ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

সরকার উন্নয়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে দেশের নানা সেক্টরে, সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানে। এখন মন্ত্রণালয়গুলো, তাদের অধীন বিভাগগুলো ও সংস্থাগুলো বছরের শুরুতে উন্নয়নের নানামুখী পরিকল্পনা নিচ্ছে, বছর শেষে লক্ষ্য অর্জনে সাফল্যের মূল্যায়ন হচ্ছে, অর্জিত মোট সাংখ্যিক মান দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ‘কী পারফরমেন্স ইনডিকেটর’ বা কেপিআই নির্ধারিত হচ্ছে। মন্ত্রণালয়গুলো সরকারের সাথে বছরের শুরুতে রীতিমতো চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে, সংস্থাগুলো প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। এ চুক্তি লিখিত এবং উভয় পক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্তৃক স্বাক্ষরিত হচ্ছে। কেবল যে দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে তা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যপদ্ধতিতে উন্নয়ন এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মচারীদের কর্মদক্ষতায় উন্নয়নও এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এজন্য দাতা দেশগুলোর চাপ যেমন রয়েছে, তেমনই তারা জ্ঞান ও পদ্ধতি দিয়ে সহায়তাও করছে। তাদের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিষ্ঠার সাথে কাজ করেও চলেছে।

বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই নিজের নজরদারীর মধ্যে রেখেছেন, নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছেন ও বাধা-বিঘ্নগুলো কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় কোঅর্ডিনেশনগুলোও করছেন। বিগত কয়েক বছরে দেশে যেরূপ উন্নয়ন হতে দেখা গেছে আগে সেরূপ দেখা যায়নি। তাছাড়া নানা ধরণের ফরমাল ও ইনফরমাল প্রশিক্ষণ প্রবর্তিত হচ্ছে, কোর্স ম্যাটেরিয়াল তৈরি হচ্ছে, প্রশিক্ষণের হিসাব নিয়মিত পাঠাতে হচ্ছে। তবে কেপিআই-এর ব্যাপারটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সাধিত হচ্ছে। উন্নয়নের জন্য অর্থ দরকার। সরকার অর্থ পায় ট্যাক্স থেকে। ভ্যাটের পরিসর বাড়ানোর জন্য সরকার তাই সঙ্গত কারণেই খানিকটা মরিয়া হয়েছে বলা যায়। এজন্য সরকার অনেক কাজ করেছে, নতুন নতুন ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপিত হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান আগে ভ্যাটের আওতায় ছিল না এখন সেগুলোকে আনা হচ্ছে।

কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে টিউশন ফী-এর উপর ভ্যাট আরোপ করা নিয়ে দেশে বিতর্ক শুরু হয়েছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অসন্তোষের প্রেক্ষিতে। যিনি একশত টাকা বেতন দিতে পারেন তিনি আরও ৭ টাকা দিতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, যেখানে বেতন অনেক কম, সেখানেও তো অনেক কম ভ্যাটই প্রযোজ্য হতো। যিনি ১০ টাকা বেতন দিতে পারেন তাকেও কেন ৭০ পয়সা ভ্যাটের আওতায় আনা হবে না? হতে পারে, সরকার যখন ভর্তুকি দিচ্ছে, শিক্ষার্থীর কাছ থেকে নেয়া অল্পকিছু টাকা সরকারের কোষেই জমা হচ্ছে, কাজেই একটা অংশ আলাদা করে ভিন্ন নাম দেয়া আর না দেয়া একই কথা। কিন্তু নামটা থাকলে বলা যেত, সবাইতো দিচ্ছে।

সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই ভ্যাটের আওতায় আনার পক্ষে ওকালতি করার জন্য এ লেখা নয়। বরং শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানেই ভ্যাট আরোপ না করাই ভাল হবে। আমাদের দেশের মতো দেশে এখনও শিক্ষার বিরাট ব্যয়ভার জনগণই বহন করে। প্রাইমারি শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে, এমনকি ছেলেমেয়েদেরকে স্কুলে আসতে উৎসাহী করার জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাবলিক স্কুল, কলেজ এবং বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর শিক্ষা খরচের একটি বিরাট অংশ জনগণ বহন করে। এর যুক্তিও আছে। কিন্তু সরকার তো সবার জন্য শিক্ষার চাহিদা এভাবে পাবলিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শতভাগ পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। সরকার নিজেই প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছে শিক্ষাকে আরও প্রসারিত করার লক্ষ্যে। কিন্তু প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান তো সমুদয় খরচ শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছ থেকেই নেবে। ফলে এর জন্য অনেক বেশী টাকা গুণতে হয় অভিভাবকদেরকে।

বেশি টাকা ধনীদের কাছে আছে বলেই কী শিক্ষার জন্য ভ্যাট নিতে হবে? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ধনীদের ছেলেমেয়েরা পড়ে না? অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরাও কি এখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না? সরকার একদলের জন্য ভ্যাট না নিয়ে উল্টো জনগণের করের টাকা থেকে প্রদান করবে আর অন্যদের বেলায় তাদের কাছ থেকে ভ্যাট নেবে কেন? যতই বলা হোক ট্যাক্স দেবে প্রতিষ্ঠান—কিন্তু এর ভিত্তি কী? ব্যবসায়িক লাভের মধ্য থেকে একটা অংশ ট্যাক্স হিসেবে নিলে দাম বাড়ানোর যুক্তি থাকে না, কিন্তু মূল্যের উপর ট্যাক্স আরোপ করলে তা প্রতিষ্ঠানটি কোথা থেকে এনে দেবে? ভ্যাট তাই গড়াতে গাড়তে গিয়ে ভোক্তার উপরই বর্তায়। ভ্যাট আরোপে রসগোল্লার দাম বেড়েছে, টিউশন ফী আজ না বাড়ুক কাল বাড়বে, আর তখন এই ভ্যাটকে কাড়ায় গন্ডায় হিসাবে নেয়া হবে। শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার যখন নিজেই পাবলিক সেকটরে ব্যয়ভার বহন করছে, তখন প্রাইভেট উদ্যোগের ক্ষেত্রে টাকা দিতে না পারুক, অন্তত ভ্যাট আরোপ করা থেকে বিরত থাকুক।

প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করছে, বেশী টাকা ফী নিচ্ছে—এ অভিযোগ যদি সত্য হয় তবে উল্টো প্রশ্ন করা চলে, সরকার তা নিয়ন্ত্রণে কী করছে? সরকারের অনুমোদন ছাড়া তো কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় না। এবং নীতিমালা অনুসরণ না করলে সেগুলোকে চলতেই-বা দেয়া হয় কেন? যদি বলা হয়, না এদের মালিকগুলো সব হারে হারে ব্যবসায়ী, নানা কারণে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না, তবে এটিই কি সত্য হয়ে উঠবে না যে, এই ভ্যাট আরোপ তাদেরকে ছুতা দেবে, ভবিষ্যতে ভ্যাটের নাম ভাঙ্গিয়ে তারা ফী বাড়িয়ে দেবে এবং সরকার এখনকার মতো সেদিনও তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না?

ভ্যাট দ্রব্যের উপর, সার্ভিসের উপর আরোপিত হয় এবং বিলাসদ্রব্য বা সার্ভিসের উপরই সাধারণত আরোপিত হয়। রসগোল্লার উপর ভ্যাট আরোপ করা হলে ধনী-গরীব সকলকেই ভ্যাট দিয়েই খেতে হয়। সরকারী কারখানার মিষ্টি খেতে ভ্যাট লাগবে না, কিন্তু প্রাইভেট কারখানার ক্ষেত্রে লাগবে—এমনটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত, সেটা একটা প্রশ্ন। সারের মূল্য কম রাখতে সরকার যদি উৎসাহী হয় এবং ভর্তুকি দেয়, তবে প্রাইভেট সার কারখানার বেলায় ভ্যাট আরোপের চিন্তা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে?

জাতীয় উন্নয়নের জন্য ভ্যাটের পরিসর বাড়ানো অবশ্যই দরকার। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত তা সম্প্রসারিত না করলেই ভাল হতো। বিষয়টা কেবল ভ্যাট দিতে পারা বা না পারার সাথেই জড়িত নয়—এর সাথে নীতি ও যুক্তির সম্পর্ক আছে বলেও মনে হয়।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচি