ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

বাগদাদের কোনো এক সরাইখানায় এক বেকুব আর এক মাতালের হৈ-হল্লায় অতিষ্ঠ হয়ে পাশের লোকজন গেল তাদের মধ্যে একটা দফারফা করতে। জানা গেল, বিবাদের বিষয় চাঁদ-সুরুজের মূল্য সংক্রান্ত অবধারণা। বেকুবের কথা, সূর্য আমাদের জন্য বেশী উপকারী। কিন্তু মাতাল মানতে নারাজ। তার এক ও সাফ কথা, চাঁদ আমাদের বেশী উপকার করে। মাতালের ক্ষেত্রে আচরণ থেকে অবজেক্টিভ আইডেন্টিফিকেশন অব স্টেট সম্ভব হলেও সেভাবে কাউকে বেকুব সাব্যস্ত করা চলে না। তবুও হাবভাব থেকে হোক বা মাতালের সাথে তর্কে নামার কারণেই হোক—লোকজন তাকে বেকুব বলেই সাব্যস্ত করেছিল। সূর্য-প্রেমিকটি চাষাদের মুলুক থেকে ও চন্দ্র-প্রেমিকটি কবিদের ডেরা থেকে এসেছিল কিনা তা তাদের বেশভূষা থেকে অনুমান করা সম্ভব না হলেও এটি সবার বুঝে আসতে দেরি হলো না যে, বিবাদ সহজে মিটবে না। সরাইখানার আরেক কোনায় বসে উদর-সেবায় নিয়োজিত ছিল নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। হৈচৈয়ের কোনার দিকে নির্লিপ্তভাবে মাঝে মাঝে তাকালেও নিজের পেটে খাবার সরবরাহের কাজটিকে সে বেশী গুরুত্ব দিয়েই চলেছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে লোকজন গিয়ে ধরলো হোজ্জাকে—হুজুর, আমরা মাতালটাকে যতই বুঝাই, সে মানতে নারাজ; আপনি দার্শনিক মানুষ, আপনার কথায় যদি সে ক্ষান্ত হয়।

হোজ্জা লোকের কথায় অকুস্থলে গিয়ে বলল, তোমরা মূর্খরা সোজা বিষয়টা নিয়ে বিজ্ঞ লোকটির সাথে পীড়াপীড়ি করছ কেন? চাঁদ যে আমাদের বেশী উপকার করে তা বুঝতে অত হুঁশ বা জ্ঞানের তো দরকার দেখছি না। উপযোগিতা হচ্ছে নীতির মূল নীতি, প্রয়োজনই হচ্ছে সত্য-মিথ্যার কষ্টিপাথর। চাঁদ আলো দেয় রাতের বেলায়, যখন আমাদের আলোর দরকার। সূর্য দেয় দিনের বেলায়। তা দিনের বেলায় আমাদের আলোর দরকারটা কী বল দিকিন? কাজেই উনার কথাই ঠিক। তোমরা বেহুদা হৈচৈ বন্ধ করে শান্তি কর।

কন্যা বলল, বাবা, লোকে চন্দ্র-সূর্যের জন্য এতো লাফায় কেন?—একধাপ নিচে, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, নেমে ঠিকমতো চললেই হয়; মানে আমি পৃথিবীর কথা বলছি।

বাগদাদের কোনো এক মা তার শিশু-সন্তানকে নিয়ে পথ চলছিল। পথের পাশে একটি গাছের নিচে সন্তানকে রেখে একটু দূরে কুয়া থেকে পানি আনতে গেলে সে অবকাশে আরেক নারী শিশুটিকে কোলে নিয়ে দ্রুত চলতে থাকে। মা এসে সন্তানকে না দেখে পাগলিনী হয়ে ছুটতে ছুটতে একসময় দ্বিতীয়া নারীটিকে ধরে ফেলে। এখানেই বিবাদের শুরু। যথারীতি খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে মামলা উঠল। সবাই জানে, খলিফা ভারী মুশকিলে পড়েছিল। সে আসল মা নকল মা ফারাক করতে না পেরে হুকুম দিল সন্তানটিকে কেটে দু-টুকরো করে প্রত্যেককে এক টুকরো করে দিয়ে দিতে। এতে কী ফল হয়েছিল তা অনুমান করাও সহজ বিধায় কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না। খলিফা আসল মাকে খুঁজে পেল, তার সুবিচার-সুখ্যাতি চারিদিকে আরও রোশনাই হয়ে ছড়িয়ে পড়লো।

কন্যা বলল, বাবা, গল্প বানিয়েরা এক-ধাপ-ওনলি চিন্তা করে কেন? ধাপ বাড়ালে গল্প তো আরও এক্সাইটিং হয়। মোটে এক ধাপ বাড়িয়ে আমি তোমার খলিফার মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারি। মনে কর: যেতে যেতে সেকেন্ড মেয়েটারও পিপাসা পেল। সে-ও মা মেয়েটার মতো বাচ্চাটাকে রেখে পানি আনতে গেল। এসে দেখলো বাচ্চা নেই। থার্ড আরেক মেয়ে তাকে তুলে নিয়ে চলে গেছে। সেকেন্ড মেয়েটা দৌড়ে থার্ড মেয়েটাকে ধরে ফেলল ও খলিফার দরবারে এই দুইজন গিয়ে হাজির হলো। ওদিকে শোকে-দু:খে আসল মা মরেই গেছে।

পরের ব্লগ: নাস্তিকতা চটুল কথার ছাড়পত্র নয়

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি