ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

নদীর দেশে নদীর পাড়ে বসে স্রোতস্বিনী-জলের কল্লোল শোনে কে? এমন সমতল দেশে কি জলকল্লোল থাকে? আছে বইকি। তা না হলে এতো মানুষের কপাল পোড়ে কেন? আর এতো মানুষের কপালই-বা কেন খোলে? শুকনো মৌসুমে যে নদী দিয়ে মনের আনন্দে বাধাহীনভাবে আড়া-আড়ি ঘোড়া দৌড়নো যায়, জলের মৌসুমে সে নদী বাঁধ-খোলা সংহারী ডাইনির রূপ নিয়ে এমনই উন্মাতাল হয় যে নৌ-চালনাও দায় হয়ে উঠে। নদীর মন নেই, নদীর বুদ্ধি নেই। ডুব দিয়ে সুমন, সুবুদ্ধি নামের মুক্তোর জন্য হন্যে হয়েও লাভ নেই। কিন্তু মানুষেরও কি তা নেই? তা থাকতে নেই? নেই বলে কল্লোল শোনারও লোক নেই। কিন্তু তার থাকতে তো দোষ ছিল না; তার থাকতে তো দোষ নেই।

নদী একূল ভাঙে, ওকূল গড়ে—এ কঠিন সত্যকে আমাদের পিতৃপুরুষেরা নৃত্যপরা নৌকোয় বসে ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দু’চোখ ভরে দেখেছে, কেঁদে-কেটে কতভাবেই না তা অনুরণিত করেছে। কিন্তু দস্যুর উল্লাস যেমন শিল্প হয়ে উঠে, তেমনই হয়ে থাকে লুণ্ঠিতের ক্রন্দন। জীবনের ব্যবস্থাটাই যেন করুণ সুরের কোনো এক যন্ত্র। ভেতরে যত যন্ত্রণা, বাইরে তত মনকাড়া সুরের লহরী। এজন্যই বুঝি পিতৃপুরুষের কান্নার উত্তরাধিকার বহমান হয়েই থাকছে, থাকছে কেবল শিল্প হয়ে, কলা হয়ে, আর থাকছে আমাদের জন্য অতি গর্বের বিষয় হয়ে।

জমিদারের কুঠরিতে কান্নার সুর পৌঁছলেও তার মর্ম পৌঁছেনি কোনোদিন। যদিও সেখান থেকে ভেসে আসা উল্লাসধ্বনি ধানের ক্ষেতে ঢেউ তুলতে অকৃপণ। সারে সারে লাঠিয়াল। এদিকের জমিদার আর ওদিকের জমিদারের অধিকার নিয়ে মরেছে জমিহীনের দল। দলগুলোতে স্থান করে নিতো নদী-ভাঙা জমি-হারারাও। আজও নদী ভাঙে। ভাঙনোত্তর যুদ্ধের পন্থায়, কৌশলে, শস্ত্রে প্রগতি আসলেও প্রসূত ফলাফলে তারা অভিন্ন। তবুও নদীর মায়া আছে। নদী শুধু মাটি-খেকো নয়, পেটে করে পলি আনে মমতা-ভরা মায়ের মতো। সে এদিকে কেড়ে নিলেও ওদিকে ছাড়ে। তারপরও নির্বাক হয়ে নদীকে দেখতে হয়, কাল যে এপারে বসে কল্লোলে শঙ্কিত হতো, শান্ত মনে কল্লোল শোনার জন্য আজ সে ওপারে নেই—নতুন মানুষের শোরগোলে জলকল্লোল চাপা পড়ে যায়।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি