ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

দুনিয়ার অনেক প্রজাতির মৃত্যু হয়েছে। আমরা একথা এজন্য বলে থাকি যে, তাদের কোনোটির একটি সদস্যকেও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মৃত্যু যে কেবল এভাবে পরম অভাবের মধ্য দিয়ে ঘটে—তা নয়। চরম প্লাবনের মধ্য দিয়েও মৃত্যু ঘটতে পারে। শিল্পকলার মৃত্যু হয়েছে এই পরের পদ্ধতিতে। অর্থাৎ কলার মৃত্যু এজন্য হয়নি যে, আমরা আর শিল্পী সৃষ্টি করতে পারছি না, বরং এজন্য যে, কলাকারদের কিলবিলানো পয়দায়েশ থেকে আমরা নিস্তার পাচ্ছি না। মধ্যযুগে যখন ঘরে ঘরে দার্শনিক তৈরি হতে শুরু করেছিল, তখন যেভাবে দর্শনের মৃত্যু ঘটেছিল, আমাদের কালেও তেমনই শিল্পকলার মৃত্যু ঘটেছে কলাকারদের মহাপ্লাবনের কারণে। আমরা বহু আগে শুনেছিলাম, গড ইজ ডেড। পরে শুনেছি, ম্যান ইজ ডেড। অধুনা শুনতে হচ্ছে, আর্ট ইজ ডেড। লেইট ক্যাপিটালিজমের কালে টেকনো-সায়েন্টিফিক রেভোলুশন যেন খুনের নেশায় মেতেছে।

কলার প্লাবন সংঘটিত হয়েছে। প্লাবন জিনিসটা মন্দ নয়। কিন্তু একটি জিনিসকে তার প্রকৃত স্থান থেকে সরিয়ে যখন অন্য সব স্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয় তখন কেমন হয়? একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হতে পারে। আমাদের কালে যৌনতা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে: ছবিতে, যন্ত্রে, সেলিব্রেশনে, বিজ্ঞাপনে, প্রচারের মাধ্যম হিসেবে, পণ্য হিসেবে, ব্যবসা হিসেবে, সর্বত্র; কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছে না যেখানে তার স্থান ছিল সেখানে। তা না হলে নারী কেন পুরুষের উপর আস্থা হারাচ্ছে, পুরুষ কেন নারীর উপর আস্থা হারাচ্ছে, অনেক দেশেই আদমের সংখ্যা কেন বিপদজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে? এ যেন ঘরে সন্ন্যাস, বাইরে সংসার; প্রাইভেট সেক্সহীনতা, পাবলিক সেক্সসর্বস্বতা। প্রজনন বিবর্জিত সার্বক্ষণিক যৌনতাই হচ্ছে একালের নীতি। যৌনতা চূড়ান্তভাবে খোলামেলা হয়ে এখন তার সব রহস্যময় স্বাপ্নিক আকর্ষণ হারিয়েছে, এবং সক্ষম গর্ভ পরিণত হচ্ছে বন্ধ্যায়। শিল্পকলার মৃত্যুও এ-রকমভাবেই হয়েছে।

শিল্পকলা তার প্রধান বৈশিষ্ট্যটি খুইয়েছে। সব প্যাসিভ জীবন, স্রোতে-ভাসা জীবন একই রকম; আর সব এক্টিভ জীবন, পাহাড়-ভাঙা জীবন নিজস্বভাবে একেক রকম। প্যাসিভ জীবন হচ্ছে অন্যের ফ্যাক্টরিতে তৈরি জীবনের মতো, চলতি ফ্যাশনের জামা পরে নিজেকে মানানসই করে উপস্থাপন করার মতো। কিন্তু এক্টিভ জীবন হচ্ছে চলতি জীবনকে অতিক্রম করার অভিপ্সামণ্ডিত জীবন। এ হচ্ছে চিন্তার এক তুরীয় অবস্থা থেকে অবস্থান্তরে ক্রমাগত অতিক্রমণ। শিল্পী তাই তার কর্মকে উপস্থাপন করেন রহস্যময়তার আবরণে—দর্শক খুঁজে বের করেন নব নব ইন্টারপ্রিটেশন, উপলব্ধি। এর মধ্য দিয়েই আসে যথার্থ স্বাতন্ত্র্য। জগত রহস্যাবৃত, একেক মানুষের কাছে এর অর্থ একেক রকম। মানুষ একারণেই জগতকে ছাড়িয়ে উঠতে চায়। শিল্পকলার বৈশিষ্ট্যও জগতের মতোই ছিল। ট্রানসেন্ডেন্স একটি সার্বজনীন বিষয়। একজন শিল্পীর কর্মে প্রতিফলিত এই আধেয়টি প্রত্যেকেই আত্তীকরণ করতে পারেন, তা তারা যে ধর্মেরই হোন না কেন, যে সাংস্কৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেই আসুন না কেন। এই আত্তীকরণের মাধ্যমে এক ধরণের আধ্যাত্মিক উন্নয়ন সাধিত হতে পারে, যা জগত ও জীবন সম্পর্কে বোধের গভীরতা বৃদ্ধির মাধ্যম এবং সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ সম্বন্ধীয় বোধকে বিস্তৃতকরণের মাধ্যমে ঘটে। এবং ঘটে একজনের ধর্ম-সংস্কৃতি-আদশের্র সাথে বিরোধ না বাধিয়েই, বরং সঙ্গতিপূর্ণভাবে। কিন্তু গণভাবে বিনোদন-ভোক্তা ও সমর্থক তৈরি করতে মশগুল একালের কলাকারেরা শিল্পকলা থেকে এই ট্রান্সেন্ডেন্সকে বিচ্ছিন্ন করেছেন।

শিল্পকলার কাজ কি? আমাদের জীবন নানা দ্বন্দ্বে ভরপুর—কত টেনশন, কত কনফ্লিক্ট। একটির অবসান ঘটালে তা থেকে নতুন টেনশন-কনফ্লিক্টের উন্মেষ হয়। আমাদেরকে নিত্য সচেতন হয়ে উঠতে থাকতে হয়, নিত্য সক্রিয় থাকতে হয়। আর এ সৃজনশীল চিন্তা ও ক্রিয়াপরতার ফল হিসেবে আসে সিনথেসিস, সাধিত হতে থাকে প্রগতি। এজন্য জনগণের মধ্যে সম্প্রসারিত করতে হয় চিন্তা ও ক্রিয়াপরতাকে। শিল্পকলার কাজ হচ্ছে এই প্রসার সাধন। কলা হিসেবে ট্র্যাজেডির মূল্য এখানেই। আমরা শিল্পীর উপস্থাপনাকে বুঝতে চাই, থিয়েটারে আমরা সমবেতভাবে চিন্তা করি, আবিষ্কার করতে চাই রূপান্তরের সম্ভাব্য রূপকে। কমেডির স্থান তার পরের। কিন্তু এখনকার কলাকারেরা কমেডিকেও পরিণত করে ছাড়ছেন ভাঁড়ামিতে। কলা এখন স্টাইলের নামে কেবল উদ্ভটতা; ‘খোশ রহো, হাসতে রহো’-ই এখনকার কলার মূল উদ্দেশ্য। তা পরিণত হয়েছে বাণিজ্যে, পর্যবসিত হয়েছে ভক্তের-পকেট-কাটা নতুন নতুন দেব-দেবী সৃষ্টির পন্থায়, আর প্রোপাগান্ডার হাতিয়ারে।

আমরা খেতে চাই বলেই আমাদের পাতে সব তুলে দিতে হবে কেন? আমরা আমাদের শাসক নির্বাচন করি—এর নাম গণতন্ত্র। শাসকরা আমাদের অভিভাবক নন, শিক্ষকও নন; তারা আইন অনুসারে আমাদেরকে পরিচালিত করবেন, আইনের আওতায় থেকে আমাদের ইচ্ছা-বাসনা পরিপূরণ করবেন, আমাদের সকলের প্রতিনিধিত্ব করবেন—এটাই এখানে নীতি ও কাম্য। কিন্তু একজন শিল্পী হচ্ছেন উৎপ্রেরণাপ্রাপ্ত স্ব-উত্থিত পথপ্রদর্শক, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দ্রষ্টা ও প্রকাশক—আমরা তাকে নির্বাচন করি না। তিনি আমাদেরকে তার ইচ্ছেমতো পরিচালিত করবেন—তা যেমন ঠিক নয়, তেমনই একথাও ঠিক নয় যে, তিনি আমাদের বাসনামতো খাবার পাতে তুলে দেবেন। আমাদের ইচ্ছা-বাসনা আমাদেরকে কোন সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে তিনি তা আমাদেরকে দেখাবেন, যেন আমরা বুঝতে পারি। তিনি আমাদেরকে নতুন সম্ভাবনার চিত্র দেখাবেন, যেন আমরা সব বিকল্পের মধ্য থেকে উত্তমটিকে নির্বাচন করতে শিখি, নিজেদেরকে গড়ে এক ধাপ উপরে নিয়ে যেতে পারি। তিনি মানবসমাজের কোন একটি খণ্ডের ঝাণ্ডাবাহী হবেন না, তিনি হবেন সবার।

শিল্পকলা এখন তার সব গুণগত ব্যাপ্তি হারিয়েছে: গভীরতা, উচ্চতা, প্রশস্ততা সবই। পক্ষপাত, চিন্তাহীনতা ও স্থূল রসিকতাকে তা একধরণের দর্শন ও আদর্শে রূপান্তরিত করে নিজে লঘু হয়েছে, মানুষের চিন্তার ক্ষমতাকে নস্যাৎ করার মাধ্যমে তাদেরকে একধরণের সম্বিতহীন যম্বিতে পরিণত করতে, বিনোদন-পণ্যের ভোক্তায় পর্যবসিত করতে সচেষ্ট হয়েছে। কলা এখন একটি ষড়যন্ত্রের নাম, পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনার নাম। কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুক্ত হয়ে গেলে কলা সাধারণত নিজেই নিজেকে একটি মহান সংগ্রামী বা জিহাদি বা একমাত্র প্রগতিশীল বা একমাত্র সত্য শিল্পকলা হিসেবে দাবী ও পরিচিত করতে থাকে। এখনকার কলা তাই উদ্দেশ্য-বিচারে তাৎপর্যমণ্ডিত কিন্তু চিন্তা-বিচারে শূন্যগর্ভ—আর এভাবেই কলা তার নিজের কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্যত্র সর্বত্র বিপুলভাবে বিস্তৃত হয়েছে। অর্থাৎ শিল্পকলার মৃত্যু হয়েছে।

“The illusion of desire has been lost in the ambient pornography and contemporary art has lost the desire of illusion.”—বাক্যটি দিয়ে Jean Baudrillard তার The Conspiracy of Art নামক প্রবন্ধটি শুরু করেন। তিনি সমকালীন শিল্পকলাকে null আখ্যায়িত করে বলেন, “It claims to be null—‘I am nulll I am nulll’—and it truly is null.” আর্টের প্রতারণাকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেন: “Therein lies all the duplicity of contemporary art: asserting nullity, insignificance, meaninglessnesss, striving for nultity when already null and void. Striving for emptiness when already empry. Claiming superficiality in superficial terms.” কিন্তু কলা null হলেও nothing নয়, এর গর্ভ ফ্যান্টাসি দিয়ে ভরা। কাজেই সবদিক-ঘিরে-থাকা পর্ন যেমন বাসনার ফ্যান্টাসি, তেমনই সমকালীন শিল্পকলা হয়ে যাচ্ছে ফ্যান্টাসির বাসনা। আমাদের দুনিয়া এখন তাই একটি সুবিশাল Fantasy Kingdom.

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি