ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

৪। বুদ্ধির বৃত্তি (function of reason)

৪.১। সাধারণত কান্টকে বুদ্ধিবাদী, যুক্তিবাদী বলে ধরা হয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগটা এই যে, তিনি অত্যন্ত আকারী, সূত্রপরায়ণ, ঠাণ্ডা, হিসাবসর্বস্ব, অতি-যুক্তিশীল (hyper-rational), প্রাণহীন (soulless) ইত্যাদি। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, কান্টের ধারণা, শুদ্ধ বুদ্ধি আমাদেরকে শুদ্ধ পথে পরিচালিত করতে যথেষ্টভাবে কার্যকর নয়। কান্টের নৈতিকতা দর্শনে চিন্তা বা বুদ্ধি বিশাল ভূমিকায় থাকলেও তার দর্শনের মূলে রয়েছে ইচ্ছা ও ইচ্ছার ভালোত্ব, শুদ্ধ বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা ও ব্যবহারিক বুদ্ধির বৈধতা।

৪.২। দার্শনিক হিসেবে কান্টের প্রকৃত পরিচয় কী? তিনি কি প্রধানত একজন জ্ঞানতাত্ত্বিক? এর উত্তর নেতিবাচক হতে পারে, যদিও কান্টের শুদ্ধ বুদ্ধির সমীক্ষা একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি ও তা দর্শনের জগতে একটি বিরাট উচ্চাসনে বসে আছে। কান্ট-পরবর্তী এমন দার্শনিক খুঁজে পাওয়া যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস যিনি দি ক্রিটিক অব পিওর রিজন বইটি পড়েননি। কিন্তু কান্ট আদতে একজন নৈতিকতা বিষয়ক তাত্ত্বিক, যিনি নৈতিকতার প্রয়োজনে প্রথমে শুদ্ধ বুদ্ধির সমীক্ষাটি করে নিয়েছেন। তিনি বুদ্ধিকে আকাশে ওঠাননি, বুদ্ধিকে শূন্যে জিমনাস্টিকসেও নিয়োজিত করেননি। তিনি জ্ঞান-পরিস্থিতি, বুদ্ধির সামর্থ্য ও তার সীমাকে বুঝতে ও চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। আমাদের জ্ঞানের আয়ত্তাধীন বিষয়গুলোর ব্যাপারে আমাদের শুদ্ধ বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার ভূমিকা এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কগুলোকে তিনি আবিষ্কার করতে চেয়েছেন; এবং এটিও বুঝতে চেয়েছেন বুদ্ধি কিভাবে সীমা অতিক্রম করতে পারে। দর্শনের জগতে শুদ্ধ বুদ্ধি প্রায়শই তার সীমা ছাড়িয়ে যায় সহজেই এবং অর্জন-অসম্ভব জ্ঞানগত বিষয়াদির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে ও অসঙ্গতিতে পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ধারণা-সমাহারের মধ্যে নিপতিত করে।

৪.৩। শুদ্ধ বুদ্ধি আমাদেরকে কোন সুনিশ্চিত আধিবিদ্যিক তত্ত্বে উপনীত করে না। আধিবিদ্যিক তত্ত্ব বলতে জগত ও চৈতন্য সংক্রান্ত কোন দার্শনিক ব্যাখ্যাকেই বুঝচ্ছি। এখান থেকে তিনি ব্যবহারিক বুদ্ধির গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ও নৈতিক আচরণের ক্ষেত্রে এর প্রকৃত ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন। তাহলে নীতি-তাত্ত্বিক হিসেবে কান্ট কি মূলত কাণ্ডজ্ঞানবাদী? নাকি তার দর্শন ফিখটে, শেলিং, হেগেলের দর্শনের ন্যায় আত্যুন্নতচিন্তাবাদী? কান্টকে কাণ্ডজ্ঞানবাদী বলে দাবী করা অসম্ভব নয়। কান্টীয় ইচ্ছা কোন পরাতাত্ত্বিক সত্ত্বা নয়, বরং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় পাওয়া কিছু। ফলে কান্টের নীতি-দর্শনের জন্য চৈতন্য, চিন্তা, ইচ্ছা ইত্যাদি নিয়ে কোন জটিল পরাতাত্ত্বিক বা সত্ত্বাতাত্ত্বিক আলোচনা/বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয় না। প্লটিনাস, ইবনুল আরাবী, শেলিং, শোপেনহাওয়ার ইত্যাদি দার্শনিকের কাছ থেকে যা পাওয়া যায় তা শেষে কোন না কোন ভাবে সর্বেশ্বরবাদেই গিয়ে ঠেকে, যেখানে ব্যক্তি পরম চৈতন্য, পরম চিন্তা বা পরম ইচ্ছার বাহন মাত্রে পরিণত হয়। অন্যদিকে কান্টের দর্শনে ব্যক্তিমানুষই প্রধানত গুরুত্ব পেয়েছে ও তিনি সাধারণের জন্যই তার মত রচনা করেছেন—যদিও তার ভাষা ও পদ্ধতি কম জটিল নয়।

৪.৪। কান্ট বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সত্ত্বার জন্য সুখকে তার নৈতিক লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি। কান্ট তার গ্রাউন্ডওয়ার্ক বইটিতে এর একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। নীতিগতভাবে ধরা যাক, প্রকৃতি কোন জৈব সংগঠনের মধ্যে এমন কোন কিছুই তৈরি করে না যা সত্ত্বাটির উদ্দেশ্য অর্জনের উপযুক্ত বা সহায়ক নয়। যদি সুখ আমাদের মতো একটি বুদ্ধিসম্পন্ন জীবের উদ্দেশ্য হয় তবে বলতেই হয় যে, প্রকৃতি খুবই অকার্যকরভাবে ও বিকলাঙ্গভাবে বুদ্ধিকে সন্নিবিষ্ট করেছে। সুখের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বরং প্রাকৃতিক উপজ্ঞা (instinct) যথাযথভাবে কার্যকর হতো—যা আমাদেরকে এমনভাবে চালিত করতো যে, আমারা সুখের সাগরে সাঁতার কেটে বেড়াতাম। এধরণের কোন সত্ত্বার মধ্যে যদি বুদ্ধি থাকতো তবে তা কেবল এই উদ্দেশ্যেই থাকতো যেন সে এই সুখের প্রকৃতি ও অবস্থা নিয়ে ভাবতে পারে, এ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে, একে উপভোগ করতে পারে, এবং করুণাময় “কারণ”য়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। অথচ আমাদের পরিস্থিতি তার বিপরীত। বুদ্ধি আমাদের দুঃখ-কষ্টকে বরং বাড়িয়েই চলেছে। ইচ্ছা যখন সুখকে উদ্দেশ্য হিসেবে নেয় ও বুদ্ধি যখন সেই উদ্দেশ্যে নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তখন সে দুঃখকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আমাদের অভিজ্ঞতার ইতিহাস থেকে আমরা এটি পাই; তদুপরি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষেরা এটিও মনে করে যে, ভাল নৈতিক সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই সুখের সাথে বিরোধ বাঁধিয়ে বসে, সুখের বস্তুকে বিসর্জন দেয়, নতুন কষ্টকে সাদরে বরণ করে। বর্তমান প্রকৃতি যদি সুখের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ও সামগ্রিকভাবে বিন্যস্ত না হয়ে থাকে তবে সুখ সর্বোচ্চ ভাল এবং তা নৈতিকতার লক্ষ্য হতে পারে না; আর কেউ একে লক্ষ্যে পরিণত করলেও তাতে সে হয় বাস্তবে, নয়তো নৈতিকভাবে সফল হতে পারবে না।

৪.৫। তাহলে আমাদের নৈতিকতার কী এমন উদ্দেশ্য থাকতে পারে যা বর্তমান জগত-প্রকৃতি ও জাগতিক-বিন্যাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে? সুখের বদলে অন্য আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে যা অর্জনের জন্য আমাদের বুদ্ধির বর্তমান কাঠামোই যথোপযুক্ত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে কান্ট ব্যবহারিক বুদ্ধির আশ্রয় নিয়েছেন ও সেখান থেকে তার নীতি-তত্ত্বকে দার্শনিকতার স্তরে উন্নীত করেছেন। এই অবস্থানকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে স্বতঃই বুঝা যায়, কেন তিনি ইচ্ছা, ভাল ইচ্ছা ও ভাল ইচ্ছার ব্যবহারিক বিচারবুদ্ধিকে সবচে বড় করে দেখেছেন; ভাল ইচ্ছার সকল ফলকে ও অর্জনকে পরিগণনার বাইরে রেখেছেন; এবং “স্বাধীন বিচারশীল ইচ্ছা”র জন্য ভাল ইচ্ছাকেই স্বগতভাবে ভাল, যা কিনা আবার নিজেই নিজের উদ্দেশ্য, বলে সাব্যস্ত করেছেন।

৪.৬। কান্টের মতে ভাল ইচ্ছা হচ্ছে সর্বোচ্চ ভাল। এই সর্বোচ্চ ভাল’র পূর্ণ তাৎপর্য এই যে, ভাল ইচ্ছাই অন্য সব কিছুর কন্ডিশন বা শর্ত—এমন কি সুখের জন্য আমাদের সকল দাবীরও। কান্ট সুখের বাসনা বা সুখের মূল্যকে সমূলে উৎপাটিত করেননি—তিনি সুখের জন্য আমাদের আকুলতাকেও আমলে নিয়েছেন। ভাল ইচ্ছা ইচ্ছাবানকে যথার্থ অর্থে মর্যাদা ও পরিতৃপ্তির উপযুক্ত করে। কিন্তু এই উপযুক্ততা যদি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন মাত্র হয়, মর্যাদা ও তৃপ্তি যদি একান্তই ব্যক্তিগত বোধের বিষয় হয় তবে তাকে ফাঁকি বা শূন্যগর্ভ হিসেবেও ধরা সম্ভব নয় কি? আবার সুখেরও যদি গুরুত্ব থাকে তবে তা মিলবে কিভাবে? এই সমস্যা সমাধানের জন্য কান্ট ঈশ্বর ও আত্মার অমরত্বের কথা বলেছেন। জগতকে তিনি উদ্দেশ্যহীন বলে মনে করতেন না। এখান থেকে অনুমান করা যায়, কেন কান্ট সর্বান্তকরণ নৈতিকতার জন্য ঈশ্বর, ব্যক্তিগত অমরত্ব ও ভিন্ন প্রকৃতির ভাবি জগতকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করতেন।

৪.৭। তা হলে জীবনে বুদ্ধির বৃত্তি বা ভূমিকা কী? বুদ্ধির কাজ হচ্ছে ইচ্ছাকে প্রভাবিত করা (influence), ভাল ইচ্ছাকে তৈরি করা (produce)। এই প্রভাবন ও তৈয়ারকরণের কাজটি ইচ্ছার উপর কর্তৃত্ব নয়, বরং কান্টীয় বিচারবুদ্ধি কান্টীয় ইচ্ছার একটি ফ্যাকাল্টি, যা ইচ্ছার সহায়ক। ইচ্ছার নির্ধারক ইচ্ছা নিজে। বলা যেতে পারে, the free will that wills the good will। বুদ্ধি নানা বিকল্প নীতির সন্ধান দেয়, ভাল ইচ্ছার বুদ্ধি সার্বজনীনটিকে খুঁজে বের করে। এবং ভাল ইচ্ছা সেটিকে গ্রহণ করে। জেনিফার লিখেছেন, কান্ট-দর্শনে ইচ্ছা, বিচারবুদ্ধি ও স্বাধীনতা একে অপরের সাথে খুবই জটিলভাবে সম্পর্কিত এবং “free rational willing” একটি সমগ্র—যাকে কান্টীয় কমপ্লেক্স বলা যায়। জেনিফারের মতে এক শব্দে এই কমপ্লেক্সের নাম দেয়া যায় স্বায়ত্বশাসন বা autonomy। তিনি আরও লিখেছেন, স্বায়ত্বশাসন হচ্ছে characteristic of will that (freely) gives itself a (rational) action-guiding law। অন্য কথায়, স্বাধীন ইচ্ছা ও নৈতিক নিয়মের অধীন ইচ্ছা এক ও অভিন্ন।

৫। কর্তব্য (duty)

৫.১। এবার প্রথমেই একটি সারাংশ লেখার চেষ্টা করা যাক। কেবলমাত্র ভাল ইচ্ছা নিঃশর্তভাবে ও নিজগুণে ভাল, অন্য সব দরকারি বিষয়াদি ভাল ইচ্ছা সাপেক্ষে ভাল। কর্মের ক্ষেত্রে স্বাধীন বুদ্ধিসম্পন্ন সত্ত্বাকে কোন না কোন নীতি-সূত্র অনুসারে করণীয় নির্বাচন করতে হয়। একটি নিঃশর্তভাবে ভাল নির্বাচন হচ্ছে সেই নির্বাচন যার ভিত্তি এমন একটি নীতি যা সকল সম্ভাব্য অবস্থাতেই নির্বাচনটিকে একটি ভাল নির্বাচন করে তোলে, যা আবার সর্বজনগ্রাহ্য।

৫.২। এখানে এসে কান্ট কর্মের সাথে সম্পৃক্ত করে কর্তব্যের ধারণাকে এনেছেন। তিনি কর্তব্য-প্রণোদনা (motive of duty) নিয়ে উদাহরণসহ আলোচনা করে এই প্রণোদনার অর্থ পরিষ্কার করতে চেয়েছেন। ধরা যাক, একজন দোকানদার তার ক্রেতাদের সাথে সব সময় ভাল আচরণ করেন—ওজনে কম দেন না, সুযোগ মতো মূল্য বাড়ান না। তিনি যদি বুঝতে পারেন যে, মূল্য সম্বন্ধে ক্রেতার কোন ধারণাই নেই এবং তার কাছ থেকে উচ্চ মূল্য নেয়া সম্ভব, তবুও তিনি তা কখনো করেন না। ফলে একজন শিশুও নিশ্চিন্তে তার দোকান থেকে সওদা করতে পারে। কিন্তু এই বিক্রেতা ব্যবসায়িক সাফল্যের উদ্দেশ্যে পলিসি হিসেবে এই কর্মধারাকে নির্বাচন করেছেন। কান্ট বলছেন, এ অবস্থায় এসব কর্মের মধ্যে কোন নৈতিক সারবত্তা (moral worth) নেই। কারণ ব্যবসায়িক সাফল্যের সম্ভাবনা না থাকলে সে এরূপ নির্বাচন করতো না। বিক্রেতা যদি লাভ বা ক্ষতি যা-ই হোক সকল অবস্থাতেই একই নির্বাচন-প্রসূ নীতি গ্রহণ করতেন, এবং নির্বাচিত কাজগুলোকে কর্তব্য হিসেবে সম্পাদন করতেন, তবে তার নীতিটি নৈতিক আধেয় (moral content) সম্পন্ন হতো এবং কাজগুলো নৈতিকভাবে সারবান হতো। মানুষের প্রতি স্বভাবগত ভালবাসার জন্যও একজনের পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব যাকে আমরা ভাল কাজ বলে থাকি। এমনও কেউ থাকতে পারেন যিনি ভাল কাজ করতে পারলে আনন্দ পান। এরকম ভালবাসা বা এরকম আনন্দ লাভের বাসনাকেও কান্ট ঝোঁক (inclination) হিসেবে গণ্য করেন। তিনি আরও একটি উদাহরণ দিয়েছেন। আমরা সবাই বেঁচে থাকার জন্য চেষ্টা করি। সে উদ্দেশ্যে পরিশ্রম করি। জীবন সংরক্ষণ করা আমাদের একটি কর্তব্য। আবার, জীবন সংরক্ষণ করার জন্য আমাদের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবেই একটি প্রবণতা বা ঝোঁক রয়েছে। কান্ট বলেন, আমাদের অনেকেই এই কর্তব্য পালন করেন এমন সব নীতি অনুসারে যার মধ্যে কোন নৈতিক আধেয় নেই। তারা জীবন সংরক্ষণের কাজগুলো করে বেঁচে থাকেন। কিন্তু কান্টের ভাষায়, “They do protect their lives in conformity with duty, but not from the motive of duty.”। এই কর্তব্য-প্রণোদনাকে বলা হচ্ছে “কর্তব্যের খাতিরে কর্তব্য” বা “for the sake of duty”।

৬। নীতি (principle), প্রবচন (maxim) ও সূত্র (law)

৬.১। ইতোমধ্যে এই লেখায় পলিসি, পরিকল্পনা, সূচি ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে নীতির উপস্থাপনা বা প্রতিরূপের উদাহরণ হিসেবে—কান্টের ভাষায় বলতে বলতে হয়, মানুষের ব্যবহারিক বিচার-বিবেচনা ও নির্বাচন (choice)। কান্টীয় ব্যবহারিক বুদ্ধিও বেশ জটিল। তিনি ব্যবহারিক নীতিগুলোকে দুভাগে ভাগ করেছেন: প্রবচন (maxim) ও সূত্র (law)। (১) প্রবচন হচ্ছে বিষয়ীগত (subjective) ব্যবহারিক নীতি। এগুলো হচ্ছে সরল ভিত্তিমূলক নীতি, বা ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনা বা বিচার-বিবেচনা থেকে জাত নীতি, যা ব্যক্তি অনুসরণ করে। কাজের ধরণ, পারিপার্শ্বিক শর্তমূলক অবস্থা, কাজের উদ্দেশ্য বিবেচনায় কাজ নির্বাচনের যুক্তির সরল উপস্থাপনা, অন্য কথায় সূত্রাবধারিত সংক্ষিপ্ত বাক্যই মূলত প্রবচন বা ম্যাক্সিম। (২) আর যে নীতিগুলো সার্বজনীন, অর্থাৎ যা সকল বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সত্ত্বার জন্য সকল অবস্থাতেই অকাট্য, নির্বাচনীয় বা যুক্তিসঙ্গত তা হচ্ছে সূত্র। অর্থাৎ সূত্র হচ্ছে সার্বজনীন নীতি।

৬.২। কর্তব্য হিসেবে সম্পাদিত একটি কাজের নৈতিক সারবত্তা, যে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কাজটি করা হয়েছে সে উদ্দেশ্যের মধ্যে বিরাজ করে না, বরং করে সেই ম্যাক্সিমের মধ্যে যা অনুসারে কাজটি করার জন্য সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে। কাজেই নির্বাচনেচ্ছার নীতির (principle of volition) মধ্যেই কাজের নৈতিক মূল্য নিহিত। কান্টের নীতি-তত্ত্ব তাই আকারী নীতি আশ্রয়ী, নির্মোহ ও কর্তব্যবাদী। এই তত্ত্ব অনুসারে মানুষের নৈতিক মূল্যায়ন তার দ্বারা উদ্দেশ্যগত অর্জনের সমাহারের উপর নির্ভর করে না, করে ইচ্ছার ভালোত্বের উপর, নির্বাচনের নীতির বৈশিষ্ট্যের উপর, এবং কেবল ইচ্ছাকরণের উপর।

৬.৩। কান্টের প্রথম প্রস্তাব হচ্ছে, ভাল ইচ্ছা-ই শর্তহীনভাবে ভাল। দ্বিতীয় প্রস্তাব হচ্ছে, ভালোত্ব নিহিত কর্তব্য হিসেবে সম্পাদিত কর্মের নির্বাচক নীতির মধ্যে। এখন তৃতীয় প্রস্তাবটি হচ্ছে—যা প্রথম দুটি হতে নিঃসৃত হয় বলে তিনি মনে করেন—কর্তব্য হলো সূত্রের প্রতি সম্মান বা ভক্তি থেকে কর্ম করার বাধ্যবাধকতা। ফলে কর্মকে দুটি জিনিস থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হচ্ছে: সব ধরণের ঝোঁকের প্রভাব এবং সব ধরণের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ভাল ইচ্ছা শেষ তক গিয়ে দাঁড়াচ্ছে দুটো বিষয়ের উপর: (ক) বিষয়গতভাবে (objectively) সূত্র এবং (খ) বিষয়ীগতভাবে (subjectively) সূত্রের প্রতি ভক্তি। কান্টের কর্তব্যবাদী নীতি-তত্ত্ব গীতার কৃষ্ণের অবস্থানের অনুরূপ এবং অর্জুনের পরিণামবাদী চিন্তার বিপরীত।

৭। শর্তহীন আদেশ (categorical imperative)

৭.১। ভালোত্বের আধেয়যুক্ত কাজ হচ্ছে এমন কাজ যা এমন ম্যাক্সিম অনুসারে নির্বাচনকৃত, যে ম্যক্মিমটি একটি সার্বজনীন নীতি, তথা সূত্রে পরিণত হওয়ার সামর্থ্যবান। কান্ট এরূপ ম্যাক্সিম নিঃসৃত কাজকেই ভাল ইচ্ছা জাত কাজ বলেছেন যে ম্যাক্সিমটি সার্বজনীন হয়ে উঠলে যৌক্তিক অসঙ্গতি তৈরি হয় না। কর্মের এই নীতিকেই তিনি ক্যাটাগরিক্যাল ইমপেরেটিভ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যাকে বাংলায় শর্তহীন আদেশ বলা যায়। অর্থাৎ কান্টীয় নীতি-তত্ত্বের আদর্শ অনুসারী মানবজাতির জন্য সার্বজনীন আইন প্রণয়নে অংশীদার স্বরূপ। বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ভাল ইচ্ছার নিঃশর্ত ভালোত্ব থেকে কান্ট পৌঁছেছেন তার নিঃশর্ত আদেশে। কান্টের মতে, আচরণ বা কর্মের নীতি-প্রকাশক সকল বিবৃতি বা প্রতিজ্ঞা বা অনুজ্ঞাই পালনীয় আদেশ (imperative)। কান্টীয় শর্তহীন আদেশ হচ্ছে পরম ও সর্বজন কর্তৃক অবশ্যপালনীয় আদেশ এবং এই পালন ক্রিয়ার কোন বহির্দেশীয় উদ্দেশ্য নেই, কর্তা নিজেই তার উদ্দেশ্য। কান্টের শর্তহীন আদেশের তিনটি রূপ রয়েছে। এদের প্রথম দুটি রূপ নীচে বিবৃত করা গেল:

(১)সার্বজনীনতা রূপ: কেবল এমন ম্যাক্সিম অনুসারে কাজ কর, যেন একই সাথে তুমি এই ইচ্ছাও করতে পার যে, ম্যক্মিমটি সার্বজনীন আইন (সূত্র) হয়ে উঠুক, যা হয়ে উঠতে গিয়ে যৌক্তিক অসঙ্গতি তৈরি করবে না।

(২) মানবতা রূপ: এমনভাবে কাজ কর যেন মানবতা—তা তুমি নিজেই হও বা অন্য যেকোন জনই হোক—কখনোই কোন উদ্দেশ্য অর্জনের নিছক নিমিত্তে পরিণত না হয়, বরং সর্বদাই মানবতা (humanity) যেন নিজেই নিজের উদ্দেশ্য হিসেবে বিরাজ করে।

৮। কান্টীয় ভালোত্ব ও কান্টীয় ভক্তি

৮.১। কান্টের “ভাল ইচ্ছা”কে “নিজের ও/বা অন্যের মঙ্গল-ইচ্ছা” অথবা “নিজের ও/বা অন্যের কল্যাণ-ইচ্ছা”র সাথে মেলানো যায় না, বরং তার “ভাল ইচ্ছা” খুবই যুক্তিসর্বস্ব বা চিন্তাসর্বস্ব সার্বজনীন নীতি অনুসরণকে বুঝায়, যা মঙ্গল-ইচ্ছা বা কল্যাণ-ইচ্ছা থেকে বেশী কিছু। “অন্যের কল্যাণ কর” নীতিটি কান্টের তত্ত্ব থেকে নিঃসৃত হয় বটে, কিন্তু আমাদের কালের কোন কোন নারীবাদী নীতিতাত্ত্বিকের যত্ন-নৈতিকতা’র সাথে এটি আরও প্রত্যক্ষ ও আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। “শুষ্ক নীতিবাগীশতা” কান্ট-দর্শনের সবচে বড় সমস্যা বলেই মনে হয়।

৮.২। কান্টীয় স্বাধীন ইচ্ছা প্রণীত নৈতিক সূত্রের সাথে প্রণেতা ইচ্ছা নিজেকে আবদ্ধ করে ও তা অনুসরণ করে নিছক কর্তব্য হিসেবে ও সূত্রের প্রতি ভক্তি সহকারে। ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে বিবেচনা করলে, কান্টীয় দর্শনে এই সূত্র-ই যেন ঈশ্বর, যে ঈশ্বর ভক্ত-ইচ্ছার নিজেরই তৈরি—আর যদি সূত্রটি স্বাধিষ্ঠ হয় তবে তা নিছক একটি সূত্র মাত্র। একথা যদি ঠিক না হয় তবে বলতে হয়, ইচ্ছা নিজেই নিজের ঈশ্বর এবং সেই ঈশ্বর এমন ঈশ্বর যে নিজের তৈরি জিনিসেরই উপাসক। অবস্থা যেটিই হোক, তা মানুষের জন্য মর্যাদাকর কি-না তা-ও বিচার করে দেখার বিষয়।

৮.৩। তবে কান্টের ভাল ইচ্ছা নৈতিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটিকে আবিষ্কার করেছে, যা নৈতিকতা বিষয়ে এতদিন ধরে চলে আসা এরিস্টটলীয় নিকোমেকিয়ান অবস্থান থেকে সুস্পষ্ট প্রস্থান, এবং এটি “প্রত্যেক কাজের মূল্য নিয়তের উপর নির্ভরশীল”—এই হাদিসটির সাথে অনেকাংশেই মেলে। নিয়তের সাথে সচেতনতা, সংকল্প ও বিচারশীলতার সম্পর্ক রয়েছে। তবে ভাল ইচ্ছা ও ভাল নিয়তকে সম্পূর্ণরূপে এক বলা যায় কিনা তা গবেষণার বিষয়। অন্যদিকে, কান্টের শর্তহীন আদেশের প্রথম রূপটি ও সুবর্ণ বিধির মধ্যেও মিল রয়েছে। সুবর্ণ বিধি মতে, অন্যকে তা-ই দাও, যা তুমি নিজের জন্য অন্যদের কাছ থেকে প্রত্যাশা কর। এই সূত্র মতো কাজ করলে প্রত্যাশাটি সার্বজনীন হয়ে উঠে। কিন্তু প্রত্যাশার বিষয় যদি সুখ ইত্যাদি বিষয়াদি হয়ে উঠে তবে তা কান্টের এসব প্রত্যাশা থেকে মুক্ত ইচ্ছার সাথে সুবর্ণ বিধি মিলবে না।

সমাপ্ত

সূত্র:
আমিনুল ইসলাম – আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন
Jennifer K. Uleman – An Introduction to Kant’s Moral Philosophy
The Blackwell Guide to Kant’s Ethics – Edited By Thomas E. Hill, Jr.
Kant – Groundwork of the Metaphysics of Morals
Immanuel Kant – Stanford Encyclopedia of Philosophy
Kant’s Philosophy of Religion – Stanford Encyclopedia of Philosophy
n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী