ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

স্বাস্থ্য-চিন্তিত যে-জন ঊষাকালের নিদ্রাসুখে জলাঞ্জলি দিয়ে নিত্য ঘণ্টাকালস্থায়ী ঘরবিবাগী পরিব্রাজক হয়ে আবার ঘরেই ফিরে আসেন, তিনি আপনাকে ব্যায়াম করার উপদেশ নিয়মিত দিতেই পারেন। নিয়ম যার অনুসরণে ব্যস্ত-সমস্ত, অক্লান্ত, সে-জন যদি আমাকে সদা-সর্বদা নিয়ম অনুসরণের সৎপরামর্শ দিতেই থাকেন, তবে তিনিও একইরূপে উত্তম কার্যে নিরত মানব বলেই আমা কর্তৃক প্রশংসিত হবার উপযুক্ত। এরূপে আপনি আচরি উপদেশ সম্প্রদান একটি—নির্দোষ তো বটেই—এমনকি বন্দনার যোগ্য কর্ম। এ-রকম একটা কর্ম-করণ-লোভের তাড়নায় পড়ে আমি লোকের অন্তরে অধুনালুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় মামা-স্নেহ জাগ্রত করার মানসে আমার সেকালের মামার উদাহরণটি ব্লগবন্দী না করে থাকতে অপারগ হলাম। কৈফিয়তোত্তর প্রকৃত বয়ান নিম্নরূপ:

মায়ের মাতুলালয়ে পাতাবাহার গাছ দেখতে পেতাম। সেখানে মায়ের মামার কাছ থেকে এ জ্ঞানও পেয়েছিলাম যে, পাতাবাহার গাছ পাতা থেকেই জন্মাতে পারে। বাহারের নিয়মই এই, বাহার থেকে বাহারের প্রসার—এজন্য ডাল-শেকড়-বীজ কোনোকিছু নিয়েই মেহনত অনাবশ্যক। আমার মামার বাড়ি ও আমার মায়ের মামার বাড়ির মধ্যে যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা তা আর বলার কী আছে? কিন্তু না, মায়ের সাথে তার মামার বাড়ীর সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠতর হয়ে উঠলেও দু’বাড়ির সম্পর্কটা শিথিল হয়েই পড়েছিল। এর একটা উপযুক্ত কারণ ছিল। আমার নানা নারী-নিন্দুকদের ভাবনা অনুসারে সৌভাগ্যবান ছিলেন। অর্থাৎ আমার নানী মারা গিয়েছিলেন এবং তারপর নানা আরেকটি বিয়ে করেছিলেন। আমার দাদাও একইরকম ভাগ্যবান পুরুষ। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর দাদা যে-নারীকে বিয়ে করেছিলেন তিনিই আমার দাদী।

প্রথমা নানীর সন্তানদের মধ্যে কেবল এক খালাকেই আমরা পেয়েছিলাম। আমার যত মামা সব দ্বিতীয়া নানীর সন্তান। কিন্তু আপন নানীর সাথে পাতাবাহারের গাছেরাও নানার বাড়িতে এসেছিল। মামারা সে-গাছ উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলেন। মামাবাড়ি গেলে প্রথমা নানীর হস্তজাত পাতাবাহার গাছদের সাথে দ্বিতীয়া নানীর গর্ভজাত মামাদের মিতালি আমরা প্রাণভরে উপভোগ করতাম। বড়মামা ছিলেন সৌখিন মানুষ। তিনি ফুটবল খেলে হয়রান হয়ে বাড়ি ফিরতে ভালবাসতেন আর ভালবাসতেন নানাজাতের পাতাবাহার গাছ দিয়ে উঠান ভরাট করতে।

এদিকে, আমার দাদার গোষ্ঠী ছিল সুজলা-সুফলা চিরায়ত বাংলার যোগ্য জাত চাষার গোষ্ঠী। উঠানে পাতাবাহার তাদের ভাবনায় ছিল নিষ্কর্মার বিলাস ও কর্মক্লান্তের জন্য বিঘ্নস্বরূপ। তাদের হয়তো ধারণা ছিল, যাদের জমিজমা নেই, চাষবাসের মুরদ নেই তাদের উঠানেই পাতাবাহার মানায়। শস্য মাড়াই-শুকানি যাদের কম্ম, তাদের উঠানে পাতাবাহার! এতো গরুতেং-ভক্ষণেং-য়েও গেরস্থের পোষায় না। পৈত্রিক সূত্রে আমি নিরেট ধান-গম-পাট-শর্ষের সাহচর্যে বড় হলেও মাতৃক সূত্রে আমার মনে পাতাবাহারের সাধ তৈরি হয়েছিল। কিভাবে এ-দুইয়ের মধ্যে মিলন ঘটানো যায় তা নিয়ে ভাবনারও অন্ত ছিল না। বিবাহ কেবল নতুন মানুষই দুনিয়ায় আনে না, সাংস্কৃতিক অন্বয়’ও তৈরী করে।

আমার বাপ-চাচাদের ছেলেমেয়ের মোটের সংখ্যা-মান তখন পাঁচগণ্ডা থেকে আধাগণ্ডা কম—সবাই শিশু-কিশোর-যুবা বয়েসি। একান্নবর্তী বিশাল পরিবারে চাচাতো ভাইবোনগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ছিল হৈ-হাঙ্গামা-আনন্দ-অভিমান-খেলা-কাজিয়ায় ভরপুর; যেমন ছিল দোস্তি, হানাহানি, তেমনই ছিল খাওয়ার জিনিস নিয়ে একটা কাড়াকাড়ি প্রতিযোগিতা—যেকোনো পার্শ্বপথচারীর মনে হতে পারতো, এ যেন বাড়ি নয়, জাহাজ খালাসের বন্দর। পরবর্তীতে অবশ্য পরিবারটি চার পরিবারে বিভক্ত হয়েছিল। কিন্তু কী আশ্চর্য! আজ সে-বাড়িগুলো জনহীন—শূন্য, নীরব, অন্ধকার। এককালে যে-বাড়িতে আঁচলে চাবির গোছা ছিল কর্তৃত্বের প্রতীক, আজ সে-বাড়ির সব চাবি পড়শির ঘরে রাখা।

মামার বাড়ি পাশের গ্রামেই। এক কুড়ি মিনিট হাঁটলেই এ-বাড়ি থেকে সে-বাড়ি। আবদার করার আগেই মামারা ভাগ্নেদের নিয়ে বাজারে হাজির হতেন। মণ্ডা-মিঠাই আমরা নিয়মিতই পেটে পাচার করে যেতাম। কিন্তু এ-যাত্রা আবদার ছিল বাহারের পাতা। উদ্দেশ্য আমাদের উঠানের চারপাশ ঘিরে গাছ লাগানো; মাঝখানের আঙিনা থাকুক ধান-গম-শর্ষের জন্য।

পাতাবাহারের পাতা ছেড়া! আজ যখন দূর অতীতের শৈশবের স্মৃতি বসে বসে চারণ করি, মনের সবটুকু দারিদ্র্য ও রিক্ততাকে বিস্মৃত হবার লক্ষ্যে অস্থিরতায়, তখন স্পষ্ট বুঝতে পারি, এমন আবদার ছোট মামাদের পক্ষেও, বা বড়মামার কোনো সন্তানের পক্ষেও করা ছিল অসম্ভব, হয়তো স্বপ্নেরও অতীত। বাগানে ছিল নানা কিসিমের সব পাতাবাহার গাছ। একেকটার পাতা একেক রকমের বাহারি আকার ও রঙের। এতদিন পরেও স্পষ্ট মনে পড়ে, নির্মম হাতে আমি সাধের গাছগুলো থেকে একের পর এক পাতা ছিঁড়ছিলাম; ছিঁড়ে ছিঁড়ে চোখজুড়ানো বাহারি গাছগুলোকে একরকম গলা-ছিলা মুরগীর মতোই শ্রীহীন করে ফেলেছিলাম। তবুও মামার মুখে কোনো বিকার নেই। পত্র-হন্তা জল্লাদ যে ভাগ্নে! ভাগ্নে বলে কথা! আজ বুঝতে কষ্ট হয় না, অন্তরের নিদারুণ ব্যথাকে তিনি সানন্দেই প্রকাশ করেছিলেন: এই কয়ডা পাতায় হইবোনি ভাইগ্না।

তারপর সন্ধ্যায় পাতার দঙ্গল নিয়ে বাড়ি ফেরা, উঠানের চারপাশে ঘরগুলোর ধার ঘেঁষে অতি যত্নে লাইন সোজা রেখে মেপে মেপে সমদূরত্বে পাতাগুলো স্থাপন তথা রোপণ করা। পাতার একজাতের পর জাতান্তর নির্বাচনটিও যেন সংখ্যাবিচারে গাণিতিক ধারার মতো হয় তা-ও লক্ষ্যে রাখা হলো। শ্রম ও নিষ্ঠা এবং কল্পনা ও আশার পাল্লায় মাপলে এ-কাজ কোনো অংশেই সামান্য ছিল না। কিন্তু হায়! সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখা গেল হৃদয় বিদারক দৃশ্য—উঠানে পাতার চিহ্নমাত্র নেই। তন্নতন্ন করে খুঁজেও একটি ছিন্ন টুকরার সন্ধান পাওয়া গেল না।

বৃষ্টির সাথে পড়া শিলা কুড়োনো একসময় আমাদের একটি বাতিকে পরিণত হয়েছিল। তখন আমরা কুষ্টিয়া শহরে। ঘরের আশপাশে রাজ্যের ঘুঘু-বসা জংলি গাছ থাকলেও আম ইত্যাদি সভ্য গাছ ছিল না। কে জানে! মাটি-চেরা রসের আম কুড়োনোর সুযোগ না-পাওয়া ছেলে-মেয়েরাই হয়তো আকাশ-পড়া জলের শিলার পিছে ছোটে। ছাইপাঁশ গেলা থেকে বিরত রাখার জন্য একবার মা শিলগুলোকে কলসির জলে যত্ন করে রেখে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই শিলাগুলো যেভাবে পানির সাথে মিশে গিয়েছিল, আমার সাধের বাহারি পাতাগুলোও কি সেভাবেই মাটির সাথে মিশে গেল!

ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হলো। আমি বরাবরই আমার বোনদের মতোই কাঁদুনে স্বভাবের। অতএব আমি তিন ভাইবোনের রীতি অনুসারে কাঁদতে বসলাম। কান্নার অভিমানী-ফুঁপানি ক্রমে আগ্রাসী উচ্চ-শব্দ-নিঃসারী রূপ নিলে ঝাঁঝালো চাচাতো বোনটা এসে হাজির। কিরে! কান্‌তাসোস্ ক্যান? সাত-সকালে হইলো কী? একে তো শৈশবি কান্না, তার উপর এতো দুঃখের—মুখ দিয়ে শব্দ বের করতে পারা দায়। অতিকষ্টে ভেঙে ভেঙে বৃত্তান্ত লাইন কয়েক বলতেই দেখলাম বুবুর দু’হাত কোমরে; এক পায়ে দাঁড়িয়ে, একটু সামনে বাড়ানো অন্য পায়ের আগালী* দিয়ে মাটি ঠুকছেন। চোখ তুলতেই দেখি বুবুর গম্ভীর মুখে ‘আহা! বড়ই সমস্যা’ গোছের দুঃখ। বললেন, তাই তো কই, দাইর জুইড়া এতো পাতা, কোন পাগলের কাণ্ড! দুঃখ করো না ভাই, তোমার চাচী পাগলের মূল্য বুঝেন না।

আমার এ বোনটি যেমন ছিলেন মেধাবী, তেমনই ছিল তার পড়াশোনায় আগ্রহ; আর ছিল নিজের বইপত্র, জামাকাপড় গোছগাছ পরিপাটি করে রাখার স্বভাব। সন্ধ্যা হতেই তিনি হারিকেনে আগুন দিতেন। তারপর নামাজ পড়েই বইখাতা নিয়ে বসতেন—যেন সারাটা দিন তিনি এ-সময়টার প্রতীক্ষায় কাটিয়েছেন। কন্যার পড়ালেখা নিয়ে চাচা-চচীর কোনো তদারকীর দরকার হতো না। বুবু গুনগুন করে পাঠ রপ্ত করতেন। আর তার নাকের নিচে সুবর্ণে ভেসে ওঠা জলের বিন্দুগুলো স্বল্প আলোয় অলৌকিক স্ফটিকের মতো শোভা বিকিরণ করতো। ঠেঙানোর সময় তিনি খাঁটি মাতৃভাষা ও পণ্ডিতদের রচিত বাংলাভাষা—দুটোকেই ব্যবহার করতেন অদ্ভুত দক্ষতায়। যেমন: তুই তো কোনো কতাই হুনোস্ না দেখি বান্দর। তোমাকে না কতবার বলেছি, হ্যাংলার মতো মুখের দিকে চেয়ে থাকবে না।

একে তো পাতা হারানোর বেদনায় মন কাতর, তার উপর এই বেইজ্জতি! কান্নার শব্দ ইতোমধ্যে ভৈরবী উচ্চাঙ্গে। বুবু হাত ধরে টেনে আমাকে নিয়ে ফেললেন মা-চাচীর সামনে। কাহিনী শুনে চাচী বললেন: ছোটবৌ, আমি কি এতো কিছু জানি? ঝাইড় দেওনের সময় তুমি তো কিছু কইলা না। না হয় রাইখ্যা দিতাম পাতাডি। আজ এটাও বুঝি: মামা ঠিকই জানতেন আমাদের বাড়িতে মাটি হওয়াই পাতার অমোঘ নিয়তি। পাতা ছেড়ার মতো দুষ্কার্যটি যে শেষ বিচারে অকাজেই গিয়ে ঠেকবে, মামা আমাকে সে-জ্ঞানটিও দিতে চাননি।

* ‘গোড়া’ থেকে ‘গোড়ালী’ হলে ‘আগা’ থেকে ‘আগালী’ হতেও পারে।
n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি