ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

একটা কাল ছিল। গ্রামের তাবৎ জমির মালিক ছিল জমিদার; সে নিজে জমি চাষ করতো না। যারা চাষ করতো তাদেরকে বলা হতো রায়ত। খুব ভাল জীবন যাপন করেনি রায়তেরা। দারিদ্র্যের মধ্যেই তারা জন্মাতো এবং কষ্ট-যন্ত্রণায় ভুগে ভুগে একদিন মরতো। জঠর-জ্বালায় জমিদারের দ্বারস্থ হলে রায়তের কপালে সের কতক চাল যে জুটতো না তা নয়, নসীবে থাকলে গোটা দুয়েক আমও হয়তো জুটতো। তা-ই পেয়ে রায়ত ‘আজ্ঞে কত্তা, পেন্নাম, আপনি সাক্ষাৎ ভগবান’ বলে ভক্তিতে পিছপা হয়ে কাচারি ছাড়তো। আজকাল আর আম দিতে হয় না। আমি একালের রায়ত। আম নয়, আমের একখানা ছবি পেলেই খুশিতে ডগমগ—লাইক খেয়ে খেয়েই জনম আমার সার্থক।

অদৃশ্য ঈশ্বরকে যদি ধরা হয় বাস্তব, তবে তার সৃষ্ট ও আমাদের দ্বারা দৃষ্ট জগতটাও হয় বাস্তব। মানুষের তৈরি ছবির দুনিয়াটি হয় সিমুলেশন। ছবির দুনিয়ায় আমার ও আমার সন্তানের বসবাস। একসময় আমার কাছে গাছটা, নদীটা, পাহাড়টা, খেলার মাঠটা ছিল বাস্তব। আজ আমার সন্তানের কাছে গাছ-নদী-পাহাড়ের ছবি বাস্তবাধিক বাস্তব। ইমেজ, সাইবারনেট, কম্পিউটার, রোবট, এআই—সবই প্রযুক্তি। প্রযুক্তির সাথে মানবের পরিচয় বহু বহু কালের পুরনো। যেসময়ে মানুষ পাথরের বল্লম, চাকা তৈরি করেছিল, আগুন, লোহা, তামা আবিষ্কার করেছিল সে সময়ের মানুষেরাও প্রযুক্তিই সংগ্রহ করছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এভাবে আগেও ছিল। তারপরও তারা বাস্তব জগতেই বসবাস করতো, প্রযুক্তি নিয়ে তারা বাস্তব জগতেরই সম্মুখীন হতো।

কিন্তু একালে প্রযুক্তি এমন একটি উন্নত ও বিস্তৃত অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, বাস্তব জগত থেকে উধাও হয়ে যাওয়া মানুষের যেন ভবিতব্য হয়ে গিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন মানুষও সম্ভব হবে যে কি না সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকবে গায়ে এককাড়ি সেন্সর লাগিয়ে। নেটওয়ার্কে যুক্ত থেকে সে অফিস করবে কম্পিউটারের মাধ্যমেই। তার গায়ে সুঁই ফুটানো থাকবে খাবারের জন্য, রোবট থাকবে নলে খাবার পুড়ে দেয়ার জন্য। মানুষটা বন্ধুদেরকে সাথে নিয়ে সিনেমা দেখবে, খেলবে, সাগরপারে ঘুরে বেড়াবে, আড্ডা দেবে—সবই বিছানায় পড়ে থেকে। আবার এই বন্ধুগুলো সিমুলেটেড ও ইন্টারএকটিভ কম্পিউটার প্রোগ্রাম মাত্রও হতে পারে।

এমন একটা জীবনের অর্থ কী? ঈশ্বরের দেয়া দেহটা থেকেও নেই, ঈশ্বরের দেয়া জগতটা থেকেও নেই। শুধু ম্যান মেইড ইমেজের স্ট্রীম ও তার ভোক্তা। আত্মাকে বলা হয়েছিল যন্ত্রের ভূত। সেই ভূত তাড়াতে গিয়ে এখন আমরা ভুতের যন্ত্র হয়েই উঠছি। এমন জীবনেরই একটি প্রাথমিক রূপ আমি দেখতে পাচ্ছি আমার সন্তানের জীবনে।

জলের অপর নাম জীবন। এ জলে নৌকা ভাসিয়ে মানুষ সাগরও পাড়ি দেয়। কিন্তু জল যদি নৌকায় ঢুকে পড়ে তবে জলেই মরণ। একালে ছবির দশাও একই রকম। ছবি, ইন্টারনেট, কম্পিউটার সবই ভাল; আমরা যোগাযোগ করতে পারি, তথ্য সংগ্রহ করতে পারি ইত্যাদি। কিন্তু ছবি যদি মনের ভেতর ঢুকে পড়ে চরম বাস্তবতা হয়ে তখন মরণ। ছবিসর্বস্বতা দেহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অন্য মানুষ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে। এ যেন দুধের স্বাদ ঘোলের পাতিলের ছবি দেখে মেটানো। দুধ যদি বাস্তব হয়, তবে ঘোল সিমুলেশনের ফার্স্ট অর্ডার, পাতিল সেকেন্ড, পাতিলের ছবি থার্ড—পাতিলের ছবির ভেতরে ঘোলটাও থাকে না। আগে ঘোল খাওয়ার জন্য আধা মাইল রোদে হেঁটে গিয়ে যদি দেখতাম ঘোলওয়ালা নেই, তবুও ফেরার পথে মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম: ঘোল খেতে গিয়ে ঘোল খেয়েই ফিরলিরে মন! আজ কোনো ঘোলই আমার কপালে নেই।

“মানুষ গাড়ি তৈরি করে, এই গাড়ি আবার মানুষকে বদলায়। টেকনোলজি মানুষের প্রতিপালক। মানুষ তার পরিকল্পনায় রূপান্তরিত হয় এবং হবে। এটাই প্রগতি। একেই সৌভাগ্য হিসেবে বরণ করে নিতে হবে।”—কিন্তু তা নিয়ে ফার্মের মুরগির মতো দুর্বল জীবনের অধিকারী হয়ে থাকবো, নাকি শিক্ষা ও যোগাযোগের বাস্তবসম্মত একান্ত প্রয়োজনের বাইরে এই গ্র্যান্ড সিস্টেম থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব বিযুক্ত করে রাখবো সেটা এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বলা হয়ে থাকে, নীটশে হচ্ছেন বর্তমান যুগের রূপকার। কিন্তু তিনি কি এধরণের পঙ্গু মানুষের স্বপ্ন দেখেছিলেন? না। তিনি ক্ষমতাবান মানুষ বলতে বুঝেছিলেন আত্মশক্তিতে বলিয়ান মানুষকে। এটা সম্ভব হতে পারে, উন্নত টেকনোলজি জাত কোনো ক্র্যাচযুগল আমার পা’দুটো থেকে অনেক বেশী দক্ষ হয়ে উঠবে। কিন্তু আমি যে ক্র্যাচেই ভর করি না কেন, তখন কি লোককে জানান দেব না যে, আমার পা দুটো অকেজো? আমি পঙ্গু? ক্ষমতার ইচ্ছা আর যন্ত্রের ইচ্ছা যেমন এক নয়, তেমনই ক্ষমতার ইচ্ছা ও ছবির ইচ্ছাও এক নয়।

নারীবাদী লেখিকা উলস্টনক্রাফটের কন্যা মেরি শেলি ছিলেন কবি শেলির পত্নী। তার লেখা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সেকালে বসে দেখা ভবিতব্যের চিত্র। সেদিনের রোমান্টিকতাবাদীরা চিন্তায় পড়েছিলেন। কিন্তু ভাবতে কি পেরেছিলেন ভবিষ্যতটা আমার মতো ছবিসর্বস্ব মানুষদের দুনিয়া হয়ে যাবে? রাও নেই, মাত নেই; নিরীহ গোবেচারা; স্টাইলটুশ, ফানটুশ আর ইমেজ ড্রিংকার? আমাদেরও কি এখন আরেকটি নতুন রোমান্টিকতাবাদী আন্দোলন দরকার? আরবের লোকেরা এককালে মদের পিপা ভেঙ্গে মরুভূমি ভাসিয়ে দিয়েছিল। মদ না খেলেও চলে, আরও ভাল করেই চলে। কিন্তু ল্যাপটপ, ট্যাব, স্মার্টফোন ছাড়া তো চলে না। কিন্তু এগুলোর মধ্যে যে মাদকতা আছে, নেশা আছে তা ভাঙার উপায় কী? তা থেকে বাঁচার উপায় কী?

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি