ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

শিরোনামের কথাটি একটি বহুল প্রচলিত হাদিসের অংশ। আমাদের দেশে বৃক্ষরোপণ অভিযান কালেও এ কথাটি কোনো কোনো সময় শোনা যায়। এটিকে বৃক্ষ রোপনের গুরুত্ব-প্রকাশক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কথা ঠিক। তবে কথার তাৎপর্য কেবল এর মধ্যেই সীমিত—তা না-ও হতে পারে। পুরো হাদিসটির মর্ম এরকম, তুমি যদি একটি গাছ রোপণ করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর জানতে পারো যে, কাল কেয়ামত হবে, তবেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে গাছটি রোপণ করা থেকে বিরত থেকো না।

কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই কি পুরো কথাটিকেই সঠিক হিসেবে নেয়া যায়? আমরা যদি জানতেই পারি কাল কেয়ামত হবে, তবে আজ গাছটি লাগিয়ে লাভ কী। গাছের ফল পেতে তো অনেকদিন লাগে। কেয়ামতের ভাঙচুরের বিপরীতে প্রস্তুতি নেয়াই কী বেশী দরকারি কাজ হবে না? নিদেনপক্ষে বেশী করে এবাদত-বন্দেগীতে নিয়োজিত হতে পারি আমরা—পরিণাম বিবেচনায়ও এটিকেই তো বেশী যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়।

পরিণাম ভেবেই তো আমরা কাজ করি বা কাজ হাতে নিয়ে থাকি। নতুন তথ্য অনুসারে যদি কাজটির নিষ্ফল হওয়া নিশ্চিত হয় তবে তো আমরা সর্বদা সিদ্ধান্তটাই পরিবর্তন করি, কাজটি চলাকালেও তা বন্ধ করি। স্টেশনে যাওয়ার পথে যদি জানতে পারি, ট্রেন কেনসেলড, তবে আমরা স্টেশনে না গিয়ে বাড়ী ফিরে যাই। পরিণাম চিন্তায় গাছ লাগানো থেকে বিরত থাকা এবং পরিণাম চিন্তায় স্টেশনে না গিয়ে বাড়ী ফিরে যাওয়ার মধ্যে কোনো ক্যাটাগরিক্যাল পার্থক্য রয়েছে বলেই মনে হয়, যা ভাবনা ও খুঁজে বের করার বিষয়।

নবীর কথাটি স্পেসিফিকভাবে গাছ লাগানো সংক্রান্তে। কিন্তু কথাটিকে কি আরও জেনারালইজড করা সম্ভব? অথবা নবী কি কোন সাধারণ নীতি বুঝাতেই এমন একটি বিশেষ উদাহরণ দিয়েছেন? আমরা যখন বলি, যেমন গাছ লাগাবে, তেমন ফল পাবে—তখন কিন্তু একটি জেনারালাইজড কিছু বুঝাই; অর্থটা নিছক গাছের মধ্যে সীমিত থাকে না।

আবার যদি সাধারণভাবে বলি, কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নিলে কাজটি সম্পন্ন ক’রো, পরিণামের দিকে নজর দিও না, তবে এর মধ্যে কিন্তু স্টেশনের উদাহরণটিকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। ফলে এভাবে সাধারণীকরণ সফল হচ্ছে না। এখানে আরেকটি বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে কেয়ামতের সংঘটন। সাধারণীকরণের বেলায় কি কেয়ামত বা কেয়ামতের মতো ঘটনার দিকে নজর রাখতে হবে? যেমন কেয়ামতের বদলে মৃত্যুকে আনা যায়। বলা যায়, কাল মৃত্যু অবধারিত হলেও গাছটি লাগিও। কিন্তু একজন মারা গেলেও অন্য মানুষরা তো বেঁচে থাকছেন যারা গাছের সুফল পাবেন। ফলে পরিণাম চিন্তা অনুসারে কাজটি বিফলে যাচ্ছে বলা যায় না; কেয়ামতের সাথে মৃত্যুর মতো কিছুও যুক্ত করা যাচ্ছে না।

গাছ রোপণের কাজটিকে কর্তব্য হিসেবে দেখলে ইহলৌকিক বিবেচনায় একে হারে হারে কর্তব্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হয়—ঠিক যেভাবে দেখেছেন গীতার কৃষ্ণ বা দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। আর পরিণাম ভাবনাকে যুক্ত করা যায় ঈশ্বর ও পরকালের সাথে একে যুক্ত করে— ঈশ্বর পরকালে এর ভাল ফল দেবেন এবং যদি কাজটি করা না হয় তবে সে ফল থেকে বঞ্চিত হতে হবে। আমরা বলতে পারি, এ হাদিসটি ঈশ্বর ও পরকালে বিশ্বাসীদের কাজের এটিচুড’টি নির্ধারণ করে। একটি কাজ ভাল হয় যদি ইহলোকে তার ভাল ফল পাওয়া যায় বা আমরা সবাই যদি করতাম তবে ভাল ফল পেতাম। ভাল কাজ আমরা করবো ইহকালে ফলের প্রত্যাশা ছাড়াই—মোটামোটিভাবে এমন একটি সাধারণ নিয়ম তৈরি করা যায় হাদিসটি থেকে।

দ্বিতীয় বিষয়টি এরকম হতে পারে। কর্ম-পরিকল্পনার দিক থেকে আমাদের জীবনটা এমন করতে পারি যে, কাল যদি কেয়ামত বা মৃত্যুর কথা নিশ্চিতভাবে জানাও যায় তবুও কর্মকাণ্ডে কোনো পরিবর্তন আসবে না। যদি কোন নির্ভরযোগ্য ডাক্তার নিশ্চিত করে বলেন যে, আমি আর দু’মাস মাত্র বাঁচবো তবে আমার জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন আসবে। এ নিয়ে মজার মজার সিনেমাও তৈরি হয়েছে। অথচ খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, আমার ধারণা মতে, সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে আমি আশি-নব্বই বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচবো। প্রশ্ন হচ্ছে, ডাক্তারের বলা দু’মাস ও আমার ধারণার আশি বছর বয়সের মধ্যে ক্যাটাগরিক্যালি কোন পার্থক্য আছে কি? তারপর দ্বিতীয় বাস্তবতা হচ্ছে, সব কিছু এই তথাকথিত ঠিকঠাক মতো চলার নিশ্চয়তা আছে কি? আমি তো যেকোনো সময়েই মারা যেতে পারি। কিন্তু আমি যখন কাজ করি বা কাজের পরিকল্পনা নেই তখন এই পরমুহূর্ত থেকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ-সম্ভব সময়টাকে বিবেচনায় রাখি না—আমার ভাবটা এমন যেন আমি চিরকালই বেঁচে থাকবো বা মৃত্যু বলে কিছু নেই। অথচ ডাক্তারের সময় বেঁধে দেয়াটা আমার জীবনকে উলটপালট করে দেবে।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি