ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আগেই বলেছি যে, সুবর্ণ বিধির প্লাটিনাম রূপের নিজেরই আবার দুটি রূপ রয়েছে। একটি ইতিবাচক—যা স্বনির্ভর ও স্বাধীন মানুষের জন্য প্রয়োগযোগ্য প্রেম বা মমতার কথা বলে, এবং অন্যটি নেতিবাচক—যা প্রতিরক্ষার কথা বলে। এখন দেখা যাক এ রূপ দুটি কিভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

প্লাটিনাম রূপের ইতিবাচক রূপ

“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যা অর্জন কর বা আমরা পৃথিবী থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপন্ন করে দেই, তার উত্তম অংশ অন্যকে দাও, মন্দ অংশ দেয়ার ভাবনাটি পর্যন্ত করো না, যেহেতু গ্রহণের বেলায় তোমরা তা থেকে চোখ সরিয়ে থাকো। আর সচেতন থেকো যে, আল্লাহ অভাবমুক্ত ও প্রশংসিত। শয়তান তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা দারিদ্র্যের প্রতিশ্রুতি এবং (কার্পণ্যের মত) নোংরা কাজটিতে উৎসাহ যোগায়। অথচ আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে দিচ্ছেন ক্ষমা ও প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতি এবং আল্লাহ সর্বাধিকারী ও সর্বজ্ঞ। তিনিই নির্ধারণ করেছেন প্রজ্ঞা বণ্টনের (বা সম্প্রসারণের) নীতি, আর যাকে প্রজ্ঞার অধিকারী করা হয়েছে সে তো নিশ্চিতভাবেই পেয়েছে শুভকে ও প্রাচুর্যকে। কিন্তু বোধসম্পন্নেরা ছাড়া কেউ যে ভেবে দেখে না!” (কোরান ২:২৬৭-২৬৯)

এবার আমরা পরীক্ষা করে দেখি কোরানের ২:২৬৭-২৬৯ আয়াত তিনটির অংশগুলোকে। প্রথমে মূল সূত্রটি সেখান থেকে তুলে ধরছি।

“তোমরা যা অর্জন কর বা আমরা পৃথিবী থেকে যা তোমাদের জন্য উৎপন্ন করে দেই, তার উত্তম অংশ অন্যকে দাও; মন্দ অংশ দেয়ার ভাবনাটি পর্যন্ত করো না, যেহেতু গ্রহণের বেলায় তোমরা তা থেকে চোখ সরিয়ে থাকো।” (১৫)

এখানে প্রকাশ ভঙ্গিটি গভীর ভাবে পরীক্ষা করে দেখার জন্য অনুরোধ করছি পাঠককে। এখানে যা পাওয়া যাচ্ছে তা হলো-

ক) এখানে আমি নিজে অন্য মানুষের থেকে প্রত্যাশা-মুক্ত অর্জনকারী; অর্জনের দুটি উৎসকেই তুলে ধরা হয়েছে এখানে: আমি আমাদের জ্ঞান দিয়ে শিল্প/কৃষি/ব্যবসা/ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে নিয়োজিত থেকে নিজ শ্রমে যা অর্জন করি এবং প্রকৃতির অবারিত দান যা আমি প্রত্যাশা-মুক্তভাবে পেয়ে থাকি। এখানে অর্জন বা প্রাপ্তি কেবল বস্তুগত বিষয়-সম্পত্তির মধ্যেই সীমিত নয়, জ্ঞান, আচরণ, সহায়তা সবই এর মধ্যে গণনীয়।

খ) এখানে নির্দেশটি এসেছে প্রথমে ও শর্ত-হীনভাবে। তারপর যুক্তিটি। যুক্তির মধ্যে মনের দুটি অবস্থাকে নির্দেশ করা হয়েছে একসাথে:

ভালটা দাও, কারণ তুমি মন্দটা পেলে আহত হও। (১৬)
(আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে এমনটা বোধ করতে পারেন)

ভালটা দাও, কারণ নেবার বেলা তুমি ভাল-মন্দ নিরপেক্ষ। (১৭)
(নিষ্কাম মনের অধিকারী ব্যক্তির বেলা এটি প্রযোজ্য হয়)

গ) যুক্তিটি রুপালী বা সুবর্ণ উভয় রূপে অনুসৃত ঢংয়ের বিপরীত। রূপালি রূপের ক্ষেত্রে যুক্তি ও প্রয়োগ উভয়টি নেতিবাচক, অন্যদিকে সুবর্ণ রূপে উভয়টি ইতিবাচক। যেমন, নিজের জন্য যা চাও না অন্যকে তা দিও না, অথবা নিজের জন্য যা চাও অন্যকে তা দাও। কিন্তু কোরানের বেলা আমরা দেখছি বিপরীত অবস্থা। ‘ভালটা দাও, কারণ ভালটা পেলে খুশি হও’ না বলে বলা হল ‘ভালটা দাও কারণ মন্দটা পেলে আহত হও অথবা তুমি ভাল-মন্দের ধার ধার না’। এখানে প্রত্যাশার বিলোপ দেখতে পাচ্ছি ও আত্মসম্মানবোধের বিকাশ দেখছি। অর্থাৎ অন্যের কাছ থেকে ভালটার প্রত্যাশা আমার নেই, কিন্তু কেউ নিজে থেকে অযাচিতভাবে মন্দটা উপহার দিয়ে গেলে আহত হই, অথবা ভাল দিল কি মন্দ দিল তা নিয়ে আমি ভাবিত নই।

ঘ) এটিকে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে না দেয়ার কোনো যুক্তি বের করা যায় না। সুবর্ণ রূপকে উল্টালে দাঁড়ায়: ‘কেউ আমাকে না দিলে আমি তাকে দেব না’। কিন্তু কোরানের প্রকাশভঙ্গীর ক্ষেত্রে, প্রত্যাশার অভাব এবং অযাচিত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমার নিজের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই (আহত হওয়া বা নিষ্কাম হওয়া) আমাকে বাধ্য করছে দিতে এবং ভালটা দিতে।

ঙ) বিধির এই রূপে যে তাৎপর্য নিহিত আছে তার দৈনন্দিন প্রয়োগটা হচ্ছে সমরূপতার নীতি থেকে ভিন্ন ভাবে। সুবর্ণ বিধির সুবর্ণ রূপ সমরূপ আচরণের বা লেন-দেনের কথা বলে। কিন্তু এখানে বেশিটার কথা বলা হচ্ছে। আমার সম্বন্ধে কেউ এতটুকু ভাল চিন্তার প্রকাশ ঘটালে আমি তার জন্য আরও বেশী ভাল চিন্তা করবো। আমার সাথে কেউ এতটুকু ভাল আচরণ করলে আমি তার সাথে তার চেয়েও ভাল আচরণ করবো। কেউ আমাকে এতটুকু দিলে আমি তাকে তারও বেশী দেব। অর্থাৎ ভালর প্রত্যাশার বিপরীতে সমরূপ ভাল দেয়ার ব্যবসার বদলে আমি এখানে অধিকতর ভাল দিয়ে দিয়ে ভালর প্রতিযোগিতায় নামছি। এটিকে আবার নেতিবাচক কাজের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়। কেউ আমার ক্ষতি করলে আমি তাকে ক্ষমা করবো অথবা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ক্ষতির পরিমাণের চেয়ে যত পারি কম নেব। কেউ আমার সাথে মন্দ আচরণ করলে, আমি তার সামনে হাজির হবো ভাল আচরণ নিয়ে।

এখানে এই প্রকাশ ভঙ্গিটি বা এই প্লাটিনাম রূপটি গ্রহণ করলে মনোগত প্রত্যাশা থেকে জাত দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হওয়া যায়। অন্যদিকে, ভালর জন্য প্রতিযোগিতা থেকে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে ঐশ্বর্যের আয়তন; আর এই প্রতিযোগিতায় নামতে অনীহাই কার্পণ্য। এটি পরে বলা হলো এভাবে-

“শয়তান তোমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা দারিদ্র্যের প্রতিশ্রুতি।
এবং (কার্পণ্যের মত) নোংরা কাজটিতে উৎসাহ যোগায়।
আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাদেরকে দিচ্ছেন ক্ষমা ও প্রাচুর্যের প্রতিশ্রুতি।”

তারপর বলা হচ্ছে, সুবর্ণ বিধির এই নতুন রূপটিকে—যার মধ্যে আগের রূপগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকছে, বাতিল হচ্ছে না—গ্রহণ করার আবেদন ও যুক্তি।

সুবর্ণ বিধির আগের রূপগুলো ঈশ্বরই দিয়েছিলেন বা সমর্থন করেছিলেন, এখন সম্প্রসারিত করলেন; যেন আমরা আরও উপরে উঠতে পারি। মানুষের ও মানব সমাজের বিকাশের সাথে সাথে তার প্রজ্ঞার বিস্তার ঘটে, তার সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়; আর সে অনুসারে বিধির রূপ বদলায়। এটি এভাবে বলা হল-

“তিনিই নির্ধারণ করেছেন প্রজ্ঞা প্রসারণের নীতি, আর যাকে প্রজ্ঞার অধিকারী করা হয়েছে সে তো নিশ্চিতভাবেই পেয়েছে শুভকে ও প্রাচুর্যকে।”

তারপর থাকল আবেদনটা আর আক্ষেপটা, একসাথে:

“কিন্তু বোধসম্পন্নেরা ছাড়া কেউ যে ভেবে দেখে না!”

এখন আমরা যদি ঈশ্বর-বিচ্ছিন্ন অথচ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন জনের নিমিত্তে একটি সুবর্ণ বিধি রচনা করতে চাই, তবে তার প্রকাশটা কেমন হতে পারে?

‘আমি নিজে যা অর্জন করি বা প্রকৃতি থেকে যা পাই তার ভাল অংশটা অন্যকে দেই কারণ মন্দটা পেলে আমি আহত হই বা আমি নিষ্কাম।’

এর বাইরে তাঁর যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এখন যদি তাঁকে ‘কেন দেন?’, ‘ভালটা কেন?’, ‘সমানটা নয় কেন?’ জিজ্ঞেস করা যায় তবে কী উত্তর দিতে পারেন তিনি? আমি নিজে সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই ও অন্যদেরকেও সুন্দরভাবে বাঁচতে দিতে চাই—এছাড়া আর কি কোনো উত্তর হয়? এর অর্থ হলো: আমি এতো বড় চৈতন্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে প্রজাতির ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করেছি—যেহেতু এর চেয়ে বেশী কিছু আমি জানি না, দেখি না, শুনি না।