ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

উপন্যাসের দুনিয়ায় ইংরেজি ভাষার দাপট অনেক কালের পুরনো। তাছাড়াও রয়েছে রুশ ভাষার প্রতাপ। ইংরেজির ডিকেন্স, হার্ডি, অথবা রুশ টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি’দের মতো বাংলায়ও রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক’য়ের মতো ঔপন্যাসিকেরা। বাংলাসাহিত্য-জগতে বঙ্কিম-রবি-শরৎ ত্রয়ী ঔপন্যাসিক হিসেবে অনন্য স্থানের অধিকারী। তবে সুনীতিকুমার থেকে জানা যায়—তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পেরেছিলেন—বঙ্কিম-শরৎ-তারা ছিলেন সেকালের সবচে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক-ত্রয়।

যারা বিত্তবান হবার কারণে এর-ওর ছবি টাঙানো অভিজাত ড্রয়িংরুমে বসে গর্বিতভাবে সংস্কৃতিচর্চা করতে পছন্দ করেন তারা যে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথকে বেশী টানবেন তা অনুমান করা যায়। আর যারা কথার যাদুতে মজে আনন্দ চান, সময় পার করতে চান, তারা শরৎচন্দ্রকে অবলম্বন করলে সুফল পাবেন। আনন্দের জন্য শরৎচন্দ্রের পুরো গল্পটি পড়ে শেষ তক যেতেই হবে এমন কথা নেই। আপনি রেল স্টেশনে বসে আছেন? ট্রেন দু’ঘণ্টা লেট? তাঁর যেকোনো একটি উপন্যাস নিয়ে পড়তে থাকুন। ট্রেন আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে আসলেও ক্ষতি নেই—যতটুকু পড়েছেন তাতেই আনন্দ। আমরা সাধারণত কষ্ট করে উপন্যাসের সবটুকু পড়ে তবে শেষে পুরো আনন্দ পাই। কিন্তু শরৎচন্দ্রের বেলায় একথা খাটে না: আমরা পড়তে শুরু করেই আনন্দের সাথে এগুতে থাকি, এবং পথ শেষ হবার আগেই কোনো কারণে যাত্রাভঙ্গ হলেও ঠকেছি বলে আফসোস হয় না।

কিন্তু যদি জীবনকে সামগ্রিকভাবে ও অর্থনৈতিক শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে মানুষের প্রকৃত টানাপড়েনকে আমরা প্রত্যক্ষ করতে চাই তবে বিভূতিভূষণ-মানিক-তারাশঙ্করই সবচেয়ে উপযুক্ত এবং এ বিচারে এ তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ই সেরা ত্রয়ীটি তৈরি করেছে বলে দাবী করা চলে। ধরা যেতে পারে যে, উপন্যাসের উপাদান চারটি: আখ্যান, চরিত্র, ভাষা ও জীবনদর্শন। এ চার উপাদান-বিচারে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) পথের পাঁচালী (১৯২৯), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬) এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭১) গণদেবতা (১৯৪২) বাংলাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপন্যাস ত্রয়ী বলেই মনে হয়। তারও উপর আরও দাবী করা যায় যে, এ তিনটি উপন্যাস বড় ক্যানভাসের উপন্যাস।

উপন্যাসের বড় ক্যানভাস বলতে কী বুঝায়? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়: যে উপন্যাস একটি কালের একটি স্থানের মানবমণ্ডলীকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে সহায়ক হয় সে উপন্যাসের প্লটই বড় ক্যানভাস। বিস্তৃতভাবে লেখা একাধিক ইতিহাস বই পড়েও যা আয়ত্তে আনা যায় না, বড় ক্যানভাসের উপন্যাস পড়ে তা সহজেই সাধন করা যায়। তবে এটাও বলতে হয় যে, এ ধরণের উপন্যাস একটি স্থান-কালকেই কেবল ধারণ করে না, বর্ণরূপায়িত করে না, বরং এর মধ্য দিয়ে তা মানুষের বহমান সার্বিক রূপকেও তুলে ধরে। বড় ক্যানভাসের উপন্যাসে আমরা একটি সমাজের ‘উচ্চ’ থেকে ‘নিচ’ বলে বিবেচিত সব অর্থনৈতিক শ্রেণির প্রতিনিধিকেই চরিত্র হিসেবে পেয়ে থাকি; ফলে প্রত্যেকের মানস-কাঠামো এবং তাদের শ্রেণিভিত্তিক আন্ত:সম্পর্ককেও আমরা বুঝতে পারি। এ-কথা ঠিক, টলস্টয়ের ওয়ার এন্ড পিস উপন্যাসের ক্যানভাসের তুলনায় আমাদের গ্রাম-ভিত্তিক বড় ক্যানভাস আদতে খুব বড় নয়। ফলে এ উপন্যাসগুলো কলেবরেও ছোট এবং এতে রাজধানীর উজির-নাজির-নকিব-কোতোয়াল-রক্ষী-সেবকেরা চরিত্র হিসেবে অনুপস্থিত। কিন্তু তাতে মূল দ্বন্দ্বের, চিন্তা ও জীবনাবস্থার বৈপরীত্যের চিরায়ত রূপটি ক্ষুণ্ণ হয়নি।

কাহিনী বা আখ্যানের মধ্যে বিদ্যমান নাটকীয়তা বিচারে ইংরেজ ঔপন্যাসিকেরা অনেক অগ্রসর হলেও চরিত্র নির্মাণ, ভাষার ব্যবহার ও বর্ণনার অন্তরালে প্রবহমান জীবনদর্শন বিচারে এ তিন উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনেও নিজেদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম। ভাষা ও ভঙ্গির দিক থেকে পাঁচালী জীবন চিত্রণে নম্র ও কাব্যিক, গণদেবতা আগ্রাসী ও নাটকীয়ভাবে গদ্যময়, আর ইতিকথা এদের মধ্যবর্তী—একাধারে কাব্যিক ও নান্দনিকভাবে ধারালো। ‘রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করনি’ আক্ষেপের রবীন্দ্রনাথ, অথবা তার অগ্রজ বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা সাধারণত বাবু ও সর্বোপরি মানুষ। এর বিপরীতে আমাদের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রগুলো কতটুকু মানুষ তা জানি না তবে তারা যে হারে-মাংসে বাঙালী তা সহজেই দাবী করতে পারি।

পথের পাঁচালী

পথের পাঁচালীতে আমরা পাই অবিকৃত প্রকৃতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে মর্ম-নাড়ী-যুক্ত রোমান্টিক জীবনের ব্যাকুলতা, কষ্ট, আনন্দ আর আশা-দুরাশার দোলচাল। গুরুতর দারিদ্র্য ও সংকটের মধ্যেও দুর্গা, তার ভাই, মা ও বাবা চারজনই বিভিন্ন মাত্রায় কম-বেশী রোমান্টিক বা কল্পবিলাসী। কাহিনী খুবই সাধারণ, চরিত্রও সাধারণ। সমালোচকেরা সাধারণত বলে থাকেন যে, প্রত্যেক পাঠকই এখানে নিজেকে খুঁজে পেয়ে থাকেন। উপন্যাসটি অসাধারণ হয়েছে প্রকৃতির ও মনোজগতের সরল কিন্তু গভীর উপস্থাপনায়। এটি সম্ভব হয়েছে বিভূতিভূষণ কর্তৃক সুবিস্তৃত চিত্রণের ফলশ্রুতিতে—মনের ভেতরটাকে, প্রাকৃতিক জগতটাকে, প্রকৃতির সাথে জীবনের মাখামাখিটাকে চিত্রিত করার কাব্যিক দক্ষতার কারণে। এটা হয়তো ঠিক, বিভূতিভূষণের বিবরণ নিরাসক্ত ও অবজেক্টিভ; কিন্তু স্বতন্ত্র বাক্যগুলোর মধ্যে নয়, কাব্যিকতাটি রয়েছে বাক্যের সমাহারের ভেতর, সামগ্রিক বুননের ভেতর, দেখবার ও প্রকাশ করবার মনোভাব ও ভঙ্গির ভেতর।

imgrok_6486

জীবনের রূঢ়তা ও শ্রেণি-দ্বান্দ্বিকতা যেমনটা আমরা দেখি গণদেবতায়, তেমনটা উৎকটভাবে তা এ উপন্যাসে উপস্থিত নয়। তবে বিত্তবানের মনোভাব, তার ভেতরে থাকা অহমিকা, দৈনন্দিন আটপৌরে জীবনে তার নিষ্ঠুর বাচনিক বহিঃপ্রকাশ এবং অর্থনৈতিক আচরণগত নির্মমতার উদাহরণ এ উপন্যাসে একেবারে অনুপস্থিতও নয়। তব্‌রেজের বউ ও অন্নদা রায়ের কথোপকথনে আমরা শেষেরটির উত্তম নজির দেখতে পাই। বাংলাদেশের অনেক বঁধুই জা-স্বামীর জিহ্বায়-হাতে কিভাবে নিপীড়িত অপমানিত হয় তার নজিরও উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। আবার শ্রেণিগত অবস্থান নির্বিশেষে মানুষের মমতা, হিংসা, শ্লাঘা সবই ফুটে উঠেছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে একই চরিত্রের মধ্যে। সর্বজয়া পুত্রের প্রতি যতটা স্নেহময়ী, কন্যা দুর্গার প্রতি ততটা নয়, এবং ইন্দির ঠাক্‌রুনের প্রতি একপ্রকার নির্মমই বলা যায়।

বিচ্ছেদ ও দারিদ্র্য এ উপন্যাসে পাঠকের মনকে কোথাও কোথাও বেদনার রসে নীল করে তোলে—অন্তর নিংড়ানো করুণার রসে চোখও আর্দ্র হয়ে উঠে; তবে শ্রেণি-দ্বান্দ্বিক ভাবনা তৈরি হয় না, বরং আশা-বেদনা, স্বপ্ন-অন্বেষা, অসহায়ত্বের বোধ, পরিবর্তনের কল্পনা—প্রকৃতির বিপরীতে প্রাকৃতিক মানুষের বসবাস-সংগ্রামের সার্বিকরূপের সাথেই যেন আমাদের পরিচয় ঘটে—পাঠক নিজেকে একধরণের আধ্যাত্মিক উচ্চ স্তরে উপনীত অবস্থায় দেখতে পায়।

এ উপন্যাসে ইন্দির ঠাক্‌রুন ও সর্বজয়ার অসহায়ত্ব স্পষ্ট এবং দুর্গার একাকীত্বটি গভীর। দুর্গার একাকীত্ব এ উপন্যাসের একটি অন্যতম প্রধান থিম। এমনকি একথাও হয়তো বলা সম্ভব: পথের পাঁচালী নারী বিষয়ক উপন্যাস, ইন্দির ঠাক্‌রুন, দুর্গা ও সর্বজয়া’ই এর প্রধান চরিত্র—অপু এংকর, দ্রষ্টা, ভাষ্যকার। ইন্দির ঠাক্‌রুনের মৃত্যুর সাথে সাথে যেভাবে সেকালের অবসান হয়েছিল, সেভাবেই দুর্গার মৃত্যু ও দুর্গাকে ফেলে রেখে গ্রাম ছাড়ার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে। তারপরের অংশে সর্বজয়া নিজেকে আবিষ্কার করে ইন্দির ঠাক্‌রুনের জায়গায়।

মহাকালের বিপরীতে দাপটে মানবজীবনের পরিণতির চিত্র তুলে ধরতেও ঔপন্যাসিক সুযোগ হাতছাড়া করেননি। হরিহরের পূর্বপুরুষ বীরু ডাকাত বা ইংরেজ কর্মকর্তা লারমার সাহেব সংবাদ তারই উদাহরণ। আবার লারমার সাহেবের মৃত শিশুপুত্রের সমাধির চিত্রটি আঁকার সময় তিনি প্রকৃতির মমতাকেও যেন দেখতে পেয়েছেন দিব্যদৃষ্টিতে। মনোগত জীবনের প্রবাহ, অহমিকার পরিণতি, মন-প্রকৃতির সম্বন্ধ বিষয়ে বিভূতি তাঁর নিজ জীবনদর্শনকে উপন্যাসের অন্তরালে প্রচ্ছন্নভাবে বহমান রেখেছেন সতর্ক প্রয়াসে। ফলে উপন্যাসটিতে প্রকৃতির কথা ও উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের মনের কথা আবর্তিত হয়েছে জালের বুননের মতো এবং কোনো কোন স্থানে যুক্ত হয়েছে ঔপন্যাসিকের চিন্তা, একটি প্রবাহের মতো করে।

পুতুলনাচের ইতিকথা

পুতুলনাচের ইতিকথা নিয়ে প্রথমেই এটি না বললে নয়: এ উপন্যাসের ভাষা একেবারে ঝরঝরে, পিচ্ছিল, সহজ-পাঠ্য, কিন্তু কাব্যিয় মাদকতায় ভরা। পাঁচালীর ভাষা সেকালের সাধুরূপ, আবার একই সাথে যশোর-কুষ্টিয়া এলাকার গ্রাম্য শব্দের ছড়াছড়ি, কাজেই পঠন সামান্য আয়াস-সাপেক্ষ। ইতিকথা পড়া যেন পিচ্ছিল পাহাড় থেকে আপনি গড়িয়ে পড়া; বাক্যগুলোও সহজ-পাঠ্য। ভাষা সাধু হলেও মনে হয় এ যেন চলতি রূপেরই আরেক রূপ। এখানে সংলাপগুলোও কাব্য গোছের—সবাই একই স্টাইলে কথা বলে। মানুষ একেকজন একেক স্টাইলে কথা বলে থাকে; শব্দের চয়ন ও প্রকাশ থেকেও চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করা যায়। ঔপন্যাসিকেরা সেদিকে খেয়াল রেখে সংলাপকে চরিত্রোচিতও করে থাকেন। তবে এককালে অনেকেই সংলাপও সাধু ভাষায় লিখতেন; এখানে চরিত্রকে বুঝতে হয় সংলাপের স্টাইল নয়, তার মধ্যকার তথ্য থেকে। ইতিকথার সংলাপও অনুরূপ—ফারাকটা হচ্ছে এখানে যে, সংলাপ চলতি ভাষার ও কাব্যিক ঢংয়ের।

rokimg_20150611_37798

মানিকের পদ্মানদীর মাঝি এবং পুতুলনাচের ইতিকথার মধ্যে কোনটি সেরা তা নির্ধারণ করা যেমন কঠিন তেমনই ইতিকথার বিশ্লেষণ করাও কঠিন। সবচেয়ে ভাল পন্থা হলো নিজেই উপন্যাসটি পড়ে দেখা। সম্ভবত যেকোনো পাঠকই উপন্যাসটি একাধিকবারও পড়ে ফেলতে পারবেন অনায়াসে ও সানন্দে।

বিদেশী একটি উপন্যাসের সাথে এর একটি তুলনা করার চেষ্টা করা যেতে পারে। টমাস হার্ডির উপন্যাস টেস অব দি ডি’আরবারভিলসকেও তার সেরা উপন্যাস বলা না গেলেও সেটিকে একটি অনন্য উপন্যাস বলা যায়, তার মধ্যে বিদ্যমান কাব্যময়তার কারণে। এ কাব্যময়তা কিন্তু সেখানকার গ্রামের মানুষের চিত্রকে বদলিয়ে ফেলেনি। সেরকম একটি উপন্যাস বাংলায় পড়ার ইচ্ছাকে খানিকটা হলেও পূরণ করা যেতে পারে ইতিকথা পড়ে।

টেস একটি শুদ্ধ-নির্মল নারী: প্রাকৃতিক, আকর্ষণীয়া এবং দরিদ্র। হার্ডির উপন্যাসটি টেস নামক পুতুলের নাচের, বিধ্বস্ত টেস’য়ের ইতিকথা। কিন্তু আমাদের ইতিকথার পুতুল কে? কুসুম? নাকি শশী নিজেই? প্রকাশ্যতঃ কুসুম; কিন্তু অনুমান করা যায়, শশীই বিধ্বস্ত পুতুল—আবার এটিও ঠিক যে, শশীর ধ্বসের আরও নানা কারণ রয়েছে। উপন্যাসে আরেক পুতুল হচ্ছে মতি নামের মেয়েটি। কুমুদ-মতির কাহিনী শশী-কুসুমের সমান্তরাল কিন্তু বিপ্রতীপ নাচের ইতিকথা। মতি কাঁচা মাটি, কিন্তু পরিণতি টেস’য়ের মতো নয়। আর কুসুম পাকা, রঙ্গময়ী ও রহস্যময়ী। হার্ডির টেস-কেন্দ্রিক উপন্যাসের ব্যাপ্তিকে ছাড়িয়ে মানিকের উপন্যাস বিস্তৃততর হয়েছে—এটি অন্যটির মতো এক-কেন্দ্রিক নয়। মানিকে জীবন বহু মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে; এখানে সকলেই পুতুল: হারুর শবদেহ থেকে পরান, যামিনী কবিরাজ, সেনদিদি, গোপাল, বিন্দু, সবাই। তবে গভীরতার বিচারে টেস-ট্র্যাজেডি অতলগামী, মানিকের বেলায় সকলই যেন স্বাভাবিক।

গণদেবতা

সবশেষে গণদেবতার কথা। অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভাজন, সাংস্কৃতিক বিভাজন, নিষ্ঠুর–দাম্ভিক অসাম্যভিত্তিক চিন্তা তাড়িত সামাজিক মিথোস্ক্রিয়ার বিদ্যমানতা, একের অহমিকা ও অপরের বঞ্চনা ইত্যাদিকে জীবন-ভাবনায় বড় করে দেখা হলে একজন যেরকম উপন্যাস লিখতে চাইবেন ঠিক সেরকম একটি সফল ও শক্তিমান উপন্যাস হচ্ছে এই গণদেবতা। এ উপন্যাসে ভাষা আগ্রাসী ও উৎকট, বর্ণনধারা ঝর্ণার মতো সংক্ষুব্ধ ও নৃত্যপরা, কিন্তু সাবলীল। ভাষায় প্রশান্তের গাম্ভীর্য নেই, আছে এমনকি পরিহাসেরও ধার। ঘটনার বিবরণে এ উপন্যাসে রয়েছে অভিঘাতমূলক নাটকীয়তা।

17253178._UY200_

একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, একেবারে প্রথম পরিচ্ছেদটি থেকেই। উপন্যাস শুরু হয়েছে এ দুটি বাক্য দিয়ে: ‘কারণ সামান্যই। সামান্য কারণেই গ্রামে একটা বিপর্যয় ঘটিয়া গেল।’ কিন্তু এখানে পরিহাস বা আয়রনি’টা হচ্ছে এই যে, প্রকৃত প্রস্তাবে কারণটা মোটেই সামান্য নয়, বরং এর মধ্যেই নিহিত আছে শ্রেণি-দ্বান্দ্বিক সংকটের চরম রূপ। অন্যদিকে, এ পরিচ্ছেদটি শেষ হয়েছে একটি বিরাট ঘটনার মাত্র একটি বাক্য সম্বলিত বিবরণের মধ্য দিয়ে। অকস্মাৎ বজ্রপাতের মতো বাক্যটি লেখা হয়েছে এভাবে: ‘পরদিন প্রাতে শোনা গেল, অনিরুদ্ধের দুই বিঘা বাকুড়ির আধা-পাকা ধান কে বা কাহারা নিঃশেষে কাটিয়া তুলিয়া লইয়াছে।’ গোটা সাতেক পৃষ্ঠার এ প্রথম পরিচ্ছেদটি—যেখানে উপন্যাসের প্রধান প্রধান সব নিয়ন্ত্রক চরিত্রগুলোর সাথেই পাঠকের পরিচয় ঘটে যায় এবং ঘটে তাদের মধ্যকার অন্ত:সম্পর্কের স্বরূপ উন্মোচন—আড়াইশ’ পৃষ্ঠার উপন্যাসটির এমন একটি সারমর্ম যা পুরো উপন্যাসটির প্রতিনিধিত্বকারী স্বয়ংসম্পূর্ণ অণু-উপন্যাস হয়ে উঠেছে।

এ উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরাও সকলে গ্রামেরই বাসিন্দা—তবে এ গ্রাম বিভূতির বা মানিকের গ্রামের মতো শান্ত-স্নিগ্ধ নয়। এতে যেন শহরের বাতাস এসে লেগেছে—কামার-কুমার-ছুতোরগুলো যেন সব শহুরে শ্রমিক, পয়সাওয়ালা মাতবর গোছের লোকগুলো যেন বস্তির সরদার। আর ক’জন গণ্যমান্য মানুষ—তারাও যেন অপদার্থ, শক্তিহীন, নিজের উপর বিরক্ত। পথের পাঁচালী বা পুতুলনাচের ইতিকথায় রাষ্ট্রের হাতের দেখা মেলে না, অপরাধ ও ত্রাসের সাক্ষাত আমরা পাই না। গণদেবতায় রাতের আঁধারে ধান কেটে নিয়ে যাওয়া, ঘরে আগুন লাগানো, মামলা-মোকদ্দমা, পুলিশ-তহশিলদারের আনাগোনা রয়েছে। সে অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। মোটকথা, মানুষগুলো সকলেই যেন সর্বদাই তেতে আছে, স্বার্থের দ্বন্দ্বে মারমুখো হয়ে কেবলই ফুঁসছে। তবে তিনটে উপন্যাসের প্রতিটিকে অন্যদুটোর পরিপূরক হিসেবে দেখলে আমরা একটি পূর্ণতর সমগ্র পাই বলেই মনে হয়।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি