ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

এটি অত্যন্ত বেদনা ও ক্রোধের বিষয় যে, গত পহেলা বৈশাখে একাধিক নারী পুরুষদের আক্রমণ ও আঘাতের শিকার হয়েছেন। ঘটনাগুলোর বিবরণ পড়ে এবং পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে যেকোনো চিন্তাশীল মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়তে বাধ্য; দুঃখে ও ক্রোধে তার মন ভরাট হতে বাধ্য। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ঘটনাগুলো নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। যারা নববর্ষ উদযাপনের বিরোধী এবং নারীর বাইরে যাওয়াকে সংকুচিত করার পক্ষপাতী তাদের অনেকেই অত্যন্ত অশোভন ও অনৈতিক ভাষায় লেখালেখি করেছেন—তারা ঘটনাকে যেন সাদরেই গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, যারা নববর্ষ উদযাপনের পক্ষপাতী তাদের অনেকেরই সমস্ত মনোযোগ গিয়ে পড়েছে নববর্ষের প্রতি। একদিকে, নির্যাতিত মানুষকে সুবিধাজনক হাতিয়ারে পর্যবসিত করা হয়েছে। যাদের কাছে মানবিকতা ও মানবিক মূল্যমানগুলোর চেয়ে ধর্মের আকার ও ধর্মের সম্প্রদায়গত সংস্কৃতি বড় হিসেবে পরিগণিত, তারা মানুষের উপর এবং বিশেষত নারীর উপর নিপীড়নকে সুবিধা হিসেবে পেয়ে উল্লসিত হতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে, যারা মানবিকতা নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলতে পছন্দ করেন, তাদের মধ্যেও এমন প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে, যা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, মানুষ নয়, পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ নিয়ে দুশ্চিন্তাটাই যেন বড় কিছু। আমার সাফ দাবী, যদি ঘটনাগুলো পহেলা বৈশাখে না ঘটতো বা তা অন্য কোনো স্থানে সংঘটিত হতো তবে এতো দুশ্চিন্তা, এতো অস্থিরতা আমাদের দেখতে হতো না। এটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, আমাদের কাছে মানুষের নিরাপত্তার অধিকারের চেয়ে, মানুষের আর্তনাদের চেয়ে ধর্ম বা সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য বা রাজনীতি বড় হয়ে উঠেছে।

অনেক কথাই ইসলামপন্থীরা বুঝতে পারেন না। এটাও ঘোর আশঙ্কা, যারা নিজেদেরকে প্রগতিশীল মনে করেন তারাও হয়তো এখানে বুঝতে চাইবেন না। সবিনয়ে অনুরোধ করা যায়, বিষয়টিকে অনুধাবন করার জন্য চিন্তা করতে। নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, দেশে অনাচার তো কম হচ্ছে না; কই, আমাদের তো সব গা-সহা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠে যখন দেখি কেউ মসজিদ অবমাননা করছে, কেউ পহেলা বৈশাখে নারীর উপর সহিংসতা করছে। মানুষকে, ব্যক্তিকে, নারীকে আমরা গৌণ বিবেচনা করি। ধর্মকে, মানবিকতাকে আমরা আমাদের তথাকথিত আদর্শের লড়াইয়ে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি মাত্র। কেউ আমরা বলি না যে, মসজিদ বা পহেলা বৈশাখ বুঝি না, আগে ব্যক্তির উপর অত্যাচারের বিচার চাই, আগে অত্যাচারের অপসারণ চাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি চাই। আর এভাবে দেখি বলেই অনেক অত্যাচারের ঘটনা আমাদেরকে বিচলিত করে না। এভাবে দেখি বলেই অত্যাচার আশকারা পায়।

বুঝবার সুবিধার জন্য একটি পন্থা তুলে ধরা যায়। যে নারী সেদিন অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তার বাবাকে, তার মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, তিনি কী ভাবছেন, তিনি কিভাবে দেখছেন। তিনি কী বলবেন, সংস্কৃতির কথা? ঐতিহ্যের মহিমার কথা? তাদের কাছে যেকোনো স্থানে যেকোনো দিনে কন্যার উপর এ অত্যাচার একই মাত্রা, একই অনুভূতি, একই অবস্থা এবং একই প্রতিক্রিয়া বয়ে আনবে। সেই মা-বাবার চোখে দেখতে পারলে দেখাটা পরিষ্কার হবে। আমি বা আপনি নিশ্চয়ই নিপীড়িত নারীকে আপন মনে করার ক্ষেত্রে বা ভালবাসার ক্ষেত্রে তার মা-বাবার চেয়ে অগ্রণী নই।

আমাদের অন্য অনেক কাজের সাথে তুলনা করেও বিষয়টিকে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি। নিরাপত্তার অভাব থাকলে সাময়িকভাবে আমরা ঘর থেকে বের হই না; বাজারে যাই না, মসজিদে যাই না; হজ্জ করাও স্থগিত রাখতে পারি। না হয় আগামী এক বছর পহেলা বৈশাখে মানুষের ঢল না-ই নামলো। তাতে এতো কী সমস্যা হবে বলুন? আর এ ঘটনার ফলশ্রুতিতে মানুষ ভয়ে ঘরে বসে থাকবে তা-ই বা কে বলল! কাজেই কোন কারণে আমরা পহেলা বৈশাখের তথাকথিত বিপদ নিয়ে এতো বিচলিত হচ্ছি? কোন কারণে নারীর উপর অত্যাচারটিকে ছাপিয়ে উপরে উঠে আসছে পহেলা বৈশাখ?

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি