। ভাল ইচ্ছা নিজে অন্যের উদ্দেশ্যে কাজ করে না এবং মানবতাকে নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যও ব্যবহার করে না। ফলে সে এমন ব্যক্তিগত নীতি অনুসরণ করে কাজ করে যা সকল বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সত্ত্বাই অনুমোদন করবে এবং তাদের প্রত্যেকের দ্বারা নির্বাচিতব্য হবে—অর্থাৎ তার নীতিটি একটি সার্বজনীন সূত্রে পর্যবসিত হওয়ার সামর্থ্যের অধিকারী হবে। ফলে ভাল ইচ্ছা সার্বজনীন সূত্রকে সমীহ করে ও তা অনুসরণ করে কেবল কর্তব্য হিসেবে।

৩.৫। কিন্তু এসব দাবীর পক্ষে কান্ট কোন প্রমাণ হাজির করেননি। কান্টের দর্শন, তার উপস্থাপনা ও বিশ্লেষণ, খুবই জটিল হলেও তিনি এ দাবী করেছেন যে, তার মূল প্রস্তাবনাগুলো সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষেরা সঠিক বলেই জানেন। এর ভিত্তিতেই তিনি তার দার্শনিক মতে উত্তরণকে সাধারণ বিচারবুদ্ধির নৈতিক জ্ঞান থেকে দার্শনিকতায় উত্তরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অসমাপ্ত

সূত্র:
আমিনুল ইসলাম – আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন
Jennifer K. Uleman – An Introduction to Kant’s Moral Philosophy
The Blackwell Guide to Kant’s Ethics – Edited By Thomas E. Hill, Jr.
Kant – Groundwork of the Metaphysics of Morals
Immanuel Kant – Stanford Encyclopedia of Philosophy
Kant’s Philosophy of Religion – Stanford Encyclopedia of Philosophy