ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

মানুষের জীবনের মধুরতম সময়কাল কোনটি?—যা স্মৃতিতে চারণ করে বিষণ্ণ হতে হয়, ফেলে আসার বেদনায়?—বা, অতীতে যাওয়ার সময়-যন্ত্রে চেপে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়? কৈশোর কাল? হতে পারে। অন্তত আমার বেলায় তো তা-ই। শৈশব অনাবিল হলেও বুদ্ধিটা তো কাঁচা। যৌবনে বুদ্ধি পাকা হলেও থাকে নানা টানাপড়েন, ভবিষ্যৎ-ভাবনা, দুশ্চিন্তা, ফ্রাসট্রেশন। তারপর তো শুধুই ভার বয়ে বেড়ানো। কিন্তু কৈশোরে আবিলতাও নেই, আবার বুদ্ধিটাও তেমন কাঁচা নয়।

আমার শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন ঝানু একটা সেট। বাংলা শিক্ষকের ক্লাস শুনতে পাশের ক্লাসের ছেলেরাও দরজার ওপাশে লুকিয়ে কান পেতে থাকতো। তবে ঘটনা রসায়ন নিয়ে। রসায়নের শিক্ষক ছিলেন কুমিল্লার মানুষ। আমরা কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা এবং হবিগঞ্জের মাধবপুর, কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মানুষেরা একই ভাষায় কথা বলি, বিয়ে-শাদির বেলায়ও পুরো অঞ্চলটাকে একটি সাংস্কৃতিক বলয় হিসেবে দেখি। আমরা প-কে ফ বলে থাকি। ফলে আপনাদের পানি আমাদের কাছে ফানি।

তা পানি ছাড়া রসায়নের র-ও হয় না। আমরা যেহেতু ফ-রহস্য জানতাম, সেহেতু স্যার যতই ফানি-ফানি করতেন না কেন আমরা খাতায় শুধু পানিই লিখতাম। সে সুবাদে স্যার যেদিন আয়রন ফাইরাইটিস বললেন সেদিন নিয়মানুসারে পাইরাইটিস-ই লিখলাম, যদিও শব্দটি সেদিনই প্রথম শুনেছিলাম। গোল বেধে গেল ফারমেনটেশনের দিন। স্যার বললেন, আজকের টপিক ফারমেনটেশন। আমি খাতার নতুন পাতার একেবারে উপরে বড় করে লিখলাম পারমেনটেশন, তারপর তার নিচে এঁকে দিলাম আনডারলাইন।

অনেক স্যারের মতো তিনিও ছাত্রদের ডেস্কের সারির মধ্যকার জায়গাটি দিয়ে ঘুরে ঘুরে হাঁটতেন ও লেকচার দিতেন। আমার লেখার উপর নজর পড়তেই স্যার থামলেন। বললেন, মিঞা, এটা ফারমেনটেশন না, ফারমেনটেশন। এবার ক্লাসের বাকী ছাত্রদের আমাদের দিকে তাকানোর পালা। আমি স্যারের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি আর বেকুবের মতো ভাবছি ফারমেনটেশন কী করে ফারমেনটেশন না হয়, অর্থাৎ পারমেনটেশন কী করে পারমেনটেশন না হয়, অর্থাৎ ফারমেনটেশন কী করে পারমেনটেশন না হয়।

বেকুবের ভাবনা বেকুবের মতো হলেও, অন্যরা তো আর সেভাবে ভাবিত হয় না। আমার কাহিল অবস্থা দেখে স্যার ফ-এর আ-কারের পর আ-এর সংখ্যা বাড়াতে থাকলেন। ফারমেনটেশন না, বাবা, ফাআরমেনটেশন, ফাআআরমেনটেশন। এবার কানারও চোখ খুললো। আমি ঝট করে খাতায় পারমেনটেশন কেটে ফারমেনটেশন লেখামাত্রই স্যার হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো করে বললেন, হ্যাঁ এবার ঠিক হয়েছে।

প্রায় সব স্যারেরই একটা করে ছাত্রসমাজ-প্রদত্ত নাম ছিল। যেমন, ফুকুদা, নারায়ণ, বাওউ, বগিলা, চেরাগ আলী ইত্যাদি। বলাই বাহুল্য, রসায়ন স্যারের নাম ছিল ফানি স্যার। তবে ছেলেরা নিজেরা একে অপরের নামও দিতো। যেমন, হাতি, গরু, চিংড়ি, কদু, মাসকলাই, লম্বুতে আলতামিরা—কোনো ভাব-জাতি-প্রজাতিরই বাদ পড়ার যেন উপায় নেই। ঝগড়া বেধে গেলে কোনো পক্ষেরই আর প্রতিপক্ষের কারও পিতৃপ্রদত্ত নাম আর স্মরণে থাকতো না।

একবার হাসপাতালে ভর্তি হলাম। নয়-দশেক রোগী। তাদের মধ্যে আমরা এক ক্লাসেরই গোটা চারেক। হাসপাতালে ডাক্তার মাত্র একজন। আর নার্স ছিলেন দু’জন—তাঁদেরকে আমরা সিস্টার বলে ডাকতাম। এবং ডাক্তারকে সকলে মিলে ডাকতাম স্যার।

কয়টি কোন ধরণের খাবার আনতে হবে—পাউরুটি-দুধ না ভাত-মাংস—তা রোগীর ইচ্ছা অনুসারে নয়, রোগের অবস্থা অনুসারে নির্ধারিত হতো। যারা সদ্য এসে জ্বরে কাহিল হয়ে কাতরাচ্ছে তাদের জন্য রুটি-দুধ, আর যারা যাওয়ার জন্য হেলে দুলে নেচে বেড়াচ্ছে তাদের বেলায় অন্যটা। এ বৈষম্যের ডাক্তারি কোনো ভিত্তি আমাদের কখনো জানা হয়নি। কিন্তু সর্বত্রই একটি গ্রে-এরিয়া থাকে, থাকে এমবিগুইটি। তবে সিস্টারই ছিলেন সব সিদ্ধান্তের একচ্ছত্র কর্ত্রী।

সেদিন দুধের বাচ্চার বিধি ছিল বাম। তার সাথে লেগে গেল শরিফ নামের একজনের (তার সেই নামটা আমার মনে নেই)। সেই সকাল থেকেই শরিফের মুখ বাচ্চা-নাম-অন্ত হয়ে আছে দেখে নামধারী বন্ধুটি গোমরা মুখে চুপচাপ। দুপুরে গুণতি শেষ করে সিস্টার যখন হেঁকে বসলেন, অতটা দুধ-রুটি ও অতটা ভাত-মাংস, তখন শরিফ পরামর্শ দিলো, সিস্টার, সিস্টার, দুধ আনতে হবে না, দুধ হাসপাতালেই আছে। এতে সিস্টার রেগে কাঁই হয়ে তিনটে চ-কে একত্র করে বললেন, এইটুকু বাচ্চ্চার কত বড় সাহস! আমি এখনই স্যারকে বলে দেবো।

আকস্মিক এই অর্থ-বিপত্তিতে পড়ে রোগীরা সব হতবাক হয়ে পড়লাম। এমন সংকটে কী বলা যায় তা নিখোঁজ দেখে এর ওর দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়িটাই কেবল চলছিল। সিনিয়র ভাইরা কিভাবে সামাল দিয়েছিলেন জানি না, তবে প্রসঙ্গত অধুনা ঘটিত সিস্টার কাহিনী দিয়ে লেখা শেষ করা যায়।

হাসপাতালে ভর্তি করলাম বউকে। সকালেই ডাক্তারের সাথে কয়েক চোট হয়ে গেছে অন্যদের। নার্স বলে গিয়েছিলেন, স্যালাইনটা শেষ হলে খবর দিয়েন। খবরের সময় হলে বাইরে গিয়ে ডাক্তারকে সিস্টার বলে সম্বোধন করায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, আপনি ডাক্তার খুঁজছেন, না নার্স? বুঝলাম ভুলটা কোথায় হয়েছে। বললাম, আমরা স্বজনদেরকে নিয়ে আপনাদের কাছে আসি, আমরা তো ডাক্তারি জানি না। আপনাদের কথায় একটু আশ্বস্ত হলেই তো শান্ত হয়ে ফিরতে পারি। আপনি তো আমার বোন, আপনাকে বোন না ডেকে কি ভাই ডাকবো? বলেই সভয়ে এক দৌড়ে বউয়ের কাছে আশ্রয় নিতে গেলাম। দেখি সেই নার্সটি তামাশা না দেখে স্যালাইন বদলাচ্ছেন। বউ বললেন, তুমি নাই, সিস্টারকেই নিচে গিয়ে স্যালাইন আনতে হলো।
n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি