ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

পারমেনাইডিসের কথা মেনে নিলে বলা সম্ভব, এ-গাঙ ও-গাঙ, যত গাঙেই পা নামানোর চেষ্টা করো না কেন ব্যাপারটা আখেরে একই। গাঙে গাঙে ফারাক নেই। চেষ্টা থাকে নানা প্রেক্ষিত থেকে দেখার, নানা ঢংয়ে উপস্থাপনার। তবু পোস্টগুলো ঘুরে ফিরে একই বলয়ে থেকে যায়—বৈচিত্র্যহীন, একঘেয়ে। তার উপর, একটি সমাজ বা জাতি যখন অস্থির থাকে তখন অস্থিরতার বিষয়টিতেই সকলে আগ্রহী হয়ে থাকেন। স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক কারণেই অন্যান্য বিষয়ে আমাদের মন বসে না। তারও উপর এই ব্লগ হচ্ছে সিটিজেন জার্নালিজমের ধারায় গড়ে উঠা। এরকম ব্লগে দর্শন থাকতেই পারে, কিন্তু তা নিশ্চয়ই একটি অপ্রধান ও পার্শ্ব বিষয়। সব সাংবাদিকতামূলক পত্রিকাতেই দর্শন-সাহিত্য-শিল্পকলার স্থান থাকে এবং একই নিয়মে এই ব্লগেও চিন্তা-দর্শন নামের একটি ক্যাটাগরি সন্নিবিষ্ট হয়েছে। তবুও শেষ কথা হচ্ছে এটি কোনোভাবেই প্রধান বিষয় নয়। আগামী ফেব্রুয়ারিতে বিডিনিউজ২৪ ব্লগের আরেকটি বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এর প্রাক্কালে কী লেখা যায় তা নির্ধারণ করাও আমার জন্য কষ্টকর হচ্ছে। ভাবছি এই ছুতায় ব্লগ লেখার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নেয়া যাক।

ব্লগ লেখা হচ্ছে ভাষা নিয়ে কারবার। ভাষার তিনটে দোষ রয়েছে: এক. ভাষার সীমাবদ্ধতা; দুই. ভাষার সীমা ছাড়ার স্বভাব; ও তিন. কথকের ভাষা-অদক্ষতা। যেকোনো বচনের নানা অর্থ করা চলে। কথক কী বলতে চেয়েছেন আর পাঠক কী বুঝছেন তার মধ্যে অমিল থেকে গেলে যোগাযোগটাই ব্যর্থ হয়ে পড়ে। ফলে অর্থকে পরিষ্কার করতে হলে আরও বচন দরকার। কিন্তু সে বচনগুলোও তো একই সমস্যায় আক্রান্ত। কোনো বচনে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলোর অর্থ অন্যসব অব্যবহৃত শব্দের অর্থের উপরও নির্ভর করে। গরু বলতে কেবল গরুই বুঝায় না; এটাকে ছাগল নয়, মহিষ নয় ইত্যাদি দিয়েও বুঝতে হয়। ফলে বচনের পর বচন সাজিয়ে কথাকে সম্পূর্ণ করা তো যায়ই না, বরং উল্টো নানা অসঙ্গতি তৈরি হয়।

ভাষার আবার সীমা ছাড়ার প্রবণতাও রয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের কোনো এক মিসির-আলী-গল্পের বইয়ে একটি ধাঁধা দেখেছিলাম। ধাঁধাটি এরকম: জীবনভর জলে বাস করা একটি প্রাণী সারাটা জীবন ডাঙাতেই থাকে, এক মুহূর্তের জন্যও তা পানিতে বাস করে না; প্রশ্ন হচ্ছে, এ প্রাণীটি থাকে কোথায়? বইটির শেষে অবশ্য উত্তরটি দেয়াও হয়েছে: কল্পনায়। কিন্তু আমাদের মনে কি সত্যি এমন প্রাণী বাস করে? আমরা কি এমন প্রাণী সত্যি কল্পনা করতে পারি? এটি তো আমাদের বুদ্ধির বা চিন্তার বা যুক্তির মূল নিয়মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বাঘের মাথায় শিং, ঘোড়ার ঘাড়ের উপর মানুষের মাথা—আমরা এসব কল্পনা করতে পারি। কিন্তু জলে বাস না করা জলবাসীকে তো কল্পনায় আনতে পারি না। তা হলে এ প্রাণীটা থাকে কোথায়? কোথাও না কোথাও তো প্রাণীটা আছে—তা না হলে প্রাণীটার কথা উঠলো কী করে? এ প্রাণীটা ভাষায় থাকে। ভাষায় এমন সব জিনিসও থাকতে পারে যা জগতে না থাকলেও, আমাদের কল্পনায় না থাকতে পারলেও, দিব্যি ভাষার দুনিয়ায় উন্মেষিত হতে পারে।

এবার বিচার করে দেখুন উপরের প্যারার শেষ বাক্যে “জগতে না থাকলেও” কথাটার “জগত” শব্দটিকে। উপরে পড়ার সময় আমার এই কথাটিকে অনেকে ঠিক বলেই হয়তো ধরেছেন। আসলেই তো! মিসির আলীর প্রাণীটি জগতে নেই, বাস্তবে নেই, আমাদের ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষণের দুনিয়ায় নেই; আবার কল্পনা মাত্র করাও যাচ্ছে না। কিন্তু রাসেলের মতো বাস্তববাদী বলবেন, না, এ প্রাণীটিও বাস্তব; তা আছে ভাষায়, ভাষাও জগতেরই অংশ, জগত বাস্তব। কাজেই মিসির আলীর প্রাণীটিও জগতেই কোনো না কোনো অর্থে বাস্তব হিসেবে বিদ্যমান। ভাষায় হেঁয়ালির আরও একটি উদাহরণ দেয়া যাক। আমি যদি বলি, “আমি সত্যবাদী”—তবে কথাটি সত্য হতেও পারে আবার মিথ্যাও হতে পারে, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই অসঙ্গতি তৈরি হবে না। কথাটি সত্য হলে আমি সত্যবাদী, মিথ্যা হলে মিথ্যাবাদী। কিন্তু যদি বলি, “আমি মিথ্যাবাদী”—তবে আমার কথাটি সত্য হলে আমি মিথ্যাবাদী, এবং মিথ্যা হলে আমি সত্যবাদী। এখানে একটি উদ্ভট অসঙ্গতি তৈরি হয়।

এখন তা হলে দার্শনিকদের অবলম্বন এই ভাষা নিয়ে কী করা যায়? সব দার্শনিকের অধিবিদ্যাকেই ‘আজাইরা’ বলে ফেলে দেয়া বা সব নীতিবিদের জীবনবীক্ষাকে ‘অসম্পূর্ণ, একপেশে’ বলে দাবী করা সম্ভব। কিন্তু আপনি সব জ্যোতিষীকে এভাবে ফেলে দিতে পারবেন না। তাদের কারও না কারও ভবিষ্যৎবাণী ফলেই থাকে। ফাইনাল খেলার দিন এক জ্যোতিষী যদি বলেন আর্জেন্টিনা জিতবে, তো আরেকজন বলবেন ব্রাজিলের নাম। একজন তো সঠিক হবেনই। আমার জীবনে করা যৎসামান্য জ্যোতিষী-বচনের সবগুলোই বেঠিক প্রমাণিত হয়েছে। আর সাহস নেই। কাজেই দর্শনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু না বলে বরং তার দুরবস্থা নিয়েই তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। জ্যোতিষীর কাজ জ্যোতিষেরাই করুক।

সবশেষে আছে কথকের বচন তৈরিতে অদক্ষতা। এই অদক্ষতার ফলে তৈরি হতে পারে ভুল বুঝাবুঝি। সব কথা স্পষ্ট করে বলা যায় না—নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। যাও বা বলা যায় তাও ঠিকভাবে বলা হয় না। সঠিকভাবে বলার চেষ্টা করেও ভাষার নিজ দোষে সফল হওয়া যায় না। ফলে এন্তার বিভ্রান্তি, অসংলগ্নতা, স্ববিরোধীতা তৈরি হতে পারে। এই সূত্রটি বোধ হয় একেবারে বেঠিক নয়: মানবসমাজের গুরুতর সংকটগুলোর মূলে রয়েছে যোগাযোগে অদক্ষতা। আর যোগাযোগের জন্য যে সিম্বল বা রিপ্রেজেন্টেশনই ব্যবহার করি না কেন তা আদতে ভাষারই অন্তর্ভুক্ত। তবে শুধু এতটুকুতেই অনেকে তুষ্ট হবেন না। তারা বলবেন, ভাষাটা উৎস নয়, উৎস হলো মন। মনের ভেতর যে প্রবণতাগুলো রয়েছে সেগুলোকে প্রাকসিদ্ধভাবে সঠিক ধরে নেয়ার কারণে বা সেগুলোকে যুক্তির আবরণে সিদ্ধ করে রাখার কারণেই স্বাভাবিক ভুল বুঝাবুঝি তো বটেই, এমনকি ইচ্ছাকৃত ভুল বুঝাবুঝি সম্ভব।

সে যা-ই হোক, ভাষা নিয়ে এতো গোল সত্ত্বেও কিছুটা অবাকও হই। গোটা চারেক বছরে ১৯০টা পোস্ট করা গেছে। এদের মধ্য থেকে গোটা চল্লিশেক ফেলে দিলেও দেড়শ বাকী থাকে। এদের মান ভাল না হলেও লেখার আগ্রহ সবটুকুই উবে যায়নি। এরও একটি কারণ রয়েছে। ব্লগে আসার আগের সময়ে হাতে গোণা মাত্র কয়েকটি লেখা লিখতে পেরেছিলাম। লিখতে গিয়ে তাল খুঁজে পাওয়া যেতো না, লেখাটা শেষ করা যেতো না। তাল অবশ্য এখনও পাই না। কিন্তু ব্লগের ক্ষেত্রে পাবলিশ করার একটি তাড়না থাকায় কোনো না কোনোভাবে একটা ইতি টানতেই হয়। ব্লগের সাথে লেপটে থাকতে না পারলে লেখা যে সম্ভব হবে না তা হয়তো হলফ করেও বলা যেতো। এখানে অনেক জনপ্রিয় ব্লগার রয়েছেন—যাঁরা অনেক ভাল লিখেছেন ও পাঠকপ্রিয়ও হয়েছেন। আরও আনন্দের বিষয় হচ্ছে, ইদানিং নতুন অনেকেই যুক্ত হয়েছেন। একালে ব্লগ সার্ভিস যারা দিচ্ছেন তারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় উপকার করছেন তা বলাই বাহুল্য।

তবে হিরাক্লিটাসের কথা মেনে নিলে বলা যায়, এক গাঙে দুবার চান করা অসম্ভব। ফলে দুটি লেখা এক না হওয়ারই কথা। যিনি পড়ছেন তিনি যদি নিজে চিন্তায় সক্রিয় হন তবে ভিন্নতা খুঁজে বের করাও সম্ভব। পড়ার মধ্যে একটি স্বাধীনতাও থাকে। উদ্ভাবনের স্বাধীনতা। লেখক যা বুঝোতে চেয়েছেন সেটাই যে বুঝতেই হবে তা তো নয়। লেখার মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে যদি কেউ অন্য উন্নতর ইন্টারপ্রিটেশন বা অন্য কোনো নতুন ধারণার সন্ধান পান তবেও বা মন্দ কী। লেখকের মনে বিদ্যমান মর্ম উদ্ধার করার চেয়ে এই পাঠকের নিজ মতো মর্ম উদ্ভাবন করাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সৃজনশীলতার বাহন বা নিমিত্ত হিসেবে ভাষার সামর্থ্যটিও একটি ইতিবাচক বিষয়। নীটিশে তার কেতাবে যা লিখেছেন তার শত ব্যাখ্যা সম্ভব। পাঠকের কী ঠেকা পড়েছে আসলটি খুঁজে পাওয়ার? তার লেখা পড়ে আমি কিভাবে নিজেকে নিজস্বভাবে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করতে পারি তাও-বা গুরুত্বে কম কিসে? সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধিটাই হচ্ছে আসল কথা।

কোনো বড় লেখকের মত ও ধারণা উল্লেখ করতে গেলে এ সমস্যায় পড়তে হয়—আমি কি তাকে ঠিকঠাক মতো বুঝতে পেরেছি? আমার মতো অজ্ঞ মানুষের পক্ষে শুদ্ধতার দাবী করা নিশ্চয়ই হাস্যকর হবে। ফলে এখানে আরেকটি কাজ করা যায়। তা হচ্ছে, আমি যা বুঝলাম তা নিজ দায়িত্বে নিজের কথা হিসেবে লিখে দিলাম। এতে অন্য লেখকের উপর ভ্রান্ত তাৎপর্য চাপিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা থেকে রেহায় জোটে। কিন্তু এরও আবার অন্য একটি অসুবিধা আছে। তা হলো, কথাটি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হলে চুরির দায়ে পড়তে হয়। মধ্যযুগের মুসলিমরা জ্ঞানকে প্রাপকের হারানো সম্পদ বলেই জ্ঞান করতেন। ফলে তারা সূত্র উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করতেন না। তারা গ্রীক, রোমান, ভারতীয় বা চীনা জ্ঞান—যেখানে যা পাওয়া যেতো—সবই নিজের করে ফেলতেন। জ্ঞান বা ধারণা চুরি করা অপরাধ কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার পক্ষে যুক্তি আছে বলেই মনে হয়। আমার আরও ধারণা, জ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি অনৈতিক কাজ হচ্ছে, জ্ঞানকে লুকিয়ে রাখা বা তা সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি করা। একথা বলা যায় যে, জ্ঞান চুরি করা যেমন পুণ্য, তেমনই তা গোপন করার ইচ্ছাও পাপ।

অবশেষে বলা যায়, যেহেতু আমাদের সব কাজেরই একটি নৈতিক লক্ষ্য রয়েছে, সেহেতু লেখার ও পড়ার মধ্যেও তা রয়েছে। লেখা ও পড়া এক ধরণের কম্যুনিকেশন, এবং এরও একটি নৈতিক লক্ষ্য থাকতে পারে। কম্যুনিকেশনে মধ্যস্থতা করার একটি রীতিও মানবসমাজে রয়েছে। এই মধ্যস্থতাকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার নেগোসিয়েশনও বলা যায়। লেখার ক্ষেত্রে নেগোসিয়েশন বলতে বুঝোচ্ছি বিভিন্ন মত ও সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের একটি জায়গা খুঁজে বের করার বিশ্লেষণমূলক চেষ্টাকে। কম্যুনিকেশন ও নেগোসিয়েশনের মাধ্যম হচ্ছে ডায়ালগ। এই ডায়ালগের বাসনা থেকেই আমরা লেখালেখি করতে উৎসাহী হই। নিজেকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার সাথে সাথে সকলের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির ভিত খুঁজে বের করাকে ডায়ালগের নৈতিক লক্ষ্য হিসেবে নেয়া যায়। সবসময় যে ডায়ালগ সফল হবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। কিন্তু সফলতাকে যদি উদ্দেশ্য হিসেবে নেয়া যায় তবে কথার ধরণের উপর তার প্রভাব পরবে। সাফল্যের ইচ্ছা ও চেষ্টার মধ্যেই আমাদের কাজের নৈতিক মূল্য বিদ্যমান।

নেগোসিয়েশনের গুরুত্ব অনেক। একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যায়। মুসা ভবিষ্যৎ খুঁজেছিলেন নীল দরিয়া ভেঙে। কিন্তু মুহম্মদ ভবিষ্যৎ পেয়েছিলেন তাঁর নেগোশিয়েট করার দক্ষতা থেকে। নবুওতের তের বছরের মাথায় আবু-তালিবের মৃত্যুতে তিনি সম্পূর্ণ সহায়হীন, নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। তাঁর নিজ গোত্রের নেতৃত্ব চলে আসে আবুজেহেলের হাতে, যিনি নিজেই নবীর ঘোর জিঘাংসু শত্রু। নবী তায়েফ ছুটে গেলেন। কেউই তাঁকে গ্রহণ করলেন না। উল্টো অত্যাচারিত হয়ে ফিরে আসলেন। মক্কাবাসীরা নবীর যেকোনো দিন নিহত হবার সংবাদের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি নীল নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মুসার মতো দেখছিলেন “নোহোয়ার টু স্টে, নোহোয়ার টু গো, নোহোয়ার টু রিটার্ন।” ওদিকে, মদিনার প্রভাবশালী আওস ও খাযরায গোত্রদুটি নিজেরা নিজেরা হানিহানি ক’রে ক’রে হয়রান হয়ে শেষে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে রাজা হিসেবে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখনও অভিষেক হয়নি। এরই মধ্যে তারা অলৌকিকভাবে মুহম্মদকে গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। এই প্রস্তাবের পেছনে নেগোসিয়েশনে নবীর সুদক্ষতা ও বিশ্বস্ততা প্রধান কারণ ছিল।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী