ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

সাধারণত নাস্তিক্যবাদী চিন্তকরা মুক্তমনাদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু একজন মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান চিন্তক, যিনি তার নিজ ধর্মের মূলকথার উপর ভিত্তি করে তার জীবনদর্শন রচনা করতে চান বা করেন, তিনি তার নিজ ধর্মীয় চিন্তার ধারা বা ঐতিহ্যের অন্ধ অনুসারী হতে অস্বীকার করলেও এবং যুক্তি-বুদ্ধির অনুসারী হতে সচেষ্ট হলেও এবং অনেক ক্ষেত্রেই নাস্তিক্যবাদীদের দাবীর সাথে তাদের সিদ্ধান্তে মিল থাকলেও, তাকে মুক্তমনা বলা হবে কিনা তা একটি প্রশ্ন। ইকবাল বা আবুল হাশিমকে কেউ মুক্তমনা বলবেন বলে মনে হয় না। এতো গেল রথী-মহারথীদের কথা। আমার মতো ছোটখাট ব্লগার মরলেও কেউ বলবেন না, মুক্তমনা মুসলিম ব্লগার মারা গিয়েছে, যদিও এই ব্লগে কেউ কেউ আমার লেখা পছন্দ করে থাকেন। মুক্তমনের সাথে আবার বিজ্ঞানমনস্কতাকে যুক্ত করা হয়। কেউ কোরানের সাথে যুক্ত থাকার কারণে মুক্তমনা বিশেষণ লাভে ব্যর্থ হন; কিন্তু কেবল বিজ্ঞানের সাথে যুক্ত মন, অর্থাৎ বিজ্ঞানাবদ্ধ মন, কিন্তু ঠিকই মুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে একটি বড় জিজ্ঞাসা তৈরি হয়। “মুক্ত” শব্দটি দ্বারা ঠিক কোন জিনিস থেকে মুক্ত থাকাকে বুঝায়? এর উত্তরে যা-ই বলা হোক না কেন, তার এদিকে-ওদিকে গিয়ে উদাহরণসহ তর্ক জুড়ে দেয়া যাবে।

সে যা-ই হোক, তা নিয়ে তর্ক চললেও আমার এ লেখার উদ্দেশ্য সে তর্ক নয়। আমি প্রথমেই একজন নাস্তিক ও একজন অজ্ঞাবাদী দার্শনিকের নাম উল্লেখ করতে চাই। প্রথম জন হচ্ছেন নীটশে ও পরের জন রাসেল। নীটশে সরাসরি নাস্তিক, ঈশ্বরে বিশ্বাস করেননি। অন্যদিকে, রাসেল বলতেন যে, ঈশ্বর আছে কি নেই—তার কোনোটিই তিনি জানেন না। অর্থাৎ ইংরেজিতে বললে, রাসেল এথেয়িস্ট নন, তিনি একজন এগনস্টিক। রাসেলকে সমীহ করেন না এমন দার্শনিক পাওয়া কষ্টকর। দর্শনের সাবলীল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তিনি ভাষাকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে সাধারণ মানুষও তার বই পড়ে দর্শন সহজেই শিখতে পারেন। অন্যদিকে, নীটশে আমাদের কালে সবচেয়ে বেশী পঠিত দার্শনিক। তার কথার মর্ম যেমন বেগবান, তেমনই তার ভাষার জোর। মজার বিষয় হচ্ছে, ইকবালের মতো কাট্টা আস্তিকও নীটশের মতো কাট্টা নাস্তিকের অনুরাগী ছিলেন। এতই অনুরাগী যে, তিনি নীটশের মতো বড় করে গোঁফ রেখেছিলেন এবং নীটশের ছবির মতো করে ছবিও তুলিয়েছিলেন। এ ছবিগুলো দেখলে অনেকের পক্ষেই বুঝা মুশকিল হবে যে, সেগুলো ইকবালের নাকি নীটশের মুখের ছবি। নীটশেকে আবার অনেকেই ভয়ও পান। দুর্বলেরা ভয় পান শক্তিমানের শক্তিকে। সবলেরা ভয় পান দুর্বলের শক্তি-সম্ভাবনাকে। ফলে অত্যাচারিত থেকে অত্যাচারী—উভয় দলের অনেকেই ক্ষমতার গদ্যকবি বা দার্শনিক নীটশেকে ভয় পান। কিন্তু কি নীটশে বা কি রাসেল—তাদের কলমে-মুখে আপনি চটুল কথা পড়তে-শুনতে পাবেন না।

পশ্চিমা দুনিয়ায় ঈশ্বরের অনুপস্থিতি নীটশের চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে আছে—বলা যায় এটিই তার ভাবনার ভিত্তি বা সূচনাবিন্দু। প্রথম দিককার আধুনিক দার্শনিকদের মধ্যকার প্রধানতমরা ঈশ্বরকে ত্যাগ করতে চাননি। অনুমান করা যায় যে, ঈশ্বরের অভাবে সামাজিক জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হবে তা তাদের সম্মিলিত শ্রেষ্ঠ চিন্তার সম্ভারও পূরণ করতে যে সক্ষম হবে না—তা সম্বন্ধে তারা সচেতন ছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানসর্বস্বতাবাদী ও ইহলোকবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাধান্যকামী রাজনীতি, পুঁজিবাদ, শিল্প-বিপ্লব ও সুখবিলাসী সংস্কৃতি-ই সমাজ জীবনে অধিকতর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। নীটশে চোখের সামনে দেখছিলেন পশ্চিমে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত ভেঙ্গে পড়ছে। অন্যদিকে, কান্ট বা শোপেনহাওয়ারের প্রচেষ্টা যে শেষতক সফল হবে না তা উপলব্ধি করতেও তার বিলম্ব হয়নি। প্রাণপ্রদায়ী প্রাণবন্ত ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলাই ছিল এ ভাঙ্গনের কারণ—পশ্চিমের জীবনে ঈশ্বর তখন মৃত, সমাজে বিদ্যমান ঈশ্বর তখন মৃত ঈশ্বর। এ পতিত বৌদ্ধিক অবস্থাকেই তিনি আখ্যায়িত করেছিলেন নিহিলিজম বলে। চিন্তায় ঈশ্বরের এই অবস্থা তাদেরকে ঠেলে দিল এক শীতল শূন্য দেশে। নীটশে এই অবস্থা বিম্বিত করলেন তার The Joyful Wisdom গ্রন্থের ১২৫ নম্বর অনুচ্ছেদটিতে এক উন্মাদের মুখে, উচ্চ কাব্যিক শৈলী দিয়ে। নিচে অনুবাদের একটা চেষ্টা করা গেল।

উন্মাদ লোকটি

তোমরা কি সেই উন্মাদ লোকটির কথা শুনেছো?—যে কিনা এক উজ্জ্বল সকালে লণ্ঠন প্রজ্বলিত করেছিল ও তা নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে উপস্থিত হয়েছিল বাজারে গিয়ে। তার মুখে ছিল বিরামহীন চিৎকার: আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি, আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি। সেখানে থাকা অনেকানেক লোক ছিল ঈশ্বরে অবিশ্বাসী, নাস্তিক। সে তাদের বড়ই আমোদের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। একজন বলে উঠলো, কেন? ঈশ্বর কি হারিয়ে গিয়েছে? আরেক জনের জিজ্ঞাসা, সে কি কোনো শিশুর মতো উরুন্ডি হয়ে গিয়েছে? অথবা সে কি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে? সে কি আমাদের ভয়ে ভীত? সে কি সমুদ্র অভিযানে বের হয়েছে? সে কি দেশান্তরী হয়েছে?—জনতার দঙ্গল হাস্যরোলে ভেঙে পড়ছিল। উন্মাদ লোকটি লাফিয়ে পড়লো লোকদের মধ্যে, যেন দৃষ্টির বাণে বিদ্ধ করে তাদেরকে অবশ করে তুলতে চাইল। চিৎকার করে সে বলতে শুরু করলো, আমাকেই কি বলতে হবে ঈশ্বর কোথায় গেল? তবে শোন, আমরাই ঈশ্বরকে হত্যা করেছি—তোমরা ও আমি! আমরা সবাই তার হত্যাকারী! কিন্তু তা কী করে সম্ভব হলো? সমুদ্রকে আমরা কী করে গিলে ফেলতে সক্ষম হলাম? সম্পূর্ণ দিগন্ত বলয়টিকে মুছে ফেলার মুছনিটা কে আমাদের হাতে তুলে দিল? পৃথিবীটাকে তার সূর্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসলে আমরা করলামটা কী? এখন এটি যাবে কোথায়? আমাদের গন্তব্যই বা কী? সব সূর্য থেকেই দূরে, বহু দূরে? আমরা কি ক্ষিপ্রগতিতে বিরামহীনভাবে কেবল এদিক-ওদিক দুলছি না?—সামনে, পিছনে, দুপাশে, সব পাশে! এখনও কি উপর ও নিচ নামের দিক দুটো বিদ্যমান আছে? আমরা কি অন্তহীন শূন্যতার ভেতর পথ হারাচ্ছি না? রিক্ত দেশ কি আমাদেরকে সার ও মূল্য থেকে বর্জিত করে তুলবে না? এটি কি ইতোমধ্যেই হিমশীতল হয়ে ওঠেনি? রাতগুলো কি ক্রমাগতভাবেই অন্ধকার থেকে গভীরতর অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে উঠছে না? সকালে উঠে কি আমাদেরকে প্রভাত-প্রদীপ জ্বালাতে হবে না? ঈশ্বরকে সমাহিত করতে ব্যস্ত কবর খননকারীদের শোরগোল কি আমরা শুনতে পাচ্ছি না? ঐশী বিকৃতির গন্ধ কি আমাদের নাকে আসছে না? এমনকি ঈশ্বরও বিকৃত হয়ে উঠে! ঈশ্বর এখন মৃত! ঈশ্বর মৃত হয়েই থাকছে। এবং আমরা তাকে হত্যা করেছি! আমরা—সব খুনিদের সেরা খুনি—এখন নিজেদেরকে প্রবোধ দেব কিভাবে? জগতের সবচেয়ে পবিত্র ও ক্ষমতাধর রক্তাক্ত হয়েছে পড়ে আছে আমাদের ছুরির নিচে। কে আমাদের দেহ থেকে এই রক্তের দাগ মুছে দেবে? কোন জলে আমরা নিজেদেরকে পরিষ্কার করবো? কোন প্রভা, জীবন নিয়ে কোন মহান খেলা আমরা এখন উদ্ভাবন করবো? এ ঘটনার মাত্রা কি আমাদের জন্য বিরাট হয়ে গেল না? আমাদেরকেই কি এখন ঈশ্বর হয়ে উঠতে হবে না? অন্তত যেন মনে হয় যে, আমরা তা হওয়ার উপযুক্ত? এ ঘটনার চেয়ে বৃহৎ কোনো ঘটনা ইতিহাসে আগে কখনোই সংঘটিত হয়নি। যারা আমাদের পরে জন্ম নেবে তারা এযাবতকালের ইতিহাসের চেয়ে অনেক অনেক উচ্চ ইতিহাসের অংশীদার হবে।” এটুকু বলে উন্মাদ লোকটি নিশ্চুপ হয়েছিল এবং আবার তার শ্রোতাদের দিকে তাকাচ্ছিল। তারাও নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল সবিস্ময়ে। অবশেষে উন্মাদটি তার লণ্ঠন ছুঁড়ে ফেলে দিল মাটিতে; তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল এবং নির্বাপিত হলো। সে বলল, “সময়ের আগেই আমার আবির্ভাব। আমি এখনও যথাসময়ে নেই। এ সুবিশাল ঘটনা এখনও তার পথের উপরেই রয়েছে, তা এখনও পথই চলছে; এটা এখনও মানুষের কানে এসে পৌঁছেনি। দৃষ্ট হবার বা শ্রুত হবার আগে বিদ্যুতের ঝলক ও বজ্রের নাদ সময় নেয়, তারাদের আলো সময় নেয়, সময় নেয় কর্মও, এমনকি তা সম্পাদিত হবার পরও। এ ঘটনা তাদের কাছে দূরতম নক্ষত্রের চেয়েও দূরবর্তী হয়ে আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা তা ঘটিয়েই ছেড়েছে!” আরও জানা গিয়েছে যে, উন্মাদটি সেদিনই নানা উপাসনালয়ে গিয়ে হাজির হয়েছিল এবং নিস্তরঙ্গভাবে তার এ শেষকৃত্য-সঙ্গীত গেয়েই চলেছিল। যখন লোকেরা তাকে বের করে দিচ্ছিল ও জিজ্ঞেস করছিল তখন সে উত্তরে কেবলই বলছিল, “এ উপাসনালয়গুলো এখন আদতে কী? ঈশ্বরের সমাধি আর স্মৃতিসৌধ মাত্র নয় কি?”

উপরের বিবরণ ও সংলাপটিতে নীটশে চিত্রিত করেছেন আধুনিক মানুষের অবক্ষয়িত দশাকে, এবং পাঠককে সচেতন করতে চাইছেন এই অবস্থায় তার উপর অর্পিত ভারের গুরুত্বকে। পাগলটির কথা তুলে ধরেছে সে ভারের বিরাটত্বের চিত্রকে এবং তার শ্রোতাদের কথা ও প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছে মানুষের বর্তমান দেউলিয়াত্বকে—চিন্তা ও বোধের দেউলিয়াত্বকে। নীটশের কাছে নাস্তিকতা চটুলতার কোনো ছাড়পত্র নয়, বরং দায়ের বিপুলায়তন আকার, ভার এবং তা সম্বন্ধে সচেতনতা। কিন্তু আমরা যাদেরকে দেখি ইউটিউবের মন্তব্যের ঘরে, ব্লগে, ডিসকাশন ফোরামে, তারা উন্মাদটির শ্রোতাদের চেয়ে উন্নততর কিছু বলেন না। ঠাট্টা-তামাশা-রঙ্গব্যঙ্গই যেন নাস্তিকতার কোনো কোনো মহলে বুদ্ধিবৃত্তিক অভিব্যক্তির একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি