ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

উচ্চ আধ্যাত্মিক বা উচ্চ নৈতিক স্তর অর্জনের জন্য যৌনতা থেকে দূরে থাকাকে ইতিবাচকভাবে দেখার নজির মানবসমাজে রয়েছে। অনেকেই কৌমার্যমণ্ডিত সন্ন্যাসীকে উচ্চ মানবজীবনের অধিকারী হিসেবে দেখে থাকেন; এবং এরকম মানুষকে অত্যুন্নত সাধু-মানুষ হিসেবে ভক্তি করা হয়ে থাকে। কিন্তু জীবন সম্বন্ধে এ ধারণার যৌক্তিক অসঙ্গতিটা হচ্ছে এখানে যে, অমন সাধু পুরুষটি বা সাধু নারীটি কিন্তু যৌনতা থেকেই অস্তিত্বে এসেছেন। জীবন সম্বন্ধীয় এমন ধারণার মধ্যে যৌক্তিক সঙ্গতি আনতে হলে জীবনকে একটি সুবিশাল ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখতে হয় এবং জীবনের ধারাবাহিকতাকে দেখতে হয় প্রবল যৌন বাসনার কাছে মানুষের শোচনীয় পরাজয় হিসেবে। আর পরাজিত গণরা তখন অবশ্যই যৎসামান্য অপরাজিতকে অনন্য-পুরুষ হিসেবে দেখবেন ও তাদেরকে ভক্তি করবেন। এ ভক্তির মাধ্যমে কি পরাজয়ের গ্লানি থেকে মুক্তি সম্ভব?

অন্যদিকে, যৌনতা কি কেবল তাৎক্ষণিক উপভোগের বিষয়?—ভবিষ্যৎ-ভাবনা নিরপেক্ষ? খেতে আমাদের ভাল লাগে। কিন্তু আমরা তো খাওয়াকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে দেখি না। খাওয়ার একটি উদ্দেশ্য আছে, আবার এ উদ্দেশ্যে খাওয়ার সময় খাবারকে আমরা উপভোগও করি। কিন্তু যৌনতার ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই আলাদা। এটি উপভোগ করাই যেন জীবনের লক্ষ্য, এতেই যেন জীবনের মোক্ষ অর্জিত হয়। যৌনাবেগকে তথাকথিত প্রেম বলে আখ্যায়িত করে এই কথিত প্রেমকে এমন মহিমা দেয়া হয় যে, জীবনে এর অভাব ঘটলে যেন জীবনটাই ভেস্তে যায়। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটা বিশাল অংশ জুড়ে আছে এর মহিমা কীর্তনে। কোনো গোবিন্দচন্দ্র দেব যদি একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আমাদের ডেকে বলেন, “আমার কাছে আসো, আমি তোমাদেরকে কিছু বলতে চাই”—তবে আমরা সাড়া দেবো না। কিন্তু যদি কোনো শাহরুখ খান সেখানে নাচের আসর বসান তবে না ডাকলেও আমরা পিলপিল করে পাহাড়ে ঠিকই উঠে পড়ব। অথচ যৌনতারও একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। আর তা যে পরবর্তী প্রজন্মকে অস্তিত্বে আনা তা কোনো বিজ্ঞানীই অস্বীকার করতে পারবেন না।

লজ্জার সাথে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও যৌনতা একটি স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক বিষয়। সব ধরণের অপরীক্ষিত ও সংস্কারপ্রসূত বাধা থেকে মুক্ত হয়ে মনোমতোভাবে যৌনতাকে উপভোগ করার সাথে সাথে ভবিষ্যৎ-ভাবনাও একটি প্রয়োজনীয় ভাবনা—মানুষ যৌনাবেগের অধিকারী মাত্র নয়, সে চিন্তাশীলও বটে। ভবিষ্যৎ-ভাবনাটি সন্তানের সাথেই—সন্তান-আকাঙ্ক্ষা ও সন্তানের শিক্ষাদীক্ষা ইত্যাদি—প্রধানত সম্পর্কিত। কোরানে মানুষকে ‘খলিফা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘খেলাফত’ শব্দের তাৎপর্যের মধ্যে ‘পারম্পর্য’-ও নিহিত রয়েছে; একের পর আরেক-এর আসা, অর্থাৎ প্রজন্মের পর প্রজন্মের আবির্ভাব। জীবনের মূল্য সম্বন্ধীয় চিন্তার সাথে যৌনতার তাই সম্পর্ক রয়েছে। যৌনতাকে সন্তান-ভাবনা-বিবর্জিতভাবে, কেবল এবং কেবলমাত্র, উপভোগের বিষয়ে পর্যবসিত করা হলে নিজের জীবনের মূল্যকেই অস্বীকার করা হয়। কারণ যৌনতাকে যিনি এভাবে দেখবেন তিনি তার পিতা-মাতাকেও এরূপ ভাবনার ছাড়পত্র দিতে, অন্তত যৌক্তিকভাবে, বাধ্য হবেন। এ অবস্থায় তিনি নিজের অস্তিত্বে আসাকে একটি আপতিক ঘটনা, একটি অপরিকল্পিত ফল ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারবেন না।

জীবনকে মূল্যবান কিছু বলে সাব্যস্ত করা হলে পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা অবধারিত হয়ে উঠে। ‘তোমরা নবীদের প্রতি কৃতজ্ঞ হও, শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞ হও, শহিদদের প্রতি কৃতজ্ঞ হও’—এরূপ কোনো কথা কোরানে পাওয়া যায় না। কিন্তু সেখানে রয়েছে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশনা।* এ কৃতজ্ঞতার একাংশের বহিঃপ্রকাশ পিতা-মাতাকে সেবা করার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় আর অপরাংশের প্রকাশ ঘটে পিতা/মাতা হওয়ার মধ্য দিয়ে। যিনি পিতা-মাতার যত্নের মধ্য দিয়ে অস্তিত্বে আসার পর সন্তান গ্রহণ করাকে আপদ সাব্যস্ত করেন তিনি অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেন বলা হলে খুব অন্যায্য হবে বলে মনে হয় না। এরূপ ব্যক্তি কি স্বার্থপরতার দোষে দুষ্ট নন? তিনি কি ‘অন্যের কাছ থেকে নেন, কিন্তু কাউকেই দেন না’ দোষে দুষ্ট নন? কোনো সন্তান জীবনকে মূল্যহীন ধারণা ক’রে অস্তিত্বের জন্য পিতা-মাতাকে দায়ী করে বসতে পারেন। তবে এ দায় আরোপের আদতে কোনো যুক্তি নেই, কারণ কেউ নিজের ইচ্ছায় অস্তিত্বে আসতে না পারলেও এর সমাপ্তি ঘটাতে যৌক্তিক দিক থেকে কোনো বাধা নেই।

লক্ষ টাকা মাত্র পুঁজি নিয়েও দু’জন ব্যক্তি ব্যবসায় নামেন না সাক্ষী-সাবুদসহ চুক্তি না করে। বাড়িভাড়া হোক আর চাকুরী হোক, সবখানেই বুদ্ধিমান মানুষেরা চুক্তি করে থাকেন। কিন্তু এর কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? সম্ভবত কেউই এ প্রশ্নের কোনো নেতিবাচক উত্তর দেবেন না। সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে এধরণের ব্যবসায় যদি কেউ নামেন, তবে বিষয়টা নিয়ে পরবর্তীতে বিরোধ বাধলে মীমাংসা বা বিচারের জন্য তৃতীয় পক্ষকে অবলম্বন করা সহজ হয় না। চুক্তি-সাক্ষীর অভাব থাকলে তৃতীয় পক্ষ মীমাংসা বা বিচারের কোনো টার্মস অব রেফারেনস পান না, বা এমনকি আদৌ কোনো চুক্তি বা লেনদেন হয়েছে কিনা তা-ও জানতে পারেন না। বিরোধ মাত্রই এ বাস্তবতাকেও অনিবার্য করে তোলে না যে, এখানে একজন অবশ্যই অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। দু’জনই অত্যন্ত ভাল নৈতিক জীবনের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বিরোধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। কাজেই চুক্তি, প্রমাণ ও সাক্ষী সব ব্যবসা ও লেনদেনের ক্ষেত্রেই একটি ভাল ও দরকারি পূর্ব-পদক্ষেপ।

মানুষের জীবন নিশ্চয়ই টাকা-পয়সার চেয়েও বেশী মূল্যবান। কোনো ব্যক্তি যদি নিজের অস্তিত্ব ও জীবনকে মূল্যহীন মনে করেন, তবে তিনি তার মতো অন্য আরেক জনের সাথে অনিশ্চিত পথে পাড়ি দিতে পারেন। কিন্তু পরে এ নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে সমাজ বা আদালতের কাছ থেকে মনোমতো বেশী কিছু প্রত্যাশা করলে সমাজ বা আদালত বিপদেই পড়বে। তবে এ বিপদ বিচার-প্রত্যাশীর কোনো কাজে না-ও আসতে পারে। বিবাহ হচ্ছে একটি চুক্তি, জীবন নিয়ে চুক্তি। অন্যসব ব্যবসায়িক চুক্তি থেকে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। অন্য চুক্তিগুলোতে চুক্তিবদ্ধ পক্ষগুলোই জড়িত। কিন্তু বিবাহে একটি অনুপস্থিত পক্ষ রয়েছে—আর তা হলো সন্তান। একজন পুরুষ তার দেহের মালিক, স্পার্মের মালিক; একজন নারীও তার দেহের মালিক, গর্ভের মালিক। কে কার সাথে সন্তানের জন্য চুক্তিবদ্ধ হবেন তা তাদের স্বাধীন নির্বাচনের বিষয়। কিন্তু নারী বা পুরুষের কেউই সন্তানের মালিক নন—সন্তান মা-বাবার মতোই আলাদা স্বাধীন ব্যক্তি-সত্ত্বা। সুতরাং সন্তানের অধিকার ও প্রাপ্য নিয়ে মীমাংসার ক্ষেত্রেও বিবাহ নামক চুক্তির গুরুত্ব রয়েছে; অথচ সন্তান-পক্ষটি এ চুক্তিতে অনুপস্থিত থাকেন।

সন্তান তার পিতৃ-মাতৃপরিচয় জানতে চাইতেই পারেন। এ পরিচয় তার অধিকার। কোনো মা বা বাবাই তার সন্তানকে বলতে পারেন না, ‘তোমার অত জানার দরকার নেই, আমি যা দিচ্ছি যতটুকু দিচ্ছি তাতেই সন্তুষ্ট থাক।’ কারণ মা বা বাবা সন্তানের অভিভাবক মাত্র, মালিক নন; সন্তান কারও সম্পত্তি নন। ডিএনএ টেস্ট নয়, সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতিই সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিচয়। আমরা জনে জনে ডিএনএ টেস্ট করে আমাদের পরিচয় জানতে চাইতে পারি না। বিবাহ, যৌনতার ক্ষেত্রে বিবাহ চুক্তি অনুসরণে আন্তরিকতা এবং বাস্তবিক পরিচ্ছন্নতা সন্তানের অধিকারের নিশ্চয়তার জন্য পূর্ব-ভূমি, পূর্ব-প্রয়োজন।

*
And We have enjoined upon man [care] for his parents. His mother carried him, [increasing her] in weakness upon weakness, and his weaning is in two years. Be grateful to Me and to your parents; to Me is the [final] destination. Koran 31:14

And We have enjoined upon man, to his parents, good treatment. His mother carried him with hardship and gave birth to him with hardship, and his gestation and weaning [period] is thirty months. [He grows] until, when he reaches maturity and reaches [the age of] forty years, he says, “My Lord, enable me to be grateful for Your favor which You have bestowed upon me and upon my parents and to work righteousness of which You will approve and make righteous for me my offspring. Indeed, I have repented to You, and indeed, I am of the Muslims.” Koran 46:15

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি