ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ভাষা অনেক আতিশয্য তৈরি করতে পারে। ভাষার এরূপ ব্যবহারে দক্ষতাকে আমরা সাধারণত কাব্য-প্রতিভার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখে থাকি। প্রাপঞ্চিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে যুক্তির বিচারে এরূপ বচনের অর্থ খুঁজে পাওয়া না গেলেও বয়ানের জোরে তা দিব্যি টিকে থাকে। জগতের অনেক প্রপঞ্চের প্রতীয়মান রূপও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: সূর্য পূব দিকে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়; অথবা সাগরতীরে দাঁড়িয়ে আমরা সূর্যকে সাগরের মধ্যে ডুবতে দেখি। এরূপ প্রতীয়মান প্রপঞ্চের বিবরণকে আতিশয্য হিসেবে দেখা চলে না। কিন্তু যদি বলা হয়, অমুকে মৃত্যু বরণ করেছেন, তখন প্রশ্ন করা চলে, তিনি তো মরতে চাননি, ঠেকায় পড়ে মরেছেন। তো ‘বরণ’য়ের কথা আসছে কেন? বলা হতে পারে, আমরা মানুষ, আমরা সভ্য, তাই সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমরা এভাবে ভাষাকে, শব্দকে ব্যবহার করে থাকি। ‘মৃত্যু’র বদলে আমরা অনেক সময়ই ‘পরলোকগমন’, ‘অমৃতধামে গমন’, ‘অনন্তের পথে যাত্রা’, ‘না ফেরার দেশে চলে যাওয়া’ ইত্যাদি নানা বিচিত্র সব শব্দসমাহার, বাগধারা ব্যবহার করি। পরলোকে বিশ্বাস করেন না, এমন বিজ্ঞানমনস্ককেও ‘মৃত্যু’র বদলে ‘প্রয়াণ’ বা ‘মহাপ্রয়াণ’ শব্দ ব্যবহার করতে দেখলে অবাক হবার কিছু থাকবে না, যদিও তা দিয়ে মৃত্যুর চেয়ে বেশী কিছু বুঝায়। প্রচলিত বয়ান কাটিয়ে উঠে এরকম সব আতিশয্য থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা আমাদের পক্ষে সবসময় সম্ভবও হয় না।

আমরা অনেক সময় বলে থাকি, ‘কোরান এই বলে’, ‘ইসলাম সেই বলে’ ইত্যাদি। কিন্তু কোরান বা ইসলাম কি আদতে কথা বলতে পারে? এর কঠিন সত্য উত্তর হচ্ছে, না পারে না। আমরা কোরানের ইন্টারপ্রিটেশন তৈরি করি, ইসলামের ভাষাগত কাঠামো তৈরি করি। এবং তারপর আমরাই আবার বলি যে, কোরান এই বলে, ইসলাম সেই বলে ইত্যাদি। এসব নানা কাঠামো ও ইন্টারপ্রিটেশনগুলোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। মদ্দা কথা এই দাঁড়ায় যে, আমরা আমাদের উপলব্ধিকেই কোরানের কথা, ইসলামের কথা বলে উপস্থাপন করি। এতে একটি চক্রাবস্থা তৈরি হয়। একই কথা বলা যায় বিজ্ঞান, দর্শনের বেলায়ও। বিজ্ঞানী লেখেন, বিজ্ঞানী বলেন। দার্শনিক শেখাতে চান। কিন্তু বিজ্ঞান নিজে কিছুই বলে না, দর্শন নিজে কিছুই শেখায় না। আমি বিজ্ঞানের বই পড়ে এটা ওটা জানতে পারি, দর্শনের বই পড়ে এটা ওটা শিখতে পারি মাত্র।

আমাদের মধ্যে বই ইত্যাদি উৎসর্গ করার রেওয়াজ আছে। আমি বইয়ের প্রথমে একটি পাতায় লিখে দিলাম, ‘আমার মায়ের জন্য’। কিন্তু এতে হলোটা কী? যদি এর অর্থ হয় এটা যে, এ বইয়ের ব্যবসা থেকে আমি যা পাব তা আমার মাকে দিয়ে দেব, তা হলে এর একটা অর্থ হয় বটে। কিন্তু মা-কে অর্থ দিয়ে সহায়তা করাকে কোনো সন্তান ঘটা করে জাহির করতে চাইবেন না নিশ্চয়ই। তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে এটা যে, মাকে আমি যা-ই দেই না কেন তা কর্তব্য পালনের চেষ্টা না হয়ে উৎসর্গ হয় কী করে? তাহলে এ ধরণের উৎসর্গ-বচনের আসলে অর্থ কী? এতে আমার মা বাস্তবিক কীভাবে উপকৃত হন? কোনো বইতে এটি লেখা আর না লেখার মধ্যে বাস্তবিক পার্থক্য রচিত হয় কীভাবে? বড়-বড় এবং জ্ঞানী-গুণী মানুষের কীর্তিকলাপের মর্ম আমার মতো ক্ষুদ্র ও মূর্খের বুঝবার সামর্থ্য না থাকাই স্বাভাবিক। কাজেই এ নিয়ে কথা না বাড়িয়ে আসল কথায় আসি।

ভক্তির ভারে আমরা মৃত্যুকে নিয়ে আতিশয্য করি, আতিশয্য করি ভয়ের বশবর্তী হয়েও। কিন্তু কোরানে মৃত্যুকে মৃত্যু হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে, এমনকি নবীর বেলায়ও। ওহুদের যুদ্ধে নবী গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন, এবং যুদ্ধের মাঠে রটে গিয়েছিল যে, তিনি মারা গিয়েছেন। এতে মুসলিমরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন। নবীর উপর এই আঘাতটি সংঘটিতও হয়েছিল কিন্তু মুসলিম সৈন্যদেরই একটি দলের ভ্রান্তির ফল হিসেবে। জেতা যুদ্ধে তারা হেরেও গিয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি বুঝবার জন্য একটি তুলনামূলক উদাহরণ আগে দেয়া যেতে পারে। মনে করুন, সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও পুত্রের বেখেয়ালে, গাফিলতিতে, পিতার জীবন যাওয়ার উপক্রম হলো; কোনোরকমে পিতার জীবন রক্ষা পেল। আপনার কী ধারণা? আত্মীয়রা, পড়শিরা তখন কী বলবেন? তারা পুত্রকে কঠোর ভাষায় বলবেন, “এটা কী করেছো? বাপ মারা গেলে তোমার কী দশা হতো একবার ভেবে দেখেছো?” ভাবনার বিষয়টা যে পার্থিব তা না বললেও চলে। মদিনায় কয়েকটি মাত্র বছর গত হয়েছে। এরই মধ্যে নবী মারা গেলে মদিনাবাসীদের কী হতো, ইসলাম ধর্মের ইতিহাস কীরকম হতো, তা নিয়ে পণ্ডিতেরা রীতিমতো থিসিস করতে পারেন। তবে সবাই সম্ভবত বলবেন, মদিনাবাসীদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকতো না, ইসলাম বলে পৃথিবীতে কিছু থাকতো না, আর থাকলেও আরবের একটি ক্ষুদ্র বিশ্বাস মাত্র হয়েই থাকতো। কোনো কোনো ঐতিহাসিক হয়তো পতিত দশা থেকে মানবজাতির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েই অসম্ভব সব কথাও বলে বসতে পারেন। কিন্তু কোরানে ঘটনাটি বর্ণীত হয়েছে ভিন্ন ভাবে: যদি নবীর মৃত্যু হয় তবে কি তোমরা আগের পথে ফিরে যাবে? এর আগে কত নবী এসেছে, তাদের মৃত্যুও হয়েছে।

আমাদের এ-ই একটা স্বভাব—আমরা বীরপুরুষের আবির্ভাব কামনা করি, তার জন্য প্রতীক্ষা করি। এবং একই সাথে তারা কবে আসবেন সে আশায় বসে না থেকে কল্পনা করি। এ কল্পনা-প্রবণতা থেকে তৈরি হয় সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, ক্যাটওম্যান, স্পাইডারম্যানের মতো এবং র‍্যাম্বো, কমান্ডো’র মতো চরিত্র। এদেরকে দেখে আমরা হাততালি দেই; আমাদের ক্যাথারসিস হয়—কল্পনায় আমাদের আকাঙ্ক্ষা ‘চরিতার্থ’ হয়। যেসব নিয়ামক এখানে কাজ করে তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে আমাদের এ বোধ-বিশ্বাস-ধারণা যে, ব্যক্তি হিসেবে আমরা আদতে ‘নো-বডি’, অক্ষম; নিজ জীবনের কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আমরা নিজেকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় বসাই না, বসাতে চাই না, সেজন্য সাহস পাই না। অন্যে আমার মুক্তি এনে দেবে, আমার জীবনকে সুখে সমৃদ্ধ করে দেবে, দুনিয়ায় একটি স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে দেবে—এ ভাবনায় আমরা তখন প্যাসিভ-ভাবে সমাজের স্রোতে ভেসে চলি। শুধু কী তা-ই? না, আমরা এর চেয়েও বেশী কিছু করতে পছন্দ করি। মুসার পেছনে পেছনে যাওয়ার জন্য যে আমরা তার প্রতীক্ষায় থাকি, তার আসার পর তার সাথে চলতে গিয়ে বিপদে পড়লে সে আমরাই তাকে এ বলতেও দ্বিধা করি না, “তোমার পিছু নিয়েই তো আমাদের এ দশা হলো।” মুসার জীবদ্দশায় আমরা বলি, “তোমার জন্য আমাদেরকে সবুজ নগরী ছাড়তে হলো।” মৃত্যুর পর বলি, “মুসা যদি আরও বেঁচে থাকতো তবে এ মরুভূমি সবুজে শোভিত নগর হয়ে উঠতো।”

স্পাইডরম্যানরা টিম লিডার নয়—তাদের অবস্থান আরও উপরে, ভক্তির মার্গে। মানুষ যখন ভেতরের নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে, অথচ বাইরেটায় বৃহৎ পরিবর্তন কামনা করে, তখন সে ভক্তির মানুষের সান্নিধ্য-প্রার্থী হয়। সে তখন অংশীদার নয়— দর্শক এবং গ্রহীতা মাত্র। আর দেখা ও নেয়া কাজ হিসেবে কঠিন নয়, বরং আমোদেরও। তার কাছে জীবন চিন্তা নয়, দৃশ্য; ক্রিয়াপরতা নয়, ক্রীড়া; সৃষ্টি নয়, ভিক্ষা; গঠন নয়, যাপন; আত্ম-সত্ত্বার উন্নয়ন নয়, জড়-পরিবেশের পরিবর্তন। আমার সার্থকতা, আমার সফলতা অন্যের উপর, ভিন্ন পরিবেশের উপর নির্ভর করে—এটাই হচ্ছে এখানে মূলনীতি, এটাই দাসত্বের নীতি। কিন্তু জীবনকে অন্যভাবেও নেয়া যেতে পারে। যা আছে তা প্রদত্ত বা ‘গিভেন’—এখানে যদি-তবে’র কোন অর্থ নেই; অর্থ আছে এটাকেই ভিত্তি হিসেবে নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলার মধ্যে। জীবনের মধ্যে যদি অর্থ, সফলতা ও উদ্দেশ্য বলে যদি কিছু থাকে তবে তা এর মধ্যেই থাকতে পারে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি