ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমি জানি, তুমি জানো, জানে সেও, কোনো কালেই চাঁদ ভেঙে আধেকটা কাওকে দেয়নি কেও। তবুও হার-সংসারীরা হাতের জোরে কথা বানিয়েছে অর্ধচন্দ্র দান। হয়তো আমার তোমার তার সন্তানেরাও বুদ্ধির জোরে নির্ণয় করে সেরেছে: কেউ কোনো দিন বৃষ্টির কালে ব্যাঙের ডাক শোনেনি, যদিও লোকে বইয়ে লেখে ব্যাঙ-ডাকা বৃষ্টি। আকাশ থেকে বেড়ালেরা কুকুরেরা ঝরে ঝরে পড়ে না, ওরাই শুধু চুপ-চুপ হয়ে বৃষ্টিতে ভেজে না। তারপরও বিলাতিরা বলে ক্যাটস এন্ড ডগস। বাংলার ব্যাঙও বুঝি-বা বিলাতের কুকুর-বিড়াল। কিন্তু চাষার ঝি-পুত নায়-নাতকরেরা জানে ব্যাঙ-ডাকা জল কারে কয়, আর তারে ব্যাঙ-ডাকা কেন বলা হয়।

আকাশ জুড়ে কাজলের মতো কালো মেঘেরা জড়ো হয়ে বিকেলকে সন্ধ্যা করে তোলে। চিত হয়ে শুয়ে থাকা পৃথিবীটা এক গম্ভীর নিস্তব্ধতায় সোজা উপরের দিকে চেয়ে থাকে প্রাণের প্রত্যাশায়। আসে ঝড়। ঝটিকা-ক্ষুব্ধ ঝড়ের দমকে ঘর কাঁপে মোমিন-মুত্তাকি হৃদয়ের মতো। আম জাম কাঁঠাল গাছের ডালেরা সব সুফিদের মতো এদিকে হেলে তো ওদিকে দোলে। ঝাড়-বাঁশেরা বাঁকা হয়ে বুঝি রবকে কুর্নিশ করে নামাজির পরিতৃপ্ত আত্মার মতো। বিদ্যুতের ঝলকানি মেঘের যুযুধান রাজ্যগুলোর সীমানা আঁকে শিরা-উপশিরা-রেখায় লকলকিয়ে। বজ্রের মুহুর্মুহু নির্ঘোষ দোর্দণ্ড প্রতাপের দস্যুগুলোকেও নিরীহ সন্তের মতো ধ্যানমগ্ন-দশায় ঠায় বসিয়ে রাখে ঘরের কোনে। তারপর আসে মুষলধারে বৃষ্টি। সব জল গড়িয়ে খালে-ডোবায় গিয়ে পড়ে। খাল-ডোবা পানিতে থৈ-থৈ। একসময় বৃষ্টি থামে। পৃথিবী শান্ত হয়। আকাশ পরিষ্কার হয়। গৃহস্থের বউ-ঝি’রা দোর খুলে আঙিনায় নামে। পাতা-ঝরা, ডাল-ভাঙ্গা, বৃষ্টি-ধোয়া রূপালী বিকেলে শব্দ কেবল ব্যাঙের একটানা ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ।

প্রশান্ত পরিবেশটা অনির্বচনীয় এক মনোদশা সৃষ্টি করে। এ এক সম্বিতবর্জিত মনোদশা, বৈরাগ্যগ্রস্ত অসচেতন নির্মল ভাব। দীর্ঘকাল ধরে তা থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্লান্তিতে মন স্মৃতির আশ্রয় নিলেই এ অনুভূতি সম্বিতে চৈতন্যে ধরা পড়ে। নাকি ভাবনাটা বয়সের সুতোয় বাঁধা? মানুষ কালে কালে বদলায়। বাবা আক্ষেপ করে বলতো, শৈশবটা কতই না সুন্দর ছিল। আজ ছেলে আক্ষেপ করে। কী আশ্চর্য! বাবা যেকালে বসে আক্ষেপ করেছিল, ছেলের আক্ষেপ সেকালের জন্যই। নাতিও একদিন একই কথা বলবে আক্ষেপের সুরে। তবে কি দুনিয়াটা একই থাকে, আর আমরা একেকজন দেখি একেকভাবে? তা কী করে হয়? দুনিয়াও যে বদলায়। বদলায় না কেবল আক্ষেপটাই। তাহলে কি সবকিছুই আপেক্ষিক আর আক্ষেপটাই কেবল অনপেক্ষ?

বাঙালির যখন শরৎকাল, মেঘেদের তখন বসন্ত। আকাশে পুঞ্জের উপর পুঞ্জের বিন্যাসে পুষ্পের ভাসমান সম্ভার। নিচে খালে-ডোবার অথৈ পানিতে এখানে ওখানে ভাসে এবরা-থেবরা কচুরিপানার দল। বর্ণালী ডানা মেলে ফড়িংয়েরা উড়ে হেথা থেকে হোথায়, বসে কচুরিপানার পাতায়, আবার কেন জানি অস্থিরমতি বালকের মতো হুট করে উঠে গিয়ে বসে পড়ে অন্য পাতায়। মাটি ও পানির সঙ্গমে জ্যামিতি-ছাড়া ঘন ঝোপঝাড়ের দঙ্গল। অনড় পাতার দল নিয়ে ঋজু ঋষি হয়ে থাকে বাড়ি ঘেরা বৃক্ষগুলো। এতকিছুর পরও কোথায় যেন একটা অভাব। নৌকায় বসে মাঝ-জল থেকে দেখা গ্রাম চোখ জুড়ানো শ্যামলী বটে, তবুও শীতল হয় না যেন মন। ওদিকে জল-গর্ভ স্তব্ধ বাতাসে ভ্যাপসা গরম—গা হাঁস-ফাঁস। কিন্তু নৌকা থেকে মুখ বাড়িয়ে খাড়া জলের দিকে তাকাতেই আত্মা জুড়িয়ে হিমশীতল। কালো জলে নীল-সাদা আকাশের রঙিন ছায়া। অতৃপ্ত দৃষ্টির যত অন্বেষা সব যেন জলের গভীরে লুকোনো অদৃষ্টের ভেতর। পিপাসু চোখের সুড়ঙ্গ গিয়ে ঠেকে অন্তরাত্মার অন্তঃস্থলের গভীর গহীনে।

একেক বাহনে ভ্রমণে একেক অনুভব। রেলে এক রকম আর লঞ্চের রকম আরেক। অপেক্ষার পালাদুটোও ভিন্ন। স্টেশনের প্ল্যাটফরম আর ঘাটের পন্টুন—অনুভবের স্রষ্টা হিসেবে একেবারেই স্বতন্ত্র। একটায় লাইনের সংকীর্ণতা, শহুরে কোলাহল আর ইট-পাথর। অন্যটায় নদীর প্রশস্ততা, গ্রাম্য নীরবতা আর মাটি-জল। স্টেশনে একটা বাবু-বাবু ভাব হয়, আর ঘাটের ভাবটা কবি-কবি। একটায় অহং ও স্বাতন্ত্র্যের দেয়াল, অন্যটায় মায়া ও কুটুম্বীর সুতো। একটায় যেন হারানোর উৎকণ্ঠা, আর অন্যটায় পাওয়ার প্রত্যাশা। একটায় ‘এখনও আসে না কেন?’, অন্যটায় ‘ঐ যে আসছে!’। লাইনের দিকে তাকালে মনে হয় ভ্রমণটা মাধ্যম, গন্তব্যই উদ্দেশ্য। নদীর দিকে তাকালে মনে হয় ভ্রমণটাই উদ্দেশ্য, গন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। স্টেশনে থাকতে ভাল লাগে না, একঘেয়ে বোরডোম। ঘাটে বসে মনে হয় আজীবন বসে থাকলেও মন্দ হয় না। স্টেশনে কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, ঘাটে কারও সাথে কথা না বলে থাকা যায় না।

সদরঘাট কিংবা এমনকি নরসিংদী ঘাটের কথা এ নয়। এ মানিকনগর ঘাটের কথা। মেঘনা-পারের লঞ্চ-ঘাটটা যেন এক মায়াবী পুরী। নদীটা পুরোপুরি সরল রৈখিক নয়, বিরাট প্রশস্ত একটা ইংরেজি অস্পষ্ট ‘ইউ’ অক্ষরের মতো। সহজেই এদিক থেকে ওদিকের নদীতে চোখ রাখা যায়। ঘাটের পাশেই বাজার। শুধু মুসাফির কেন, গ্রামের ভেতর থেকে যারা প্রতিদিন বাজারে আসে তাদের মনেও বোধ করি দৃশ্যটি নিত্য ভাবের রূপান্তর ঘটায়—যেন পুরনো হওয়ার নয়, অভ্যস্ত বা উদাসীন হবার সুযোগ বুঝি নেই। আর যারা মুসাফির—বিশ্বাস না হয় তুমি নিজেই গিয়ে ও-ঘাটে নেমে দেখ—তারা অনুভব করে মগ্নতার বিস্তার।

শীতের ক্ষীণ অঙ্গই হোক, কি বর্ষার ভরা তনু—নদীর বুকে রবির কিরণে রূপালী ঝিকিমিকির ঋতু-ফারাক নেই। তবুও অবহেলায়-অভিমানী’র মতো নদীটা কেবলই বয়ে চলে নীরবে। দেখলে না, বুঝলে না, কথা কইলে না, শুধুই পারাপারের অবলম্বন—এ অভিমানেই কি সে মাঝে মাঝে আছড়ে পড়ে মাটির কিনারে? রোষে আক্রোশে ভেঙে গিলে বিরাট একটা ‘ভি’ করে তুলতে চায় ‘ইউ’ অক্ষরটাকে? কারণের খোঁজ কেউ রাখে না, কার্য দেখে সবাই। ভাঙনের রূপ দেখে লোকেরা আর্তনাদ করে: ও-গাঙ ডাইনি, রাক্ষসী, ভয়ংকরী। মানবের মন না থাক, গাঙচিলদের আছে। আভিজাত্য ঠিকরে বেরোনো ঠোঁট চোখ গা নিয়ে ওরা উড়ে বেড়ায় নিজস্ব মহিমায়, আকাশের নীলিমা থেকে ডানা মেলে মহনীয় মসৃণতায় নেমে এসে ছুঁয়ে দিয়ে যায়—নদীর সাথে তাদের এ এক মনের মিতালি, প্রাণের খেলা।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি