ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—৬ষ্ঠ অংশ

blank_m2m

নেল নোডিংস একজন শিক্ষা-দার্শনিক, যিনি যত্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা সম্বন্ধীয় মত রচনা করেছেন। আধুনিকতা প্রভাবিত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রধানত জ্ঞানগত উন্নয়নকেই (cognitive development) লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং সাধারণভাবে জীবিকা উপার্জনের উদ্দেশ্যে পেশাগত দক্ষতা সৃষ্টিই এর আরেক লক্ষ্য। মোটামুটিভাবে বলা যায়, এই দুই লক্ষ্যের বাইরে যে চরিত্র শিক্ষা (charachter education) বা নৈতিক শিক্ষার (moral education) একটি অঙ্গন রয়েছে তা—যেন ধর্মের মতোই—ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে আছে; প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তার সম্পর্ক নিবিড় নয়। কিন্তু যত্ন-নৈতিকতার দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে নেল এই অবস্থাটিকে সন্তোষজনক নয় বলেই মনে করেন। তিনি ঘর ও স্কুল উভয় স্থানেই শিশুদের মধ্যে এবং জীবনের সকল অঙ্গনেই প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও যত্ন-গ্রহণ ও যত্ন-প্রদানের দক্ষতা বৃদ্ধি করাকে খুবই প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। তিনি যত্নকে জীবনের ও নৈতিকতার মূল ভিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

যত্ন-নৈতিকতার উৎস

প্রাকৃতিক যত্ন

ডিঅন্টোলজিক্যাল নৈতিকতা কর্তব্য (duty) ও অধিকারকে (right) বড় করে দেখে। একইভাবে যত্ন-নৈতিকতাও দায়বদ্ধতার (obligation) কথা বলে। “আমাকে অবশ্যই” তার জন্য কিছু করতে হবে, যিনি আমার কাছে এসেছেন কোনো দরকারে বা আমার সাথে কোনোভাবে সম্পর্কিত। এই “আমাকে অবশ্যই…” হচ্ছে যত্নের দায়বদ্ধতা। যার সাথেই একজনের প্রত্যক্ষ সাক্ষাত ঘটে তার প্রতিই মনযোগী হওয়া ও সাড়া দেয়ার, তথা যত্নবান হওয়ার দুটি প্রকার বা ধরণের কথা বলেছেন নেল। একটি অবস্থা হচ্ছে এরূপ যে, এই সাড়াদান কাজটি আমাদের কাছে প্রিয়; আমরা এক্ষেত্রে মনের কাছ থেকে কোনো বাধা পাই না। কারণ যত্ন-গ্রহীতাটি আমাদের প্রিয়, তার সাথে সম্পর্কটি খুবই নিকটের—সন্তান, পিতামাতা, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু ইত্যাদির ক্ষেত্রে যেমনটা হয়। এখানে মনের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট থাকে না। একইরকম তুষ্ট ও ইতিবাচক মানসিক অবস্থায় থাকেন যত্ন-গ্রহীতাও—যত্ন গ্রহণমূলক সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে। এধরণের যত্নকে বলা যায় প্রাকৃতিক যত্ন (natural care)। এখানে “আমাকে অবশ্যই…” একটি প্রাকৃতিক বাসনা বা প্রবণতা হিসেবে প্রকাশিত হয়—কোনো কর্তব্যের ধারণা বা বোধ হিসেবে নয়, যা কর্তব্য-নৈতিকতার প্রণোদনার ধরণ থেকে ভিন্নই বটে।

নৈতিক যত্ন

কিন্তু অন্য ক্ষেত্রটিতে আমাদের মন সহজে সাড়া দিতে চায় না। আমরা অন্যের প্রয়োজনকে জানতে পারি ও তা স্বীকারও করি বটে, কিন্তু সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে মনের ভেতরে বাধা অনুভব করি—অর্থাৎ আমরা যত্ন-কাজে অগ্রসর হতে চাই না। এই অবস্থা নানা কারণে হতে পারে—সম্পর্কের দূরত্ব, অপর পক্ষকে অপছন্দ বা ঘৃণা করা, নিজের ক্লান্তি, বা অপর জনের প্রয়োজনের বিরাটত্ব যা পূরণ করার সামর্থ্য যত্ন-প্রদাতার না থাকা ইত্যাদি। নেল বলেন, এখানে এসেই আমাদেরকে নৈতিক যত্নের (ethical care) পরিমণ্ডলে প্রবেশ করতে হয়। “আমাকে অবশ্যই” তখন অনেকটাই কান্টীয় কর্তব্য সদৃশ হয়ে উঠে। তবে কান্ট থেকে দূরে থাকতেই যেন নেল পছন্দ করেন, যদিও তিনি এও বলেছেন যে, যত্ন-নৈতিকতা যুক্তি (logic) ও যুক্তিপাতকে (reasoning) এড়িয়ে চলে না। কিন্তু তিনি এই মন-না-চাওয়া যত্ন কর্তব্যকে সম্পর্ক, যত্নের স্মৃতি, আবেগের সাথেই যুক্ত করে প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী। তার প্রধান বক্তব্য হচ্ছে, নৈতিক যত্ন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যত্ন-নৈতিকতার লক্ষ্য হচ্ছে শিথিল সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করা, পুনরুদ্ধার করা, বৃদ্ধি করা এবং বিরূপ সম্পর্ককে সুসম্পর্কে রূপান্তরিত করা। ফলে এই নৈতিক যত্নও অবশেষে প্রাকৃতিক যত্নের মতো হয়ে উঠবে।

নেল নোডিংসের নিজের ভাষায়, “Kant subordinated feeling to reason. He insisted that only acts done out of duty to carefully reasoned principle are morally worthy. Love, feeling, and inclination are all supposed by Kant to be untrustworthy. An ethic of care inverts these priorities. The preferred state is natural caring; ethical caring is invoked to restore it. This inversion of priority is one great difference between Kantian ethics and the ethic of care.” নারীবাদী যত্ন-নৈতিকতা হচ্ছে সর্বতোভাবে সম্পর্ক-সূত্রিত। এই ফেমিনিস্ট প্রেক্ষিত থেকেও নেল নৈতিক যত্নকে কান্টীয় কর্তব্য থেকে ভিন্ন হিসেবে দেখিয়েছেন, যদিও তিনি যত্নকে একটি “দায়বদ্ধতা” হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। এই দায়বদ্ধতা আসে মানুষের অরিজিনাল কন্ডিশন থেকে। শিশুর প্রতি পরিবার ও সমাজের যত্ন একটি প্রাকৃতিক দায়বদ্ধতা। বড়দের পারস্পরিক নৈতিক যত্ন কারও কারও বেলায় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে আসতে পারে, কারও বেলায় শৈশবে গৃহীত যত্নের স্মৃতি থেকে আসতে পারে। নেল আবার, সংগত কারণেই, এরিস্টটলীয় সদগুণ নৈতিকতাকেও (virtue ethics) ভয়ের চোখে দেখেন। নিজের মধ্যে মমতা, দানশীলতা ইত্যাদি সদগুণের বিকাশকেই প্রধান করে তুললে ব্যক্তি নিজেকেই প্রধান করে তোলেন এবং “অপর”কে প্রতীকে পর্যবসিত করে ফেলেন, অপরকে লক্ষ্য হিসেবে না নিয়ে বরং নিজের বিকাশের মাধ্যমে পরিণত করেন; “অপর” তখন আর আরেকটি অস্তিত্ববান সত্ত্বা হিসেবে পরিগণিত হয় না।

যত্নের উৎস হিসেবে মূর্ত বাস্তব সম্পর্ক

তবে যৌক্তিকতাকে নেল মনে করেন সর্বোত্তম যত্ন প্রদান-গ্রহণের হাতিয়ার হিসেবে এবং সদগুণের বিকাশকে তিনি দেখেন ব্যক্তির মধ্যে যত্ন-দক্ষতা সৃজনের উপায়সমূহের একটি হিসেবে। ফলে নারীবাদী যত্ন-নৈতিকতা কান্টীয় ডিঅন্টোলজিক্যাল নৈতিকতা ও এরিস্টটলীয় সদগুণ-নৈতিকতা থেকে স্পষ্টতই স্বতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও উভয়কেই নিজের মধ্যে অন্তর্ভুক্তও করে। নেল নৈতিক যত্নকে উপযোগবাদী প্রকৃতিবাদের (pragmatic naturalism) একটি রূপ বলে অভিহিত করেছেন। তার দাবী, যত্নবাদী নৈতিক জীবনের জন্য প্রকৃত বা বাস্তব মানবিক মিথস্ক্রিয়ার ঊর্ধ্বে অবস্থিত কোনোকিছুকে ভিত হিসেবে নেবার আবশ্যকতা নেই; ঈশ্বর, চিরন্তন সত্য বা সারগত মানবপ্রকৃতি—কিছুরই দরকার পড়ে না। যত্নতত্ত্ব মূর্ত সম্পর্ক, সম্পর্কগত আত্মসত্ত্বার বাস্তবতার উপরই প্রতিষ্ঠিত করা যায়, যেখানে বিমূর্ত, আকারী নীতি-চিন্তা অত্যাবশ্যক নয়। নেলের ভাষায়, “Even its relational ontology points to something observable in this world—the fact that “I” am defined in relation, that none of us could be an “individual,” or a “person,” or an entity recognizably human if we were not in relation.” সারকথা, নেলের মেতে, যত্নের প্রাকৃতিক উৎস হচ্ছে সম্পর্ক; যেখানে সম্পর্ক বিদ্যমান সেখানে যত্ন স্বতঃই উৎসারিত হয়। যত্নের অভাব বা ঘাটতি ঘটে সম্পর্কে বিচ্ছেদ ও যত্নদক্ষতার ঘাটতি থেকে। কাজেই নৈতিক যত্নের লক্ষ্যও আবার সম্পর্ককে যথাযথকরণ ও শিক্ষণ। ফলে নৈতিক যত্নকে প্রাকৃতিক যত্নের অঙ্গনে টেনে আনাই নৈতিক বা চরিত্র শিক্ষার কাজ। এখান থেকেই তিনি উপনীত হয়েছেন নৈতিকতা শিক্ষা হিসেবে যত্নশিক্ষার আঙ্গিনায়।

নৈতিক যত্ন শিক্ষার উপাদানগুলো

মডেল

নেল নোডিংস যত্ন-নৈতিক শিক্ষার চারটি প্রধান উপাদানকে (component) চিহ্নিত করেছেন। এদের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে আদর্শ নমুনা উপস্থাপন বা মডেলিং। আমাদেরকে অবশ্যই বাস্তবে আচরণ করে দেখাতে হবে যত্ন বলতে আসলে কী বুঝায়। আর এই মডেল থেকে শিক্ষা নেবে শিশুরা ও অন্যরা। তবে এখানেও তিনি হুঁশিয়ার করে বলেছেন যে, মডেলিং নিজেই যেন প্রাধান্য পেয়ে না বসে; কারণ এতে করে যত্ন-গ্রহীতার দিক থেকে আমাদের দৃষ্টি মডেল বা মডেলিংয়ের দিকে সরে আসতে পারে। অনুকরণীয় নমুনা হয়ে উঠতে হলে একজনকে আত্মসচেতন হতে হয়, নিজের মধ্যে সদগুণের বিকাশে যত্নবান হতে হয় এবং চিন্তা করার প্রয়োজন হয়। নেলের উপদেশ হচ্ছে, এসব যেন সম্পর্ক থেকে আমাদের মনোযোগ সরিয়ে না নেয়: আমাদের সাড়া কি পর্যাপ্ত হচ্ছে? আরও ভালভাবে কি যত্ন কাজটি সম্পন্ন করা যেতো না? আমাদের কাজ কি গ্রহীতার বিকাশে সহায়ক হচ্ছে, নাকি তা তার জন্য বাধা তৈরি করছে? অবসর সময়ে নিজের দিকে দৃষ্টি ফেরানোটা সবচেয়ে ভাল। তখন আমরা নিজের ও নিজের কাজের বিচার করে দেখতে পারি।

ডায়ালগ

যত্নের দ্বিতীয়, কেন্দ্রীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হচ্ছে সংলাপ বা ডায়ালগ। যত্ন-প্রদাতা ও যত্ন-গ্রহীতার মধ্যকার সংলাপ সম্পর্ককে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। তাছাড়া যত্নের ক্ষেত্রে প্রদান-কাজটিই সব নয়, গ্রহণ-কাজটিও একই মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ। সংলাপের মাধ্যমে যত্ন-গ্রহীতা প্রদাতার সাথে তার সম্পর্ককে প্রকাশ করে, যত্ন-গ্রহণে সাড়া দেয় এবং সর্বোত্তম যত্ন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তা না হলে যত্ন অপচয় বা অফলপ্রসূ হয়ে উঠতে পারে, বা এমনকি পীড়নমূলক হয়ে উঠতে পারে। বৈরী সম্পর্কে আবদ্ধরা পরস্পরের যত্ন নিতে আগ্রহী হয় না, একে অপরের কাছেই আসতে চায় না। কাজেই নৈতিক যত্নের ক্ষেত্রে সংলাপ আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যত্নের প্রেক্ষিত থেকে দেখা সংলাপকে নেল সংলাপের যুদ্ধ মডেল থেকে পৃথক করেছেন। তিনি সংলাপের যুদ্ধ মডেলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, সংলাপ সারগতভাবে কোনো বিতর্ক নয়, যুক্তিতে জেতাটাও এর উদ্দেশ্য নয়। নেলের ভাষায়, “Dialogue as described here rejects the “war model” of dialogue. It is not debate, and its purpose is not to win an argument. It may, of course, include intervals of debate, and both participants may enjoy such intervals. But throughout a dialogue, participants are aware of each other; they take turns as carer and cared-for, and no matter how great their ideological differences may be, they reach across the ideological gap to connect with each other.” নেল সংলাপের ক্ষেত্রে তাই “কমন গ্রাউন্ড”-এর উপর জোর দেন।

প্রকৃত ডায়ালগ অবশ্যই মুক্তপ্রান্ত, নতুবা তা অনর্থক হয়ে উঠে। সকল পক্ষই যদি নিজ নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকে তবে অপর পক্ষকে স্বমতে আনাই ডায়ালগের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে উঠে। কিন্তু সত্যিকারের ডায়ালগে সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে একটি অনিশ্চয়তা থাকে, সকল পক্ষকেই একটি অজানা সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়—যে সিদ্ধান্ত ডায়ালগের ভেতর থেকে যৌক্তিকভাবে নির্ধারিত ও গৃহীত হয়। সংলাপে উভয়েই আন্তরিকভাবে কথা বলে এবং উভয়েই মনোযোগের সাথে শোনে। যত্নসম্পর্কমূলক সংলাপে যত্ন-প্রদাতা ও যত্ন-গ্রহীতা উভয়েই অপর পক্ষকে নিজের মতোই আরেকটি সত্ত্বা হিসেবে দেখে ও তার প্রতি মনোযোগী হয় সর্বোত্তম ও সর্বাধিক যত্নকে সফলভাবে প্রবাহিত করার জন্য। তাই সংলাপ যত্ন-নৈতিকতার ভিতগত প্রয়োজন। বৈরীদের মধ্যে বৈরিতা হ্রাস ও কমন গ্রাউন্ড খুঁজে বের করার জন্য সংলাপই প্রথম পদক্ষেপ, যা থেকে পারস্পরিক যত্ন-সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। ঐক্যের সাধারণ নীতিগুলো অন্বেষণ করার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক পক্ষই তার প্রত্যয়-বিশ্বাসে অটল থেকে যুক্তি বিন্যাস করতে প্রাণপাত করবে এবং “মূর্খ-অশুভ” অপর পক্ষের উপর “গৌরবময় বিজয়” অর্জন করবে। এপর্যায়ে এসে নেল কগনিটিভিস্টদের জাস্টিস তত্ত্বের সাথে নৈতিক যত্নতত্ত্বের ফারাকটি নিয়েও আলোচনা করেন। তিনি বলেন, দেখার ন্যায়-প্রেক্ষিত ও যত্ন-প্রেক্ষিতের মধ্যে বহুবিধ ও গভীর ফারাক রয়েছে। ন্যায়বিচারবাদীরা যেখানে “কী সঠিক/অধিকার” তা নিয়ে বেশী চিন্তিত, সেখানে যত্ন তাত্ত্বিকেরা “কী সকলের জন্য ভাল/শুভ” তা নিয়ে বেশী আগ্রহী। এ বিচারে যত্নবাদীরা বরং পরিণামবাদী চিন্তকদের প্রতিই বেশী অনুরক্ত।

অনুশীলন

নেলের মতে যত্ন শিক্ষার তৃতীয় উপাদান হচ্ছে অনুশীলন বা প্র্যাকটিস। প্রত্যেককে অবশ্যই আন্তব্যক্তি মনোযোগ-সামর্থ্য ও যত্ন-দক্ষতার উন্নয়ন সাধনে অধ্যবসায়ী হতে হবে। নেল এ প্রসঙ্গে সাইমন ওয়েইল’য়ের মতের বিরোধিতা করেন। সাইমনের মতো চিন্তকেরা বিশ্বাস করেন যে, স্কুলে বিশেষত জ্যামিতি ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাকে “সঠিক”ভাবে কাজে লাগানো যায় মনোযোগিতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। কিন্তু নেল এতে মোটেই সন্তুষ্ট নন কারণ ধীশক্তিসম্বন্ধীয় বিষয়াদিতে বিস্ময়করভাবে মনোযোগ দিতে সক্ষমদের অনেককেই আমরা মানুষের প্রতি ও তাদের প্রয়োজনের প্রতি প্রায় সংবেদহীন দেখতে পাই। তাই ঘরে ও স্কুলে শিশুদেরকেও অপরের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধির জন্য বাস্তব যত্নমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমে অনুশীলনের বিকল্প নেই।

প্রায় সব সংস্কৃতিতেই নারীরা নিজের মধ্যে যত্নের মনোযোগ ও দক্ষতার বিকাশে পুরুষদের চেয়ে অগ্রসর, উন্নত ও গভীর। অধিকাংশ যত্নতাত্ত্বিক মনে করেন যে, নারীর কোনো বিশেষ সহজাত (innate) বা সারগত (essential) স্বভাবের কারণে এমনটি ঘটেনি। এটি ঘটেছে সমাজের প্রত্যাশা ও প্রত্যাশা মতো নারীদের যত্ন অনুশীলনের কারণে। সমাজ যেহেতু প্রায়শই ছেলেদেরকে এ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে সেহেতু উপযুক্ত অনুশীলনের অভাবে তারা এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। যত্ন করার প্রবণতা নারীর মনস্তত্ত্বে স্বগতভাবে নিহিত থাকুক আর না-ই থাকুক, এই আশা গুরুত্বপূর্ণ যে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই অনুশীলনের মাধ্যমে যত্ন-মনোযোগ ও যত্ন-দক্ষতা বৃদ্ধিতে সক্ষম। নেলের জোরালো দাবী হচ্ছে, যত্ন কেবল নারীরই কাজ নয়, এবং যত্নের ক্ষেত্র কেবল ব্যক্তিগত জীবনের পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশুরা কী ধরণের যত্ন অনুশীলন করবে? এখানে প্রসঙ্গত আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি কথা বলতে পারি: বলা হয়ে থাকে, পুরুষেরা নারীকে নারী করে রেখেছে, মানুষ হতে দেয়নি। তবে যত্নের ক্ষেত্রটিতে পুরুষেরা নিজের অজান্তেই নারীকে মানুষ করে রেখেছে এবং ভুলবশত নিজেরা পুরুষ হয়ে থেকে গিয়েছে, মানুষ হতে পারেনি। এখন পুরুষরা যদি মানুষ হতে চায় তবে তাদেরকে নারীর মতো যত্নবান হতে শিখতেই হবে। নেল বলেন, এখন মেয়েরা যেমন গণিত, বিজ্ঞান ইত্যাদি শিখছে, তেমনই ছেলেদেরকেও যত্ন শিখতে হবে; তাদেরকেও গৃহস্থালি কাজ, মেহমানের প্রয়োজন জানা ও তা পূরণে এগিয়ে আসা, স্কুলে পরস্পরকে সহায়তা করা ইত্যাদি কাজের অনুশীলন করতে হবে। যত্ন অনুশীলনের উপকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে নেল বলেন, “The supposition, from a care perspective, is that the closer we are to the intimate physical needs of life, the more likely we are to understand its fragility and to feel the pangs of the inner “I must”—that stirring of the heart that moves us to respond to one another.”

স্বীকৃতি

যত্ন প্রেক্ষিত থেকে নৈতিক শিক্ষার চতুর্থ উপাদানটি হচ্ছে স্বীকৃতি বা কনফারমেশন। স্বীকৃতির কাজটি যত্ন প্রদানকারীর করণীয় এবং তা প্রাসঙ্গিক হয় গ্রহণকারীর নেতিবাচক কাজের বিপরীতে। স্বীকৃতির অর্থ হচ্ছে অপরের মধ্যকার সবচেয়ে ভালকে তুলে আনা। স্বীকৃতি কোন আচার-সর্বস্ব কাজ নয়, এর জন্য প্রয়োজন সম্পর্ক। অযত্নমূলক বা অনৈতিক (আমাদের বিচারে) কাজের পেছনেও কারণ বা মোটিভ থাকে। আমরা এরকম কাজের বিপরীতে সাড়া দেবার ক্ষেত্রে বাস্তব অবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ সর্বোত্তম-সম্ভব মোটিভ বিবেচনায় আনতে পারি। মিথোস্ক্রিয়াকালে প্রাথমিক এই বিবেচনা যত্নশীলের পক্ষ থেকে এমন একটি সহানুভূতিপূর্ণ মনোভাবের অভিব্যক্তি ঘটাবে যা দেখে, অনুভব করে যত্ন-গ্রহীতার মধ্যে তার নিজের সর্বোত্তম সত্ত্বার প্রতি নিজেকে ইতিবাচকভাবে মনোযোগী করে তুলবে; সে যত্ন প্রদাতার নিকটে আসবে, তার উপর আস্থা রাখতে পারবে এবং যত্ন গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠবে। নেতিবাচক কাজগুলোর ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত অভিযুক্তকরণ, স্বীকারোক্তি (confession), ক্ষমা ও প্রায়শ্চিত্তকে প্রধান করে তুলি। নেলের মতে, অভিযুক্তকরণ যত্ন প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে সম্পর্ককে দুর্বল করে তুলে। স্বীকারোক্তি ও ক্ষমা সম্পর্ককে কর্তৃপক্ষ ও অধীনের সম্পর্কে পর্যবসিত করে; যার ফলশ্রুতিতে অনৈতিক কাজের সংঘটক নিজ কাজের জন্য নিজের দায়-দায়িত্বকে বুঝতে বা অনুভব করতে ব্যর্থ হয়।

অসমাপ্ত

সূত্র: Nel Noddings – Educating Moral People : a caring alternative to character education
নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—১ম অংশ
নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—২য় অংশ : নৈতিকতার নারী-পুরুষ!
নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—৩য় অংশ : ক্যারল গিলিগান: নারীর নৈতিকতা পুরুষের নৈতিকতার সমান
নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—৪র্থ অংশ : নেল নোডিংস: যত্নের রূপতত্ত্ব
নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—৫ম অংশ : নেল নোডিংস: অরিজিনাল কন্ডিশন
নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—৬ষ্ঠ অংশ : নেল নোডিংস: নৈতিক যত্ন শিক্ষা
নারীবাদী যত্ন নৈতিকতা—৭ম অংশ : নেল নোডিংস: যত্ন দিতে ও নিতে শেখা
n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী