ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

রুপালী রূপের পরিণতি

সন্ন্যাস জীবনে সুবর্ণ বিধির রুপালি রূপটি অনুসৃত হয়। তবে এটিকে নিয়ে যৌক্তিকভাবে এগোলে কোথায় গিয়ে পৌঁছতে হয় তা পরীক্ষা করে দেখা যাক। এ বিধিটি যেহেতু নেতিবাচক তাই এখানে আমি মনের অবস্থা দেখাতে ‘হিংসা’ ও তার প্রয়োগ দেখাতে ‘ক্ষতি’ পদ দুটো ব্যবহার করছি। মনে হিংসা বলতে আমি এখানে হিংসা বোধকে বুঝচ্ছি, আঘাত করাকে নয়।

আমি অপরের কাছ থেকে হিংসা চাই না, তাই আমি অপরকে হিংসা করি না। (১)
আমি অপরের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না, তাই আমি অপরের ক্ষতি করি না। (২)

এখন যদি কেউ এ নীতি না মানে অর্থাৎ আমাকে হিংসা করে বা আমার ক্ষতি করে তবে আমি কী করতে পারি? এটি আমি নিচে প্রকাশ করলাম।

আমি অপরের কাছ থেকে হিংসা চাই না, তাই অপরে হিংসা করলেও আমি তাকে হিংসা করি না। (৩)
আমি অপরের কাছ থেকে ক্ষতি চাই না, তাই অপরে ক্ষতি করলেও আমি তার ক্ষতি করি না। (৪)

এতে যে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় তা তো স্পষ্ট। মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাই যে এতে বিপন্ন হয়ে ওঠে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব যদি নীতির উল্টোটা প্রয়োগ করি, যা নিচে আমি উল্লেখ করলাম।

কেউ আমাকে হিংসা করলে আমি তাকে হিংসা করব। (৫)
কেউ আমার ক্ষতি করলে আমি তার ক্ষতি করব। (৬)

এখানে সমরূপ পারস্পরিক আদান প্রদানের নীতিটা লঙ্ঘিত হচ্ছে না। এর ফলাফল হল সমরূপ ক্ষতির দণ্ড বা আইন। এটিই হলো মুসার আইনের মূল ভিত্তি। তবে মনের হিংসাটা আমরা এখনও পরিহার করতে পারি, কারণ তাতে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হচ্ছে না। মনে হিংসা তৈরি করা মুসার আইনের উদ্দেশ্যও ছিল না। যদিও রূপটি নেতিবাচক তবুও প্রেমের জায়গা করে দেওয়াও এখানে সম্ভব। তাছাড়া, হিংসা ও ক্ষতির পরিমাণ কমাতে চাইলে মনের দশা হিসেবে প্রেম প্রায়োগিক দিক থেকে সুবিধা হিসেবে তো থাকছেই। অর্থাৎ প্রেমের সম্ভাবনা এখানে বিদ্যমান।

সুবর্ণ রূপের পরিণতি

প্রেমের জীবনে সুবর্ণ রূপটি অনুসৃত হয়। তবে এটিকে নিয়ে যৌক্তিকভাবে এগোলে কোথায় গিয়ে পৌঁছতে হয় তা পরীক্ষা করে দেখা যাক। এ বিধিটি যেহেতু ইতিবাচক তাই এখানে আমি মনের অবস্থা দেখাতে ‘ভালবাসা’ ও তার প্রয়োগ দেখাতে ‘চাই/দেই’ পদ দুটো ব্যবহার করছি। এখানে চাই/দেই এর বিষয় হলো জীবনের জন্য, সুখ-আনন্দ-স্বস্তি-স্বাচ্ছন্দ্য-উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় আচরণ ও সামগ্রী।

আমি অপরের কাছ থেকে ভালবাসা চাই, তাই আমি অপরকে ভালবাসি। (৭)
আমি অপরের কাছে চাই, তাই আমি অপরকে দেই। (৮)

এখন যদি কেউ এ নীতি না মানে অর্থাৎ আমাকে আমার প্রত্যাশামত ভাল না বাসে বা আমাকে আমার প্রত্যাশামত না দেয় তবে আমি কী করতে পারি? এটি আমি ঘৃণা ও অত্যাচার—এই সম্ভাব্য চরম অবস্থা দুটি ব্যবহার করে নিচে প্রকাশ করলাম।

আমি অপরের কাছ থেকে ভালবাসা চাই, তাই অপরে ঘৃণা করলেও আমি তাকে ভালবাসি। (৯)
আমি অপরের কাছে চাই, তাই অপরে অত্যাচার করলেও আমি তাকে দেই। (১০)

সুবর্ণ রূপটি মূলতঃ ইতিবাচক, প্রেম বা মমতা বা সংহতি এখানে লক্ষ্য। তাই যিশু অত্যাচারের বিপরীতে অত্যাচার সয়ে যাওয়ার শিক্ষা দিলেন। কেউ আমার উপর এতটুকু অত্যাচার করল তার পরিকল্পনা মতো ও তার সামর্থ্য মত, আমি ততটুকুই সহ্য করলাম। এতে তো শত্রুর প্রতি আমার প্রেমের যথার্থ প্রকাশ ঘটল না; তাই যিশু বললেন, সয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তুমি নিজের ইচ্ছায় আরও কিছুদূর এগোও যেন তোমার পক্ষ থেকে তাকে কিছু দেয়া হয় ও ভালোবাসাটা প্রকাশিত হয়।

কিন্তু আমি যদি, অন্তত মানসিকভাবে, স্বাবলম্বী হতে পছন্দ করি ও অপরের ভালবাসা বা অন্যকিছুর প্রত্যাশা আমার মন থেকে সরিয়ে নেই, তবে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি হয় ও সুবর্ণ রূপটি স্বতঃই ভেঙ্গে পড়ে। নিচে তা বিবৃত করার চেষ্টা করলাম।

আমি অপরের কাছ থেকে কিছুই প্রত্যাশা করি না, তাই …… ???? (১১)

আমার মনকে যদি সম্পূর্ণরূপে অপরাপর মানুষের নিকট থেকে সুখের প্রত্যাশার বিপরীতে নিষ্কাম এবং তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত দুঃখের বিপরীতে অচঞ্চল করেও তুলি, তবুও সুবর্ণ ও রুপালি উভয় রূপকে টিকিয়ে রাখা যায় কেবল মাত্র ঈশ্বরের ধারণা দিয়ে। যেমন:

আমি ঈশ্বরে নিকট ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাই, তাই আমি অন্যের ক্ষতি করি না। (১২)
আমি ঈশ্বরের ভালবাসা চাই, তাই আমি ঈশ্বর থেকে যা পাই তার ভাল অংশটা অন্যকে দেই। (১৩)

ঈশ্বরের নিকট প্রত্যাশা ঈশ্বরের সংজ্ঞা থেকে—অস্তিত্বের জন্য অনিবার্যভাবে ঈশ্বরের ইচ্ছার উপর নির্ভরতার কারণে—অবধারিত ভাবে নিঃসৃত হয়; যা বস্তু বাদীদের বস্তুর সংজ্ঞা ও ভাববাদীদের ধারণার সংজ্ঞা থেকে হয় না।

কিন্তু তারপরও যদি আমরা একজন ঈশ্বর-বিচ্ছিন্ন কিন্তু আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তির জন্য সুবর্ণ রূপ তৈরি করতে চাই, তবে সেটি নিম্নরূপ হবে।

আমি অপরের কাছ থেকে কিছুই প্রত্যাশা করি না, তাই অপরকে সবকিছু দিয়ে দেই। (১৪)

এখানে আমার দেয়াটা হয়ে উঠছে নিজের জন্য সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য বিহীন, যাকে বলা যায় পরম নিঃস্বার্থভাবে নিঃশেষে প্রাণ দান। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে এটা স্পষ্ট হবে যে, এই বোধের প্রথম প্রয়োগেই আমি ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য।

ঈশ্বরকে পরিহার করলে আমার সামনে যে পথগুলো খোলা থাকে:

অপরাপর মানুষের নিকট প্রত্যাশার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, যা কিনা, অন্ততঃ মনোগতভাবে, দারিদ্র্যের নির্দেশক; অথবা সুবর্ণ বিধিটিকে হারিয়ে ফেলা, যা অহংকার, অত্যাচার ও মিথ্যাচারকে বৈধতা দেয়ার নামান্তর; অথবা জীবনকে আত্মগত দিক থেকে উদ্দেশ্যহীন করে তোলা, যা আত্মহত্যাকে বৈধ করে দেয়।

……………….
পরের অংশগুলো
সুবর্ণ বিধির তৃতীয় রূপ – অংশ ৩
সুবর্ণ বিধির তৃতীয় রূপ – অংশ ৪
সুবর্ণ বিধির তৃতীয় রূপ – শেষ অংশ

আগের অংশগুলো
ধর্ম ও সুবর্ণ বিধি
সুবর্ণ বিধির তৃতীয় রূপ – অংশ ১

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী