ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

Gang-Rape

কোনো বাড়ীতে চুরি-ডাকাতি সংঘটিত হলে আমরা এ বলে হৈচৈ শুরু করি না যে, ঘরের মালিক তার সম্পদ মানুষকে দেখাচ্ছেন কেন। কারও টাকা-ঘড়ি ছিনতাই হলে আমরা কাউকে এ দোষ দেই না যে, তিনি ঘড়ি পরে কেন বের হলেন বা এত টাকা পকেটে নিয়ে কেন বের হলেন—ধনসম্পদ, টাকা, ঘড়ি লুকিয়ে রাখলেই হয়। সাজানো খাবারের লোভ সামলাতে না পেরে কেউ যদি দোকানে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তবে কেউ কিন্তু দোকানিকে দুষতেন না। কিন্তু ধর্ষণের বেলায় নারীর অনেক ‘দোষ’—নারীর পোশাক কেন শালীন নয়, সে কেন একা রাতে ঘর থেকে বের হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।

ধর্ষণ কমানোর উপায় কী? এ বিষয়ে বিস্তর কথা বললেও আমরা কেউ এটি স্পষ্ট করে বলি না যে, পুরুষের দায় বেশী; এবং পুরুষের দায়িত্ব নিঃশর্তভাবে নারীকে রক্ষা করা। একজন নারী রাস্তা দিয়ে নগ্ন হয়ে হেঁটে গেলেও পুরুষের দায় থেকে যায় তাকে রক্ষা করার। একজন পুরুষকে যদি কোনো নারী প্রলুব্ধও করেন এবং এতে সাড়া দিয়ে পুরুষটি ধর্ষণ করতে অগ্রসর হন, তবুও পুরুষটি দায়ী হবেন তার দায়িত্ব পরিহার করার জন্য।

পুরুষকে রক্ষা করার দায় নারীর উপর আল্লাহ সেভাবে আরোপ করেননি, যেভাবে আল্লাহ নারীকে রক্ষা করার দায়িত্ব পুরুষের উপর আরোপ করেছেন। পুরুষেরা নারীদের ‘কাওয়াম’, ‘কর্তা’, ‘রক্ষক’ ইত্যাদি শুনতে আমরা বেশ অভ্যস্ত। বোনকে রক্ষা করার, সাপোর্ট করার শর্তেই আল্লাহ ভাইকে সম্পত্তিতে অংশ বেশী দিয়েছেন। এখন সম্পত্তিতে বেশী নেবার বেলায় আমরা ষোল আনা। আর ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে দায় যেন নারীর। ভাবটা এমন যে, নারীরা সব হিজাব করা শুরু করে দিলে দেশে যেন আর ধর্ষণ থাকবে না; নারীর হিজাবের গুণে পুরুষরা সবাই সাধু হয়ে উঠবেন।

নারীর পোশাক নিয়ে কেউ যদি নসিহত করতে চান তবে তা আলাদাভাবে করাই ভাল; ধর্ষণের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তার সাথে এটিকে যুক্ত করা অনুচিত। যদি করা হয় তবে অত্যাচারিত নিজে অত্যাচারের কারণ—এরূপ ওকালতি করার দায়ে দায়ী হতে হয়। এ চেষ্টা যারা করেন তারা দুটি অন্যায় করেন: ক. অত্যাচারীর দায় লাঘব করা, এবং, খ. অত্যাচারিতের উপর দায় আরোপ করা। দুনিয়ার অনেক দুষ্ট লোক এ নীতি নিয়ে চলেন, দুনিয়ার অনেক অত্যাচারী এ নীতি নিয়ে চলেন; আব্দারটা তাদের এমন যে, আমার কী দোষ, ওর দোষেই তো ওর এ দশা হলো।

‘পর্দানশীন’ নারীরাও ধর্ষণের হাত থেকে মুক্তি পাননি। ‘বেপর্দা’ নারী ধর্ষিত হলে সে নারীকে আংশিকভাবে দায়ী বলা গেলে, ‘পর্দানশীন’ নারীকেও দায়ী করা যাবে কেন তিনি ঘর থেকে বের হলেন বলে। একইভাবে, ঘরের ভেতর থাকা নারী ধর্ষণের শিকার হলেও বলা যাবে, কেন তিনি মাটির নিচে গেলেন না! পৃথিবীর সব নারী হিজাব করলেও পুরুষের দশার পরিবর্তন না হলে নারী রক্ষা পাবেন না।

একটি ধর্ষণের ঘটনা সমগ্র পুরুষ সমাজের জন্য একটি চরম ব্যর্থতা। পুরুষের মুখে তখন কালি পড়ে। তখন তিনি আর পর্দার কথা তুলবেন না, ধর্ষকের পক্ষে যায় এমন একটি কথাও উচ্চারণ করবেন না। তিনি স্তম্ভিত হয়ে যাবেন, বেদনায় ক্লিষ্ট হবেন, এবং সুবিচারের জন্য কথা বলবেন। আমাদের সমাজে যারা ধর্ষিত হন তারা শক্তিহীন, ক্ষমতাহীন। এ নারীরা একটি সম্ভ্রমবোধ, শালীনতাবোধ নিয়েই চলেন। হতে পারে তাদের বোধের সাথে অন্যদের বোধের পার্থক্য রয়েছে।

‘পর্দা’ ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নারীর অধিকারের সাথে ন্যূনতমভাবেও আবশ্যিক সম্পর্কে আবদ্ধ নয়। যখন কেউ এ দাবী করেন যে, ‘পর্দা’ করলে ধর্ষণের হাত থেকে নারী রক্ষা পেতেন, তখন তিনি নারীর নিরাপত্তা লাভের নিরঙ্কুশ অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করেন। তখন শালীনতা সম্বন্ধে তার নিজের আদর্শ ও ধারণাকে নারীর উপর আরোপ করেন। এ প্রবণতা থেকে এটি প্রকাশিত হয় যে, নারী কী কাপড় পরবেন, তার দেহের কতটুকু অংশ তাকে ঢাকতে হবে তা পুরুষরা ঠিক করে দেয়ার অধিকারী, যা মানতে নারী বাধ্য। আর যদি নারীরা তা না মানেন তবে ধর্ষণের হাত থেকে তাদের রক্ষা করার দায় যেন পুরুষদের হ্রাস পায়।

নারী ‘বেপর্দা’ হলেও তিনি পুরুষের উপর এমন কোনো অত্যাচার করেন না যা নিয়ে মামলা চলতে পারে। কারণ তিনি পুরুষের দেহে কোনো আঘাত করেন না, তার উপর কোনো জোর খাটান না। কিন্তু বিপরীতক্রমে, পুরুষ যদি ধর্ষণ করেন তবে তিনি নারীর উপর জঘন্যতম অত্যাচার করে—তিনি তার দেহের উপর আক্রমণ করেন। পুরুষটি এতে এমন একটি কাজ করেন যার ফলে নতুন সন্তানের আবির্ভাব হতে পারে—সম্ভাব্য সন্তানের অধিকার, লালনপালন ইত্যাদির জন্য কোনো দায়বদ্ধতার অঙ্গিকারই তিনি করেন না। তিনি নারীর গর্ভকে আক্রমণ করেন। তিনি পশুরও অধম হয়ে উঠেন।

পুরুষতান্ত্রিক ভাবনার প্রথম এসাম্পশন হচ্ছে, নর-নারী ব্যভিচার করলে তার দায় নারীর, নারী রাজী না হলে তো পুরুষও বেঁচে যেত। অর্থাৎ যৌন বাসনা যেন শুধু পুরুষের, নারীর নেই। অথবা, থাকলেও সে পুরুষের পথে হাঁটবে কেন? আহা! সব পথ পুরুষের জন্য খোলা, নারীর জন্য নয়। কিন্তু কৌশলটার মধ্যে পুরোই ফাঁকি; কোন ব্যভিচারে পুরুষ নেই? পুরুষ ছাড়া ব্যভিচার হয় কি? ভেবে দেখুন, কোনো নারী ব্যভিচার ক’রে স্বামীর উপর অবিচার করলেও অন্য নারীর উপর নিজের সন্তান চাপিয়ে দেন না। কিন্তু পুরুষ চোরের মতো নিজের সন্তান অন্য পুরুষের ঘরে রেখে দেন, সন্তানের পিতৃ-পরিচয় বদলে দেন এবং তার ভরণপোষণের দায় অন্য পুরুষের উপর চাপিয়ে দেন। কাক হয়ে কাকের মাংস খাওয়া বলতে যা বুঝায় সেটাই হলো পুরুষের কাণ্ড। অথচ হেন কাণ্ডে পুরুষ সমাজ পুরুষটির উপর চড়াও না হয়ে নারীটিকে নিয়ে পড়েন। এ ভাবনারই চরম অত্যাচারী প্রকাশ ঘটে ধর্ষণের বেলায়। আহারে পুরুষ! সেখানেও দোষ নারীর, নারীর পোশাকের!

মানুষ কাপড় পরে কেন? ধর্ষণ কমানোর জন্য? পুরুষতান্ত্রিক একপেশে মূল্যবোধ আমার মাথায় প্রিসাম্পশন হয়ে গেঁথে বসে থাকলে হ্যাঁ-বাচক উত্তর নারীদের বেলায় আমি মেনে নিতে পারব। কিন্তু যদি আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেন, তুমি পুরুষ কাপড় পর কেন? নারী কর্তৃক ধর্ষিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য? তবে একই উত্তরে আমার মান যে যায়। যে ভূত শর্ষের ভেতরে বাস করে, যে বুলবুলি ধান খেয়ে ক্ষেত উজাড় করে, সে-ই যদি বিচারক হয় তবে দোষ যে শর্ষের হবে, ধানের হবে, তাতে আর অবাক হবার কী আছে!

পুরুষ সে যে নারীর নিরাপত্তা দিতে সক্ষম, নারীর উপর কোনরূপ শর্ত আরোপ ছাড়াই; নারীর প্রাপ্য তার সমরূপ যা তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হবে এবং নারীর প্রাপ্য নারীকে আগে দিয়ে তারপর পুরুষ আশা করতে পারবে তার কাছ থেকে সে কী পেতে পারে—এটাই ঈশ্বরের বিধান। আমি পুরুষ আগে তো ঠিক হই, পুরুষ হই। নারীর ভাবনা নারীর কাছেই থাকুক। আমি জানি ভাবনায় নারী আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি